বাংলা ও বাঙালির প্রাণের কবি কাজী নজরুল ইসলাম অসাম্প্রদায়িক চেতনার মূর্ত প্রতীক। যিনি নিজেকে সর্বদা রেখেছেন জাতি-ধর্ম-বর্ণ ও সম্প্রদায়ের ঊর্ধ্বে। বাংলা সাহিত্যে নজরুলই প্রথম এক হাতে বাঁশের বাঁশরী, আরেক হাতে রণতূর্য নিয়ে প্রগতিশীল ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার বিকাশ ঘটিয়েছেন, যার মূলে ছিল মানবপ্রেম। নজরুলের জীবনদর্শনে ‘দ্রোহে প্রেম, প্রেমে দ্রোহ’—এ মেলবন্ধন মুক্তিকামী গণমানুষের চেতনায় বৃটিশ শাসন-শোষণ, সকল অন্যায় ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের আগুন জ্বালায়, যা তাঁকে দ্রোহের কবি বা বিদ্রোহী কবি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
কাজী নজরুল শুধু একজন কবি, সাহিত্যিক, প্রবন্ধকার, গীতিকার কিংবা সংগীতজ্ঞ ছিলেন না, সর্বোপরি তিনি ছিলেন একজন বিপ্লবী দার্শনিক। তাঁর জীবনদর্শনের মূলে রয়েছে মানবতাবাদ, সাম্যবাদ ও অসাম্প্রদায়িকতা। তাঁর কবিতা, গান, প্রবন্ধসহ সব সৃষ্টকর্মে জীবনদর্শন প্রতিফলিত হয়েছে। এই দর্শনে একদিকে রয়েছে মানবপ্রেম ও মানবিকতা, আবার রয়েছে ব্রিটিশ শাসকদের বিরুদ্ধে দ্রোহের অগ্নিশিখা জ্বালিয়ে বিপ্লবের মাধ্যমে সমাজ থেকে সকল বৈষম্য দূর করে সাম্যবাদ প্রতিষ্ঠা করা, অন্যদিকে রয়েছে সকল প্রকার কুসংস্কার, সাম্প্রদায়িকতা, মৌলবাদ ও ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে গিয়ে অসাম্প্রদায়িক মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠিত করা।
নজরুলের জীবনদর্শনে মানবপ্রেম, সাম্য ও আন্তঃধর্মীয় সম্প্রীতি পরস্পর পরিপূরক। তাঁর দর্শনে দ্রোহ যেমন বিদ্যমান; তেমনই রয়েছে দ্রোহের গভীরে অকৃত্রিম মানবপ্রেম। বিদ্রোহ আর বিপ্লবের মাধ্যমে পুরোনো, জরাজীর্ণ সমাজব্যবস্থাকে ভেঙে জাতি-ধর্ম-বর্ণ-গোত্র নির্বিশেষে এক নতুন সাম্যবাদী সমাজ বিনির্মাণ করতে চেয়েছিলেন; যেখানে প্রতিষ্ঠিত হবে মানবপ্রেম, ন্যায়বিচার ও সম্প্রীতির দর্শন। এই ত্রিমুখী দর্শন চিন্তাই নজরুলকে এক অনন্য দার্শনিক উচ্চতায় অধিষ্ঠিত করেছে।
নজরুলের অসাম্প্রদায়িক জীবনদর্শনের মূলে রয়েছে মানবতাবাদ। সাম্প্রদায়িকতার ঊর্ধ্বে উঠে তিনি মানবতাকে স্থান দিয়েছেন সবার উপরে। মানবধর্ম বা মনুষ্যত্ববোধের জয়গান গেয়েছেন। তাঁর অসাম্প্রদায়িক চেতনা এবং মানবপ্রেমের কারণে তাকে হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান বা অন্য কোনো সুনির্দিষ্ট ধর্মের ফ্রেমে আটকানো যায়নি। তাই তো নজরুল অবলীলায় শ্যামাসংগীত, কীর্তন, বৃন্দাবন-গীত লিখেছেন; রচনা করেছেন গজল, আরবি-ফার্সি শব্দের বহুল ব্যবহার। তাঁর এই সমন্বয়বাদী দর্শনের মাধ্যমে ধর্মীয় ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি তুলে ধরে অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে জাগ্রত করেছেন। অসাম্প্রদায়িক নজরুলের ভাষায়—‘আমি শুনেতেছি মসজিদের আজান আর মন্দিরের শঙ্খধ্বনি। তাহা একসাথে উত্থিত হইতেছে ঊর্ধ্বে—স্রষ্টার সিংহাসনের পানে। আমি দেখেতেছি সারা আকাশ যেন খুশি হইয়া উঠিতেছে।’
অসাম্প্রদায়িক চেতনার অন্তর্নিহিত তাৎপর্য হচ্ছে—যে যার ধর্ম স্বাধীনভাবে পালন করবে, সকল ধর্মের প্রতি পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, আন্তঃধর্মীয় সম্প্রীতি ও পরমতসহিষ্ণুতা। অসাম্প্রদায়িকতা মানে ধর্মহীনতা নয়। বরং সকল ধর্ম-বর্ণ-গোত্র-সম্প্রদায় নির্বিশেষে মানবিক ও নৈতিক মূল্যবোধের সহাবস্থান। নজরুল কোনো ধর্ম বা উপাসনালয়ের বিরুদ্ধে কথা বলেননি। নজরুল বিদ্রোহ করেছেন ধর্মীয় উন্মাদনা সৃষ্টিকারী ধর্মব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে, যারা ধর্মকে ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক বা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা বা শোষণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট করতে চায়। অধ্যাপক ড. অমিতাভ চক্রবর্তীর ভাষায়: ‘আজীবন তাঁকে লড়তে হয়েছে একদিকে মুসলমান সাম্প্রদায়িক ধর্মান্ধ শক্তিগুলির বিরুদ্ধে অপরদিকে হিন্দু সাম্প্রদায়িকতা, অস্পৃশ্যতার বিরুদ্ধে। বহুমুখী এই আক্রমণে নজরুলের হৃদয় ক্ষতবিক্ষত হলেও তিনি সেই ক্লান্তিহীন চির ‘মহাবিদ্রোহী’।’ (বাঙালি মনন: সম্প্রীতি ও সাম্প্রদায়িকতা, ২০০৮, পৃ-৩৪২)।
নজরুলের রাষ্ট্রদর্শনে ছিল অসাম্প্রদায়িক চেতনার মধ্য দিয়ে ন্যায় ও সমতাভিত্তিক কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা। তিনি ছিলেন সাম্যের কবি। গণমানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ব্রিটিশ শাসক ও শোষকদের বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষ সংগ্রামে অংশ নিয়েছেন এবং কারাবন্দি হয়ে ‘রাজবন্দির জবানবন্দি’র মতো দুঃসাহসী সাহিত্যকর্ম রচনা করেছেন। বিংশ শতাব্দীর প্রারম্ভে বাংলা সাহিত্যে ধূমকেতুর মতো আবির্ভাব হয়েছিল কাজী নজরুলের, তাঁর সাহিত্যকর্মে সকল প্রকার অন্যায়-অবিচার, শাসন-শোষণের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী চেতনা প্রতিবাদী বজ্রকণ্ঠের মাধ্যমে তুলে ধরেন। তাঁর কলম সব সময় শোষিত, লাঞ্ছিত, নিপীড়িত, সুবিধা বঞ্চিত মানুষের অধিকার আদায়ে সোচ্চার ছিল। নজরুলের বিপ্লবী দর্শন ও অসাম্প্রদায়িক ভাবনায় সকল ধর্মাবলম্বী মানুষের জন্য সত্য-সুন্দর ও ন্যায়ভিত্তিক সাম্যবাদী সমাজ প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছেন। তাঁর বিপ্লবী দর্শনের গভীরে ছিল মানুষের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা। তিনি ধর্মের ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে মানবতার জয়গান গেয়েছেন। তাঁর ভাষায়: ‘গাহি সাম্যের গান—/ মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান।’
