কোরআন-সুন্নাহর দৃষ্টিতে স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস
আজকে আমরা দ্বীন সংক্রান্ত এমন একটি বিষয় নিয়ে আলোচনা করব, যা মূলত আমাদের দুনিয়াবি জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। আমরা জানি, আমাদের দ্বীন দুনিয়া এবং আখেরাত দুটোকেই ধারণ করে। দুনিয়াতে আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে অসংখ্য সুসংবাদ ও নেয়ামত দান করেছেন। এসব নেয়ামত যেন আমরা নিজ হাতে নষ্ট না করি, বরং সঠিক উপায়ে এগুলোর হেফাজত করি তা নিশ্চিত করা আমাদের দায়িত্ব। দুনিয়াবী যতগুলো নেয়ামত আল্লাহ আমাদের দিয়েছেন, তার মধ্যে অন্যতম শ্রেষ্ঠ ও বড় একটি নেয়ামত হচ্ছে আমাদের শরীর ও স্বাস্থ্য। শারীরিক সুস্থতা কত বড় এক নেয়ামত, তা মানুষ কেবল তখনই গভীরভাবে উপলব্ধি করতে পারে, যখন সে ব্যাধিগ্রস্ত হয়ে পড়ে। যারা দীর্ঘকাল রোগে আক্রান্ত হয়ে শয্যাশায়ী হয়ে আছেন, তাদের মনোকষ্ট ও হাহাকার কতটা গভীর, তা তাদের সাথে কথা না বললে বোঝা যায় না। তারা আফসোস করেন, কত বছর ধরে তারা বিছানা ছেড়ে স্বাভাবিকভাবে উঠতে পারছেন না। এক বয়োজ্যেষ্ঠ ভাই আমার কাছে এসে বলছিলেন, ‘হুজুর, একটু দোয়া করবেন। রাতে ঘুমাতে পারি না, শুধু প্রস্রাবের জন্য উঠতে হয়।’ প্রতি দশ থেকে পনেরো মিনিট পর পর যদি কাউকে উঠতে হয়, তবে তার পক্ষে কি স্বাভাবিক ঘুম সম্ভব? আর এই ঘুম না হওয়া
আজকে আমরা দ্বীন সংক্রান্ত এমন একটি বিষয় নিয়ে আলোচনা করব, যা মূলত আমাদের দুনিয়াবি জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। আমরা জানি, আমাদের দ্বীন দুনিয়া এবং আখেরাত দুটোকেই ধারণ করে। দুনিয়াতে আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে অসংখ্য সুসংবাদ ও নেয়ামত দান করেছেন। এসব নেয়ামত যেন আমরা নিজ হাতে নষ্ট না করি, বরং সঠিক উপায়ে এগুলোর হেফাজত করি তা নিশ্চিত করা আমাদের দায়িত্ব।
দুনিয়াবী যতগুলো নেয়ামত আল্লাহ আমাদের দিয়েছেন, তার মধ্যে অন্যতম শ্রেষ্ঠ ও বড় একটি নেয়ামত হচ্ছে আমাদের শরীর ও স্বাস্থ্য। শারীরিক সুস্থতা কত বড় এক নেয়ামত, তা মানুষ কেবল তখনই গভীরভাবে উপলব্ধি করতে পারে, যখন সে ব্যাধিগ্রস্ত হয়ে পড়ে। যারা দীর্ঘকাল রোগে আক্রান্ত হয়ে শয্যাশায়ী হয়ে আছেন, তাদের মনোকষ্ট ও হাহাকার কতটা গভীর, তা তাদের সাথে কথা না বললে বোঝা যায় না। তারা আফসোস করেন, কত বছর ধরে তারা বিছানা ছেড়ে স্বাভাবিকভাবে উঠতে পারছেন না।
এক বয়োজ্যেষ্ঠ ভাই আমার কাছে এসে বলছিলেন, ‘হুজুর, একটু দোয়া করবেন। রাতে ঘুমাতে পারি না, শুধু প্রস্রাবের জন্য উঠতে হয়।’ প্রতি দশ থেকে পনেরো মিনিট পর পর যদি কাউকে উঠতে হয়, তবে তার পক্ষে কি স্বাভাবিক ঘুম সম্ভব? আর এই ঘুম না হওয়া যে কত বড় শারীরিক ও মানসিক কষ্টের বিষয়, তা ভুক্তভোগী মাত্রই জানেন। ডায়াবেটিস অনিয়ন্ত্রিত হয়ে গেলে বা অন্যান্য শারীরিক জটিলতা তৈরি হলে এই ধরণের সমস্যা দেখা দেয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এমন কঠিন পরিণতির মুখোমুখি হওয়ার আগেই কি আমরা নিজেদের সাহায্য করতে পারি না?
আমাদের এই স্বাস্থ্য নামক অমূল্য আমানত রক্ষা করার জন্য আল্লাহ তাআলা কোরআনে কারীমে সুস্পষ্ট কিছু দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। পাশাপাশি রাসুলুল্লাহও (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জীবনযাত্রার অত্যন্ত চমৎকার কিছু আদব শিখিয়ে গেছেন। সব আলোচনা একসাথে করতে গেলে অনেক সময়ের প্রয়োজন। তাই আজ আমরা অন্তত আমাদের চলাফেরা ও খাওয়া-দাওয়া সংক্রান্ত কিছু শরঈ আদব উল্লেখ করার চেষ্টা করব।
প্রথমেই দেখা যাক, অতিরিক্ত আহারের বিষয়ে শরিয়তের দৃষ্টিভঙ্গি কী। কোরআনে আহার ও পান করার নির্দেশ দেওয়ার সাথে সাথেই সতর্ক করে দেওয়া হয়েছে, যেন আমরা অপচয় বা অতিরিক্ত ভোজন না করি। অতিরিক্ত আহার শরীরের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। যারা কোনো কাজে বাড়াবাড়ি করে, আল্লাহ তাআলা তাদেরকে পছন্দ করেন না।
রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) একটি হাদিসে উল্লেখ করেছেন, দুটি বিশেষ নেয়ামত সম্পর্কে বহু মানুষ চরম উদাসীন থাকে এবং সেগুলোর সঠিক কদর করে না; এক. সুস্বাস্থ্য এবং দুই. অবসর বা হাতে থাকা সময়। মানুষ এই দুটি নেয়ামতের সৎব্যবহার না করে অবহেলায় নষ্ট করে ফেলে।
কেয়ামতের দিন মহান আল্লাহর আদালতে পাঁচটি জরুরি প্রশ্নের উত্তর না দেওয়া পর্যন্ত কোনো বান্দা এক কদমও এগোতে পারবে না। প্রথম প্রশ্নটি হবে তার সামগ্রিক বয়স বা জীবনকে সে কোন কাজে ব্যয় করেছে। দ্বিতীয়টি হলো, তার অর্জিত ইলম বা জ্ঞান অনুযায়ী সে কতটা আমল করেছে।
তৃতীয় ও চতুর্থ প্রশ্ন হবে ধন-সম্পদ সম্পর্কিত; সে কীভাবে আয় করেছে এবং কোন খাতে তা ব্যয় করেছে। আর পঞ্চম প্রশ্নটি করা হবে তার শরীর ও শারীরিক শক্তি নিয়ে। এই দেহ ও শক্তিকে সে কীভাবে ব্যবহার করেছে, এর সঠিক যত্ন নিয়েছে নাকি গুনাহ ও পাপাচারের পেছনে উজাড় করে নষ্ট করেছে এই সবকিছুর হিসাব আল্লাহ তাআলার কাছে দিতে হবে।
বিশেষ করে আহারের ক্ষেত্রে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অত্যন্ত কড়াকড়িভাবে পরিমিত খাওয়ার তাগিদ দিয়েছেন। তিনি স্পষ্ট বলেছেন, মানুষের শারীরিক সক্ষমতা ধরে রাখা ও মেরুদণ্ড সোজা রাখার জন্য সামান্য কয়েক লোকমা খাবারই যথেষ্ট। পেট পুরে খেতে কোনো হাদিসে উৎসাহিত করা হয়নি, বরং পেটের কিছু অংশ সর্বদা খালি রাখার কথা বলা হয়েছে।
সুন্নাহর গাইডলাইন অনুযায়ী, পেটের এক-তৃতীয়াংশ খাবারের জন্য, এক-তৃতীয়াংশ পানির জন্য এবং বাকি এক-তৃতীয়াংশ বাতাস চলাচলের জন্য খালি রাখা উচিত। এতে শরীর কর্মক্ষম ও প্রাণবন্ত থাকে এবং ইবাদত-বন্দেগিসহ স্বাভাবিক কাজে কোনো কষ্ট হয় না। কিন্তু আমাদের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে পেট চেপে খাবার খাওয়া, যা হাদিসের শিক্ষার একেবারেই পরিপন্থী।
রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আরও বলেছেন, একজন মুমিন এক পেটে বা এক নাড়িতে আহার করে, আর যে মুমিন নয়, সে আহার করে সাত পেটে। হজরত ইবনে ওমর (রা.) কখনো কোনো অসহায় বা মিসকিন ছাড়া একা খেতে বসতেন না। একদিন তাঁর আমন্ত্রণে এক ব্যক্তি এসে প্রচুর পরিমাণ খাবার খেয়ে ফেলল। তখন তিনি বললেন, এমন লোককে যেন আর না আনা হয়, কারণ রাসুলুল্লাহর (সা.) বাণী অনুযায়ী মুমিনের খাবার হওয়া উচিত পরিমিত।
শরীরের পুষ্টির জন্য কোন খাবারগুলো উপকারী, তার দিকনির্দেশনাও কোরআনে রয়েছে। পবিত্র কোরআনের সুরা ত্বোয়াহায় আল্লাহ তাআলা বর্ণনা করেছেন, কীভাবে তিনি জমিনকে মানুষের চলাচলের উপযোগী করেছেন, আকাশ থেকে বৃষ্টি বর্ষণ করে নানা পদের শস্য, শাকসবজি, ফলমূল ও উদ্ভিদের বাগান সৃষ্টি করেছেন। একই সাথে নির্দেশ দিয়েছেন, যেন মানুষ এসব সতেজ প্রাকৃতিক উপাদান থেকে আহার গ্রহণ করে এবং তাদের গৃহপালিত পশুদের চারণভূমিতে চড়ায়।
আজকের আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানও স্বীকার করছে যে, লাল মাংস বা প্রক্রিয়াজাত খাবারের চেয়ে সবুজ শাকসবজি, সালাদ ও ফলমূল স্বাস্থ্যের জন্য অনেক বেশি উপকারী। চারণভূমিতে প্রাকৃতিক ঘাস খেয়ে বড় হওয়া পশুর মাংস ও দুধ যতটা পুষ্টিকর, ফার্মের কৃত্রিম প্রসেসড খাবার খেয়ে মোটাতাজা হওয়া পশুর দুধ ও মাংসের স্বাস্থ্যঝুঁকি ততটাই বেশি। প্রসেসড মিট বা অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত মাংস গ্রহণের ফলে ক্যাান্সারের মতো মরণব্যাধির ঝুঁকি আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যায়।
কোরআনে আল্লাহ তাআলা সামুদ্রিক ও নদীর তাজা মাছকে অত্যন্ত উৎকৃষ্ট খাবার হিসেবে উল্লেখ করেছেন। সুরা নাহলে সাগরের তাজা ও সতেজ গোশত খাওয়ার কথা বলা হয়েছে। মিঠা ও লোনা উভয় পানির মাছের ভেতরেই আল্লাহ মানুষের শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় উপাদান, যেমন ওমেগা-থ্রি ফ্যাটি এসিডের মতো মহৌষধ রেখে দিয়েছেন।
অন্যান্য পশুর মাংস খাওয়া শরিয়তে জায়েজ করা হলেও অতিরিক্ত মাংস ভক্ষণের বিষয়ে সাহাবায়ে কেরাম সতর্কবার্তা দিয়ে গেছেন। হজরত ওমর (রা.) বলতেন, মদের মতো মাংসের ভেতরেও এক ধরণের ক্ষতিকর আসক্তি ও শারীরিক ঝুঁকি রয়েছে। যদিও মাংস খাওয়া সম্পূর্ণ হালাল আর মদ হারাম, তবুও অতিরিক্ত মাংস ভক্ষণ শরীরের জন্য অত্যন্ত মারাত্মক পরিণতি ডেকে আনতে পারে।
একইভাবে পানির প্রয়োজনীয়তা বর্ণনা করতে গিয়ে আল্লাহ তাআলা বলেছেন, তিনি পানি থেকে প্রতিটি জীবন্ত বস্তুকে সৃষ্টি করেছেন। আমাদের মানবদেহের সিংহভাগ অংশই পানি দিয়ে গঠিত। পর্যাপ্ত পানি না পান করার কারণে শরীরের নানা অঙ্গপ্রতঙ্গ বিকল হতে পারে ও রোগ ব্যাধি বাসা বাঁধে। তবে এখানেও সুষম ভারসাম্য বজায় রাখা জরুরি, কারণ কোনো কিছুরই অতি বাড়াবাড়ি ভালো নয়।
আজ আমরা অসুস্থ হয়ে ডাক্তারের কাছে গেলে তারা কেবলই এটা-ওটা খাওয়া কমাতে বলেন বা বারণ করেন। এতে স্পষ্ট বোঝা যায়, এতদিন ধরে আমরা নিজের শরীরের ওপর কতটা অবিচার ও অন্যায় করে এসেছি। নিজেদের অসচেতনতা ও ভুল খাদ্যাভ্যাসের কারণেই অধিকাংশ শারীরিক রোগের উৎপত্তি ঘটে।
আজকে আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান যেসব বিষয় গবেষণার মাধ্যমে আবিষ্কার করছে, কোরআন-সুন্নাহ চৌদ্দশত বছর আগেই সেসব বিষয়ে নিখুঁত দিক-নির্দেশনা দিয়ে রেখেছে।
লেখক পরিচিতি ও সূত্র: শায়খ আব্দুল কাইয়ুম একজন স্বনামধন্য ব্রিটিশ-বাংলাদেশি ইসলামিক স্কলার এবং যুক্তরাজ্যের ইস্ট লন্ডন মসজিদের প্রধান ইমাম ও খতিব। ইউটিউব চ্যানেল মুসলিম উম্মাহ-এ প্রকাশিত তার বক্তব্যের ভিডিও থেকে লেখাটি তৈরি করা হয়েছে।
ওএফএফ
What's Your Reaction?