কী শেখাচ্ছে ‘শিক্ষা’, একজন মা, শিল্পী ও শিক্ষার্থীর গভীর ভাবনা
আমি কোনো দিনই খুব সহজে কোনো ব্যবস্থার মধ্যে নিজেকে খাপ খাওয়াতে পারিনি। ছোটবেলায় আমি স্কুলে ঠিক মানিয়ে নিতে পারতাম না। কারণ আমি পড়তে ভালোবাসতাম না— এমন নয়। বরং উল্টোটা। আমি শেখাকে ভীষণ ভালোবাসতাম। কিন্তু আমাকে কী ভাবতে হবে, সেটাই বেশি শেখানো হতো; কেন ভাবছি, কীভাবে ভাবছি, আর কীভাবে আরও গভীরভাবে ভাবা যায়— সেই জায়গাটা খুব কমই ছিল। আমি সেই বাচ্চাটাই ছিলাম যে অনেক প্রশ্ন করত, পড়ার বইয়ের বাইরে চলে যেত, আর সিলেবাসে না থাকা বিষয়গুলো নিয়েই সবচেয়ে বেশি কৌতূহলী হয়ে উঠত। আমার কাছে শ্রেণিকক্ষটা প্রায়ই পৃথিবীর তুলনায় খুব ছোট মনে হতো। সেই অনুভূতিটা কোনো দিন বদলায়নি। বহু বছর পরে, যখন আমি নিজে মা হলাম, তখন আবার সেই একই শিক্ষাব্যবস্থার সামনে দাঁড়ালাম— এবার আমার নিজের সন্তানদের চোখ দিয়ে। আমি ওদের দুটি স্কুলে ভর্তি করিয়েছিলাম। কারণ আমি বিশ্বাস করতে চেয়েছিলাম, কোথাও না কোথাও এমন একটি জায়গা নিশ্চয়ই আছে, যেখানে কৌতূহলকে মূল্য দেওয়া হয়, শুধু আনুগত্যকে নয়।কিন্তু আমি যা দেখলাম, তা ভিন্ন। আমি দেখলাম শিক্ষকরা নিজেরাও একটি নির্দিষ্ট সিলেবাসের মধ্যে বন্দি। তারা নিষ্ঠার সঙ্গে পড়াচ্ছেন, পরীক্
আমি কোনো দিনই খুব সহজে কোনো ব্যবস্থার মধ্যে নিজেকে খাপ খাওয়াতে পারিনি।
ছোটবেলায় আমি স্কুলে ঠিক মানিয়ে নিতে পারতাম না। কারণ আমি পড়তে ভালোবাসতাম না— এমন নয়। বরং উল্টোটা। আমি শেখাকে ভীষণ ভালোবাসতাম। কিন্তু আমাকে কী ভাবতে হবে, সেটাই বেশি শেখানো হতো; কেন ভাবছি, কীভাবে ভাবছি, আর কীভাবে আরও গভীরভাবে ভাবা যায়— সেই জায়গাটা খুব কমই ছিল।
আমি সেই বাচ্চাটাই ছিলাম যে অনেক প্রশ্ন করত, পড়ার বইয়ের বাইরে চলে যেত, আর সিলেবাসে না থাকা বিষয়গুলো নিয়েই সবচেয়ে বেশি কৌতূহলী হয়ে উঠত। আমার কাছে শ্রেণিকক্ষটা প্রায়ই পৃথিবীর তুলনায় খুব ছোট মনে হতো। সেই অনুভূতিটা কোনো দিন বদলায়নি। বহু বছর পরে, যখন আমি নিজে মা হলাম, তখন আবার সেই একই শিক্ষাব্যবস্থার সামনে দাঁড়ালাম— এবার আমার নিজের সন্তানদের চোখ দিয়ে।
আমি ওদের দুটি স্কুলে ভর্তি করিয়েছিলাম। কারণ আমি বিশ্বাস করতে চেয়েছিলাম, কোথাও না কোথাও এমন একটি জায়গা নিশ্চয়ই আছে, যেখানে কৌতূহলকে মূল্য দেওয়া হয়, শুধু আনুগত্যকে নয়।
কিন্তু আমি যা দেখলাম, তা ভিন্ন।
আমি দেখলাম শিক্ষকরা নিজেরাও একটি নির্দিষ্ট সিলেবাসের মধ্যে বন্দি। তারা নিষ্ঠার সঙ্গে পড়াচ্ছেন, পরীক্ষা নিচ্ছেন, অধ্যায় শেষ করছেন। আমি তাদের দোষ দিই না। আমার বিশ্বাস, তাঁদের অধিকাংশই তাঁদের সাধ্যের মধ্যে সেরাটাই করার চেষ্টা করেন।
সমস্যাটা আরও গভীরে।
পৃথিবী বদলে গেছে। আমাদের শিশুদের মস্তিষ্ক কীভাবে শেখে, সৃজনশীলতা কীভাবে জন্মায়, প্রকৃতি কীভাবে আমাদের টিকিয়ে রাখে— এসব সম্পর্কে আজ আমরা অনেক বেশি জানি। কিন্তু আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা যেন এখনও বহু বছর আগের এক পৃথিবীর জন্য তৈরি।
আমরা তথ্য শেখাই।
কিন্তু বোঝা শেখাই না।
আমরা উত্তর মুখস্থ করাই।
কিন্তু প্রশ্ন করতে শেখাই না।
আমরা প্রতিযোগিতা শেখাই।
কিন্তু সহমর্মিতা শেখাই না।
সবচেয়ে বড় কথা, আমরা শিক্ষাকে জীবন থেকে আলাদা করে ফেলেছি। আমাদের শিশুরা পরীক্ষায় ভালো নম্বর পায়, কিন্তু নিজেদের আশপাশের গাছগুলোর নাম জানে না। তারা দূরের দেশের রাজধানী জানে, কিন্তু প্রতিদিন সকালে যে পাখির ডাক শুনে ঘুম ভাঙে, সেই পাখিটিকে চেনে না। তারা ইতিহাসের সাল-তারিখ মুখস্থ করে, কিন্তু নিজেদের নদী, বন, মাটি আর মানুষের জীবন্ত ইতিহাসের সঙ্গে পরিচিত হয় না।
কেন আমরা শিশুদের বন দেখাতে নিয়ে যাই না?
কেন প্রকৃতিকে আমরা তাদের সবচেয়ে বড় শিক্ষক হিসেবে দেখি না?
কেন তারা মাঠে যায় না, নদীর ধারে বসে না, গাছ লাগায় না, পোকামাকড় পর্যবেক্ষণ করে না, মাটির গন্ধ শিখে না, কিংবা বোঝে না যে পৃথিবীর প্রতিটি প্রাণী একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত?
যে পৃথিবী তাদের বাঁচিয়ে রাখবে, সেই পৃথিবীকে ভালোবাসতে শেখানো ছাড়া আমরা কীভাবে আশা করি, তারা একদিন সেটিকে রক্ষা করবে?
আমার নিজের শিক্ষা কখনই শুধু স্কুলে হয়নি।
আমার শিক্ষক ছিল গান।
আমার শিক্ষক ছিল ভ্রমণ।
মানুষ ছিল আমার শিক্ষক।
বন ছিল আমার শিক্ষক।
জীবন ছিল আমার শিক্ষক।
গান আমাকে পৃথিবীর নানা জায়গায় নিয়ে গেছে। নানা মানুষের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে। সুন্দরবনে দীর্ঘ সময় কাটিয়ে আমি প্রকৃতিকে নতুন করে চিনেছি। নেপাল, চীন এবং আরও নানা জায়গায় ঘুরে আমি শুধু নতুন দেশ দেখিনি; শিখেছি স্থানীয় সংস্কৃতি, ভেষজ চিকিৎসা, কৃষি, প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সহাবস্থান এবং সেইসব মানুষের কাছ থেকে, যাদের জ্ঞান কোনো পাঠ্যবইয়ে লেখা থাকে না। এগুলিও শিক্ষা।
জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষক সব সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক নন।
কখনো একজন কৃষক।
কখনো একজন শিল্পী।
কখনো একজন কারিগর।
কখনো কোনো আদিবাসী সম্প্রদায়, যারা শত শত বছর ধরে প্রকৃতির সঙ্গে ভারসাম্য রেখে বেঁচে আছে।
কখনো একটি শিশু।
আমার মনে হয়, একটি রাষ্ট্রের কাজ শিশুদের কৌতূহলকে বাঁচিয়ে রাখা, তাদের বিবেককে জাগিয়ে তোলা এবং স্বাধীনভাবে চিন্তা করার ক্ষমতা গড়ে তোলা। আমি বিশ্বাস করি, কোনো রাষ্ট্রেরই অধিকার নেই এমন একটি প্রজন্ম তৈরি করার, যাদের শৈশব ভয়ের ওপর দাঁড়িয়ে তৈরি হয়। ধর্ম সম্পর্কে জানা, বিভিন্ন বিশ্বাস ও দর্শন সম্পর্কে শিক্ষা লাভ করা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় ব্যাখ্যাকে, বিশেষ করে সৌদি-উৎসের ওয়াহাবি ইসলামের ব্যাখ্যাকে— একমাত্র সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে শিশুদের বড় করে তোলা শিক্ষার উদ্দেশ্য হতে পারে না।
শিক্ষা যদি মানুষকে প্রশ্ন করতে না শেখায়, তবে তা মুক্ত শিক্ষা নয়।
যদি শিক্ষা মানুষকে ভিন্নমতকে সম্মান করতে না শেখায়, তবে তা পূর্ণ শিক্ষা নয়।
যদি শিক্ষা মানুষকে মানবিকতার আগে ভয় শেখায়, তবে সেই শিক্ষা আমাদের আরও ছোট করে দেয়।
আমি চাই এমন একটি শিক্ষা, যেখানে শিশুরা বিজ্ঞান শিখবে, দর্শন শিখবে, সাহিত্য শিখবে, সব ধর্ম সম্পর্কে জানবে, প্রকৃতিকে জানবে, শিল্পকে জানবে, আর নিজের বিবেককে ব্যবহার করতে শিখবে।
শিল্পকলার অবস্থাও একই।
গান হয়ে যায় একটি অতিরিক্ত বিষয়।
ছবি আঁকা হয়ে যায় ঐচ্ছিক।
নাচ হয়ে যায় শুধু মঞ্চে পরিবেশনের বিষয়।
কবিতা হয়ে যায় পরীক্ষার বিশ্লেষণ।
আর ধীরে ধীরে শিশুরা বিশ্বাস করতে শুরু করে যে সৃজনশীলতা নয়, উৎপাদনশীলতাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
আমি তা বিশ্বাস করি না।
সৃজনশীলতা কোনো বিলাসিতা নয়।
এটি মানুষের সবচেয়ে মূল্যবান ক্ষমতাগুলোর একটি।
একটি গান লিখতে সময় লাগে।
একটি ছবি আঁকতে সময় লাগে।
একটি ভাবনাকে শব্দে গুছিয়ে আনতে সময় লাগে।
আজকের পৃথিবী আমাদের প্রতিটি মুহূর্তে তাড়া দেয়।
আরও দ্রুত।
আরও বেশি।
আরও উৎপাদন।
স্ক্রল করো।
সুইপ করো।
পরেরটায় যাও।
কিন্তু প্রজ্ঞা কখনো নোটিফিকেশনের গতিতে জন্মায় না।
শিল্পও না।
ভালোবাসাও না।
গভীর বোঝাপড়াও না।
একই প্রশ্ন আমি আজ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়েও করি। আমি প্রযুক্তিকে ভয় পাই না। বরং আমি তার সম্ভাবনায় বিস্মিত হই। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানবজাতির সবচেয়ে অসাধারণ আবিষ্কারগুলোর একটি। কিন্তু আমার প্রশ্ন এর নির্মাতাদের কাছে। যদি এত অসাধারণ প্রযুক্তি তৈরি করার সময় পৃথিবীর পরিবেশ, নদী, পানি, শক্তির ব্যবহার, জীববৈচিত্র্য এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর এর প্রভাবকে যথেষ্ট গুরুত্ব না দেওয়া হয়, তাহলে সেটিকে আমি প্রকৃত বুদ্ধিমত্তা বলতে পারি না।
আমার কাছে প্রকৃত বুদ্ধিমত্তা শুধু দ্রুত উত্তর দেওয়ার ক্ষমতা নয়। প্রকৃত বুদ্ধিমত্তা হলো নিজের সৃষ্টির দীর্ঘমেয়াদি পরিণতি সম্পর্কে সচেতন থাকা। প্রযুক্তি যদি পৃথিবীর ক্ষতির বিনিময়ে তৈরি হয়, তবে সেই প্রযুক্তিকে আরও দায়িত্বশীল, আরও টেকসই এবং আরও ন্যায়সঙ্গত করার দায়ও আমাদেরই।
আমার কাছে শিক্ষা, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি এবং শিল্প— এগুলো আলাদা বিষয় নয়। এগুলো একই যাত্রার অংশ। একটি যাত্রা, যার লক্ষ্য মানুষকে আরও মানবিক করে তোলা, প্রকৃতির সঙ্গে আমাদের সম্পর্ককে আরও গভীর করা। এবং এমন একটি পৃথিবী রেখে যাওয়া, যেখানে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম শুধু বেঁচে থাকবে না, সুন্দরভাবে বাঁচতে পারবে।
শিক্ষা আসলে কোনো ডিগ্রি নয়।
কোনো সিলেবাসও নয়। হ
য়তো শিক্ষা হলো বিস্মিত হতে শেখা।
প্রশ্ন করতে শেখা।
শুনতে শেখা।
ভুল স্বীকার করতে শেখা।
অন্যের কাছ থেকে শিখতে শেখা।
প্রকৃতিকে শিক্ষক হিসেবে গ্রহণ করা।
এবং শেষ পর্যন্ত বুঝতে শেখা যে, আমরা কেউই আলাদা নই।
আমরা সবাই একই পৃথিবীর সন্তান।
আরএমডি
What's Your Reaction?