কারাজীবনে ‘গাদিরে খুম’ ঘিরে আইভীর বিশেষ প্রার্থনা, কী এটি
১৩ মাসের দীর্ঘ বন্দিজীবন শেষে কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। তবে এই আলোচনা তার রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তনের জন্য নয়, বরং কারাজীবনে তার আধ্যাত্মিক পরিবর্তন এবং ‘গাদিরে খুম’ নামক একটি বিশেষ দিনকে ঘিরে তার বিশেষ প্রার্থনা নিয়ে। কারাগারে নতুন আইভীর জন্ম আইভীর ঘনিষ্ঠজন ও তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করা একাধিক ব্যক্তির ভাষ্য অনুযায়ী, দীর্ঘ ১৩ মাসের বন্দিজীবন তাকে ভেতর থেকে অনেকটাই বদলে দিয়েছে। তিনি নিজেকে আধ্যাত্মিক চর্চার মধ্যে নিমগ্ন রেখেছিলেন। নিয়মিত নামাজ, দোয়া, দরুদ শরিফ পাঠ এবং ধর্মীয় অনুশীলনের মাধ্যমে সময় কাটিয়েছেন। কারাগারের দিনগুলোকে তিনি শুধু বন্দিত্ব নয়, আত্মশুদ্ধির এক বিশেষ সময় হিসেবেও দেখেছেন। সাক্ষাৎ পাওয়া ঘনিষ্ঠ সূত্র জানায়, আইভী প্রায়ই বলতেন, মেয়র হিসেবে কর্মব্যস্ত জীবনে যে পরিমাণ ইবাদত-বন্দেগির সুযোগ তিনি পাননি, কারাগারে সেই সুযোগ পেয়েছেন অনেক বেশি। ব্যস্ত রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক জীবনের বাইরে গিয়ে তিনি নিজের আত্মিক জগৎকে নতুনভাবে আবিষ্কার করার সুযোগ পেয়েছেন বলেও মনে করেন। কাশিমপুর মহিলা কারাগারে আওয়ামী লীগের
১৩ মাসের দীর্ঘ বন্দিজীবন শেষে কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। তবে এই আলোচনা তার রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তনের জন্য নয়, বরং কারাজীবনে তার আধ্যাত্মিক পরিবর্তন এবং ‘গাদিরে খুম’ নামক একটি বিশেষ দিনকে ঘিরে তার বিশেষ প্রার্থনা নিয়ে।
কারাগারে নতুন আইভীর জন্ম
আইভীর ঘনিষ্ঠজন ও তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করা একাধিক ব্যক্তির ভাষ্য অনুযায়ী, দীর্ঘ ১৩ মাসের বন্দিজীবন তাকে ভেতর থেকে অনেকটাই বদলে দিয়েছে। তিনি নিজেকে আধ্যাত্মিক চর্চার মধ্যে নিমগ্ন রেখেছিলেন। নিয়মিত নামাজ, দোয়া, দরুদ শরিফ পাঠ এবং ধর্মীয় অনুশীলনের মাধ্যমে সময় কাটিয়েছেন। কারাগারের দিনগুলোকে তিনি শুধু বন্দিত্ব নয়, আত্মশুদ্ধির এক বিশেষ সময় হিসেবেও দেখেছেন।
সাক্ষাৎ পাওয়া ঘনিষ্ঠ সূত্র জানায়, আইভী প্রায়ই বলতেন, মেয়র হিসেবে কর্মব্যস্ত জীবনে যে পরিমাণ ইবাদত-বন্দেগির সুযোগ তিনি পাননি, কারাগারে সেই সুযোগ পেয়েছেন অনেক বেশি। ব্যস্ত রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক জীবনের বাইরে গিয়ে তিনি নিজের আত্মিক জগৎকে নতুনভাবে আবিষ্কার করার সুযোগ পেয়েছেন বলেও মনে করেন।
কাশিমপুর মহিলা কারাগারে আওয়ামী লীগের কয়েকজন নারীনেত্রীসহ মোট ১৩ জন একসঙ্গে ছিলেন। তাদের সঙ্গে ধর্মীয় আলোচনা, স্মৃতিচারণ, পারস্পরিক সহমর্মিতা ও বিভিন্ন বিষয়ে মতবিনিময়ের মধ্য দিয়েই সময় কেটেছে। একই কারাগারে থাকা সাবেক সংসদ সদস্য মমতাজ বেগম বিভিন্ন সময় গান শুনিয়ে বন্দিদের সময় কাটাতে সাহায্য করতেন বলেও জানা গেছে।
গাদিরে খুম ঘিরে বিশেষ প্রার্থনা
কারাজীবনের সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি ছিল গাদিরে খুমকে ঘিরে আইভীর ব্যক্তিগত বিশ্বাস ও প্রার্থনা। তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করা কয়েকজনের দাবি, বন্দি অবস্থায় আইভী সবসময় একটি বিশেষ দোয়া করতেন। তার বিশ্বাস ছিল, গাদিরে খুমের দিনটি তার জীবনে বিশেষ তাৎপর্য বহন করবে। ধর্মীয় বর্ণনা অনুযায়ী, গাদিরে খুমে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) হজরত আলীর (রা.) মাথায় হাত রেখে বিশেষ দোয়া করেছিলেন। সেই ঐতিহাসিক স্মৃতিবিজড়িত দিনটি ঘিরেই মুক্তির জন্য প্রার্থনা করতেন আইভী।
এ বছর গাদিরে খুম পালিত হয় বলে গতকাল আইভী তার ঘনিষ্ঠজনদের জানিয়েছেন, তিনি আল্লাহর কাছে দোয়া করেছিলেন যেন এই দিনটিকে ঘিরেই তার মুক্তি হয়। শেষ পর্যন্ত গাদিরে খুমের আগের রাতেই তিনি কারামুক্ত হন। বিষয়টিকে তিনি নিজের দোয়া কবুল হওয়ার একটি নিদর্শন হিসেবে দেখছেন বলেও জানিয়েছেন ঘনিষ্ঠজনদের।
গাদিরে খুম কী?
