কবি কাজী নজরুল ইসলাম বাংলা সাহিত্যের অন্যতম এক নক্ষত্র। যার বিচরণ ছিল সাহিত্যের প্রতিটি শাখায়। কবিতা, গান, নাটক থেকে শুরু করে সাহিত্যের সব শাখায় তিনি অবদান রেখেছেন। মাত্র ২৩ বছরের সাহিত্যিক জীবনে সৃষ্টির যে প্রাচুর্য তা তুলনারহিত। গান লিখেছেন আট হাজারেরও বেশি যার বেশিরভাগই সংরক্ষণ করা যায়নি।
শুধু কবিতা কিংবা গানই নয়, সাংবাদিকতার মাধ্যমেও কাজী নজরুল ইসলাম বিপ্লবী ধারার সূচনা করেন। অগ্নীবীণা হাতে তার প্রবেশ, ধূমকেতুর মতো তার প্রকাশ। কবি সাংবাদিক হিসেবে জীবনের গুরুত্বপূর্ণ একটা সময় ব্যয় করেছিলেন। বিংশ শতাব্দীতে তিনি একাধারে কবি, সাহিত্যিক, সংগীতজ্ঞ, সাংবাদিক, সম্পাদক, রাজনীতবিদ এবং সৈনিক হিসেবে অন্যায় ও অবিচারের বিরুদ্ধে র্সবদাই ছিলেন সোচ্চার।
সাহিত্যিক হিসেবে কবির তুলনা কবি। কিন্তু কবি ব্যক্তিজীবনে ছিলেন খুবই সাধারণ একজন মানুষ। বরং বলা যায় আর দশ জন সাধারণ মানুষের চেয়েও সাধারণ। বেশ রসিক মানুষ ছিলেন তিনি। তার কথা শুনে যে কেউ হেসে গড়াগড়ি খেতেন। হিরণ্ময় ভট্টাচার্য ‘রসিক নজরুল’ নামে একটি বই লিখেছেন। যারা বইটি পড়েননি, তাদের পক্ষে বোঝা কষ্টকর নজরুল কী পরিমাণ রসিক ছিলেন! একটা উদাহরণ দেওয়া যাক, একবার এক ভদ্রমহিলা নজরুলকে খুব স্মার্টলি জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আপনি কি পানাসক্ত?’ নজরুল বললেন, ‘না, বেশ্যাসক্ত!’ কবির কথায় ভদ্রমহিলার মুখ কালো হয়ে গেল। আর তক্ষুনি ব্যাখ্যা করলেন নজরুল, ‘পান একটু বেশি খাই। তাই বেশ্যাসক্ত, অর্থাৎ বেশি+আসক্ত = বেশ্যাসক্ত!’
কবির কথা, ব্যবহারে তার প্রেমে পড়তে বাধ্য হতেন যে কেউ। পুরুষ কিংবা নারী যেই হোন না কেন, এমনকি চরম শত্রুরাও তার ভালোবাসার শক্তির কাছে হার মেনেছেন। কবি বুদ্ধদেব বসু নজরুলকে প্রথম দেখেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলে। তিনি লিখেছেন, ‘সেই প্রথম আমি দেখলাম নজরুলকে। এবং অন্য অনেকের মতো যথারীতি তার প্রেমে পড়ে গেলাম!’ শুধু বুদ্ধদেব বসু নন, তার স্ত্রী প্রতিভা বসুও নজরুলের প্রেমে পড়েছিলেন। সেই কাহিনি নিয়ে তিনি লিখেছেন ‘আয়না’ নামে একটি গল্প। কী অবাক কাণ্ড! স্বামী-স্ত্রী দুজনেই একই লেখকের প্রেমে হাবুডুবু খেয়েছেন!
কবির লেখার জন্য কোনো বিশেষ পরিবেশ লাগত না। গাছতলায় বসে যেমন তিনি লিখতে পারতেন, তেমনি ঘরোয়া বৈঠকেও তার ভেতর থেকে লেখা বের হয়ে আসত। তবে লিখতে বসলে কবির সঙ্গে থাকত চা আর জর্দা দেওয়া পান। কবির ছিল চা আর পানের ভীষণ নেশা।
লেখার সময় চা আর থালা ভর্তি পান নিয়ে বসতেন তিনি। পান শেষ করে চা, এরপর আবার চা শেষ করে পান খেতেন। তিনি বলতেন, ‘লেখক যদি হতে চান/ লাখ পেয়ালা চা খান!’ চা তার খুবই প্রিয় ছিল। তিনি বলতেন, যে চা খায় না, সে ‘চাকর’। তীব্র চায়ের নেশার কারণে সময়মতো চা না পেলে তার মন অস্থির হয়ে উঠত এবং তার লেখালেখিও বন্ধ হয়ে যেত।
অনেকেই এর সুযোগও নিয়েছেন অনেকবার। কাজ আদায় করার জন্য কবিকে খাতা-কলম, পান-জর্দা দিয়ে একটি বন্ধ ঘরে বসিয়ে দেওয়া হতো, যেখানে তিনি চা-পান করতেন আর লিখতেন। এভাবে কত রচনা, কত কালজয়ী গান সৃষ্টি হয়ে গেছে তার সঠিক সংখ্যা বোধহয় কারো জানা নেই।
চা নিয়ে আরও একটি মজার ঘটনা আছে। চা ছাড়া কবি কিছুই লিখতে পারতেন না, গান গাইতে পারতেন না। চা নাই তার লেখাও বন্ধ, গানও বন্ধ, আড্ডাও বন্ধ। একবার তিনি ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে সংসদ নির্বাচনে দাঁড়ালেন। যেহেতু পূর্ববঙ্গে তার পরিচিতি বেশি। তাই তিনি চাইলেন পূর্ববঙ্গে জনসভা করবেন।
নজরুল বেশ কিছু জনসভা করবেন বলে এলেন ফরিদপুর। এজন্য বেশ কিছুদিন ফরিদপুর থাকতে হবে নজরুলকে। কবি বন্ধু জসীমউদ্দীনের বাড়ি ফরিদপুরের কাছেই তাম্বূলখানা গ্রামে। সেখানেই তার থাকার বন্দোবস্ত হলো। কবি যেখানে আছেন সেখানে গানের আসর জমবে না তা তো হয় না।
আসর বসলো। গভীর রাত পর্যন্ত চলবে গানের আসর। কবি গান গাইবেন। প্রচুর লোক জড়ো হয়েছে। কিন্তু বিদ্রোহী কবির চায়ের তেষ্টা পেল মাঝরাতে। গান বন্ধ করে দিলেন তিনি। চা ছাড়া আর একটি গানও নয়, জানিয়ে দিলেন সাফ। জসীমউদ্দীন পড়লেন বিপাকে। এখন চা পাবেন কোথায়!
রাত ১২টা পার হয়েছে। ঘুমিয়ে গেছে পুরো গ্রাম। কিন্তু কবির তো চা চাই-ই চাই। গাঁয়ের লোকে চা খেতে শেখেনি তখনো। তবু জসীমউদ্দীন সারা গ্রামের লোককে জাগিয়ে তুললেন, কাঁচা ঘুম ভাঙানোর অপরাধে কেউ রেগে গিয়েছিল কি না কে জানে। কারো বাড়িতে চা পাওয়া গেল না।
যখন সবাই হতাশ, এক ভদ্রলোকের ভাঁড়ারে পড়ে থাকা অবস্থায় পাওয়া গেল অল্প কিছু চায়ের লিকার। ভদ্রলোক শৌখিন গোছের, কিন্তু চা নিজে খান না, অতিথি আপ্যায়নের জন্য জমিয়ে রেখেছেন কয়েক বছরের পুরোনো চা। সেগুলো দিয়েই তেষ্টা মেটালেন নজরুল। তারপর রাতভর গান হলো। কিন্তু যার জন্য এত আয়োজন, সেই নির্বাচনে ভরাডুবি হয়েছিল বিদ্রোহী কবির।
আরেকবার কবি পল্লীকবি জসীমউদ্দীনের বাড়ি বেড়াতে গেলেন। নজরুল চা পান করার আগ্রহ প্রকাশ করলে পল্লীকবি বাজার থেকে চা পাতা এনে বাড়ির বউ-ঝিকে বানানোর জন্য দেন। এদিকে বাড়ির বউ-ঝিরা এর আগে চা বানাননি। তারা বাড়িতে যত রকম মসলা ছিল (আদা, মরিচ, পেঁয়াজ, ধনে, জিরা ইত্যাদি) সবকিছু দিয়ে জম্পেশ এক কাপ চা খাওয়ালেন নজরুলকে। পল্লীকবি জসীমউদ্দীন তার স্মৃতিকথা সমগ্রতে কবি নজরুলকে নিয়ে স্মৃতিচারণে লিখেছিলেন এসব স্মৃতি।
কেএসকে/জেআইএম