কী ঘটেছিল চব্বিশের ৩৬ জুলাই, যেভাবে পালালেন শেখ হাসিনা

২০২৪ সালের ৩৬ জুলাই (৫ আগস্ট) সোমবার ছিল অসহযোগ কর্মসূচির দ্বিতীয় দিন। ঢাকামুখী লং মার্চের ঘোষণাও ছিল। নানা জল্পনা-কল্পনা আর দুশ্চিন্তায় রাত কেটেছে দেশের মানুষের। ঢাকায় এদিন ভোর হয়েছিল উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার মধ্য দিয়ে। দেশে কী ঘটছে তা নিয়ে অন্ধকার ছিল সাধারণ মানুষ। এর আগেরদিন ৪ আগস্ট সন্ধ্যা ৬টা থেকে চলছিল অনির্দিষ্টকালের কারফিউ। কখন কারফিউ শিথিল হবে, কেউ জানতেন না। কারফিউর কারণে ঢাকাবাসী উৎকণ্ঠা যেন আরও কয়েকগুণ বেড়ে যায়। ৫ আগস্ট সকালটা ছিল মেঘাচ্ছন্ন। ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় সেনাবাহিনী ও পুলিশের কঠোর অবস্থান। সকালে সব সড়কই ছিল জনশূন্য। জরুরি সেবার দুয়েকটি গাড়ি ছাড়া সড়কে যানবাহন ছিল না। ঢাকার সবগুলো প্রবেশপথে ব্যাপক সতর্ক অবস্থান নেয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। বিভিন্ন মোড় ব্যারিকেড দিয়ে বন্ধ করে দিয়েছিল সেনাবাহিনী। কড়া নিরাপত্তায় ছিল আমিনবাজার ব্রিজ, যাত্রাবাড়ীর শনির আখড়া, বাবুবাজার ব্রিজ। রাস্তায় কেউ বের হলে চলেছে তল্লাশি বা জিজ্ঞাসাবাদ। সোমবার শুরু হয় তিনদিনের সাধারণ ছুটি। অফিস আদালত, ব্যাংক ও শিল্প কারখানা বন্ধ। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ আগে থেকেই। সোমবার সকালে সারাদেশে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনে

কী ঘটেছিল চব্বিশের ৩৬ জুলাই, যেভাবে পালালেন শেখ হাসিনা

২০২৪ সালের ৩৬ জুলাই (৫ আগস্ট) সোমবার ছিল অসহযোগ কর্মসূচির দ্বিতীয় দিন। ঢাকামুখী লং মার্চের ঘোষণাও ছিল। নানা জল্পনা-কল্পনা আর দুশ্চিন্তায় রাত কেটেছে দেশের মানুষের। ঢাকায় এদিন ভোর হয়েছিল উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার মধ্য দিয়ে। দেশে কী ঘটছে তা নিয়ে অন্ধকার ছিল সাধারণ মানুষ। এর আগেরদিন ৪ আগস্ট সন্ধ্যা ৬টা থেকে চলছিল অনির্দিষ্টকালের কারফিউ। কখন কারফিউ শিথিল হবে, কেউ জানতেন না। কারফিউর কারণে ঢাকাবাসী উৎকণ্ঠা যেন আরও কয়েকগুণ বেড়ে যায়।

৫ আগস্ট সকালটা ছিল মেঘাচ্ছন্ন। ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় সেনাবাহিনী ও পুলিশের কঠোর অবস্থান। সকালে সব সড়কই ছিল জনশূন্য। জরুরি সেবার দুয়েকটি গাড়ি ছাড়া সড়কে যানবাহন ছিল না। ঢাকার সবগুলো প্রবেশপথে ব্যাপক সতর্ক অবস্থান নেয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। বিভিন্ন মোড় ব্যারিকেড দিয়ে বন্ধ করে দিয়েছিল সেনাবাহিনী। কড়া নিরাপত্তায় ছিল আমিনবাজার ব্রিজ, যাত্রাবাড়ীর শনির আখড়া, বাবুবাজার ব্রিজ। রাস্তায় কেউ বের হলে চলেছে তল্লাশি বা জিজ্ঞাসাবাদ।

সোমবার শুরু হয় তিনদিনের সাধারণ ছুটি। অফিস আদালত, ব্যাংক ও শিল্প কারখানা বন্ধ। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ আগে থেকেই। সোমবার সকালে সারাদেশে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটও বন্ধ হয়। আগের দিন রোববার দুপুরেই বন্ধ করা হয় মোবাইল ইন্টারনেট। ফলে ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউটের কবলেই ছিল বাংলাদেশ।আন্দোলনকারীদের লং মার্চ এবং কারফিউয়ে উৎকণ্ঠার মধ্যে আড়াই ঘণ্টা বন্ধ রাখার পর ফেরে ইন্টারনেট সেবা। ব্রডব্যান্ডের সঙ্গে ফেরে মোবাইল ইন্টারনেটও। ফেসবুক তখনো বন্ধ।

তবে গণভবনে শেখ হাসিনার সকালটা ঠিক আর সব সকালের মতোই ছিল। হাসিনা পতনের পর, বেশ কয়েকটি গোপন সূত্রে ফাঁস হয়েছিল সেদিনের গণভবন কিচ্ছা-কর্মযজ্ঞ।

৫ আগস্ট শেখ হাসিনা ভোরেই ঘুম থেকে ওঠেন। আগের রাতে অনেক দেরিতে ঘুমানোর পরও তিনি খুব সকালেই উঠলেন। ফজরের নামাজ শেষে দীর্ঘক্ষণ মোনাজাত করলেন। এরপর এক কাপ চা নিয়ে বসলেন গণভবনে নিজের অফিসকক্ষে। সেদিনও তার চারদিকে কতো নিরাপত্তারক্ষী, প্রতিদিনকার মতোই নানা বাহিনীর সদস্যরা গণভবনের নিরাপত্তায় অবস্থানরত ছিলেন। কিন্তু হাসিনা তখনো ভাবেনি, তার ক্ষমতার শেষ ক্ষণটা আসন্ন।

jagonewsপরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছিল যে, শেখ হাসিনার সামনে তখন কেবল একটাই বিকল্প খোলা-‘পদত্যাগ’

নিজের অফিস কক্ষে বসেই, পুলিশ ও অন্যান্য বাহিনীতে থাকা আস্থাভাজনদের সঙ্গে ফোনে কথা বলা শুরু করেন তিনি। খোঁজ খবর নিচ্ছিলেন, সবাই জানাচ্ছিলেন-কারফিউ বলবৎ আছে। বাহিনীর কর্মকর্তারা তাকে আশ্বস্ত করলেন-কেউ কারফিউ ভঙ্গ করলে কড়া পদক্ষেপ নেওয়া হবে। জানানো হলো, রাজধানীতে প্রবেশের সব পথ বন্ধ করা হয়েছে, একটি পিঁপড়াও ঢুকতে পারবে না। এরপর শেখ হাসিনা নাস্তা করলেন। সেদিনের খাবারের মেনুতে কী কী থাকবে, তারও খোঁজ নিলেন। কারণ রাজনৈতিক নেতা, সুশীল সমাজ ও নানান বাহিনীর প্রধানদের তার সঙ্গে দেখা করার কথা ছিল।

কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ততক্ষণে শত শত মানুষ জড়ো হয়েছেন। খবর পেয়ে কয়েকশ পুলিশ শাহবাগ থেকে শহীদ মিনার গিয়ে তাদের ওপর সাউন্ডগ্রেনেড-গুলি নিক্ষেপ করে। এতে আন্দোলনকারীরা দিগ্‌বিদিক ছোটাছুটি করে সেখান থেকে সরে যান। সেখান থেকে দুজনকে আটক করে থানায় নিয়ে যেতে দেখা যায়। সকাল ১০টার পর থেকে আন্দোলনকারীরা ফের চাংখারপুলেও জমায়েত হলেন। এসময় ছাত্র-জনতার গণমিছিল ও বিক্ষোভকে যে কোনো উপায়ে ঠেকিয়ে রাখার চেষ্টা চালাচ্ছিলেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীগুলো। তবে আন্দোলন তীব্র থেকে তীব্রতর হতে থাকে। ব্যক্তিগত সোর্সে- এ খবর শেখ হাসিনার কাছেও পৌঁছাতে থাকে। প্রধানমন্ত্রী জানতে পারলেন, রাজধানীর প্রবেশ পথ যাত্রাবাড়ী, সাভার, আশুলিয়া, উত্তরায় এরই মধ্যে জনতা জড়ো হয়ে গেছেন।

৫ আগস্ট সকাল সাড়ে ১০টায় শেখ হাসিনা নিরাপত্তা বাহিনীর ঊর্ধ্বতনদের ডেকে পাঠালেন। গণভবনে ডাকা হলো তিন বাহিনীর প্রধান ও পুলিশের মহাপরিদর্শককেও (আইজিপি)। তারাও দ্রুত এলেন। আলোচনায় বসলেন। তারা সবাই বুঝছিলেন- ঢাকার পরিস্থিতি খারাপ হতে চলেছে। বিষয়টি শেখ হাসিনাকেও জানানো হলো। তবে হাসিনা নির্দেশ দিলেন, যে কোনো মূল্যে বিক্ষোভকারীদের প্রতিহত করতে। নিরাপত্তাবাহিনী কেন পরিস্থিতি সামাল দিতে পারছে না, তার জন্য শেখ হাসিনা ক্ষোভ প্রকাশ করলেন। বিশ্বাস করে এই কর্মকর্তাদের শীর্ষ পদে তিনিই বসিয়েছেন, সেটাও স্মরণ করিয়ে দিলেন।

কিন্তু বাহিনীর প্রধানরা রক্তপাত এড়াতে চাইলেন। জানানো হলো, গুলি করলে দুপক্ষেরই হাজারো লাশ পড়বে। হতাহতের ঘটনা ঘটবে। শীর্ষ কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে বোঝানোর চেষ্টা করা হলো, বলপ্রয়োগ করে এই পরিস্থিতি সামাল দেওয়া যাবে না। তবে শেখ হাসিনা সেটা মানতে চাচ্ছিলেন না।

অন্যদিকে বেলা সাড়ে ১১টার পরে কারফিউ অমান্য করে উত্তরা আজমপুর এলাকায় জড়ো হয় বিপুলসংখ্যক আন্দোলনকারী। মার্চ টু ঢাকা কর্মসূচির অংশ হিসেবে প্রায় ১০ হাজার মানুষ আজমপুরের ব্যারিকেডে পৌঁছালে র‍্যাব ও সেনাবাহিনীর সদস্যরা ব্যারিকেড সরিয়ে নেন। পরে পুলিশ সদস্যরাও ঢাকা অভিমুখী আন্দোলনকারীদের কোনো বাধা দিতে দেখা যায়নি। এর এক ঘণ্টা পর তারা রাজলক্ষ্মীর দিকে পৌঁছে যান। অন্যদিকে বেলা পৌনে ১১টা নাগাদ কাজলা ও শনির আখড়া থেকে মিছিল নিয়ে গুলিস্তান এবং যাত্রাবাড়ী ফ্লাইওভারের টোলপ্লাজার দিকে আসে আন্দোলনকারীদের আরেকটি দল। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে এসময় পুলিশ সাউন্ড গ্রেনেড ছোড়েন।

এগুলো তো মাত্র কয়েকটি এলাকার উদাহরণ। ঢাকা শহর ও এর আশপাশের জেলাগুলোর প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টের দৃশ্য ছিল প্রায় একইরকম। হামলা-যুদ্ধ-আগুন-টিআরসেলেও থামানো যায়নি মানুষের পায়ের ছন্দ। গন্তব্য-ঢাকা। সবাই ঢাকামুখী। ১২টা না পেরুতেই বাঁধভাঙা ঢলের মতোই মানুষের ঢল নামলো ঢাকার পথে। রাজধানীতে প্রবেশ করে লাখো জনতা। উত্তরা থেকে শাহবাগ, চিটাগাং রোড হয়ে শাহবাগ, গাবতলী হয়ে শাহবাগ, বাবুবাজার ব্রিজ হয়ে শাহবাগ পথ ছিল লোকে লোকারণ্য।

বোঝা যাচ্ছিল, বড় কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে। প্রতিরক্ষা পরিস্থিতি ইঙ্গিত দিচ্ছিল, গণ-অভ্যুত্থান আসন্ন। কর্মকর্তারা শেখ হাসিনাকে জানালেন, ঢাকার পতন এখন মাত্র দুই ঘণ্টা দূরত্বে। পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছিল যে, শেখ হাসিনার সামনে তখন কেবল একটাই বিকল্প খোলা-‘পদত্যাগ’। এবারও সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন তিনি।

jagoআন্দোলনকারীরা লং মার্চ কারফিউ উপেক্ষা করে ঢাকা আসতে থাকে

পালালেন হাসিনা-রেহেনা

ক্রমেই যখন পরিস্থিতি বিপজ্জনক হয়ে উঠছে, তখন গণভবনে অবস্থানরত সামরিক-বেসামরিক কিছু হেভিওয়েট কর্মকর্তারা শেখ হাসিনাকে পদত্যাগ ও পালিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেন। তবে প্রধানমন্ত্রী আরও বল প্রয়োগ করে ক্ষমতায় থাকতে চাইলে তাকে জানানো হয়, এই ধরনের ব্যবস্থা অকার্যকর হবে। এ ব্যাপারে শেখ রেহানার সঙ্গেও একটি ভিন্ন কক্ষে আলোচনা করেন একাধিক কর্মকর্তারা। পরিস্থিতি জানিয়ে শেখ হাসিনাকে বোঝানোর অনুরোধ করেন। এরপর রেহানা বড় বোনের সঙ্গে আলোচনা করেন। কিন্তু, হাসিনাকে মানানো যায়নি। তখনও ক্ষমতা ধরে রাখতে অনড় প্রধানমন্ত্রী। একপর্যায়ে বিদেশে থাকা সজীব ওয়াজেদ জয়কে ফোন করেন একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। ফোনালাপ চলে দীর্ঘক্ষণ। পরে জয় তার মায়ের সঙ্গে কথা বলেন। এরপর শেখ হাসিনা বুঝতে পারলেন-স্বৈরাচারী শাসনের অন্ধকারময় অধ্যায় শেষ। শেষমেষ পদত্যাগের জন্য রাজি হলেন বঙ্গবন্ধুর এই উত্তরসূরি।

উচ্চপদস্থ নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের কথায় কান না দিলেও শেষ পর্যন্ত পরিবারের সদস্যদের পরামর্শে তিনি পালিয়ে যেতে রাজি হলেন। তবে ক্ষমতা ছাড়ার আগে একবার তিনি ধানমণ্ডি ৩২ ও গোপালগঞ্জে গিয়ে পিতার প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা নিবেদনের ইচ্ছা প্রকাশ করলেন। তবে কর্মকর্তারা বুঝতে পেরেছিলেন, এর ফলে নতুন করে ঝামেলা বাড়বে। টুঙ্গিপাড়া গেলেই শেখ হাসিনার মনও পরিবর্তন হতে পারে। তাই বাহিনী প্রধানরা এই প্রস্তাবও প্রত্যাখ্যান করেন।

অবশেষে দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে শেখ হাসিনা পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর করলেন। হয়তো এরই মাধ্যমে দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনেরও ইতি টেনেছেন শেখ হাসিনা। এরপর শেখ হাসিনা ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে স্যাটেলাইট ফোনে ফোন দেন। দ্রুত একটি ফ্লাইট পাঠিয়ে তাকে ভারত নিয়ে যেতে অনুরোধ করেন। প্রথমে মোদী রাজি হয়ে যান। কিন্তু দ্রুতই আবার ফোন করে মোদী জানান, কোনো আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া ছাড়া বিমান পাঠালে তা আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন হবে। মোদী জানান, কেবল ভারতের সীমানার মধ্যে ঢুকতে পারলেই, তখন ভারত সব ব্যবস্থা করতে পারবে। এরপরই নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় আকাশপথে দেশ ছাড়লেন শেখ হাসিনা।

গণভবন দখল

শেখ হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার পর জনতা যেন গণভবন, সংসদ ভবন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, ন্যাম ভবন নিয়েই মেতে ওঠেন। কেউ মেতেছেন খুশিতে, কেউ মেতেছেন লুটে। কেউবা গণভবনের লম্বা লেকে গোসলে নেমেছেন। কেউবা ঘুরে ঘুরে দেখছিলেন- যা হয়তো দেখা হতো না কোনোদিন। সংসদ ভবন, আগারগাঁও, শ্যামলী এলাকায় তখন যারা ছিলেন, তারা যেন ভুলেই গিয়েছিল শাহবাগ সমাবেশের কথা। ঐ মুহূর্তে আসিফ মাহমুদ আহ্বান জানান, ‘সবাই শাহবাগ আসুন, কেন্দ্রীয় সমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে। কোনো প্রকার সামরিক শাসন আমরা মানব না। জনতার ঘোষণা দেওয়া হবে কেন্দ্রীয় সমাবেশ থেকে।’ আগে থেকেই শাহবাগে অবস্থানরত ছিলেন লাখো শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ। সেখানে যারা ছিলেন, তারাও বিজয় উল্লাস করছেন। নেচে নেচে স্লোগান দিচ্ছিলেন-মাঝেমধ্যেই স্লোগানে উচ্চকিত হয়ে ওঠে পুরো এলাকা।

শেখ হাসিনার পলায়নের খবর শুনে চট্টগ্রামের ২ নম্বর গেট, মুরাদপুর, বায়েজিদ, জিইসি, আগ্রাবাদ, এ কে খান, কাজীর দেউড়ি, প্রবর্তকসহ বিভিন্ন সড়কে মিছিল করে হাজারো মানুষ। সাধারণ মানুষ জাতীয় পতাকা নিয়ে উল্লাস করে ও স্লোগান দেয়। পরে তারা সড়ক থেকে দলে দলে চট্টগ্রাম নগরের নিউমার্কেট এলাকায় জড়ো হন। বগুড়ায় শেখ হাসিনার পদত্যাগ ও দেশত্যাগের খবর ছড়িয়ে পড়লে বেলা ২টার পর কারফিউ ভেঙে মিছিল নিয়ে লাখো ছাত্র-জনতার ঢল নামে। এ সময় শিশু থেকে শুরু করে বৃদ্ধ, নারী থেকে কিশোরী সব বয়সিকে উল্লাস করতে দেখা যায়।

শুধু ঢাকা আর চট্টগ্রামবাসী নয়, হাসিনা পালিয়ে যাবার খবর শুনে আনন্দে ফেটে পড়ে পুরো দেশ। দেশের প্রতিটি জেলা-উপজেলা-থানা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে উল্লাস, মিষ্টি বিতরণ, বিজয় মিছিল অনুষ্ঠিত হয়েছে। মিষ্টির দোকানগুলো থেকে মিষ্টি শেষ হয়ে গিয়েছে। সারাদেশের সরকারি অফিসগুলো থেকে বিকেলের মধ্যে হাসিনার ছবিগুলো খুলে নিয়ে ভাঙা হয়েছে। কোথাও কোথাও আনন্দে কাঙালিভোজের আয়োজন করা হয়েছে। এরই মধ্যে বিএনপি, জামায়াত ও অন্য দলগুলোর সমর্থকরা সেদিন রাস্তায় এসেছেন। পালিয়ে থাকা কিংবা বন্দিদশা থেকে মুক্তি মিলেছে। দলীয়করণের ফলে কোণঠাসা অফিসিয়াল কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সেদিন মুক্তাঙ্গনে আনন্দে মেতেছেন।

শেখ হাসিনার পদত্যাগ ও দেশ ছাড়ার সংবাদে দেশের বাইরেও সেদিন উল্লাস হয়। লন্ডনের আলতাব আলী পার্কে বিজয়োৎসবে শামিল হন হাজারো প্রবাসী বাংলাদেশি। বিভিন্ন শ্রেণি পেশার নারী-পুরুষের পদচারণায় মুখর হয়ে উঠে ওই পার্ক প্রাঙ্গণ।

jagoধানমন্ডির ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিবিজড়িত বাড়িটিতে আগুন ধরিয়ে দেয় বিক্ষোভকারীরা

তখনো দেশব্যাপী চলছিল ধ্বংসযজ্ঞ

এদিকে আনন্দ মিছিলের পাশাপাশি ধ্বংসযজ্ঞও চালায় কিছু অতিউৎসাহী। ৫ আগস্ট বিকেল ৩টা থেকে শুরু হয় নানা ধ্বংসযজ্ঞ। ওইদিন রাতভর কিংবা পরদিনও চলে ধ্বংসলীলা। ঢাকার বিভিন্ন থানায় হামলা হয়। ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্মৃতিবিজড়িত বাড়িটিতে আগুন ধরিয়ে দেয় বিক্ষোভকারীরা। সোমবার (৫ আগস্ট) বিকেল পৌনে ৪টার দিকে সেখানে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলতে দেখা যায়। বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে ধানমন্ডির সুধা সদনে আগুন ধরিয়ে দেয় বিক্ষোভকারীরা। এর আগে সুধাসদনে ভাঙচুর চালানো হয়। বাড়ি থেকে জিনিসপত্র বের করে যে যার মতো নিয়ে চলে যায়। রাজধানীতে আওয়ামী লীগের ধানমন্ডি ও ঢাকা জেলা কার্যালয়ে আগুন দেয় আন্দোলনকারীরা। রাজধানী ঢাকার বিজয় সরণিতে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাস্কর্য ভাঙচুর করা হয়।

দায়িত্ব নিলেন সেনাপ্রধান

শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে কয়েক সপ্তাহের বিক্ষোভে হাজারেরও বেশি মানুষ নিহত হয়। তাদের বেশিরভাগই মারা গেছে পুলিশের গুলিতে। সেই রক্তভেজা মাটিতে নতুন শাসন প্রতিষ্ঠার পালা। কার হাতে যাচ্ছে বাংলাদেশ? সেই প্রশ্নের সমাধানের ক্ষণ এল।
প্রধানমন্ত্রী পালিয়ে যাওয়ার পর ৫ আগস্ট সেনা সদর দফতরে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা ও বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে বৈঠক করেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান। সেই বৈঠকে ডাক পান জাতীয় পার্টির আনিসুল ইসলাম মাহমুদ ও মুজিবুল হক চুন্নু, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক আসিফ নজরুল, বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও মির্জা আব্বাস।

আইএসপিআর থেকে পূর্বে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছিল, সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান সোমবার দুপুর ২টায় জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেবেন। শেষমেষ বিকেল ৪টায় জনগণের উদ্দেশে ভাষণ দিলেন সেনাপ্রধান। ভাষণে তিনি বলেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করেছেন। এখন একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করে আমরা আমাদের কার্যক্রম পরিচালনা করব।’

সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান বলেন, ‘দেশে রাজনৈতিক ক্রান্তিকাল চলছে। একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করা হবে। সব হত্যার বিচার হবে। সেনাবাহিনীর ওপর আস্থা রাখেন। আমরা রাজনৈতিক দলের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছি। দেশে শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখেন। আপনারা আমার ওপর আস্থা রাখেন, একসাথে কাজ করি। দয়া করে সাহায্য করুন। মারামারি সংঘাত করে আর কিছু পাব না। সংঘাত থেকে বিরত হোন। সবাই মিলে সুন্দর দেশ গড়ি।’

সেনাপ্রধানের এমন ভাষণের পর ঐদিন সন্ধ্যায় চ্যানেল ২৪-এর এক অনুষ্ঠানে অংশ নেন আটজন সমন্বয়ক। ওই অনুষ্ঠানে অন্যতম সমন্বয়ক নাহিদ বলেন, ‘ছাত্র-নাগরিক গণ-অভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারী প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলাপ আলোচনার ভিত্তিতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করতে হবে। ছাত্র-নাগরিক প্রতিনিধিত্বের সঙ্গে আলোচনা ছাড়া কোনো প্রকার সেনা-সমর্থিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করা যাবে না। অভ্যুত্থানে অংশীজন ছাত্র, নাগরিক সমাজ এবং রাজনৈতিক শক্তির প্রতিনিধিত্ব অন্তর্বর্তীকালীন সরকারে নিশ্চিত করতে হবে। ফ্যাসিবাদের সহযোগী বা সুবিধাভোগীদের এ সরকারে অংশ নিতে দেওয়া হবে না।

এদিন রাত ৯টায় রাজধানীর তেজগাঁওয়ে সংবাদ সম্মেলন করেন ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়করা। সেখানে সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের রূপরেখার জন্য আমাদের সবার সঙ্গে বসতে হবে। আমরা সব সমন্বয়ক কমিটির সঙ্গে আলোচনা করব, নাগরিক সমাজ, রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করব, রাষ্ট্রের সব স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে আলোচনা করব। তবে নির্দিষ্ট কাদের সঙ্গে বসব তা আমরা পরবর্তীতে জানিয়ে দেব। তবে আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পূর্ণাঙ্গ রূপরেখা দেওয়া হবে।

জনমনে কয়েকটি অমীমাংসিত প্রশ্ন

শেখ হাসিনার পদত্যাগ ও বাংলাদেশ থেকে পালিয়ে যাওয়ার পরেও বেশকিছু বিষয় ধোঁয়াশা ছিল। পালানোর সময়টা নিয়ে সত্য-মিথ্যা-গুজব নানা তথ্যও আসতে থাকে। প্রশ্ন ওঠে ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা নিজে কী রাষ্ট্রপতির কাছে পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছিলেন? তিনি কি গণভবন থেকে বঙ্গভবনে গিয়েছিলেন? কোথায় তিনি পদত্যাগপত্র স্বাক্ষর করেছেন? সত্যিই কি তিনি স্বাক্ষর করেছেন? কোন মাধ্যমে কীভাবে সেদিন শেখ হাসিনা দেশের সীমানা পেরিয়েছিলেন?

এ বিষয়ে টিবিএস এর একটি ভিডিও প্রতিবেদন বলছে-শেখ হাসিনা সেদিন গণভবনে যাননি। নিজ হাতে তিনি পদত্যাগপত্র জমাও দেননি। পদত্যাগপত্রটি বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতির কাছে পৌঁছে দিয়েছিলেন একজন সরকারি উচ্চ পদস্থ আমলা। ঐ প্রতিবেদনে আরও জানানো হয়েছে, গণভবনে দুই ঘণ্টার উত্তপ্ত বিতর্কের পর অবশেষে দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে শেখ হাসিনা পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর করেছিলেন। এরপর তাকে এসএসএফ সদস্যরা বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রের পাশে একটি জায়গায় নিয়ে যান। সেখানে ইটের স্তূপের পাশেই একটি হেলিকপ্টার অপেক্ষা করছিল। চারদিকে তখন নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা। ইন্টারনেটও বন্ধ ছিল। ওই হেলিকপ্টারে করে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পাশে কুর্মিটোলায় বঙ্গবন্ধু বিমান ঘাঁটিতে নিয়ে যাওয়া হয় শেখ হাসিনাকে। সেখান থেকে বিমানবাহিনীর একটি পরিবহন বিমানে চড়ে ভারতের পথে রওনা দেন হাসিনা-রেহানা। শেখ হাসিনা ভারতে পৌঁছানো নিশ্চিত হওয়ার পর তার পদত্যাগের ঘোষণা দেওয়া হয়।

শেখ হাসিনা পালানোর পর দেশের শীর্ষ কর্মকর্তারা বিষয়গুলো আর পরিষ্কার করেনি। এ বিষয়ে সংবাদমাধ্যম কিংবা অন্যকোনো প্লাটফর্মে বিষদ কোনো বিবরণও আসেনি। ৫ আগস্টের অফিসিয়াল সংস্করণটি কেবল কয়েকটি শব্দের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল- ‘শেখ হাসিনা পদত্যাগ করেছেন’। বঙ্গভবন থেকে শুধু ঘোষণা দেওয়া হয়- ‘শেখ হাসিনার পদত্যাগপত্রটি গৃহীত হয়েছে’।

কেএসকে

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow