আপনি কি জানেন সেই অনুভূতি যখন সারাদিন কাজ করার পর শরীর চরম ক্লান্ত, চোখের পাতা পুরু, কিন্তু রাতের বেলা বিছানায় গেলেও ঘুম আসে না? অনেকেই এই সমস্যার সঙ্গে পরিচিত। কখনো মনে হয় ঘুমের ঘাটতি বা দিনভর অতিরিক্ত কাজের কারণ, আবার কখনো মনে হয় কিছুই করার পরও রাতের ঘুম আসে না।
ঘুম আসতে না পারার সমস্যার পেছনে থাকতে পারে অনেক কারণ। কখনো এটি দৈনন্দিন অভ্যাস বা শারীরিক সমস্যা, আবার কখনো মানসিক চাপ বা উদ্বেগ। দিনের ছোট ছোট নাপ, বিকেলের কফি বা রাতের স্ক্রিন ব্যবহারও এই সমস্যাকে বাড়াতে পারে। এমনকি কোভিড-১৯ বা দীর্ঘস্থায়ী স্বাস্থ্য সমস্যাও ঘুমের ব্যাঘাত ঘটাতে পারে।
আজ আমরা জানব কেন দিনে ক্লান্ত থাকা সত্ত্বেও রাতে ঘুম আসে না, এর পেছনের সম্ভাব্য কারণগুলো কী এবং কীভাবে সাধারণ কিছু পরিবর্তনের মাধ্যমে ভালো ঘুম ফিরে আনা যায়।
দিনে ঘুমানো ঠিক কি না?
দিনে ঘুমানো খারাপ নয়, সঠিকভাবে ন্যাপ নেওয়া স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী। তবে বেশি সময়ের ন্যাপ বা দুপুরের পরে ঘুমানো রাতে ঘুমকে ব্যাহত করতে পারে।
পরামর্শ : দিনে ২০–৩০ মিনিটের ছোট ন্যাপ নিন এবং প্রতিদিন একই সময়ে ঘুমানোর চেষ্টা করুন, যাতে শরীর অভ্যস্ত হয়।
উদ্বেগ এবং ঘুমের সমস্যা
মাথায় চিন্তা ঘুরে থাকলে শান্তভাবে ঘুমানো কঠিন। কিছু উদ্বেগজনিত সমস্যার অন্যতম লক্ষণই ঘুমে ব্যাঘাত। উদ্বেগ থাকলে শরীর বেশি সতর্ক থাকে, যা ঘুম আসাকে আরও দেরি করে।
ডিপ্রেশন এবং ঘুমের ব্যাঘাত
গবেষণায় দেখা গেছে, ডিপ্রেশন ধরা পরার পর প্রায় ৯০%-এর বেশি মানুষ ঘুমের সমস্যায় ভুগে। এর মধ্যে নিদ্রাহীনতা, ন্যাকোলেপসি, শ্বাসের সমস্যা বা রেস্টলেস লেগস সিনড্রোম থাকতে পারে।
ডিপ্রেশন এবং ঘুমের মধ্যে সম্পর্ক জটিল। এটি শরীরের ঘুম-জাগর সময় (circadian rhythm) ব্যাহত করতে পারে।
কফি এবং ঘুমের মান
গবেষণায় দেখা গেছে কফির প্রভাব ৫ ঘণ্টা পর্যন্ত থাকে। যদি বিছানায় যাওয়ার আগে ৪-৬ ঘণ্টার মধ্যে কফি খান, ঘুমের মান অনেক কমতে পারে। রাতে ১০ টায় ঘুমাতে চাইলে বিকেল ৪টার পরে কফি না খাওয়াই ভালো।
স্ক্রিন টাইম
ফোন, ল্যাপটপ বা টিভির নীল আলো মেলাটোনিন হরমোনের উৎপাদন কমায়, যা ঘুম আসা ধীর করে। রাতের আগে ২ ঘণ্টা ডিভাইস ব্যবহার বন্ধ করতে পারেন বা নীল আলো ব্লক করার চশমা ব্যবহার করতে পারেন।
কোভিড-১৯ এবং ঘুমের সমস্যা
কোভিডে ঘুমে সমস্যা সাধারণ। গবেষণায় দেখা গেছে, কোভিডে আক্রান্ত কিছু মানুষের ৫–১০% পর্যন্ত ঘুমের সমস্যা হয়েছে, বিশেষ করে যারা হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।
দীর্ঘস্থায়ী কোভিডে ঘুমের সমস্যা আরও বেশি দেখা যায়- অনেকের ক্ষেত্রে ৪০%-এর বেশি মানুষের মধ্যেই মধ্যম থেকে গুরুতর ঘুমের সমস্যা দেখা গেছে।
অন্যান্য ঘুমের রোগ
স্লিপ অ্যাপনিয়া বা রেস্টলেস লেগস সিনড্রোম রাতে ঘুমে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে। ডিলে ড স্লিপ ফেজ সিনড্রোম (DSPS) তে শরীরের ঘুম-জাগর সময় বিপর্যস্ত হয়। এই ধরনের সমস্যা দিনে ক্লান্তি বাড়ায়, কিন্তু রাতে ঘুম আসে না।
সারকেডিয়ান রিদম (Circadian Rhythm)
আমাদের শরীরের ভেতরের ঘড়ি ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বিভিন্ন কাজ নিয়ন্ত্রণ করে- ঘুম, হরমোন, শরীরের তাপমাত্রা। দিনে আলো থাকলে মেলাটোনিন কম থাকে, রাতের দিকে বেশি হয়। ঘুম আসা শুরু হয় মেলাটোনিন বাড়ার ২ ঘণ্টার মধ্যে।
দিনে ক্লান্তি থাকা এবং রাতে ঘুম না আসা একটি সাধারণ সমস্যা। এটি ঘুমের অভ্যাস, মানসিক স্বাস্থ্য, কফি, স্ক্রিন ব্যবহার, বা অন্যান্য স্বাস্থ্যগত কারণে হতে পারে।
যদি ঘুমের সমস্যার কারণে দৈনন্দিন জীবন প্রভাবিত হয়, তবে ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া উচিত। তারা মূল কারণ চিহ্নিত করে কার্যকর সমাধান দিতে পারেন, যাতে রাতে শান্তভাবে ঘুম হয় এবং দিনে সতেজ থাকা যায়।
সূত্র : HealthLine