বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে, বিশেষ করে পূর্ব ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে আজ বড়দিন উদ্যাপন করছেন কোটি খ্রিস্টান। ফিলিস্তিন, মিসরসহ আরব বিশ্বের বহু এলাকায় এবং পূর্ব ইউরোপের নানা দেশে ৭ জানুয়ারি বড়দিন পালন করা হয়, যা পশ্চিমা বিশ্বের ২৫ ডিসেম্বরের বড়দিন থেকে আলাদা।
খ্রিস্টধর্মে বড়দিন যিশু খ্রিস্টের জন্মদিন হিসেবে পালিত হয়। ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, যিশুর জন্ম হয়েছিল ফিলিস্তিনের বেথলেহেমে। তবে যিশুর জন্ম ভিন্ন দিনে হওয়ার বিশ্বাসে একটি পক্ষ ৭ জানুয়ারি বড়দিন উদযাপন করেন না, বরং এই পার্থক্যের মূল কারণ হলো ভিন্ন ক্যালেন্ডার ব্যবহারের ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত।
দুটি বড়দিনের পেছনের ইতিহাস
এই বিভক্তির সূচনা হয় ১৫৮২ সালে। সে সময় রোমান ক্যাথলিক চার্চের প্রধান পোপ গ্রেগরি ত্রয়োদশ একটি নতুন ক্যালেন্ডার চালুর সিদ্ধান্ত নেন, যা পরিচিত হয় গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার নামে। এটি আগের জুলিয়ান ক্যালেন্ডারের তুলনায় অনেক বেশি নির্ভুল ছিল।
জুলিয়ান ক্যালেন্ডার চালু করেছিলেন রোমান সম্রাট জুলিয়াস সিজার, খ্রিস্টপূর্ব ৪৬ সালে। কিন্তু এই ক্যালেন্ডার সূর্য বছরের দৈর্ঘ্য প্রায় ১১ মিনিট বেশি ধরে নিয়েছিল। এর ফলে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ঋতুর সঙ্গে ক্যালেন্ডারের সময়ের মিল ধীরে ধীরে সরে যেতে থাকে।
হিসাব অনুযায়ী, জুলিয়ান ক্যালেন্ডার প্রতি ১২৮ বছরে এক দিন হারায়, যেখানে গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার একই ভুল করতে সময় নেয় প্রায় ৩ হাজার ২৩৬ বছর। এই গরমিল সংশোধন করতে ১৫৮২ সালে একসঙ্গে ১০ দিন বাদ দেওয়া হয়।
বিশ্বের অধিকাংশ দেশ ও চার্চ নতুন গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার গ্রহণ করলেও অনেক অর্থোডক্স ও প্রাচ্য খ্রিস্টান চার্চ তাদের ঐতিহ্য ধরে রাখতে জুলিয়ান ক্যালেন্ডার অনুসরণ করে যেতে থাকে।
বর্তমানে জুলিয়ান ক্যালেন্ডার গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারের চেয়ে ১৩ দিন পিছিয়ে। ফলে জুলিয়ান ক্যালেন্ডারের ২৫ ডিসেম্বর বর্তমান ক্যালেন্ডারে পড়ে ৭ জানুয়ারি। ভবিষ্যতে এই ব্যবধান আরও বাড়বে। যদি অর্থোডক্স চার্চ জুলিয়ান ক্যালেন্ডার ব্যবহার অব্যাহত রাখে, তাহলে ২১০১ সালে বড়দিন পালিত হবে ৮ জানুয়ারি।
কারা ৭ জানুয়ারি বড়দিন পালন করেন
বিশ্বে প্রায় ২৩০ কোটি খ্রিস্টান রয়েছে। এর মধ্যে আনুমানিক ২০০ কোটি মানুষ ২৫ ডিসেম্বর বড়দিন পালন করে। এই দলে রয়েছে প্রায় ১৩০ কোটি ক্যাথলিক, ৯০ কোটি প্রোটেস্ট্যান্ট এবং কিছু অর্থোডক্স খ্রিস্টান, যারা গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার গ্রহণ করেছে।
বাকি প্রায় ২৫ থেকে ৩০ কোটি খ্রিস্টান ৭ জানুয়ারি বড়দিন উদযাপন করে। এই দিনটিকে অনেক জায়গায় ‘ওল্ড ক্রিসমাস ডে’ বলা হয়।
৭ জানুয়ারি বড়দিন পালনকারী প্রধান গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে রয়েছে রুশ অর্থোডক্স চার্চ, যা এই ধারার সবচেয়ে বড় অনুসারী। এ ছাড়া সার্বিয়ান ও জর্জিয়ান অর্থোডক্স চার্চ, মিসরের কপটিক অর্থোডক্স চার্চ এবং ইথিওপিয়া ও ইরিত্রিয়ার অর্থোডক্স তেওয়াহেদো চার্চ এই দিনে বড়দিন উদযাপন করে।
ইউক্রেনে দীর্ঘদিন ধরে বড়দিন পালিত হয়ে আসছে ৭ জানুয়ারি। তবে ২০২৩ সালে দেশটি পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে রাষ্ট্রীয় ছুটি হিসেবে ২৫ ডিসেম্বর বড়দিন পালনের সিদ্ধান্ত নেয়। যদিও এখনো বহু মানুষ ধর্মীয়ভাবে জানুয়ারির বড়দিন পালন করেন।
গ্রিস ও রোমানিয়ার মতো দেশগুলো প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর রাজনৈতিক ও ভৌগোলিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে ২৫ ডিসেম্বর বড়দিন পালনে চলে আসে। বুলগেরিয়া পরে ১৯৬৮ সালে চার্চ পর্যায়ে এই পরিবর্তন গ্রহণ করে।
বেলারুশ ও মলদোভায় দুই ধারার খ্রিস্টানদের সম্মান জানিয়ে ২৫ ডিসেম্বর ও ৭ জানুয়ারি উভয় দিনই জাতীয় ছুটি হিসেবে পালিত হয়। বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা এবং ইরিত্রিয়ার কিছু অঞ্চলেও একই রীতি চালু রয়েছে।
নতুন বছর কেন ১ জানুয়ারি
অনেকের প্রশ্ন, যিশুর জন্মদিন যদি বড়দিন হয়, তাহলে বছরের শুরু কেন ১ জানুয়ারি। এর উত্তর পাওয়া যায় রোমান ইতিহাসে। খ্রিস্টধর্মের বহু আগে, খ্রিস্টপূর্ব ১৫৩ সালে রোমানরা ১ জানুয়ারিকে নতুন বছরের সূচনা হিসেবে নির্ধারণ করে। এই দিনে নতুন প্রশাসনিক মেয়াদ শুরু হতো।
জুলিয়াস সিজার তার ক্যালেন্ডার সংস্কারের সময়ও ১ জানুয়ারিকে নতুন বছরের দিন হিসেবে রাখেন। জানুয়ারি মাসের নামকরণ হয়েছিল রোমান দেবতা জানুসের নামে, যিনি নতুন সূচনা ও পরিবর্তনের প্রতীক।
যিশুর জন্মের সুনির্দিষ্ট তারিখ ঐতিহাসিকভাবে নিশ্চিত নয়। প্রাথমিক খ্রিস্টানদের বিশ্বাস ছিল, যিশু জন্মেছিলেন তার গর্ভধারণের ৯ মাস পর। গর্ভধারণের দিন হিসেবে তারা ২৫ মার্চকে ধরতেন, যা ঘোষণার উৎসব হিসেবে পরিচিত। সেই হিসেবেই ২৫ ডিসেম্বর বড়দিন নির্ধারিত হয়।
ভিন্ন ভিন্ন ক্যালেন্ডারের ব্যবহার
বিশ্বের বিভিন্ন ধর্ম ও সংস্কৃতিতে ভিন্ন ধরনের ক্যালেন্ডার ব্যবহৃত হয়।
সূর্যভিত্তিক ক্যালেন্ডারে এক বছর ধরা হয় ৩৬৫ দিন, আর লিপ ইয়ারে ৩৬৬ দিন। গ্রেগরিয়ান, কুর্দি ও ফার্সি ক্যালেন্ডার এই শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত। ফার্সি ক্যালেন্ডারে নওরোজ উদ্যাপিত হয় ২১ মার্চ, বসন্তের প্রথম দিনে।
চন্দ্রভিত্তিক ক্যালেন্ডারে বছর হয় ৩৫৪ দিনের। ইসলামি ক্যালেন্ডার এর উদাহরণ। এই ক্যালেন্ডারে নতুন বছর প্রতি বছর ভিন্ন তারিখে শুরু হয়। ২০২৬ সালে ইসলামী নতুন বছর শুরু হওয়ার সম্ভাব্য তারিখ ১৬ জুন।
চন্দ্র ও সূর্যের সমন্বয়ে গঠিত লুনি-সোলার ক্যালেন্ডার ব্যবহৃত হয় ইহুদি, হিন্দু, শিখ, বৌদ্ধ ও চীনা সংস্কৃতিতে।
এই ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় প্রেক্ষাপটের কারণেই বিশ্বের প্রায় ২৫ কোটি খ্রিস্টান আজ ৭ জানুয়ারি বড়দিন উদযাপন করছেন, যা তাদের বিশ্বাস, ঐতিহ্য ও সময় গণনার দীর্ঘ ইতিহাসের অংশ।
[আলজাজিরায় প্রকাশিত মোহাম্মদ হাদ্দাদের প্রতিবেদন অনুসারে ]