বর্তমান বিশ্বের অন্যতম সমস্যা হচ্ছে ধর্মীয় উন্মাদনা, জাতিগত বিভেদ ও সাম্প্রদায়িকতা। নিজ ধর্মের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ কিংবা রক্ষার নামে অন্য ধর্মের প্রতি বিদ্বেষ ছড়ানোর মধ্য দিয়ে মানুষে মানুষে হানাহানি-মারামারি তৈরি করার প্রবণতা সমকালীন বিশ্বে বিরাজমান। বিশেষ করে ভারতবর্ষ কিংবা বাংলাদেশে এখনো উগ্র সাম্প্রদায়িকতা ও ধর্মীয় সংকীর্ণতা থেকে বের হতে পারেনি। আজ যখন সাম্প্রদায়িকতা, সংকীর্ণতা ও ধর্মীয় বিদ্বেষের উত্থান হয়; তখন আন্তঃধর্মীয় সম্প্রীতি বিনষ্ট হয়। অসাম্প্রদায়িক চেতনার প্রকাশ ও বিকাশের মাধ্যমে এই সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব। বাঙালির হাজার বছরের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ঐতিহ্য যে কোনো মূল্যে রক্ষা করতে হবে। রুখে দিতে হবে সব সাম্প্রদায়িক অপশক্তিকে। নজরুলের জীবনদর্শনে ছিল অসাম্প্রদায়িক চেতনা, তিনি বিদ্রোহ করেছেন সাম্প্রদায়িকতা ও ধর্ম ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন কীভাবে অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে হয়, একই সঙ্গে শিখিয়েছেন জাতি-ধর্ম-বর্ণ-গোত্র নির্বিশেষে মানুষের প্রতি ভালোবাসা ও শ্রদ্ধাবোধ জাগ্রত করতে হয়।
নজরুলের কবিতা, সাহিত্য ও জীবনদর্শন সব সময়ই প্রাসঙ্গিক। তিনি কেবল একজন কবিই নন, তিনি আজ ও আগামীর পথপ্রদর্শক, যার দার্শনিক আলোকবর্তিতা আমাদের সঠিক ও ন্যায় পথের নির্দেশনা দেবে। আবহমান বাংলার ঐতিহ্যগত ধারায় এই ভূখণ্ডে বহু ধর্ম, বহু মতের মানুষ একত্র হয়েছে এবং নানা ধর্মাবলম্বী মানুষ সহ-অবস্থান করছে। এর মূলভিত্তি হচ্ছে আন্তঃধর্মীয় সম্প্রীতি ও অসাম্প্রদায়িক চেতনা। নজরুলের অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও মানবপ্রেম তাঁকে খাঁটি বাঙালিতে পরিণত করেছিল। নজরুল আমাদের প্রেরণা, তিনি আছেন আমাদের মননে।
বর্তমান তরুণ প্রজন্মকে অসাম্প্রদায়িকতা ও মানবতার জয়গানে উজ্জ্বীবিত করতে হবে। পরিবার থেকে শুরু করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজের সর্বস্তরে আন্তঃধর্মীয় সম্প্রীতি ও অসাম্প্রদায়িক মননশীলতার চর্চা করতে হবে। অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়তে হলে আমাদের বাঙালিত্ব, বাঙালি সংস্কৃতি ও মননশীলতা চর্চা করার পাশাপাশি নজরুল চর্চার উদ্যোগ নিতে হবে। কবি নজরুলের জীবনদর্শন, সাম্য ও শান্তির বাণী, মানবতাবাদ ও অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে সমাজে প্রতিষ্ঠা করে আমরা একটি মানবিক বিশ্ব গড়বো। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ৪৯তম মৃত্যুবার্ষিকীতে বিনম্র শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা। শেষ করবো নজরুলের উক্তি দিয়ে: ‘মোরা এক বৃন্তে দুটি কুসুম হিন্দু-মোসলমান;/ মুসলিম তার নয়ন-মণি, হিন্দু তাহার প্রাণ।’
এসইউ/জেআইএম