মা’হাদুত তালীম ওয়াল বুহুসিল ইসলামি ঢাকার পরিচালক ও প্রধান মুফতি লুৎফুর রহমান ফরায়েজী কালবেলাকে বলেন, গাদিরে খুমের মূল ঘটনা হলো, রাসুল (সা.) বিদায় হজ শেষে যখন মদিনা ফিরছিলেন তখন মদিনার উপকণ্ঠে গাদিরে খুম নামক স্থানে এসে যাত্রাবিরতি করেন। তখন সেখানে বুরাইদা আসলামী (রা.) নামে একজন সাহাবি হজরত আলী (রা.)-এর বিষয়ে কিছু অভিযোগ নবীজির (সা.) কাছে পেশ করেন।
এরপর নবীজি (সা.) গাদিরে খুমে একটি ভাষণ প্রদান করেন। যাতে তিনি তার মৃত্যু সন্নিকটে হওয়ার ইশারা করেন এবং কোরআন ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরার তাগিদ দেন। সে সঙ্গে আহলে বাইতের সদস্যদের প্রতি ভালোবাসার গুরুত্বারোপ করেন। হজরত আলী (রা.) বিষয়ে ইরশাদ করেন যে, আমি যাদের বন্ধু, আলীও তাদের বন্ধু।
মুফতি ফরায়েজী বলেন, ওই ভাষণের মাধ্যমে আহলে বাইতের প্রতি সবার মোহাব্বতের সম্পর্ক রাখার তাগিদ করা হয়েছে। এর দ্বারা বুরাইদা আসলামীর (রা.) মন থেকে হজরত আলীর (রা.) প্রতি যে ধারণা ছিল, তা দূরীভূত হয়ে যায়। ব্যাস এতটুকুই। ওই খুতবার কোথাও নবীজির (সা.) পর হজরত আলীকে (রা.) খলিফা নিযুক্ত করতে হবে এমন কোনো কথা নেই। শুধু মহব্বতের তাগিদ করা হয়েছে। আর মহব্বত কখনোই নেতৃত্বের হকদার হওয়ার মানদণ্ড নয়। কাজেই শিয়া সম্প্রদায় বা অন্য যেসব লোক গাদিরে খুমকে সামনে টেনে সাহাবায়ে কেরামের সমালোচনা করেন, এটা নিছক অজ্ঞতা এবং খারাপ মতলবের প্রতিফলন।
ইসলামি স্কলার শায়খ আহমাদুল্লাহ এক প্রশ্নের উত্তরে বলেন, মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) তাঁর বিদায় হজের সফর শেষে মদিনায় ফেরার পথে ‘গাদিরে খুম’ নামক স্থানে যাত্রাবিরতি করেন। সেখানে তিনি এক বিশেষ ভাষণ দেন এবং সাহাবি হজরত আলী (রা.)-এর প্রতি ভালোবাসা প্রকাশের গুরুত্বারোপ করেছিলেন। কিন্তু শিয়া বন্ধুরা ওই ভাষণের মাধ্যমে হজরত আলীকে (রা.) নবী পরবর্তী খলিফা হওয়ার মানদণ্ড মনে করে, এটা সম্পূর্ণ ভুল ব্যাখ্যা।
মুক্তির পরবর্তী মুহূর্ত
মুক্তির পরদিন অর্থাৎ গাদিরে খুমের দিনে আইভী তার নিজ বাসভবন ‘চুনকা কুটিরে’ রাজনৈতিক আলোচনার চেয়ে ধর্মীয় আলোচনায় বেশি সময় ব্যয় করেন। তিনি তার তরিকার অনুসারীদের সঙ্গে এই দিনের গুরুত্ব নিয়ে দীর্ঘ সময় কথা বলেন। এমনকি কারাগার থেকে মুক্তির সময় যে শাড়িটি তিনি পরেছিলেন, সেটিও বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে এদিন দুপুরের আগে পরিবর্তন করেননি।
বর্তমানে তিনি কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচি বা ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে কথা বলতে আগ্রহী নন। কারাজীবনের অভিজ্ঞতা ও আধ্যাত্মিক উপলব্ধি নিয়েই তিনি দিন অতিবাহিত করছেন।
What's Your Reaction?