কুমিল্লা সেন্ট্রাল মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থী অর্পিতা নওশিনের আত্মহত্যার ঘটনাকে ঘিরে রহস্য ও নানা প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। শুক্রবার (০৩ এপ্রিল) রাত ১০টার দিকে পুলিশ ক্যাম্পাস সংলগ্ন হাসপাতাল থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করে।
নিহত অর্পিতা নওশিনের বাড়ি খুলনায়। খুলনার সরকারি গার্লস হাইস্কুল থেকে এসএসসি ও খুলনা কলেজিয়েট গার্লস স্কুল অ্যান্ড কেসিসি উইমেন কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করে অর্পিতা মেডিকেল কলেজটির ১৮তম ব্যাচে ভর্তি হন।
অর্পিতা কলেজের এক নারী শিক্ষকের মানসিক চাপে অতিরিক্ত ঘুমের ট্যাবলেট খেয়ে ‘আত্মহত্যা’ করতে বাধ্য হয়েছেন- তার পরিবার ও সহপাঠীরা এমন দাবি করলেও পুলিশ বলছে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন ও তদন্তের আগে বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে না। এ ঘটনায় শনিবার কলেজ কর্তৃপক্ষ ৩ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। কমিটির প্রধান কলেজের সহকারী অধ্যাপক সহিদ উল্লাহ।
সহপাঠী ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, প্রথমবর্ষে অধ্যয়নকালে কলেজের এনাটমি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ডা. মনিরা জহিরের সঙ্গে একটি ব্যক্তিগত বিষয়কে কেন্দ্র করে অর্পিতা নওশিনের সম্পর্কের অবনতি ঘটে। এরপর থেকেই তিনি বিভিন্ন ধরনের মানসিক চাপ ও একাডেমিক জটিলতার মুখে পড়েন বলে অভিযোগ উঠে।
অভিযোগ রয়েছে, একই ব্যাচের অন্যান্য শিক্ষার্থীরা নিয়মিতভাবে পরবর্তী বর্ষে উত্তীর্ণ হলেও অর্পিতা নওশিন বারবার পরীক্ষায় অংশ নিয়েও এনাটমি বিষয়ে পাস করতে পারেননি। ফলে দীর্ঘ সময় ধরে তাকে প্রথমবর্ষেই আটকে থাকতে হয়। পরবর্তীতে তাকে জুনিয়র শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ক্লাস ও প্রফেশনাল পরীক্ষায় অংশ নিতে বাধ্য হতে হয়। যা তার জন্য মানসিকভাবে অত্যন্ত চাপে পড়েন অর্পিত নওশিন। গত তিন বছরে আরও চারবার এনাটমির পরীক্ষা দিয়েছেন নওশিন। কিন্তু প্রত্যেকবারই পরীক্ষায় ফেইল এসেছে।
সহপাঠীরা জানান, দীর্ঘদিন ধরে এই পরিস্থিতি তাকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তোলে। ব্যক্তিগত হতাশা, একাডেমিক অনিশ্চয়তা এবং সামাজিক অস্বস্তি সব মিলিয়ে তিনি প্রচণ্ড মানসিক চাপে ছিলেন বলে জানান তার ঘনিষ্ঠরা।
পুলিশ ও কলেজ সূত্র জানায়, শুক্রবার রাত সাড়ে ৭টার দিকে কলেজটির সদর দক্ষিণ উপজেলার মোস্তফাপুর ক্যাম্পাস সংলগ্ন মহিলা হোস্টেল থেকে অর্পিতার নিথর দেহ উদ্ধার করে কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নেওয়া হয়। পরীক্ষার পর চিকিৎসরা জানিয়েছেন হাসপাতালে নেওয়ার অনেক আগেই তার মৃত্যু হয়েছে।
সদর দক্ষিণ মডেল থানা পুলিশের তদন্ত সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, মেডিকেল ছাত্রীর মরদেহ ১০টার দিকে উদ্ধার করে থানায় নেওয়া হয়। শনিবার ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ নেওয়া হয়েছে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে।
সহপাঠীরা জানান, গত ৮ মার্চ চট্টগ্রাম মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় তাদের ব্যাচের তৃতীয় প্রফের ফল প্রকাশ হয়। ২০২১-২২ সেশনের সবাই এখন পঞ্চম বর্ষে পড়ছেন। কিন্তু অর্পিতা নওশিনের ক্ষেত্রে বিষয়টি সম্পূর্ণ বিপরীত। তিনি এখনও প্রথম প্রফ পরীক্ষাই উত্তীর্ণ হতে পারেননি। জুনিয়রদের সঙ্গে তার ক্লাস করতে হচ্ছে। এতে তিনি মানসিকভাবে বিপর্যপ্ত ছিল, তাই অতিরিক্ত ঘুমের ট্যাবেলেট খেয়ে আত্মহত্যা করেছেন।
তবে কী কারণে ওই তাকে ওই নারী শিক্ষকের ‘রোষানলে’ পড়তে হয়েছে এ বিষয়ে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
অর্পিতা নওশিনের ভাই শাহরিয়ার আরমান বোনের মরদেহ নিতে কুমিল্লায় আসেন। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, শিক্ষকের মানসিক চাপ থেকে এটা হয়তো করেছে। নওশিন বারবার এনাটমি বিভাগের ডা. মনিরার কথা বলত। একদম ফার্স্ট ইয়ার থেকে আমার বোনকে মানসিক নিপীড়ন করেছেন তিনি। আমি বলেছি, আমার বোনের সমস্যা কোথায় বলেন, তাও বলবে না।
এ বিষয়ে জানতে এনাটমি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ডা. মনিরা জহির সঙ্গে বারবার চেষ্টা করেও যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
সদর দক্ষিণ মডেল থানার ওসি মোহাম্মদ সিরাজুল মোস্তফা বলেন, তার মৃত্যু কারণ ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন আসার পরই নিশ্চিত হওয়া যাবে। অতিরিক্ত ঘুমের ট্যাবলেট খেয়েছে কি না বিষয়টি নিয়ে তদন্ত চলছে।
সেন্ট্রাল মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ ডা. ফজলুল হক লিটন বলেন, এমন মৃত্যু আমাদের মর্মাহত করেছে। তবে কোনো শিক্ষকের অবহেলার কারণে যদি তার মৃত্যু হয়ে থাকে, তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি আরও বলেন, এমন হয়ে থাকলে ওই ছাত্রী কিংবা তার অভিভাবকরা আগেই আমাদের লিখিতভাবে অবহিত করতে পারতেন। আমরা তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি করেছি। কমিটি কাজ শুরু করেছে। পুলিশও আলাদাভাবে তদন্ত করছে।