কালের সাক্ষী শতবর্ষী জলকল ভবন, আধুনিক যশোরে নিরাপদ পানির সংকট
যশোরে একসময় কল খুললেই মিলতো নিরাপদ সুপেয় পানি। ব্রিটিশ আমলে ১৯১৮ সালে নির্মিত আধুনিক জলকলেই ট্রিটমেন্ট হয়ে সেই পানি পৌঁছে যেতো নগরবাসীর ঘরে। শত বছর পর উল্টে গেছে পানি সরবরাহ চিত্র। বর্তমানে পৌরসভার সরবরাহ করা পানি অনেক ক্ষেত্রে পান তো দূরের কথা, ব্যবহারও অনুপযোগী। ফলে বাধ্য হয়ে বাসাবাড়িতে বসাতে হচ্ছে ডিপ টিউবওয়েল। অথচ সেই ঐতিহাসিক জলকল ভবন আজও দাঁড়িয়ে আছে হারানো এক জনবান্ধব নগর ব্যবস্থার নীরব সাক্ষী। যশোর জেলা প্রশাসক ও পৌরসভা সূত্র জানায়, ব্রিটিশ ভারতের প্রথম জেলা শহর যশোর প্রায় আড়াইশ’ বছরের পুরনো (১৭৮১ সালে যশোর জেলা গঠিত)। আর পৌরসভা প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮৬৪ সালে। তখনো বিশেষ আধুনিকতার ছোঁয়া লাগেনি শহরে। সুপেয় পানির জন্য মানুষকে জলাশয়, কূপ, বৃষ্টির পানিসহ প্রকৃতিক উপায়ের ওপর নির্ভর করতে হতো। তাই ১৯১৮ সালে সুপেয় পানির জন্য ব্রিটিশ সরকার একটি জলকল স্থাপন করেন যশোর পৌর এলাকায়। আরও পড়ুন ধ্বংসের পথে কবি কাজী কাদের নেওয়াজের স্মৃতিধন্য বাড়ি জলকলটি ছিল লাল রঙের একটি সুদৃশ্য ভবন। এই ভবনের ভিতর তিনটি ভাগ ছিল। একটিতে ছিল ইঞ্জিল চালিত পাইপ মেশিন। একটি অপারেটর রুম। অপেক্ষাকৃত বড় রুমটি ব্যবহৃত
যশোরে একসময় কল খুললেই মিলতো নিরাপদ সুপেয় পানি। ব্রিটিশ আমলে ১৯১৮ সালে নির্মিত আধুনিক জলকলেই ট্রিটমেন্ট হয়ে সেই পানি পৌঁছে যেতো নগরবাসীর ঘরে। শত বছর পর উল্টে গেছে পানি সরবরাহ চিত্র। বর্তমানে পৌরসভার সরবরাহ করা পানি অনেক ক্ষেত্রে পান তো দূরের কথা, ব্যবহারও অনুপযোগী। ফলে বাধ্য হয়ে বাসাবাড়িতে বসাতে হচ্ছে ডিপ টিউবওয়েল। অথচ সেই ঐতিহাসিক জলকল ভবন আজও দাঁড়িয়ে আছে হারানো এক জনবান্ধব নগর ব্যবস্থার নীরব সাক্ষী।
যশোর জেলা প্রশাসক ও পৌরসভা সূত্র জানায়, ব্রিটিশ ভারতের প্রথম জেলা শহর যশোর প্রায় আড়াইশ’ বছরের পুরনো (১৭৮১ সালে যশোর জেলা গঠিত)। আর পৌরসভা প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮৬৪ সালে। তখনো বিশেষ আধুনিকতার ছোঁয়া লাগেনি শহরে। সুপেয় পানির জন্য মানুষকে জলাশয়, কূপ, বৃষ্টির পানিসহ প্রকৃতিক উপায়ের ওপর নির্ভর করতে হতো। তাই ১৯১৮ সালে সুপেয় পানির জন্য ব্রিটিশ সরকার একটি জলকল স্থাপন করেন যশোর পৌর এলাকায়।
জলকলটি ছিল লাল রঙের একটি সুদৃশ্য ভবন। এই ভবনের ভিতর তিনটি ভাগ ছিল। একটিতে ছিল ইঞ্জিল চালিত পাইপ মেশিন। একটি অপারেটর রুম। অপেক্ষাকৃত বড় রুমটি ব্যবহৃত হতো পানি হাইজিং করার কাজে। এই জল কলের উৎস ছিল ওয়াটার সারফেস দুটি বড় জলাশয়। জলাশয় দুটি একপাশে সংযুক্ত। এই জলাশয় দুটি থেকে পাম্পের মাধ্যমে পানি টেনে তোলা হতো জলকলের উপরে।
‘ঐতিহাসিক জলকল ভবনটি সংস্কারের পরিকল্পনা তার রয়েছে। একইসঙ্গে এটি কিভাবে দর্শনীয় ও আকর্ষণীয় করা যায় সেই পরিকল্পনাও গ্রহণ করা হবে। তবে অবশ্যই পূর্বের জলকল ভবনটির আদল ও ঐতিহ্য সমুন্নত রেখেই পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।’
জলকলের উপরে ছিল একটি চৌবাচ্চা। যেটি ছিল জলকলের অনুরূপ ৬০ ফুট লম্বা ৩০ ফুট প্রস্থ এবং উচ্চতায় ছিল ৫ ফুট। জলাশয় থেকে পানি টেনে তুলে এখানেই সে পানি ট্রিটমেন্ট করা হতো। এখানে কয়েকটি সেকশন ছিল। কোনটিতে পানি থেকে ময়লা আবর্জনা, শামুক, ঝিনুক প্রভৃতি আলাদা করা হতো। কোনোটিতে পানি থিতিয়ে রাখা হতো। যেহেতু এটি সারফেস ওয়াটার। জলাশয়ের এ সারফেস ওয়াটার ফুটানো পদ্ধতি ফিল্টার পদ্ধতি ও হাইজিং পদ্ধতির মাধ্যমে ট্রিটমেন্ট করে তা সুপেয় করে তোলা হতো। এই সুপেয় পানি শহরের বিভিন্ন স্থানে পাইপের মাধ্যমে পৌঁছে দেওয়া হয়। শুরুতে এ পানির সাপ্লাই লাইন ছিল ১০ থেকে ১৫ কিলোমিটার পর্যন্ত। এর আওতাধীন ছিল, ঘোপের কিছু অংশ, হাজী মোহাম্মদ মহসিন রোড, চুড়িপট্টির কিছু অংশ এবং পোস্ট অফিস পাড়া (তখন বাজার ছিল)।
দুটি বড় জলাশয়, রাজ্জাক কলেজের মাঠ, স্টেডিয়াম পাড়া, শিল্পকলা একাডেমী মিলে পুরো এলাকাটিই ছিল জলকলের অর্থাৎ ওয়াটার ট্রিটমেন্ট সাপ্লাইয়ের এলাকার আওতাধীন।
এরপর সময়ের পরিক্রমায় ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন করে ব্যবহার পদ্ধতি চালু হয়। ফলে ১৯৪৭ সালে জলাশয়ের কাছে (বর্তমান পৌর পার্কের তীর্যকের সামনে) একটি পাম্প বসানো হয়। এতে ভূগর্ভস্থ সুপেয় পানি পাওয়া সম্ভব হয়। ফলে জলকলের কার্যক্রমটি বন্ধ হয়ে যায়। ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত মোট আটটি ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের পাম্প মেশিন বসানো হয়।
‘ভূগর্ভস্থ পানির উপরে অতিমাত্রার নির্ভরতা আমাদের বহুমুখী বিপদ ডেকে আনতে পারে। এতে ভূগর্ভে শূন্যতা সৃষ্টির মাধ্যমে ভূমিধস, ভূমিকম্প, ফাটল দেখা দিতে পারে। এছাড়া পরিবেশে আদ্রতা কমে যায়, তাপমাত্রা বৃদ্ধি পায়, উদ্ভিদ ও প্রাণিজগতে বিরূপ প্রভাব পড়ে। সেক্ষেত্রে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং প্রকৌশল-প্রযুক্তির মাধ্যমে ভূউপরিস্থ পানি পানযোগ্য করে পাইপলাইনে সরবরাহ করা সম্ভব।’
যশোর পৌরসভার সহকারী প্রকৌশলী (পানি) বি এম কামাল আহম্মেদ জানান, যশোর পৌরসভা এখন ২৮টি ভূগর্ভস্থ গভীর নলকূপ দিয়ে পানি উত্তোলন করে সরাসরি সরবরাহ করা হচ্ছে। তবে এই পানি পান করার মতো নিরাপদ নয়।
এ বিষয়ে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর যশোরের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আব্দুল আলিম গাজী জাগো নিউজকে বলেন, যশোর পৌর এলাকার পানি সরবরাহের বিষয়টি পৌরসভাই দেখভাল করে থাকে। তারা চাইলে তাদের ল্যাব থেকে পানির মান পরীক্ষা করতে পারে। মান পরীক্ষার পরই বলা যাবে পানি পানযোগ্য কিনা। এবং এর ভিত্তিতে প্লান্টে ওয়াটার ট্রিটমেন্ট করে পানযোগ্য পানি সরবরাহ করা যেতে পারে।
যশোর সরকারি এমএম কলেজের ভূগোল ও পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক সোলজার রহমান বলেন, ভূগর্ভস্থ পানির উপরে অতিমাত্রার নির্ভরতা আমাদের বহুমুখী বিপদ ডেকে আনতে পারে। এতে ভূগর্ভে শূন্যতা সৃষ্টির মাধ্যমে ভূমিধস, ভূমিকম্প, ফাটল দেখা দিতে পারে। এছাড়া পরিবেশে আদ্রতা কমে যায়, তাপমাত্রা বৃদ্ধি পায়, উদ্ভিদ ও প্রাণিজগতে বিরূপ প্রভাব পড়ে। সেক্ষেত্রে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং প্রকৌশল-প্রযুক্তির মাধ্যমে ভূউপরিস্থ পানি পানযোগ্য করে পাইপলাইনে সরবরাহ করা সম্ভব।
‘যশোর পৌরসভা এখন ২৮টি ভূগর্ভস্থ গভীর নলকূপ দিয়ে পানি উত্তোলন করে সরাসরি সরবরাহ করা হচ্ছে। তবে এই পানি পান করার মতো নিরাপদ নয়।’
এদিকে, যশোর পৌরসভার শতবর্ষী সুদৃশ্য লাল জলকল ভবনটি পড়ে আছে দীর্ঘদিন ধরে। এটি ভেঙে ফেলার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ১৯৯৫ সালে ব্রিটিশ এম্বাসি থেকে একটি প্রস্তাবনা আসে তাদের সময়কালে বিভিন্ন দেশে যেসব স্থাপনা তৈরি করেছিল সেগুলো ক্ষতিগ্রস্ত না করে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করার জন্য। ফলে পরবর্তীতে ভবনটি আর ভাঙা হয়নি। এরপর ২০১৯ সালে এই জলকলের ভবনটি সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়। সেই সময় সংস্কারকাজ কিছুটা এগোলেও পরবর্তীতে মেয়র পরিবর্তন হওয়ার পর সেই কাজ আর অগ্রগতি পায়নি।
যশোর এমএম কলেজের ছাত্র ইমামুল হোসেন জানান, যশোর পৌরসভায় এসে পুরানো এই ভবনটি দেখি। একদিন কৌতুহলী হয়ে জিজ্ঞাসা করে এই জলকল ভবন সম্পর্কে জানতে পেরেছি। ভবনটি সংরক্ষণের পাশাপাশি এর ইতিহাস যদি সাইনবোর্ড আকারে স্থাপন করা হয়, তাহলে সাধারণ মানুষ তা জানতে পারবে।
যশোরের ইতিহাস গবেষক জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক সাজেদ রহমান বলেন, যশোর পৌরসভার লাল রঙের শতবর্ষী জলকল ভবনটি একটি ঐতিহ্য। ইতোপূর্বে একটিকে সংরক্ষণ করে মিউজিয়ামে পরিণত করার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে সেই উদ্যোগের খুব একটা অগ্রগতি হয়নি। ইতিহাস ঐতিহ্য ধরে রাখার স্বার্থে এই ভবনটি সংরক্ষণ করা উচিত।

সাইকেলের ঘণ্টায় জেগে ওঠা এক গ্রাম
জলকল ভবনটি নিয়ে কথা হয় যশোর পৌরসভার প্রশাসক স্থানীয় সরকার যশোরের উপ-পরিচালক রফিকুল হাসানের সঙ্গে।
তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ঐতিহাসিক জলকল ভবনটি সংস্কারের পরিকল্পনা তার রয়েছে। একইসঙ্গে এটি কিভাবে দর্শনীয় ও আকর্ষণীয় করা যায় সেই পরিকল্পনাও গ্রহণ করা হবে। তবে অবশ্যই পূর্বের জলকল ভবনটির আদল ও ঐতিহ্য সমুন্নত রেখেই পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।
এনএইচআর/এএসএম
What's Your Reaction?

