খাল খননের সুযোগে চলছে গাছ কাটার মহোৎসব
তিন শতাধিক গাছ কাটার অভিযোগ বন বিভাগে জমা পড়েছে ৫টি গাছ একে অপরকে দুষছেন বিএনপি নেতা ও বন বিভাগ ফরিদপুরের বোয়ালমারীর নদীয়ারচাঁদ খাল। খালের পানিপ্রবাহ ঠিক রাখতে এখানে চলছে সরকারি অর্থায়নে খনন কাজ। তবে খালের এই উন্নয়ন কাজই এখন কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে দু’পাড়ে থাকা হাজারো গাছের জন্য। অভিযোগ উঠেছে, দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের প্রত্যক্ষ মদদেই উপজেলার গুনবহা ইউনিয়নের নদেরচাঁদ বাজার থেকে স্লুইসগেট পর্যন্ত খালের দুই পাশের গাছ প্রকাশ্যে কেটে নেওয়া হচ্ছে। রীতিমতো ওখানে চলছে লুটের মহোৎসব। অথচ স্থানীয়দের দাবি, গাছগুলো না কেটেও খুব সহজেই খাল খনন করা সম্ভব ছিল। আর এ কাজের জন্য একে অপরকে দায়ী করছেন বিএনপি নেতা ইউপি চেয়ারম্যান ও বন বিভাগের কর্মকর্তা। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সামাজিক বনায়ন কর্মসূচির আওতায় এই খালের পাশে প্রায় ১০ হাজার গাছ রোপণ করেছিল ফরিদপুর বন বিভাগ। যা তদারকির দায়িত্বে ছিল ‘নদীয়ারচাঁদ সামাজিক বনায়ন ব্যবস্থাপনা কমিটি’। সম্প্রতি ক্ষতিগ্রস্ত গাছ কেটে বন বিভাগে জমার অনুমতি দেয় প্রশাসন। আর এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে প্রায় তিন শতাধিক গাছ কেটে একপ্রকার লোপাটের অভিযোগ উঠেছে খোদ বনায়ন কমিটির বিরুদ্ধে। ‘খালের
- তিন শতাধিক গাছ কাটার অভিযোগ
- বন বিভাগে জমা পড়েছে ৫টি গাছ
- একে অপরকে দুষছেন বিএনপি নেতা ও বন বিভাগ
ফরিদপুরের বোয়ালমারীর নদীয়ারচাঁদ খাল। খালের পানিপ্রবাহ ঠিক রাখতে এখানে চলছে সরকারি অর্থায়নে খনন কাজ। তবে খালের এই উন্নয়ন কাজই এখন কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে দু’পাড়ে থাকা হাজারো গাছের জন্য।
অভিযোগ উঠেছে, দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের প্রত্যক্ষ মদদেই উপজেলার গুনবহা ইউনিয়নের নদেরচাঁদ বাজার থেকে স্লুইসগেট পর্যন্ত খালের দুই পাশের গাছ প্রকাশ্যে কেটে নেওয়া হচ্ছে। রীতিমতো ওখানে চলছে লুটের মহোৎসব। অথচ স্থানীয়দের দাবি, গাছগুলো না কেটেও খুব সহজেই খাল খনন করা সম্ভব ছিল। আর এ কাজের জন্য একে অপরকে দায়ী করছেন বিএনপি নেতা ইউপি চেয়ারম্যান ও বন বিভাগের কর্মকর্তা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সামাজিক বনায়ন কর্মসূচির আওতায় এই খালের পাশে প্রায় ১০ হাজার গাছ রোপণ করেছিল ফরিদপুর বন বিভাগ। যা তদারকির দায়িত্বে ছিল ‘নদীয়ারচাঁদ সামাজিক বনায়ন ব্যবস্থাপনা কমিটি’। সম্প্রতি ক্ষতিগ্রস্ত গাছ কেটে বন বিভাগে জমার অনুমতি দেয় প্রশাসন। আর এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে প্রায় তিন শতাধিক গাছ কেটে একপ্রকার লোপাটের অভিযোগ উঠেছে খোদ বনায়ন কমিটির বিরুদ্ধে।
‘খালের দুই পাশে যে গাছগুলো আছে গাছগুলো না কেটেও খাল খনন করতে পারতো। আর গাছের বয়স হয়ে গেছে ১৫-২০ বছর। পাশে মাটি ফেললেও গাছগুলো থাকতো, ছায়া দিতো তাতে দেশের উপকার হতো।’
আরও পড়ুন-
ঢাকার খালে টয়লেটের লাইন, পাড়ে নাক চেপে বসবাস
সংরক্ষিত বন থেকে উজাড় হচ্ছে গাছ-বাঁশ
গাছ না কেটে মেরিন ড্রাইভ সড়ক প্রশস্তের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর
নিয়ম অনুযায়ী, কাটা গাছের মূল কাণ্ড বন বিভাগের নার্সারিতে জমা দেওয়ার কথা। কিন্তু পাঁচ দিনে শত শত গাছ কাটা হলেও নার্সারিতে জমা পড়েছে মাত্র পাঁচটি গাছ! বাকি গাছের কোনো হদিস নেই।
অন্যদিকে, খালের অপর পাড়ের গাছগুলো ব্যক্তিমালিকানার দাবি করে কেটে নিয়ে যাচ্ছে স্থানীয়রা। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং লাখ লাখ টাকার সরকারি সম্পদ রক্ষায় প্রশাসনের এই রহস্যজনক নীরবতা নিয়ে ক্ষুব্ধ ফরিদপুরের সচেতন মহল। দ্রুত তদন্ত করে এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি ভুক্তভোগী এলাকাবাসীর।
‘এর দ্বায়ভার শুধুমাত্র বন বিভাগেরই বলে আমি মনে করি এবং তাদের দোষটা আমাদের ঘাড়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে। এরসঙ্গে বিএনপি কোনোভাবে জড়িত নয়। আমিও জড়িত নই। প্রকৃতপক্ষে এই গাছ কাটার হোতা হচ্ছে বন বিভাগের কর্মকর্তারা।’
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, দা, কুড়াল, কোদাল, ডিজিটাল করাত ও হাত করাত দিয়ে ছোট-বড় বিভিন্ন সাইজের রেইন্ট্রি, লাটিম, আম, মেহগনিসহ বিভিন্ন ধরনের গাছ কর্তন চলছে। কয়েক কিলোমিটার দৈর্ঘ্যে খালটির কয়েকটি স্থানে চলছে গাছ কাটার কর্মযজ্ঞ। গাছগুলো কাটার পর গাছের গোড়া-শিকড় পর্যন্ত তুলে ফেলে মাটি দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়েছে। গাছগুলোর কাণ্ড ও ডালপালা অটোভ্যান ও নসিমনে করে বন বিভাগের অফিসে নেওয়ার কথা বলে অন্যত্র নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
গুনবহা ইউনিয়নের উমর নগর গ্রামের মো. গফফার মোল্লা জাগো নিউজকে বলেন, ‘খালের দুই পাশে যে গাছগুলো আছে গাছগুলো না কেটেও খাল খনন করতে পারতো। আর গাছের বয়স হয়ে গেছে ১৫-২০ বছর। পাশে মাটি ফেললেও গাছগুলো থাকতো, ছায়া দিতো তাতে দেশের উপকার হতো। খাল কাটার সুযোগে দুই পাশের গাছগুলো কেটে শেষ করছে।’
বাগুয়ান গ্রামের সাহেব শেখের স্ত্রী হোসনে আরা বলেন, ‘সরকারি জায়গা, সরকারি খাল কাটা শুরু করছে। এইজন্যে মানুষে লুটপাট করে নিয়ে যাচ্ছে। মেলা গাছ কাটা হইছে। দেখতেছি গাড়ি ভরে নেচ্ছে মানুষ।’
আরও পড়ুন-
কর্ণফুলী সংযুক্ত খাল পরিদর্শন তিন প্রতিমন্ত্রীর, ড্রেজিংয়ে সন্তোষ
ডাকাতিয়ার প্রবাহ বন্ধ হলে মরা খালে পরিণত হবে শাখা খালগুলো
খাল পুনঃখনন কার্যক্রম ইতোমধ্যে সারাদেশে একটি জাগরণ সৃষ্টি করেছে
গুড়দিয়া গ্রামের বাসিন্দা ও শ্রমিক মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘গাছগুলো বাঁচিয়ে রেখে খালটি খনন করা যেত। কিন্তু এখন আমরা এ বিষয়ে জানি না, কারণ আমরা শ্রমিক। জানবে যাদের জমি আর যে লোক কিনছে।’
‘খাল খননের ঠিকাদার গুনবহা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান এবং উপজেলা বিএনপির সভাপতি সিরাজুল ইসলাম। তিনি শুরুতে আমাদের না জানিয়ে গাছ কাটা শুরু করেন। আমরা জানতে পেরে গাছ কাটা বন্ধ করি।’
মুক্তারপুর গ্রামের আরেক শ্রমিক রবিউল ইসলাম বলেন, ‘যে পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে তাতে গাছগুলো সরকারি জায়গায়। আর যে স্কেভেটর দিয়ে মাটি কাটছে তাতে গাছের সমস্যা হয় না, খাল কাটা যায়।’
বোয়ালমারীর ছোলনা গ্রামের বাসিন্দা সমাজকর্মী সুমন রাফি বলেন, সম্প্রতি খাল খননের নামে দুই ধারে ফলজ ও বনজ বৃক্ষ ছিল তার অধিকাংশ কেটে ফেলা হচ্ছে। বনবিভাগের পাশাপাশি আমি নিজেও ২০১২-১৩ সালে বেশ কিছু গাছ লাগিয়েছিলাম। বড় গাছগুলোর সঙ্গে ছোট গাছগুলোও কেটে ফেলা হচ্ছে। যা পরিবেশের জন্য হুমকিস্বরূপ। এরকম হলে আর কেউ গাছ লাগাবে না। বিষয়টি প্রশাসনের খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত।
নদীয়ারচাঁদ সামাজিক বনায়ন ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য মো. নান্নু শেখ জানান, ‘খাল কাটার জন্য অনেক সময় স্কেভেটরে গাছ ভেঙেচুরে যাচ্ছে। আমাদের গুনবহা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান সাহেব, ইউএনও সাহেব ও বোয়ালমারী বন কর্মকর্তা তারা এসে বলেছেন যেগুলো ভেঙে যায়, বেঁধে যায় সেগুলো কেটে ফেলতে।’
নদীয়ারচাঁদ সামাজিক বনায়ন ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি হেমায়েত মোল্লা বলেন, ‘বন বিভাগের অনুমতিক্রমে ওয়াপদা বেড়ি বাঁধে আমরা গাছ লাগাই। ভেকু দিয়ে খাল খনন করা হচ্ছে, খাল খননের সময় গাছগুলোর কারণে সমস্যা হচ্ছে। এমতাবস্থায় বন বিভাগকে জানানোর পর ইউএনওকে অবহিত করেন। ইউএনও এবং বন বিভাগ আসেন। আমাদের গুনবহা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সিরাজুল ইসলামও ছিলেন। তাদেরা নির্দেশ দেন- নিচের যে গাছগুলো বাধা হয়ে যাচ্ছে সেগুলো কেটে বনবিভাগের অফিসে পাঠিয়ে দেবেন। আর গাছের ডালপালা বিক্রি করে খরচখরচা হিসেবে উপকারভোগীদের ভেতর বণ্টন করবেন।’
বোয়ালমারী উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও গুনবহা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘কিছু ছোট ছোট গাছ ছিল, যেগুলো পড়ে গেছিলো সেগুলো কাটলেও তারা কাটতে পারতো। কিন্তু সেগুলো কাটতে গিয়ে বড় বড় গাছও তারা কাটছে। এগুলো ঠিক করেনি। তারা বড় বড় গাছগুলো কর্তন করে বিএনপি তথা আমাদের ওপর দায়ভার চাপানোর চেষ্টা করছে। যার সঙ্গে বিএনপি তথা আমি চেয়ারম্যান হিসেবে জড়িত নই।’
তিনি বলেন, ‘এর দায়ভার শুধু মাত্র বন বিভাগেরই বলে আমি মনে করি এবং তাদের দোষটা আমাদের ঘাড়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে। এরসঙ্গে বিএনপি কোনোভাবে জড়িত নয়। আমিও জড়িত নই। প্রকৃতপক্ষে এই গাছ কাটার হোতা হচ্ছে বন বিভাগের কর্মকর্তারা। বন বিভাগের কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে গাছগুলো কাটা হয়েছে এবং গাছগুলো তাদের হেফাজতে আছে।’
এ ব্যাপারে ফরিদপুর নাগরিক কমিটির সাধারণ সম্পাদক প্রবীর কান্তি বালা বলেন, ‘খাল খননের সুযোগে অকারণে গাছ কর্তন কাম্য নয়। যদি সত্যি এমন হয়, তাহলে বিষয়টি খুবই দুঃখজনক। উন্নয়নের নামে পরিবেশের এমন বিপর্যয় এবং প্রকাশ্যে সরকারি সম্পদ গাছ লুটের এই উৎসব বন্ধে প্রশাসন কার্যকর ব্যবস্থা নেবে এমনটি প্রত্যাশা করি।’
ফরিদপুরে সহকারী বন সংরক্ষণ কর্মকর্তা তাওহীদ হোসেন বলেন, ‘খাল খননের ঠিকাদার গুনবহা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান এবং উপজেলা বিএনপির সভাপতি সিরাজুল ইসলাম। তিনি শুরুতে আমাদের না জানিয়ে গাছ কাটা শুরু করেন। আমরা জানতে পেরে গাছ কাটা বন্ধ করি। পরবর্তীতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নির্দেশে নির্দিষ্ট কিছু গাছ কাটার অনুমতি দেওয়া হয়। খাল যেমন উপকারী, ঠিক গাছও তেমনি উপকারী। গাছগুলো কাটা হোক আমরা চাই না।’
এ বিষয়টি নিয়ে বোয়ালমারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস এম রকিবুল হাসান বলেন, ‘গাছ কাটার নির্দেশ দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। সরকারি জমিতে যেহেতু গাছ, এটি নিয়ে যাওয়ার সুযোগও নেই। এ ঘটনায় একটি তদন্ত কমিটি করা হবে। পরে আমরা সরেজমিনে তদন্ত করে কী পরিমাণ গাছ কর্তন হয়েছে এবং প্রয়োজনের বাইরে কোনো গাছ কর্তন হয়েছে কি না সেটি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।’
এফএ/জেআইএম
What's Your Reaction?