কেল্লার স্বপ্ন গোল্লায় গেছে চরবাসীর

প্রাকৃতিক দুর্যোগের হাত থেকে চরাঞ্চলের মানুষ ও গবাদি পশুকে রক্ষায় আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ নেয় সরকার। এ উপলক্ষে গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে কাপাসিয়া ইউনিয়নের ভাটি বোচাগারির পোড়ারচরে ১২ বিঘা জমির ওপর আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ শুরু হয়। এতে ব্যয় ধরা হয় প্রায় ৯ কোটি টাকা। কিন্তু সরকার পরিবর্তনের পর প্রকল্পের নাম পরিবর্তন ছাড়া কাজের আর কোনো অগ্রগতি হয়নি। একদিকে আশ্রয়কেন্দ্রের জন্য কৃষিজমি দিয়ে স্বপ্ন ভেঙে কৃষকের। অন্যদিকে এখনো বানে ভাসার শঙ্কায় দিন পার করছেন বাসিন্দারা। কোনো দপ্তরে এই প্রকল্পের বিষয়ে কোনো তথ্য না থাকলেও স্থানীয়দের অভিযোগ পিলারেই হরিলুট হয়ে গেছে বরাদ্দের টাকা। জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন দপ্তর বলছে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বানভাসি মানুষ ও গবাদি পশুর আশ্রয়ের জন্য ‘মুজিব কেল্লা আশ্রয়কেন্দ্র’ নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। সেসময় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে এসব নিয়ন্ত্রণ করা হতো। গণ-অভ্যুত্থানের পর শুধু নাম পরিবর্তন করে এর নাম ‘আশ্রয় প্রকল্প’ রাখা হয়। প্রকল্পটির বাজেট ও কাজের মেয়াদ সম্পর্কে জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন এবং উপজেলা পিআইও অফিসে কোনো তথ্য নেই। তাদের দাবি এ প্রকল্পটি সম্পূর্ণ ঢাকা থেকে

কেল্লার স্বপ্ন গোল্লায় গেছে চরবাসীর

প্রাকৃতিক দুর্যোগের হাত থেকে চরাঞ্চলের মানুষ ও গবাদি পশুকে রক্ষায় আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ নেয় সরকার। এ উপলক্ষে গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে কাপাসিয়া ইউনিয়নের ভাটি বোচাগারির পোড়ারচরে ১২ বিঘা জমির ওপর আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ শুরু হয়। এতে ব্যয় ধরা হয় প্রায় ৯ কোটি টাকা। কিন্তু সরকার পরিবর্তনের পর প্রকল্পের নাম পরিবর্তন ছাড়া কাজের আর কোনো অগ্রগতি হয়নি।

একদিকে আশ্রয়কেন্দ্রের জন্য কৃষিজমি দিয়ে স্বপ্ন ভেঙে কৃষকের। অন্যদিকে এখনো বানে ভাসার শঙ্কায় দিন পার করছেন বাসিন্দারা। কোনো দপ্তরে এই প্রকল্পের বিষয়ে কোনো তথ্য না থাকলেও স্থানীয়দের অভিযোগ পিলারেই হরিলুট হয়ে গেছে বরাদ্দের টাকা।

জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন দপ্তর বলছে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বানভাসি মানুষ ও গবাদি পশুর আশ্রয়ের জন্য ‘মুজিব কেল্লা আশ্রয়কেন্দ্র’ নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। সেসময় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে এসব নিয়ন্ত্রণ করা হতো। গণ-অভ্যুত্থানের পর শুধু নাম পরিবর্তন করে এর নাম ‘আশ্রয় প্রকল্প’ রাখা হয়। প্রকল্পটির বাজেট ও কাজের মেয়াদ সম্পর্কে জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন এবং উপজেলা পিআইও অফিসে কোনো তথ্য নেই। তাদের দাবি এ প্রকল্পটি সম্পূর্ণ ঢাকা থেকে নিয়ন্ত্রণ করা হয়। তবে বর্তমানে প্রায় দেড় বছর ধরে কাজটি বন্ধ আছে।

‘আশ্রয়কেন্দ্রটিকে আশীর্বাদ মনে করেছিলাম। আর এ কারণে ফসল নষ্ট করে জমি দিয়েছি। অন্তত বন্যায় যেন ভাসতে না হয়। কিন্তু সে আশায় এখন ছাই। আশ্রয়কেন্দ্রতো এখনো হলোই না বরং জমিগুলো আবাদ করলে ফসল পেতাম, সেটাও নাই।’

আরও পড়ুন-
৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়ের ক্ষত এখনো সারেনি, এপ্রিল এলেই আতঙ্ক বাড়ে উপকূলে
ভারী বর্ষণে সিলেট অঞ্চলে বন্যার শঙ্কা
বজ্রপাতে মৃত্যু বাড়ছেই, আলোর মুখ দেখে না প্রতিরোধে নেওয়া উদ্যোগ

ঠিকাদার সূত্রে জানা গেছে, আশ্রয়কেন্দ্রের ঘর নির্মাণে ৮ কোটি ৬০ লাখ টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। কাজটি শুরু হয় ২০২৪ সালের শুরুর দিকে।

সরেজমিনে দেখা যায়, আশ্রয়কেন্দ্রের জায়গায় বালু ভরাট করা হয়েছে। মানুষের জন্য তিনতলা ও গবাদিপশুর জন্য একটি একতলা ভবন হওয়ার কথা ছিল। সেখানে গবাদিপশুর বিল্ডিংয়ের ৪০টি কলাম ভাসানো হয়েছে মাত্র। ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে নির্মাণ কাজে ব্যবহৃত সামগ্রীগুলো। কোথাও বাঁশ, কোথাও ইটের খোয়া আবার কোথাও শাটারের তক্তা। পড়ে আছে মিকচার মেশিন। টিউবওয়েলে পড়েছে মরিচা। কাজের লোকদের থাকার ঘরটিও ভেঙে গেছে।

‘‘কাজটা শুরু হয়েছে ২০২৪ সালের দিকে। ৬ মাস হওয়ার পর থেকে বন্ধ আছে। পিআইও, ঠিকাদার কেউ আর আসেন না। মোবাইল করলে ফোনও রিসিভ করেন না।’

স্থানীয়রা বলেন, ‘আমরা বানভাসি মানুষ। বন্যা হলেই গবাদিপশু, আসবাবপত্র ও পরিবার নিয়ে ভাসতে হয় বিভিন্ন এলাকায়। সে কারণে আশ্রয়কেন্দ্রটিকে আশীর্বাদ মনে করেছিলাম। আর এ কারণে ফসল নষ্ট করে জমি দিয়েছি। অন্তত বন্যায় যেন ভাসতে না হয়। কিন্তু সে আশায় এখন ছাই। আশ্রয়কেন্দ্রতো এখনো হলোই না বরং জমিগুলো আবাদ করলে ফসল পেতাম, সেটাও নাই। এদিকে আশ্রয়কেন্দ্রে বাকিতে কাজ করেছি, তার টাকাও বুঝি আর পাই না। দায়িত্বশীলদের গাফিলতি থাকায় আজকের এ দুরবস্থা।’

বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. এন্তাজ আলী বলেন, ‘এই আশ্রয়কেন্দ্রে জমি লেগেছে ১২ বিঘা। সবগুলোই খাস জমি। আমরা সেগুলো আবাদ করতাম। বন্যা হলে যাতে করে এ এলাকার মানুষ আশ্রয় নিতে পারে সেজন্য আশ্রয় প্রকল্পকে দিয়েছি।’

কেল্লার স্বপ্ন গোল্লায় গেছে চরবাসীর

আরও পড়ুন-
আশ্রয়ণের ঘর এখন পরিত্যক্ত জনপদ
হস্তান্তরের আগেই ঝুঁকিতে আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর
গাইবান্ধায় হবে ৩৪ আশ্রয়কেন্দ্র, ব্যয় ২৪১ কোটি ৮৮ লাখ টাকা
৫০ হাজারে বিক্রি হচ্ছে আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর!

তিনি বলেন, ‘এক বিঘা জমিতে এবারও ৪০ থেকে ৫০ মণ ভুট্টা হয়েছে। তাহলে ১২ বিঘা জমিতে আমরা কতগুলো ভুট্টা পেতাম! আর সেই জমিগুলো ২৪ সালেরও আগে ছেড়ে দিয়েছি। একদিকে আবাদ থেকে বঞ্চিত হচ্ছি, অন্যদিকে আশ্রয়কেন্দ্রও হচ্ছে না। মহাবিপদে ফেলেছেন সরকার আমাদের। অসমাপ্ত কাজ দ্রুত শেষ করার দাবি জানাচ্ছি।’

‘উপজেলায় ঘুরে লাভ কী? স্যারতো অফিসেই আসেন না। মাঝে মধ্যে এসে দাপ্তরিক কাগজে সই করে চলে যান। আমাদের ফোনই ধরতে চান না।’

স্থানীয় মো. ফজলু মিয়া বলেন, ‘কাজটা শুরু হয়েছে ২০২৪ সালের দিকে। ৬ মাস হওয়ার পর থেকে বন্ধ আছে। পিআইও, ঠিকাদার কেউ আর আসেন না। মোবাইল করলে ফোনও রিসিভ করেন না। ধরার কোনো লোকও পাইতেছি না। এখানে আমরা ৫ থেকে ৬ মাস লেবারি করেছি। চার থেকে পাঁচ লাখ টাকা পাবো। সে টাকাও পাইতেছি না। এখন আমরা খুবই অসহায়। কে শুনবে আমাদের কথা?’

তিনি বলেন, ‘ঠিকাদার অনিয়ম করবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু পিআইও অফিসের লোকজন সৎ ও দায়িত্বশীল হলে আজ এই দুরবস্থা তৈরি হতো না। অনিয়মে তারা উল্টো ঠিকাদারকে সহযোগিতা করেছেন।’

কাপাসিয়া ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান মো. হাফিজার রহমান বলেন, ‘কাজটা বন্ধ আছে দীর্ঘদিন ধরে। প্রকল্পে সাধারণ মানুষের প্রায় ১২ বিঘা জমি দেওয়া আছে। কিন্তু কাজতো হচ্ছে না। বন্যার সময় যদি বানভাসিরা আশ্রয় নিতে নাই পারে তাহলে জমি দেওয়ার কী দরকার ছিল?’

ঢাকার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান উষাণ এন্টারপ্রাইজের ঠিকাদার মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে বরাদ্দ বাড়ানোর জন্য ফাইল পাঠানো হয়েছে। বাকি তথ্যের জন্য তিনি ঢাকায় খোঁজ নেওয়ার পরামর্শ দেন।

কাজটি তদারকির দায়িত্বে থাকা উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মো. মশিউর রহমানের অফিসে একাধিকবার গিয়ে তাকে পাওয়া যায়নি। এমনকি তার ব্যক্তিগত ও সরকারি মোবাইল নম্বরে একাধিকবার ফোন দিলেও তিনি রিসিভি করেননি।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে তার অফিসের এক কর্মচারী বলেন, ‘উপজেলায় ঘুরে লাভ কী? স্যারতো অফিসেই আসেন না। মাঝে মধ্যে এসে দাপ্তরিক কাগজে সই করে চলে যান। আমাদের ফোনই ধরতে চান না।’

জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘এ প্রকল্পের কোনো তথ্য আমার কাছে নেই। তবে কাজটি বন্ধ আছে বিষয়টি জানি। প্রকল্পের মেয়াদ শেষ, তাই বন্ধ আছে। আগামী বাজেটের একনেকে বরাদ্দ বাড়ানোর জন্য আবেদন করা হয়েছে।’

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ঈফফাত জাহান তুলি বলেন, ‘বিষয়টি আমার জানা নেই। খোঁজ নিয়ে দেখবো।’

এফএ/এএসএম

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow