কক্সবাজারে ত্রিমুখী সংকটে মৎস্য খাত, সাগরে যাচ্ছে না শত শত ট্রলার

জ্বালানি তেলের কৃত্রিম সংকট এবং জলদস্যুদের আতঙ্কে স্থবির হয়ে পড়েছে কক্সবাজারের মৎস্য খাত। লোকসান গুনতে গুনতে ক্লান্ত হয়ে অনেক মালিক তাদের ফিশিং ট্রলার উপকূলে নোঙর করে রেখেছেন। এতে জেলাজুড়ে কয়েক লাখ জেলে পরিবার এখন চরম অর্থ সংকটে দিনাতিপাত করছে। কক্সবাজার জেলা মৎস্য ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির সভাপতি শওকত ওসমান ফারুক জানিয়েছেন, বঙ্গোপসাগরে মাছের তীব্র সংকটে মৎস্য খাত এখন খাদের কিনারায়। তিনি বলেন, প্রতি ট্রিপে ট্রলার প্রতি ৩.৫ থেকে ৪ লাখ টাকা খরচ হলেও মাছ না পাওয়ায় মালিকরা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। তেলের সংকটের চেয়েও বড় সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে সাগরের মৎস্য শূন্যতা, যা তেলের দোহাই দিয়ে আড়াল করা হচ্ছে। এই ধারাবাহিক লোকসানের কারণে অনেক ট্রলার নোঙর করে রাখা হয়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে কয়েক লাখ জেলে পরিবারের জীবন-জীবিকার ওপর। একই কথা বলছেন কক্সবাজার জেলা ফিশিং বোট মালিক সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক মোস্তাক আহমদ। তার মতে, বঙ্গোপসাগরে বিচরণ করা ফিশিং ট্রলি (ফিশিং ক্যাসল) গুলো সাগরকে মৎস্য শূন্য করে তুলছে। এসব ট্রলিগুলো নাবিকদের দ্বারা পরিচালিত হয়। ট্রলিতে থাকা রাডারের সহায়তায় মাছের অবস্থান নিশ্

কক্সবাজারে ত্রিমুখী সংকটে মৎস্য খাত, সাগরে যাচ্ছে না শত শত ট্রলার

জ্বালানি তেলের কৃত্রিম সংকট এবং জলদস্যুদের আতঙ্কে স্থবির হয়ে পড়েছে কক্সবাজারের মৎস্য খাত। লোকসান গুনতে গুনতে ক্লান্ত হয়ে অনেক মালিক তাদের ফিশিং ট্রলার উপকূলে নোঙর করে রেখেছেন। এতে জেলাজুড়ে কয়েক লাখ জেলে পরিবার এখন চরম অর্থ সংকটে দিনাতিপাত করছে।

কক্সবাজার জেলা মৎস্য ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির সভাপতি শওকত ওসমান ফারুক জানিয়েছেন, বঙ্গোপসাগরে মাছের তীব্র সংকটে মৎস্য খাত এখন খাদের কিনারায়। তিনি বলেন, প্রতি ট্রিপে ট্রলার প্রতি ৩.৫ থেকে ৪ লাখ টাকা খরচ হলেও মাছ না পাওয়ায় মালিকরা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। তেলের সংকটের চেয়েও বড় সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে সাগরের মৎস্য শূন্যতা, যা তেলের দোহাই দিয়ে আড়াল করা হচ্ছে। এই ধারাবাহিক লোকসানের কারণে অনেক ট্রলার নোঙর করে রাখা হয়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে কয়েক লাখ জেলে পরিবারের জীবন-জীবিকার ওপর।

একই কথা বলছেন কক্সবাজার জেলা ফিশিং বোট মালিক সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক মোস্তাক আহমদ। তার মতে, বঙ্গোপসাগরে বিচরণ করা ফিশিং ট্রলি (ফিশিং ক্যাসল) গুলো সাগরকে মৎস্য শূন্য করে তুলছে। এসব ট্রলিগুলো নাবিকদের দ্বারা পরিচালিত হয়। ট্রলিতে থাকা রাডারের সহায়তায় মাছের অবস্থান নিশ্চিত হয়ে তারা বিশেষ কায়দায় ছোট-বড় সব ধরনের মাছ ধরে ফেলে। এতে মাদার ও বাচ্চা মাছ ধ্বংস হওয়ায় প্রজনন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, সাগরে থাকা এসব ট্রলি ৪০ মিটার গভীরতায় মাছ শিকারের কথা থাকলেও তারা জাল ফেলে ৮-১০ মিটার গভীর সাগরে। ফলে, কাঠের ফিশিং ট্রলার মাছের দেখা পাচ্ছে না। একবার সাগরে নামতে ভোগ্যপণ্য, তেল, বরফ ও অন্যান্য সরঞ্জামসহ সাড়ে তিন থেকে ৬ লাখ টাকার মালামাল নেওয়া হয়। কিন্তু মাছহীন ফিরলেও খাবার ও মালামাল ব্যবহার হয়ে লোকসানের তালিকা দীর্ঘ হচ্ছে বোট মালিকদের। যারা ধারাবাহিক ক্ষতি সইতে পারছেন না, তারা বাঁকখালী নদীর তীরবর্তী উপকূলীয় এলাকায় বোট নোঙ্গর করে রাখছেন।

কক্সবাজারে ত্রিমুখী সংকটে মৎস্য খাত, সাগরে যাচ্ছে না শত শত ট্রলার

বোটমালিক সমিতির নেতা মোস্তাক বলেন, ইসরাইল-ইরান যুদ্ধ শুরুর পর জ্বালানি তেল জালিয়াতি শুরু হয়েছে। জলে-স্থলে বিদ্যমান তেল পাম্পগুলোতে জ্বালানি সংকট দেখানো হচ্ছে। একটা নির্ধারিত পরিমাণের বেশি তেল দেওয়া হচ্ছে না বলে প্রচার পাচ্ছে। এটাও কানে আসছে, বাড়তি দাম পরিশোধ করলে আবার চাহিদা মতো তেল মিলছে। তাই, প্রশাসনের উচিত কোনো অসাধু চক্র কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করছে কি না সজাগ দৃষ্টি রাখা।

এদিকে, পেট্রোল পাম্প মালিকরা বলছেন, কক্সবাজার উপকূলের মাছ ধরার ট্রলারের জন্য ২১টি পেট্রোল পাম্প রয়েছে। এসব পাম্পে মাসে অন্তত ১০ লাখ লিটার ডিজেলের প্রয়োজন হয়। সপ্তাহখানেক ধরে নদীর ভাসমান সব পেট্রোল পাম্পে পর্যাপ্ত ডিজেল নেই। অনেক পাম্প কার্যক্রম প্রায় বন্ধ করে দিয়েছে।

সরেজমিনে ফিশারিঘাট ও বাঁকখালী নদীর তীরে দেখা গেছে, শত শত বোট সারি সারি করে নোঙর করা। মাছ, তেল ও জলদস্যু—এই তিন সংকটে পড়ে অনেক ব্যবসায়ী এই পেশা থেকে নিজেদের গুটিয়ে নিচ্ছেন। ফলে বেকার হয়ে পড়া হাজার হাজার জেলের ঘরে এখন জ্বলছে না চুলা।

ফিশিং ট্রলার সংশ্লিষ্ট ফিশারিঘাট এলাকার ব্যবসায়ী আবু নাঈম বলেন, কোনো বোট ১৮শ থেকে ২ হাজার, আবার বড়গুলো সাড়ে ৩ হাজার থেকে ৪ হাজার লিটার তেল নিয়ে সাগরে যায়। এখন এতো তেল দেওয়া হচ্ছে না। তেল আর মাছের চেয়ে সাগরে আরেকটি সংকট হলো জলদস্যু। সাগরের যে এলাকায় অল্প-স্বল্প মাছ মিলে সেখানে সশস্ত্র জলদস্যুরা বিচরণ করে। তারা হঠাৎ হামলা ও লুটপাট চালিয়ে মাছ, রসদ ও দামি মালামাল নিয়ে যায়।

তিনি আরও বলেন, এতসব যন্ত্রণা হজম করতে না পেরে ধীরে ধীরে অনেক বহদ্দার ফিশিং বোট ব্যবসা থেকে নিজেদের গুটিয়ে নিচ্ছে। কিন্তু কিছু গরিব মানুষ এ পেশাটা ছাড়া অন্যকোনো পেশায় নিজেদের মানিয়ে নিতে পারে না বলে পেটের দায়ে ঝুঁকি নিয়ে সাগরে মাছ ধরতে যাচ্ছেন।

কক্সবাজারে ত্রিমুখী সংকটে মৎস্য খাত, সাগরে যাচ্ছে না শত শত ট্রলার

কক্সবাজার মৎস্য ব্যবসায়ী নেতা জয়নাল আবেদীন হাজারি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতির কারণে তেলের সংকট তৈরি হতে পারে। এর প্রভাব বাংলাদেশেও পড়বে। মাছ-জলদস্যু-তেল, এ তিন সংকট এক হলে কয়েক লাখ জেলে পরিবার দুর্ভোগ পোহাবে।

এদিকে বাঁকখালী নদীর উপকূলে থাকা ২১টি ভাসমান পেট্রোল পাম্পের জ্বালানি তেলের সরবরাহের ওপর নির্ভর করে কক্সবাজারের কয়েক হাজার মাছ ধরার ট্রলার চলে। এসবের মাঝে কিছু কিছু পাম্প কয়েকদিন ধরে বন্ধ রাখা হয়েছে। চালু রয়েছে বৃহৎ তেলের পাম্প চেয়ারম্যানঘাট এলাকার ফারিয়া ট্রেডিং।

পাম্পটির ম্যানেজার রিয়াজ উদ্দিন বলেন, সপ্তাহখানেক ধরে তেলের সংকট চলছে। আমাদের পাম্পে প্রতিদিন ন্যূনতম প্রায় ৯ হাজার লিটার ডিজেলের প্রয়োজন হয়। কিন্তু তেল সরবরাহ একেবারেই কম। তাই মাছ ধরার ট্রলারে চাহিদা মতো তেল দিতে পারছি না।

কোস্টগার্ডের টেকনাফ স্টেশন ইনচার্জ লে. কমান্ডার শাহিন আলম জানান, কক্সবাজারের মহেশখালী ও কুতুবদিয়া সমুদ্র দিয়ে জ্বালানি তেল পাচার ও জলদস্যুদের অপতৎপরতা রোধে বিশেষ অভিযান অব্যহত রয়েছে। অত্যাধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে কোস্টগার্ডের আওতাধীন নাফ নদী ও সমুদ্র সীমান্ত এলাকায় সকল ধরনের জলযান ও সন্দেহজনক গতিবিধি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। সমুদ্র এলাকায় ডাকাত ও জলদস্যু নির্মূলে এবং মৎস্য আহরণে থাকা জেলেদের সার্বিক নিরাপত্তায় সাঁড়াশি অভিযান চলে।

তিনি বলেন, গত দুই মাসে কোস্টগার্ডের একাধিক বিশেষ অভিযানে ৪টি আগ্নেয়াস্ত্র, ১৭টি দেশীয় অস্ত্র, ৬ রাউন্ড তাজা কার্তুজসহ ৩০ জন ডাকাত ও জলদস্যুকে আটক করা হয়েছে। এসময় ডাকাতের কবলে জিম্মি থাকা ৩২ জন জেলেকেও জীবিত উদ্ধার করে পরিবারের নিকট হস্তান্তর করা হয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

সায়ীদ আলমগীর/কেএইচকে/এএসএম

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow