কেন বারবার মহামারি রূপে ফিরে আসে ‘নীরব ঘাতক’ হাম?

একসময় বিশ্বের সবচেয়ে ভয়ংকর সংক্রামক রোগগুলোর একটি ছিল হাম। টিকা আবিষ্কারের আগে প্রতি দুই থেকে তিন বছর পরপর এই রোগ মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়ত। আর তাতে বছরে গড়ে ২৬ লাখ মানুষের মৃত্যু হতো। এখনো বিশ্বজুড়ে টিকাদান কর্মসূচি দুর্বল হয়ে পড়লে রোগটি দ্রুত ফিরে আসে এবং হাজারও মানুষের প্রাণ নেয়। হাম অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত একটি রোগ। আক্রান্ত ব্যক্তি কাশি বা হাঁচি দিলে বাতাসের মাধ্যমে এটি ছড়ায়। ভাইরাসটি বাতাসে বা কোনো পৃষ্ঠে দুই ঘণ্টা পর্যন্ত সক্রিয় থাকতে পারে। একজন আক্রান্ত ব্যক্তি গড়ে ১২ থেকে ১৮ জনকে সংক্রমিত করতে পারেন, যদি তাদের শরীরে প্রতিরোধক্ষমতা না থাকে। হাম কতটা ভয়ংকর অনেকেই হামকে শিশুদের সাধারণ একটি রোগ মনে করলেও এর পরিণতি হতে পারে অত্যন্ত ভয়াবহ: নিউমোনিয়া ও মস্তিস্কের ক্ষতি: হামের কারণে মারাত্মক নিউমোনিয়া, স্থায়ী অন্ধত্ব, এবং তীব্র ডায়রিয়া হতে পারে। সবচেয়ে বিপজ্জনক হলো ‘এনসেফালাইটিস’ বা মস্তিষ্কের প্রদাহ, যা আক্রান্ত শিশুকে চিরতরে বিকলাঙ্গ করে দিতে পারে অথবা মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়। হাসপাতালে ভর্তির উচ্চ হার: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরিসংখ্যান অনুযায়ী, আক্রান্ত প্রতি পাঁচজন শিশুর মধ্যে

কেন বারবার মহামারি রূপে ফিরে আসে ‘নীরব ঘাতক’ হাম?

একসময় বিশ্বের সবচেয়ে ভয়ংকর সংক্রামক রোগগুলোর একটি ছিল হাম। টিকা আবিষ্কারের আগে প্রতি দুই থেকে তিন বছর পরপর এই রোগ মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়ত। আর তাতে বছরে গড়ে ২৬ লাখ মানুষের মৃত্যু হতো। এখনো বিশ্বজুড়ে টিকাদান কর্মসূচি দুর্বল হয়ে পড়লে রোগটি দ্রুত ফিরে আসে এবং হাজারও মানুষের প্রাণ নেয়।

হাম অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত একটি রোগ। আক্রান্ত ব্যক্তি কাশি বা হাঁচি দিলে বাতাসের মাধ্যমে এটি ছড়ায়। ভাইরাসটি বাতাসে বা কোনো পৃষ্ঠে দুই ঘণ্টা পর্যন্ত সক্রিয় থাকতে পারে। একজন আক্রান্ত ব্যক্তি গড়ে ১২ থেকে ১৮ জনকে সংক্রমিত করতে পারেন, যদি তাদের শরীরে প্রতিরোধক্ষমতা না থাকে।

হাম কতটা ভয়ংকর

অনেকেই হামকে শিশুদের সাধারণ একটি রোগ মনে করলেও এর পরিণতি হতে পারে অত্যন্ত ভয়াবহ:

  • নিউমোনিয়া ও মস্তিস্কের ক্ষতি: হামের কারণে মারাত্মক নিউমোনিয়া, স্থায়ী অন্ধত্ব, এবং তীব্র ডায়রিয়া হতে পারে। সবচেয়ে বিপজ্জনক হলো ‘এনসেফালাইটিস’ বা মস্তিষ্কের প্রদাহ, যা আক্রান্ত শিশুকে চিরতরে বিকলাঙ্গ করে দিতে পারে অথবা মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়।
  • হাসপাতালে ভর্তির উচ্চ হার: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরিসংখ্যান অনুযায়ী, আক্রান্ত প্রতি পাঁচজন শিশুর মধ্যে একজনকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়।
  • রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ধ্বংস: হামের ভাইরাস মানবশরীরের পূর্বের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার স্মৃতি বা ‘ইমিউন মেমোরি’ সম্পূর্ণ মুছে দেয়। ফলে হাম থেকে সেরে ওঠার পরও শিশুরা দীর্ঘদিন অন্য যে কোনো সাধারণ রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে।

ইতিহাসে হামের মহামারি ও মৃত্যুর মিছিল

টিকা আবিষ্কারের আগে ও পরে মানব ইতিহাসে হাম বহুবার প্রলয়ংকরী মহামারি আকারে আঘাত হেনেছে। চিকিৎসকদের ধারণা, বিগত ১৫০ বছরে হামের কারণে বিশ্বে আনুমানিক ২০ কোটি মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন।

আমেরিকা মহাদেশের আদিবাসী বিপর্যয় (১৬শ শতাব্দী)

ইউরোপীয় অভিযাত্রীরা যখন প্রথম আমেরিকা মহাদেশে পাড়ি জমায়, তখন তাদের মাধ্যমে সেখানে হাম, ইনফ্লুয়েঞ্জা ও গুটিবসন্তের ভাইরাস প্রবেশ করে। আমেরিকার স্থানীয় আদিবাসীদের শরীরে এই ভাইরাসের বিরুদ্ধে কোনো প্রাকৃতিক প্রতিরোধ ক্ষমতা ছিল না। ইতিহাসবিদদের মতে, মাত্র কয়েক দশকের মধ্যে হাম ও অন্যান্য মহামারিতে আমেরিকার প্রায় ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ আদিবাসী জনসংখ্যা নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছিল।

আরও পড়ুন>>
হাম ও হামের উপসর্গে আরও ৮ জনের মৃত্যু
হাম পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে সময় লাগবে: স্বাস্থ্যমন্ত্রী
হামের পরিবর্তে এক মাসের শিশুকে দেওয়া হলো জলাতঙ্কের ভ্যাকসিন

ফিজির এক-তৃতীয়াংশ জনসংখ্যা বিলুপ্তি (১৮৭৪ সাল)

১৮৭৪ সালে ফিজির তৎকালীন রাজা কাকোবাউ ব্রিটেন সফর শেষে দেশে ফিরে আসেন। তার সঙ্গ আসা ক্রুদের মাধ্যমে দ্বীপরাষ্ট্রে হামের ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ে। বিচ্ছিন্ন এই দ্বীপে হামের তীব্রতা এতই ভয়াবহ ছিল যে মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে ফিজির মোট জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশ (প্রায় ৪০ হাজার মানুষ) মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। পুরো দ্বীপটি তখন এক বিশাল শ্মশানে পরিণত হয়েছিল।

টিকা আবিষ্কারের আগে বৈশ্বিক তাণ্ডব (১৯৬৩ সালের আগে)

১৯৬৩ সালে বিজ্ঞানী মরিস হিলম্যানের হাত ধরে হামের সফল টিকা আবিষ্কারের আগে এটি ছিল একটি নিয়মিত বৈশ্বিক মহামারি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ফ্যাক্টশিট অনুযায়ী, প্রতি দুই থেকে তিন বছর পর পর বিশ্বজুড়ে হামের বড় মহামারি দেখা দিত। সেই সময়ে প্রতি বছর বিশ্বে গড়ে ২৬ লাখ মানুষ কেবল হামের কারণেই মারা যেত।

বিংশ শতাব্দীর শেষভাগের মহামারি (১৯৮০ ও ১৯৯০)

টিকা আবিষ্কারের পরও টিকাদানের আওতা সব দেশে সমান না হওয়ায় বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটে। ১৯৮০ সালেও বিশ্বব্যাপী হামের প্রকোপে ২৬ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়। এরপর ১৯৯০ সালের দিকে টিকাদানের হার বৃদ্ধিতে মৃত্যু কমলেও ওই বছর বিশ্বজুড়ে ৫ লাখ ৪৫ হাজার মানুষ মারা যায়।

কঙ্গো ও মাদাগাস্কার সংকট (২০১৯)

সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ হামের প্রাদুর্ভাব ঘটে ২০১৯ সালে। আফ্রিকার দেশ ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গো, মাদাগাস্কার এবং ইউরোপের ইউক্রেনে টিকাদানের হার আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ায় রোগটি মহামারির রূপ নেয়। ওই বছর কেবল কঙ্গোতেই পাঁচ হাজারের বেশি শিশুর মৃত্যু হয় এবং বিশ্বজুড়ে মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়ায় ২ লাখ ৭ হাজার ৫০০ জনে।

সাম্প্রতিক পুনরুত্থান (২০২৪–২০২৬)

করোনা মহামারির ধাক্কায় বিশ্বজুড়ে প্রায় তিন কোটি শিশু নিয়মিত হামের টিকা থেকে বঞ্চিত হয়। এর ফলে ২০২৪ সালে বিশ্বের ৫৯টি দেশে বড় ধরনের হামের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে। দ্য ল্যানসেট জার্নালে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বিশ্বে রেকর্ড ১ কোটি ১০ লাখ মানুষ হামে আক্রান্ত হয়েছে এবং ৯৫ হাজার মানুষ মারা গেছে। এই মৃত্যুর ৮০ শতাংশই ঘটেছে আফ্রিকা ও পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে।

এমনকি ২০২৫ এবং ২০২৬ সালে যুক্তরাষ্ট্র-কানাডার মতো উন্নত দেশগুলো ‘হাম মুক্ত’ দেশের মর্যাদা হারানোর ঝুঁকিতে পড়েছে এবং আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে প্রাদুর্ভাব অব্যাহত রয়েছে।

বাংলাদেশের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চের পর থেকে এ পর্যন্ত দেশে হামে ৬৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে সন্দেহভাজন হামজনিত মৃত্যুর সংখ্যা ৩৬৩ জন।

বারবার কেন ফিরে আসে হাম?

হামের ভাইরাসের বিরুদ্ধে কোনো সুনির্দিষ্ট অ্যান্টিভাইরাল বা কার্যকর ওষুধ নেই। আক্রান্ত শিশুদের ভিটামিন-এ ক্যাপসুল এবং পুষ্টিকর খাবার দেওয়ার মাধ্যমে এর তীব্রতা কিছুটা কমানো যায়। নিউমোনিয়া ও অন্যান্য সংক্রমণ মোকবিলায় চিকিৎসক হয়তো অ্যান্টিবায়োটিকও ব্যবহার করতে পারেন।

তবে এই মহামারি থেকে বাঁচার একমাত্র উপায় হলো দুই ডোজের হাম-রুবেলা (এমএমআর) প্রতিষেধক টিকা।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সতর্ক করে বলেছে, হাম কোনো সীমানা মানে না। এই ভাইরাস আমাদের প্রতিরোধ ব্যবস্থার যে কোনো সামান্যতম ফাঁকফোকরকেও খুঁজে বের করে আক্রমণ করে। যদি কোনো সম্প্রদায়ের অন্তত ৯৫ শতাংশ শিশুকে দুই ডোজ টিকার আওতায় আনা না যায়, তবে হামের মহামারি প্রতিরোধ করা অসম্ভব।

বাস্তবতা হলো, বিশ্বব্যাপী বর্তমানে প্রথম ডোজের টিকার হার ৮৪ শতাংশ এবং দ্বিতীয় ডোজের হার মাত্র ৭৬ শতাংশে নেমে এসেছে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই টিকাদানের বৈশ্বিক ঘাটতি দ্রুত পূরণ করা না গেলে ইতিহাসের এই ভয়ংকর ঘাতক রোগটি আবারও মানবসভ্যতার জন্য বড় মহামারি বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়াবে।

সূত্র: ডব্লিউএইচও, ইউনিসেফ, এনএলএম, ল্যানসেট, উইকিপিডিয়া
কেএএ/

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow