কোথায় হারিয়ে যাচ্ছে কৃষকের ন্যায্য দাম?

বুশরা আজমী সোনালি শস্যে ভরা মাঠে যখন ধান দোলে; তখন মনে হয় প্রাচুর্যের গল্প লেখা হচ্ছে। কিন্তু সেই গল্পের ভেতরেই লুকিয়ে আছে এক নির্মম বাস্তবতা—যে কৃষক এই প্রাচুর্য তৈরি করেন, তিনিই আজ সবচেয়ে বেশি বঞ্চিত। ধানের দাম পড়ে থাকে তলানিতে, অথচ সেই ধান থেকেই তৈরি চালের দাম বাজারে আকাশছোঁয়া। প্রশ্নটা তাই সরাসরি—এই ব্যবধান কোথায় তৈরি হয়, আর কেন তার ভার একমাত্র কৃষকের কাঁধেই পড়ে? ‎ধান উৎপাদনের প্রতিটি ধাপই এখন ব্যয়বহুল। বীজ, সার, কীটনাশক, সেচ—সব কিছুর দাম বেড়েছে। চলতি মৌসুমে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি কৃষকদের খরচ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। সেচের জন্য ডিজেল, ধান মাড়াইয়ের জন্য যন্ত্র, এমনকি ধান শুকানোর কাজেও জ্বালানির প্রয়োজন—সবখানেই অতিরিক্ত খরচ গুনতে হচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শ্রমিকের বাড়তি মজুরি এবং হারভেস্টার মেশিনের উচ্চ ভাড়া। অর্থাৎ ফসল ফলাতে গিয়ে কৃষককে এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি বিনিয়োগ করতে হচ্ছে। ‎কিন্তু সবচেয়ে বড় আঘাত আসে ফসল ঘরে তোলার পর। পাইকারি বাজারে ধানের দাম এত কম যে, অনেক সময় উৎপাদন খরচই ওঠে না। কৃষক বাধ্য হয়ে কম দামে ধান বিক্রি করেন—কারণ তার কাছে সংরক্ষণের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই, ঋণের চাপ রয়েছে এ

কোথায় হারিয়ে যাচ্ছে কৃষকের ন্যায্য দাম?

বুশরা আজমী

সোনালি শস্যে ভরা মাঠে যখন ধান দোলে; তখন মনে হয় প্রাচুর্যের গল্প লেখা হচ্ছে। কিন্তু সেই গল্পের ভেতরেই লুকিয়ে আছে এক নির্মম বাস্তবতা—যে কৃষক এই প্রাচুর্য তৈরি করেন, তিনিই আজ সবচেয়ে বেশি বঞ্চিত। ধানের দাম পড়ে থাকে তলানিতে, অথচ সেই ধান থেকেই তৈরি চালের দাম বাজারে আকাশছোঁয়া। প্রশ্নটা তাই সরাসরি—এই ব্যবধান কোথায় তৈরি হয়, আর কেন তার ভার একমাত্র কৃষকের কাঁধেই পড়ে?

‎ধান উৎপাদনের প্রতিটি ধাপই এখন ব্যয়বহুল। বীজ, সার, কীটনাশক, সেচ—সব কিছুর দাম বেড়েছে। চলতি মৌসুমে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি কৃষকদের খরচ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। সেচের জন্য ডিজেল, ধান মাড়াইয়ের জন্য যন্ত্র, এমনকি ধান শুকানোর কাজেও জ্বালানির প্রয়োজন—সবখানেই অতিরিক্ত খরচ গুনতে হচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শ্রমিকের বাড়তি মজুরি এবং হারভেস্টার মেশিনের উচ্চ ভাড়া। অর্থাৎ ফসল ফলাতে গিয়ে কৃষককে এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি বিনিয়োগ করতে হচ্ছে।

‎কিন্তু সবচেয়ে বড় আঘাত আসে ফসল ঘরে তোলার পর। পাইকারি বাজারে ধানের দাম এত কম যে, অনেক সময় উৎপাদন খরচই ওঠে না। কৃষক বাধ্য হয়ে কম দামে ধান বিক্রি করেন—কারণ তার কাছে সংরক্ষণের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই, ঋণের চাপ রয়েছে এবং দ্রুত নগদ অর্থের প্রয়োজন হয়। এই বাধ্যবাধকতাই তাকে বাজারের সবচেয়ে দুর্বল পক্ষ করে তোলে।

‎এখানেই তৈরি হয় সেই বৈষম্যের চক্র। কৃষকের কাছ থেকে কম দামে ধান কিনে একাধিক স্তরের মধ্যস্বত্বভোগী, মিলার ও ব্যবসায়ীর হাত ঘুরে তা চালে রূপান্তরিত হয় এবং প্রতিটি স্তরে মূল্য বাড়তে থাকে। কিন্তু এই মূল্যবৃদ্ধির কোনো অংশই কৃষকের কাছে ফিরে আসে না। অর্থাৎ উৎপাদনের মূল দায়িত্ব যার, লাভের অংশ থেকে তিনি সম্পূর্ণভাবে বিচ্ছিন্ন।

‎এই বাস্তবতা কেবল একটি বাজারগত সমস্যাই নয়; এটি একটি কাঠামোগত সংকট। কৃষকের সরাসরি বাজারে প্রবেশের সুযোগ সীমিত, সরকারিভাবে ধান সংগ্রহ কার্যক্রম পর্যাপ্ত নয় এবং সংরক্ষণ ব্যবস্থার দুর্বলতা কৃষককে বাধ্য করে দ্রুত বিক্রিতে। ফলে বাজার নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা চলে যায় মধ্যস্বত্বভোগীদের হাতে।

‎ফলে এক গভীর বৈপরীত্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে—খরচ বাড়ছে, কিন্তু দাম কমছে; উৎপাদন বাড়ছে, কিন্তু কৃষকের আয় কমছে। এই চক্র চলতে থাকলে কৃষকের কৃষির প্রতি আগ্রহ কমে যাওয়াই স্বাভাবিক। দীর্ঘমেয়াদে এটি দেশের কৃষি ব্যবস্থার জন্য বড় ধরনের হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে।

‎এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য কার্যকর পদক্ষেপ জরুরি। কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি ধান সংগ্রহ বৃদ্ধি, ন্যূনতম সহায়ক মূল্য নিশ্চিত করা, আধুনিক সংরক্ষণ সুবিধা গড়ে তোলা এবং বাজারে মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব কমানো—এসব উদ্যোগ বাস্তবায়ন না করলে এই বৈষম্য দূর হবে না।

‎ধানের ন্যায্য দাম নিশ্চিত করা মানে শুধু একটি পণ্যের মূল্য নির্ধারণ নয়; এটি কৃষকের শ্রমের মর্যাদা রক্ষা করা। যে কৃষক দেশের মানুষের খাদ্য জোগান দেন, তার প্রাপ্য থেকে তাকে বঞ্চিত রেখে কোনো উন্নয়ন টেকসই হতে পারে না। এখনই সময়—এই অসাম্য ভাঙার, কৃষকের পাশে দাঁড়ানোর।

লেখক: ‎অর্নাস ৩য় বর্ষ, ‎সমাজকর্ম বিভাগ, রাজশাহী কলেজ।

এসইউ

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow