কৌশিক আজাদ প্রণয়ের প্রতীক্ষা

  প্রতীক্ষা আমাদের দেখা হয় না অনেকদিন। সময়ের চলন্তিকায় ক্ষণিক দেখার যে প্রহর, তাতেও ভর করে সান্ধ্য ব্যস্ততার দ্যোতনায় বিদায়-বাক্য। আমাদের কথা হয় না অনেকদিন। কাজের প্রয়োজনে এক-দু’বার ভুল করে কথা হলেও তাতে জুড়ে থাকে যদি-কিন্তু, যেহেতু-সেহেতু, এভাবে-ওভাবের এক যান্ত্রিক মিশ্রণ। আমি দীর্ঘ সময় প্রতীক্ষায় থাকি। অঘোর প্রতীক্ষা বিষাদের ঘাম ঝরায়, আমাকে ক্লান্ত করে। আমার দহনগুলো দেখা যায় না, বোঝা যায় না। সারাক্ষণ শুধুই তোমায় ভেবে থাকা। সময়-অসময়ে রিংটোন বাজলে তুমি ভেবে দ্রুত ছুটে যাওয়ার ব্যর্থ উৎকণ্ঠা! ম্যাসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপ—মিউট কনভার্সেশনেও বারবার ঢুকে অস্থিরতার উদগীরণ! তুমি যদি বার্তা দাও—তোমার! না, আজকাল আর তেমন হয় না। সময় তোমায় অনেক বেশি শক্ত হতে শিখিয়েছে। তোমার প্রাত্যহিক আচরণ আর ভাবনার ঢঙে দারুণ প্র‍্যাকটিক্যালিটি। তাছাড়া তোমার দুর্দান্ত ছকে বাঁধা সময়ে শুধুই মনস্তাত্ত্বিক উন্মেষে ভাগ বসানোর দুঃসাহস করবার ইচ্ছে আমি প্রশমিতই রাখি। একরাশ অভিমান জমে। কতজনের কত কে আছে, আমার শুধু তুমিই ছিলে—প্রাণপণ। তুমি আজও আছো, শুধু আমার নও আর। বাক্যগুলো পড়লে কুঞ্চিত চোখ আর ভ্রুকুটি তোমার বিরক্তি আনবে।

কৌশিক আজাদ প্রণয়ের প্রতীক্ষা

 

প্রতীক্ষা

আমাদের দেখা হয় না অনেকদিন। সময়ের চলন্তিকায় ক্ষণিক দেখার যে প্রহর, তাতেও ভর করে সান্ধ্য ব্যস্ততার দ্যোতনায় বিদায়-বাক্য। আমাদের কথা হয় না অনেকদিন। কাজের প্রয়োজনে এক-দু’বার ভুল করে কথা হলেও তাতে জুড়ে থাকে যদি-কিন্তু, যেহেতু-সেহেতু, এভাবে-ওভাবের এক যান্ত্রিক মিশ্রণ।

আমি দীর্ঘ সময় প্রতীক্ষায় থাকি। অঘোর প্রতীক্ষা বিষাদের ঘাম ঝরায়, আমাকে ক্লান্ত করে।

আমার দহনগুলো দেখা যায় না, বোঝা যায় না। সারাক্ষণ শুধুই তোমায় ভেবে থাকা।
সময়-অসময়ে রিংটোন বাজলে তুমি ভেবে দ্রুত ছুটে যাওয়ার ব্যর্থ উৎকণ্ঠা!
ম্যাসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপ—মিউট কনভার্সেশনেও বারবার ঢুকে অস্থিরতার উদগীরণ!
তুমি যদি বার্তা দাও—তোমার!

না, আজকাল আর তেমন হয় না। সময় তোমায় অনেক বেশি শক্ত হতে শিখিয়েছে।
তোমার প্রাত্যহিক আচরণ আর ভাবনার ঢঙে দারুণ প্র‍্যাকটিক্যালিটি।
তাছাড়া তোমার দুর্দান্ত ছকে বাঁধা সময়ে শুধুই মনস্তাত্ত্বিক উন্মেষে ভাগ বসানোর দুঃসাহস করবার ইচ্ছে আমি প্রশমিতই রাখি।

একরাশ অভিমান জমে।
কতজনের কত কে আছে, আমার শুধু তুমিই ছিলে—প্রাণপণ।
তুমি আজও আছো, শুধু আমার নও আর।
বাক্যগুলো পড়লে কুঞ্চিত চোখ আর ভ্রুকুটি তোমার বিরক্তি আনবে।
সত্যি বলতে, ‘আমার’ করে নিতে দস্তখত কিংবা শরীরী উষ্ণতা নিষ্প্রয়োজন।

আমি কেবল তুমিহীন বিষাদের অঙ্গারে পুড়ে-পুড়ে দগ্ধ হই।
কালে ভদ্রে খোঁজ নাও তুমি।
তোমার সপ্তায়-মাসের সময়ের অববাহিকা আমার কাছে মিনিট-সেকেন্ডের প্রতীক্ষা।
এই বিষাদ আমি প্রকাশ করতে পারব না, শত শব্দ লিখেও।


২. 
অবস্থান

তবু তো আমার একটুখানি উপস্থিতি তোমার উপলব্ধিতে
নিঃস্বার বিকেলের উদ্ভ্রান্ত শূন্যতায়
অথবা গাঢ় এক অনিচ্ছার তীক্ষ্ম ভ্রুকুটিতে
তোমার একান্ত গল্পগুলোতে জুড়ে আছি একাকার।

গা এলিয়ে চায়ের কাপে দোল চেয়ারে বসা বারান্দায়
তোমার ভাবনার অনুষঙ্গে আমার জায়গা নেই জানি
কিংবা তুমিময় প্রখর তৃষ্ণায় এক আঁজলা জলের মত
তোমাকে চাওয়ার অধিকারগুলো অনেক বড় মিথ।

অধিকাররা ডানা মেললে বরং তীরষ্কারের তীব্র হলাহলে
নীলকন্ঠ হই!
কাঙ্খিত দেবত্ব আমার মাঝে লেশমাত্র নেই
যার তরে সঁপে দিতে প্রস্তুত তোমার সকল আকুতি।
বরং সময়ের প্রদাহে অঙ্গার হয় লহরিত হাওয়ার ফুলেল    ভাবনারা।

আমার এতে দুঃখ নেই একদম। তবু তো জুড়ে আছি তোমার অলক্ষ্যে পদপিষ্ট হওয়া ঘাসের মত, তৃষিত হাতে ছুঁয়ে যাওয়া অর্ঘ্য ফুল হইনি আমি এতে তবু আক্ষেপ নেই। ধূসর আব্রু তবু সাক্ষ্য দেয় তোমার স্পর্শের।

৩.
নির্ঘুম শতাব্দীর ক্লেশে

শুনে দেখো সান্ধ্য সঙ্গীতে এক আর্তীর দীর্ঘশ্বাস।
চুরি যাওয়া আলোয় গত হয়েছে উদ্ভাসী প্রহরেরা
আমাদের রক্ত ঘামে একাকার হয়ে ডানা মেলে
নিকশ কালো অভিমান! ছিন্ন পত্রের অনুরাগে
ধেয়ে আসে স্মৃতির কালো অক্ষর, মুর্ছিত অব্দ।
অথবা রাশ উৎসবে মাতোয়ারা হয়ে প্রতীক্ষিত,
তাই ঈর্ষায় আদ্যপান্ত জ্বলে ছারখার অঙ্গারে
প্রতিটি কবিতা জন্ম নেয় নির্ঘুম শতাব্দীর ক্লেশে
যাত্রা শুরু হলো আবার, তীর্যক অপ্রসন্নতায়
বছরান্তের ধুলিত স্মৃতির অধিকারহীন সমারোহে।

৪.
অসমাপ্ত গল্প


এখানে নামে না রাত্রি অরূপ জ্যোৎস্নার মোমে
এখানে ফোটে নি ফুল রঙন লালের উজ্জীবনে
কেটে গেছে বহুকাল দূর হিমালয়ের আবক্ষ শীতলে
অথবা আমিও রয়েছি ঘুমায়ে শ্রান্ত কীর্তিনাশায়।
হিজলের বাকলে প্রেতায়িত বুনো অন্ধকার নামে
এখানে অশ্বত্থের ছায়ায় মন খারাপের অঙ্গীকার
শহুরে রাত্রির আলোয় ঝাঁপ দিলে, এ সব ছেড়ে-
মেতে ওঠে লালসার কামার্য মানবিক অবয়বে।
সেখানে লৌকিক সময়ের আব্রু জাগে বর্ণীল
আমাদের ক্ষতে ক্ষতে জমা হয় পান্ডু-পূঁজ প্রদাহ।
একটিবার ধর্মরাজ ভিক্ষা দিলে প্রাণ, জাগব আমিও
মহাকালে একটিবার ইন্দ্রজিত হবার লোভে,
নয়ত ধবধবে রিমের কাগজে কালো অক্ষরে লিখব
অসমাপ্ত এক গল্পের মুখবন্ধ, বাকি টুকু থাক।

৫.
তবু কেউ আসে


তবু কেউ আসে তিমিরের তিরোধানে প্রভাতী উৎসরণ
আমাদের রক্তে স্নায়ুতে দুর্বার বয়ে যায় সঞ্চারী আশারা
পরাভূত বাস্তব আহত যোদ্ধা হয়ে তুলে নেয় বৈজয়ন্তী
অথবা সংশপ্তক যাত্রির রাত্রির পথ ধরে ভোরের খোঁজ।
আদিগন্ত লিখে গিয়ে কোনো কবি- অবিশ্রান্ত সংলাপ
তোমাতে গড়েছে শত শত কাব্যের বাসন্তী উন্মাদনা!
কখনো আড়চোখে রিকশায় স্পর্ধিত নিমিলিত কায়ায়
তবু এক প্রেম এসে খুলে দিলো হৃদয়ের বন্ধ বাতায়ন,
আমি আজ শিল্পী হই ! তুমিই তবে ক্যানভাসের রঙ।

৬.
দ্বিধা

রুদ্ধ সময়ে বারেবারে হোঁচট খাই ধুলোমাখা পথে
বিভ্রান্ত পথিকের মত হেঁটেছি যার ঊষর বুকে অবিরাম
পেছনে তাকালে পরে অস্পষ্ট ঝাপসা আলো এক।
এই বুঝি আমাকে বিদায় দিতে প্রস্তুত চেনা এক মুখ
শরীরে স্মৃতির গন্ধ মেখে হাত বাড়াই আঁকড়ে থাকতে
ক্রমশ ক্ষীণ হতে হতে বিন্দু আলোয় শেষ উপস্থিতিতে
একবার দাঁড়ালে। আমায় বললে ভুলে যেতে সব।
পরক্ষনে উত্তরের অপেক্ষায় না থেকে মহাকালের রুঢ় স্রোতে
অবিচল শৃঙ্খলের মোটা বেড়ি জড়িয়ে নিলে পায়ে।
আমিও সভ্যতার মোড়কে লালিত দায়িত্বশীল নাগরিক।
আঁধারের সাথে গড়ে নেই অবিচ্ছিন্ন স্বার্থপর আবাস এক।
কৃপণ আলোর অন্তঃপুরে চেনা এক মুখ তবু, তুমি ।

৭.
নিষিদ্ধ অন্ধকার


অনাকাঙ্ক্ষিত অবোধ্য যাতনায় অশরীরী সময় ছেদ আঁকে ক্রুদ্ধতায়
বদলে যাওয়া হেম, বদলে যাওয়া ঘ্রাণ, কখনও পরিবর্তিত অনুভব
আকাশটার নীল বসনে আবীরের রক্তাক্ত ছোপ, অপরাহ্নের ডাক।
এরপর নামলে অন্ধকার, আলোকভ্রমে খুঁজবে কে কারে বিভীষিকায়?  
কালো শামীয়ানায় মুখ লুকোনো অপারগতায়, কখনও হেয়ালি বিস্মৃতি
এই পথে হেঁটেছিল সুজাতা, হেঁটেছিল শ্যামলি আর সুরঞ্জনারা ।
বনলতা টিকে রয় অন্তরাত্মায়, কত নামে ডাকি তারে, কত যাতনায়!
নীরব রাত্তিরে অনর্গল কর্কশ ডাকে নিশাচর প্যাঁচার দল,
কবিতার শব্দ আর্তি ভুলে মূর্ছা যায় ডাস্টবিনের কুঁকড়ানো কাগজে।
অজস্র পেয়ালার হেমলক গমনোন্মুখ থাকে পাকস্থলীকে আশ্রয় করে
গতজনমে ভালবেসে ছুঁয়েছিলে হাত। হয়েছিলে নীল শাড়ির বনলতা
বর্ষীয়সী শব্দের প্রেমারক্তি শাশ্বত হয় রোদনে, ভারি দীর্ঘশ্বাসে ।
তারে আর মনে নাই, ভুলে গেছে সব, হেঁটে গিয়ে কয়েকশ মাইল
কণ্ঠের আড়ষ্টতায় ভুল শব্দটি বড় অস্ফুট এক উচ্চারণ।
কালো পায়রার ডানা মিশে যায় অন্ধকার রাত্রির বিশালতায় ।
চুরি সঙ্গমে বিভোর রমণীয় শীৎকারে প্রাণ পাক নিষিদ্ধ অন্ধকার ।

৮.
ক্লান্তি


তোমাদের নিয়মের পৃথিবীতে আমি বেমানান-
এক প্রশ্বাসী দো-পেয়ে জীব,
পর্যায়ক্রমিক অনভ্যাসের এক অপরিচিত সত্ত্বা।

তোমাদের চেনা নগরীর সাধারণ মুখ-
যার অতলের ঢেউ কাঙ্ক্ষিত হয়নি অনুরাগে,
কেবলই বৃথা আস্ফালন,
জনৈক উদ্বেল হয়ে
পরিচিত আকুতির জালে কচুরিপানা হয়।

বিশেষত্বহীন বিচারবোধে
আমি এক জনৈক প্রেমিক তবে!
প্রেমহীন পৃথিবীর আনাচে-কানাচে
তোমায় খুঁজে ফিরি।
যা কিছু সঞ্চিতি-
ফুরোলো বলে
অসার ফিরি বারবার।

তোমাদের নীরবতায়
সঞ্জীবনের সুর তুলতে গিয়ে
স্বরের সংকটে মূক হই,
অথচ সুরেলা রই সতত।

তাই বড্ড বেশি অভিমানের আচ্ছাদনে নিজেকে লুকোই।
বেমানান হয়ে মানানসই গল্পের
প্রচ্ছদ হবার চেষ্টায় রই সবটাক্ষণ।

৯.
তৃষিত চুম্বন


রাত্রির বিভোর সঙ্গমে ক্রেকাতোয়ার প্রবল গর্জন শুনি
জীবনমুখী শব্দস্রোত নিরবধি বয়ে চলে রাত্রির তীর ঘেঁসে
পাণ্ডুলিপির মলিন পাতা উল্টে যায় একপশলা অন্ধ সমীর
স্তব্ধ অন্ধকারে শতাব্দীর শীৎকারে চেনা কণ্ঠ, পর্দার ওপাশে।
মৌন রাত্রির কোমল শিশির ছুঁয়ে গেলো অঙ্গে অঙ্গে  
প্রদাহের ক্ষত ঢেকে দেয় অনাবিল এক ভোরের স্পর্ধিত স্বপ্ন।
শঙ্কিত কালপুরুষ মুখ লুকায়ে থাকে তিমির অম্বরের চাদরে
বজ্রাহত ধরিত্রীর পোড়া অঙ্গারে জমবে কি সুপ্ত আর্তি?
প্রতীক্ষিত তৃষিত চুম্বন মোর,ওষ্ঠে উত্তাপ ছড়াক শব্দজালে।

কবি পরিচিতি : জন্ম ২৬ জুলাই, ১৯৮৭, ঢাকায়। বেড়ে ওঠার শুরুটা মুন্সীগঞ্জে, কৈশোর কেটেছে নিজ জেলা শরীয়তপুরের জাজিরা থানায়। ওখান থেকে মাধ্যমিক, পরে নটরডেম কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক এবং এরপর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণিত শাস্ত্রে স্নাতকসহ স্নাতকোত্তর। তারপর চাকরি জীবন শুরু একটা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার মাধ্যমে। এরপর শিক্ষকতা ছেড়ে বর্তমানে ব্যস্ত ব্যাংকার। কবিতা ভালো লাগে, কবিতা পড়তে ভালোবাসেন, কবিতা নিয়ে ভাবেন। মাঝে মাঝে লেখার চেষ্টা করেন। শিক্ষাজীবনে স্কাউটিং, আবৃত্তি আর বিতর্ক এই ৩টি শিল্প ধারণ করেছেন হৃদয়ে। প্রকাশিত বই : প্রেম ও দ্রোহের শঙ্খনাদ (২০১৪-একক কাব্যগ্রন্থ) শতরূপে ভালোবাসা (২০১৫- যৌথ কাব্যগ্রন্থ) দীপাঞ্জলি (২০১৬-যৌথ কাব্যগ্রন্থ ) কাব্য মঞ্জুষা (২০১৬-যৌথ কাব্যগ্রন্থ ) কাব্য কৌমুদী (২০১৭-যৌথ কাব্যগ্রন্থ) বিতর্ক কৌশল (২০১৭-বিতর্কবিষয়ক বই)

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow