কিশোর-কিশোরীর মানসিক স্বাস্থ্য, পরিবারের করণীয় কী?

একটি ঘটনা দিয়ে শুরু করতে চাই—বাবা সরকারি চাকরি করেন। মা ব্যস্ত থাকেন বিভিন্ন সাংগঠনিক কাজে। পরিবারের প্রথম সন্তানটি ছেলেশিশু। বাবা-মায়ের ব্যস্ততায় শিশুটির প্রতি যত্নবান হওয়ার সময় কম। বাবা-মায়ের সঙ্গও তেমন পায় না। তার সময় কাটে একা ঘরে স্মার্টফোনের গেম, সোশ্যাল মিডিয়ার রিলস আর ইউটিউবের ভিডিও দেখে। শিশুটি কৈশোরে উত্তীর্ণ হতেই লক্ষ্য করা যায়, তার আচরণ স্বাভাবিক নয়। পারিবারিক বা সামাজিক কার্যক্রমে আগ্রহ নেই। পড়াশোনায়ও মনোযোগী নয়। যখন চিকিৎসকের শরণাপন্ন হলেন বাবা-মা; তখন আর কিছুই করার নেই। নিভৃতেই তার ভেতরে গড়ে উঠেছে আলাদা জগত। স্মার্টফোন হাতে পেলেই ছেলেটি স্বাভাবিক। ভিডিও দেখে প্রকাশ করে নানারকম অনুভূতি। কিন্তু অন্য কারো সঙ্গে নিজেকে খাপ খাওয়াতে পারছে না। এর জন্য হয়তো তার মানসিক অবস্থাই অন্যতম কারণ। একটি বিষয় লক্ষ্য করলে দেখবেন, আমাদের কন্যাসন্তানের প্রতি পরিবার বা অভিভাবকেরা বেশি নজর দিলেও ছেলেসন্তানের প্রতি আমাদের নজর কম। কন্যাসন্তানকে একা বের হতে দেওয়া হয় না। স্কুলে পৌঁছে দেন পরিবারের যে কেউ। একইভাবে ছেলেসন্তান স্কুলে যাচ্ছে একা। এই আসা-যাওয়ার সময় পথিমধ্যে কী করছে, কার সঙ্গে মিশছে—কিছুই

কিশোর-কিশোরীর মানসিক স্বাস্থ্য, পরিবারের করণীয় কী?

একটি ঘটনা দিয়ে শুরু করতে চাই—বাবা সরকারি চাকরি করেন। মা ব্যস্ত থাকেন বিভিন্ন সাংগঠনিক কাজে। পরিবারের প্রথম সন্তানটি ছেলেশিশু। বাবা-মায়ের ব্যস্ততায় শিশুটির প্রতি যত্নবান হওয়ার সময় কম। বাবা-মায়ের সঙ্গও তেমন পায় না। তার সময় কাটে একা ঘরে স্মার্টফোনের গেম, সোশ্যাল মিডিয়ার রিলস আর ইউটিউবের ভিডিও দেখে। শিশুটি কৈশোরে উত্তীর্ণ হতেই লক্ষ্য করা যায়, তার আচরণ স্বাভাবিক নয়। পারিবারিক বা সামাজিক কার্যক্রমে আগ্রহ নেই। পড়াশোনায়ও মনোযোগী নয়। যখন চিকিৎসকের শরণাপন্ন হলেন বাবা-মা; তখন আর কিছুই করার নেই। নিভৃতেই তার ভেতরে গড়ে উঠেছে আলাদা জগত। স্মার্টফোন হাতে পেলেই ছেলেটি স্বাভাবিক। ভিডিও দেখে প্রকাশ করে নানারকম অনুভূতি। কিন্তু অন্য কারো সঙ্গে নিজেকে খাপ খাওয়াতে পারছে না। এর জন্য হয়তো তার মানসিক অবস্থাই অন্যতম কারণ।

একটি বিষয় লক্ষ্য করলে দেখবেন, আমাদের কন্যাসন্তানের প্রতি পরিবার বা অভিভাবকেরা বেশি নজর দিলেও ছেলেসন্তানের প্রতি আমাদের নজর কম। কন্যাসন্তানকে একা বের হতে দেওয়া হয় না। স্কুলে পৌঁছে দেন পরিবারের যে কেউ। একইভাবে ছেলেসন্তান স্কুলে যাচ্ছে একা। এই আসা-যাওয়ার সময় পথিমধ্যে কী করছে, কার সঙ্গে মিশছে—কিছুই জানতে পারছে না পরিবার। ফলে কখনো কখনো কিশোরটি পা বাড়াচ্ছে মাদকের দিকে, কিশোর অপরাধের দিকে কিংবা অনৈতিক কোনো কাজের দিকে। সুতরাং কিশোর বা কিশোরী; যেই হোক না কেন, প্রত্যেকের মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে সমপরিমাণ নজর রাখা আবশ্যক।

ফলে এ ক্ষেত্রে বলা যায়, কিশোর-কিশোরীর মানসিক স্বাস্থ্য স্বাভাবিক রাখতে পরিবারের ভূমিকাই বেশি। পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা লক্ষিত জনগোষ্ঠীকে আরও বেশি সচেতন করতে পারে। কেননা বাংলাদেশে মানসিক স্বাস্থ্য একটি গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রায় ১৬.৮ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক (প্রায় ২ কোটি ৮০ লাখ মানুষ) এবং ১৩.৬ শতাংশ শিশু ও কিশোর-কিশোরী মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় আক্রান্ত। উদ্বেগজনকভাবে, প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্যসেবার চিকিৎসা ঘাটতি ৯২.৩ শতাংশ। দেশে প্রতি ১ লাখ মানুষের জন্য মাত্র ০.০৭৩ জন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ এবং ০.১২ জন মনোবিজ্ঞানী আছেন। জাতীয় স্বাস্থ্য বাজেটের মাত্র ০.৪৪ শতাংশ মানসিক স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ হওয়ায় মানসম্মত ও সহজলভ্য সেবা নিশ্চিত করা এখনো একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যমতে, সবশেষ জনশুমারি অনুযায়ী, দেশের মোট জনসংখ্যা ১৬ কোটি ৯৮ লাখ ২৮ হাজার ৯১১ জনের মধ্যে ১ কোটি ৭১ লাখ ৬০ হাজার ১৭৫ জনই ১৫ থেকে ১৯ বছর বয়সী, শতাংশের হিসাবে যা ১০.১০। এরপরই আছে ১০ থেকে ১৪ বছর বয়সী, যাদের সংখ্যা ১ কোটি ৬৮ লাখ ৪২ হাজার ৬৮২ জন। শতাংশের হিসাবে ৯.৯২। এই বিশাল সংখ্যক কিশোর-কিশোরীর শিক্ষা, জীবন-দক্ষতা ও স্বাস্থ্যের ওপর নির্ভর করছে আমাদের দেশের ভবিষ্যৎ। তারপরেও মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় খুব একটা গুরুত্ব পাচ্ছে না তারা। এ ব্যাপারে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন পর্যায়ে উদ্যোগ থাকলেও, নেই এর যথাযথ বাস্তবায়ন। যদিও ২০১৮ সালে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের উদ্যোগে সারাদেশে চার হাজার ৮৮৩টি কিশোর-কিশোরী ক্লাব উদ্বোধন করা হয়েছিল। তার কয়টা কার্যকর ভূমিকা রাখছে, তা-ও নজর রাখা জরুরি। এ ছাড়া কিশোর-কিশোরীর জন্য সহজলভ্য, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও যুববান্ধব মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে কৈশোরবান্ধব সেবাকেন্দ্রে ভলান্টিয়ার পিয়ার লিডার (ভিপিএল) মডেল নিয়ে কাজ করছে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা সিরাক-বাংলাদেশের মতো বেশকিছু সংস্থা। তাই কিশোর-কিশোরীদের মানসিক স্বাস্থ্যকে বাল্যবিবাহ, মাদকাসক্তি, সহিংসতা এবং অন্যান্য সামাজিক ঝুঁকির সঙ্গে সমন্বিতভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। এ ধরনের বিষয়গুলোতে সচেতনতা সৃষ্টির কার্যক্রম বিদ্যালয় পর্যায় থেকেই শুরু করা উচিত এবং সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বয়ে এ বিষয়ে একটি কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। খাদ্য, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার মতোই বয়ঃসন্ধিকালীন স্বাস্থ্য এবং মানসিক স্বাস্থ্যসেবা সম্পর্কে জানা ও সেবা পাওয়া কিশোর-কিশোরীদের মৌলিক অধিকারের অংশ হওয়া উচিত।

kishor

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, ১০ থেকে ১৯ বছর বয়স পর্যন্ত সময়কাল হলো কৈশোরকাল। এই বয়সের ছেলেদের কিশোর এবং মেয়েদের কিশোরী বলা হয়। এই ১০ থেকে ১৯ বছর বয়সকে ‘বয়ঃসন্ধিকাল’ বলা হয়। এ সময়ে ছেলে ও মেয়েদের শরীরে নানা ধরনের হরমোনজনিত পরিবর্তন ঘটে। শারীরিক বৃদ্ধি এবং মানসিক বিকাশের সঠিক সময় এটি। এ সময় প্রজনন স্বাস্থ্য ও পুষ্টির বিষয়ে সচেতনতা অত্যন্ত জরুরি। শারীরিক সুস্থতার জন্য নিয়মিত খেলাধুলা বা শারীরিক সক্রিয়তা বজায় রাখা প্রয়োজন। এ বয়সে অনেক সময় তারা হতাশা বা মানসিক চাপে ভুগে থাকে। আমরা দেখেছি, এই সময়কালে তারা শারীরিক ও মানসিকভাবে দ্রুত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যায়। পরিবর্তনগুলো তাদের জীবনের সব দিককে প্রভাবিত করে। সহপাঠী বা সহকর্মীদের সাথে সম্পর্ক, পরিবারের সাথে সম্পর্ক এবং তাদের নিজের পরিচয় খুঁজে পেতে চেষ্টা করে। এই সময়ে কিশোর-কিশোরীরা বিভিন্ন মানসিক চাপের সম্মুখীন হয়, যা তাদের মানসিক স্বাস্থ্যকে প্রভাবিত করতে পারে।

আমাদের জেনে রাখা জরুরি, কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে কিছু সাধারণ মানসিক সমস্যা হলো: পরীক্ষা, সামাজিক অনুষ্ঠান, ভবিষ্যতের চিন্তা ইত্যাদি কারণে কিশোর-কিশোরীরা উদ্বেগ অনুভব করতে পারে। এমনকি কিশোর-কিশোরীরাও ডিপ্রেশনে ভুগতে পারে। এর লক্ষণ হতে পারে মন খারাপ, আনন্দহীনতা, ক্লান্তি, ঘুমের সমস্যা, খাবারের রুচি হারানো ইত্যাদি। এ ছাড়া মনোযোগ ঘাটতি একটি নিউরোডেভেলপমেন্টাল ডিসঅর্ডার, যা মনোযোগ কেন্দ্রীকরণ, অধিক সক্রিয়তা এবং আবেগপ্রবণ আচরণের সাথে সম্পর্কিত। কিংবা তারা অন্যদের সামনে কথা বলতে ভয় পায়, নতুন পরিস্থিতিতে অস্বস্তি বোধ করে। এর বাইরে এনিরেক্সিয়া নার্ভোসা, বুলিমিয়া নার্ভোসা ইত্যাদি খাওয়ার ব্যাধি তাদের মধ্যে দেখা যেতে পারে।

কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে এসব মানসিক সমস্যার অনেকগুলো কারণ থাকতে পারে। কিশোর-কিশোরীরা শারীরিকভাবে দ্রুত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যায়, যা তাদের মেজাজ এবং আচরণকে প্রভাবিত করতে পারে। স্কুল, বন্ধু-বান্ধব, এবং সামাজিক মাধ্যম থেকে আসা চাপ কিশোর-কিশোরীদের মানসিক স্বাস্থ্যকে প্রভাবিত করতে পারে। পরিবারের মধ্যে দ্বন্দ্ব, অস্থিরতা বা অভাব ইত্যাদি কিশোর-কিশোরীদের মানসিক স্বাস্থ্যকে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করতে পারে। এ ছাড়া কিছু মানসিক সমস্যা জৈবিক কারণেও হতে পারে।

তাহলে এর সমাধান কী? বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, কিশোর-কিশোরীদের মানসিক সমস্যা সমাধানের জন্য বিভিন্ন পদ্ধতি অবলম্বন করা যেতে পারে। কগনিটিভ বিহেভিয়ারাল থেরাপি এবং অন্যান্য ধরনের থেরাপি কিশোর-কিশোরীদের মানসিক সমস্যা মোকাবিলায় সাহায্য করতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে মানসিক রোগের চিকিৎসায় ওষুধের প্রয়োজন হতে পারে। পরিবারের সদস্যরা কিশোর-কিশোরীদের সমর্থন করে এবং তাদের সাথে কথা বলে তাদের মানসিক স্বাস্থ্য উন্নত করতে সাহায্য করতে পারেন। স্কুল কর্তৃপক্ষ কিশোর-কিশোরীদের মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতন হওয়া এবং তাদের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করা উচিত। এ ছাড়া সুষম খাদ্য, নিয়মিত ব্যায়াম এবং পর্যাপ্ত ঘুম কিশোর-কিশোরীদের মানসিক স্বাস্থ্য উন্নতি করতে সাহায্য করে।

kishor

তাই কিশোর-কিশোরীদের মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো এবং তাদের সমর্থন করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যদি আপনার কোনো কিশোর-কিশোরী মানসিক সমস্যায় ভুগছেন বলে মনে করেন, তাহলে তাকে একজন মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সাথে দেখা করার পরামর্শ দিন। এ জন্য পরিবারকে বেশি সচেতন হতে হবে। অভিভাবকেরা যেন কিশোর-কিশোরীর মানসিক অবস্থার দিকে সজাগ দৃষ্টি রাখেন। পাশাপাশি সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থার উদ্যোগ এ বিষয়ে ব্যাপক ভূমিকা রাখতে পারে। এই সময়ে দৈনন্দিন জীবনে সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। এ ক্ষেত্রে অভিভাবকদের সচেতন করতে রিলস এবং ইউটিউব কনটেন্ট নির্মাণ করতে হবে। গান, পুঁথিপাঠ এবং নাটক নির্মাণ করা যেতে পারে। এ ছাড়াও বিভিন্ন সচেতনতামূলক বার্তা সবার কাছে পৌঁছে দিতে হবে। বিভিন্ন গণমাধ্যমও এ ক্ষেত্রে ব্যাপক ভূমিকা রাখতে পারে। কবি-লেখকরাও গল্প, কবিতা বা উপন্যাসের মাধ্যমে বিষয়টি তুলে ধরতে পারেন।

আমরা জানি, ‘আজকের শিশু আগামী দিনের ভবিষ্যৎ’। তাই এই ভবিষ্যৎ যেন অবহেলায় অকালেই নষ্ট হয়ে না যায়। কিশোর-কিশোরীর প্রতি সুদৃষ্টি রাখা আমাদের সকলেরই নৈতিক দায়িত্ব। সুখী ও সমৃদ্ধ পরিবার গঠনে অভিভাবক থেকে শুরু করে সবারই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। কেননা কিশোর-কিশোরীরা সঠিক ভাবে বেড়ে উঠলেই দেশ উন্নত হবে। অদম্য গতিতে এগিয়ে যাবে পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্র।

এসইউ

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow