কম খরচে ডিজিটাল লেনদেনে যুক্তরাষ্ট্রের আপত্তি, বিশ্বে শুরু নতুন লড়াই
ব্রাজিলের রাজধানী ব্রাসিলিয়ার একটি ব্যস্ত কফি শপ। কাউন্টারে দাঁড়িয়ে পকেট থেকে মোবাইল ফোন বের করলেন রদ্রিগো নামে এক তরুণ। কেন্দ্রীয় ব্যাংক পরিচালিত তাৎক্ষণিক পেমেন্ট ব্যবস্থা ‘পিক্স’ (Pix) দিয়ে মুহূর্তেই বিল পরিশোধ করলেন তিনি। কোনো বাড়তি চার্জ নেই, নেই কোনো কার্ড সোয়াইপ করার ঝামেলা। শুধু ব্রাজিল নয়, ভারতের ইউপিআই থেকে শুরু করে ইন্দোনেশিয়ার কিউআরআইএস—বিশ্বের কোটি কোটি সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের গল্পটা এখন ঠিক এমনই। কিন্তু সাধারণ মানুষের স্বস্তির এই সহজ ও সাশ্রয়ী ডিজিটাল লেনদেন ব্যবস্থাই যেন যুক্তরাষ্ট্রের ঘুম উড়িয়ে দিয়েছে। ওয়াশিংটনের ক্ষমতা অলিন্দে এখন একটাই আলোচনা, কীভাবে বিশ্বের এই কম খরচের পেমেন্ট বিপ্লবকে থামানো যায়। ট্রাম্প প্রশাসনের এই নতুন আপত্তির কারণে বিশ্বজুড়ে এখন এক অভূতপূর্ব অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের আপত্তির আসল কারণ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের এই কম খরচের বা বিনামূল্যে পরিচালিত ডিজিটাল লেনদেন ব্যবস্থার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের আপত্তির কারণটি মোটেও প্রযুক্তিগত নয়, বরং সম্পূর্ণ বাণিজ্যিক ও রাজনৈতিক। আন্তর্জাতিক ক্যাশলেস বা ডিজিটাল লেনদেনের বাজার দীর
ব্রাজিলের রাজধানী ব্রাসিলিয়ার একটি ব্যস্ত কফি শপ। কাউন্টারে দাঁড়িয়ে পকেট থেকে মোবাইল ফোন বের করলেন রদ্রিগো নামে এক তরুণ। কেন্দ্রীয় ব্যাংক পরিচালিত তাৎক্ষণিক পেমেন্ট ব্যবস্থা ‘পিক্স’ (Pix) দিয়ে মুহূর্তেই বিল পরিশোধ করলেন তিনি। কোনো বাড়তি চার্জ নেই, নেই কোনো কার্ড সোয়াইপ করার ঝামেলা। শুধু ব্রাজিল নয়, ভারতের ইউপিআই থেকে শুরু করে ইন্দোনেশিয়ার কিউআরআইএস—বিশ্বের কোটি কোটি সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের গল্পটা এখন ঠিক এমনই।
কিন্তু সাধারণ মানুষের স্বস্তির এই সহজ ও সাশ্রয়ী ডিজিটাল লেনদেন ব্যবস্থাই যেন যুক্তরাষ্ট্রের ঘুম উড়িয়ে দিয়েছে। ওয়াশিংটনের ক্ষমতা অলিন্দে এখন একটাই আলোচনা, কীভাবে বিশ্বের এই কম খরচের পেমেন্ট বিপ্লবকে থামানো যায়। ট্রাম্প প্রশাসনের এই নতুন আপত্তির কারণে বিশ্বজুড়ে এখন এক অভূতপূর্ব অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের আপত্তির আসল কারণ
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের এই কম খরচের বা বিনামূল্যে পরিচালিত ডিজিটাল লেনদেন ব্যবস্থার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের আপত্তির কারণটি মোটেও প্রযুক্তিগত নয়, বরং সম্পূর্ণ বাণিজ্যিক ও রাজনৈতিক। আন্তর্জাতিক ক্যাশলেস বা ডিজিটাল লেনদেনের বাজার দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের দুটি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান নিয়ন্ত্রণ করে আসছে। এ দুটি প্রতিষ্ঠান হলো ভিসা (Visa) এবং মাস্টারকার্ড (Mastercard)।
যখনই কোনো দেশে বিনামূল্যে বা নামমাত্র খরচে নিজস্ব রাষ্ট্রীয় ডিজিটাল পেমেন্ট নেটওয়ার্ক গড়ে ওঠে, তখনই সেখানে মার্কিন কার্ড কোম্পানিগুলোর একচেটিয়া ব্যবসা ও বিলিয়ন ডলারের মুনাফা মুখ থুবড়ে পড়ে।
ট্রাম্প প্রশাসন মনে করে, এই দেশীয় ব্যবস্থাগুলো যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তির ওপর এক ধরনের ডিজিটাল আক্রমণ। ওয়াশিংটনের দাবি, নিজস্ব ব্যবস্থা চালু করে মার্কিন আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাজার থেকে দূরে রাখা হচ্ছে এবং এটি আন্তর্জাতিক মুক্ত বাণিজ্য নীতির সম্পূর্ণ পরিপন্থি।

ডিজিটাল লেনদেনের বাজারে একচেটিয়া দাপট ভিসা-মাস্টারকার্ডের/ ছবি: পেক্সেলস
যুক্তরাষ্ট্রের হুমকি ও চাপ প্রয়োগ
বিষয়টি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র কেবল মৌখিকভাবে আপত্তি জানিয়েই ক্ষান্ত হয়নি, বরং বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন দেশের ওপর সরাসরি চাপ ও কঠোর শুল্ক আরোপের পথ বেছে নিয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসন এই লড়াইকে তাদের বাণিজ্য যুদ্ধের প্রধান হাতিয়ার বানিয়েছে।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধির (USTR) কার্যালয় ব্রাজিলের অত্যন্ত জনপ্রিয় পিক্স ব্যবস্থাকে সরাসরি একটি ‘বাণিজ্য প্রতিবন্ধকতা’ হিসেবে ঘোষণা করেছে। এর জের ধরে ট্রাম্প প্রশাসন ব্রাজিলের বেশ কিছু পণ্যের ওপর ২৫ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপ করেছে।
একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে ইন্দোনেশিয়া এবং কানাডার ক্ষেত্রেও। ইন্দোনেশিয়ার নিজস্ব কিউআর কোড ব্যবস্থা এবং কানাডার ডিজিটাল কর নীতির বিরুদ্ধে ওয়াশিংটন তাদের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তি বাতিলের মতো কঠোর হুমকি দিয়েছে।
এমনকি, যুক্তরাষ্ট্রের এই শুল্ক যুদ্ধের চোখ রাঙানি থেকে রেহাই পায়নি ইউরোপীয় ইউনিয়নও।
মার্কিন চাপ মোকাবিলায় ব্রাজিলের কৌশল
যুক্তরাষ্ট্রের এই নজিরবিহীন বাণিজ্যিক ও রাজনৈতিক চাপ মোকাবিলায় ব্রাজিল তাদের পিক্স ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখতে লাতিন আমেরিকার অন্য দেশগুলোর সাথে জোট বাঁধার চেষ্টা করছে। তারা আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ফোরামে এই অর্থনৈতিক চাপের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলছে।
ব্রাজিল সরকার স্পষ্ট করেছে, দেশের সাধারণ মানুষের আর্থিক অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করতে পিক্স অত্যন্ত জরুরি। মার্কিন শুল্কের কারণে তাদের অর্থনীতিতে যে প্রভাব পড়বে, তা অন্য কোনো পণ্যের রপ্তানি বাড়িয়ে বা বিকল্প বাজার খুঁজে সামলানোর পরিকল্পনা করছে দেশটি। ব্রাজিল কোনোভাবেই নিজেদের তৈরি এই সফল পেমেন্ট সিস্টেমকে বন্ধ বা সংকুচিত করবে না।
ইন্দোনেশিয়ার অবস্থান ও আপস ফর্মুলা
ইন্দোনেশিয়া তাদের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মাধ্যমে ডিজিটাল পেমেন্ট সুইচিং ব্যবস্থায় মার্কিন চাপ সামলাতে কিছুটা মধ্যপন্থি কৌশল নিয়েছে। দেশটির জিপিএন ও কিউআরআইএস ব্যবস্থার কারণে মার্কিন পেমেন্ট কোম্পানিগুলো বৈষম্যের শিকার হচ্ছে—যুক্তরাষ্ট্রের এমন অভিযোগের পর তারা কিছুটা নমনীয় হয়েছে।
ইন্দোনেশিয়া সরকার বর্তমানে তাদের স্থানীয় পেমেন্ট সুইচিং কোম্পানিগুলোতে বিদেশি মালিকানার সর্বোচ্চ ২০ শতাংশের যে আইনি সীমা ছিল, তা কিছুটা শিথিল করার বিষয়ে আলোচনা করছে। এর মাধ্যমে মার্কিন প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিনিয়োগের সুযোগ দিয়ে তারা ট্রাম্প প্রশাসনকে কিছুটা শান্ত রাখার চেষ্টা করছে, যাতে মূল ফ্রি পেমেন্ট ব্যবস্থাটি সুরক্ষিত থাকে।

জনপ্রিয় হচ্ছে ডিজিটাল লেনদেন/ ছবি: পিটিআই
ইউরোপের পাল্টা প্রতিরোধ
ইউরোপের কার্ড পেমেন্ট বাজারে Visa ও Mastercard-এর প্রভাব অত্যন্ত শক্তিশালী। ইউরোজোনে ২০২২ সালে কার্ড লেনদেনের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ তাদের নেটওয়ার্কের মাধ্যমে হয়েছিল।
এই একচেটিয়া মার্কিন নির্ভরতা থেকে নিজেদের মুক্ত করতে ইউরোপের ১৬টি বড় ব্যাংক একজোট হয়ে ‘ডব্লিউইআরও’ (Wero) নামে একটি নিজস্ব পেমেন্ট ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নিয়েছে।
একই সঙ্গে, ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাদের নিজস্ব ডিজিটাল মুদ্রা বা ‘ডিজিটাল ইউরো’ প্রকল্প নিয়ে দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তিগত আধিপত্য কমাতে ফ্রান্স ও ইতালির মতো দেশগুলো মার্কিন টেক জায়ান্টদের ওপর ‘ডিজিটাল সার্ভিস ট্যাক্স’ বসানোর নীতি গ্রহণ করেছে। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প ইউরোপীয় পণ্যের ওপর ১০০ শতাংশ পর্যন্ত শাস্তিমূলক শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়ে রেখেছেন।
কিন্তু ইউরোপীয় ইউনিয়ন স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, আর্থিক সার্বভৌমত্ব রক্ষার স্বার্থে তারা মার্কিন চাপের কাছে মাথা নত করবে না এবং প্রয়োজনে পাল্টা আইনি ব্যবস্থা নেবে।
ভারতের আইন সংশোধন ও ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা
ভারত তাদের ইউপিআই (UPI) ব্যবস্থার ওপর আন্তর্জাতিক চাপ সামলাতে এবং পরিকাঠামো টিকিয়ে রাখতে একটি ভারসাম্যপূর্ণ পথ বেছে নিয়েছে। ট্রাম্পের হুমকি এবং মর্কিন কার্ড কোম্পানিগুলোর লবিংয়ের মুখে ভারত সরকার ইউপিআই সেবায় বড় বড় বাণিজ্যিক লেনদেনের ওপর নামমাত্র ফি বা মার্চেন্ট ডিসকাউন্ট রেট (MDR) বসানোর আইনি পথ তৈরি করেছে। লোকসভায় নতুন বিল পাসের মাধ্যমে এই পরিকাঠামো তৈরি করা হয়েছে।
তবে ভারত সরকার বলছে, সাধারণ গ্রাহকদের জন্য বা পার্সন-টু-পার্সন লেনদেন সব সময়ই সম্পূর্ণ বিনামূল্যে থাকবে।
এর মাধ্যমে একদিকে যেমন যুক্তরাষ্ট্রের কার্ড কোম্পানিগুলোর অভিযোগের জবাব দেওয়া গেছে যে, ইউপিআই সম্পূর্ণ ফ্রি হওয়ায় প্রতিযোগিতা নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে দেশের সাধারণ মানুষের স্বার্থও রক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে।
কোন পথে ভবিষ্যতের ডিজিটাল অর্থনীতি
ডিজিটাল লেনদেনের এই বৈশ্বিক লড়াই আসলে এক নতুন অর্থনৈতিক স্নায়ুযুদ্ধের ইঙ্গিত দিচ্ছে। একদিকে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের শত শত কোটি ডলারের করপোরেট মুনাফা ও বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থার ওপর তাদের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার মরিয়া চেষ্টা। অন্যদিকে রয়েছে উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর স্বনির্ভরতা, আর্থিক সার্বভৌমত্ব এবং সাধারণ মানুষের জন্য কম খরচে সেবা নিশ্চিত করার তাগিদ।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র হয়তো সাময়িকভাবে শুল্কের ভয় দেখিয়ে বা নিষেধাজ্ঞা জারি করে কিছু দেশকে কিছুটা ধীরগতির করতে পারবে। কিন্তু সাধারণ মানুষের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে ওঠা এই সাশ্রয়ী প্রযুক্তিগত রূপান্তরকে পুরোপুরি দমন করা ওয়াশিংটনের পক্ষে অসম্ভব। শেষ পর্যন্ত এই লড়াইয়ের ওপরই নির্ভর করছে বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থা মার্কিন কোম্পানিগুলোর নিয়ন্ত্রণে থাকবে নাকি বহুত্ববাদী ও স্বনির্ভর হবে।
সূত্র: রয়টার্স, দ্য গার্ডিয়ান, ফিন্যান্সিয়াল টাইমস, নিউজ১৮, সিটিভি, ডয়েচে ভেলে
কেএএ/
What's Your Reaction?




