ঈদের জামাত মানেই একামতের ধ্বনি- এটাই মুসলিম বিশ্বের চিরাচরিত রীতি। কিন্তু সেই প্রচলিত ধারার বাইরে গিয়ে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এক ব্যতিক্রমী রীতি চলে আসছে কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দানে। এখানে ঈদের জামাত শুরু হয় বন্দুকের গুলির আওয়াজে- যা বিশ্বজুড়েই বিরল এক ধর্মীয় রেওয়াজ হিসেবে পরিচিত।
ঐতিহ্য অনুযায়ী, নির্দিষ্ট সময় অন্তর শটগানের গুলি ছুড়ে মুসল্লিদের সতর্ক করা হয়। জামাতের ১০ মিনিট আগে ৫টি, ৫ মিনিট আগে ৩টি এবং এক মিনিট আগে দুটি গুলি ছোঁড়া হয়। প্রথম গুলিটি ছোড়েন দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ সুপার। ঈদগাহের পশ্চিম পাশে সাজিয়ে রাখা হয় গুলি ভর্তি শটগান, আর সেই শব্দেই শুরু হয় লাখো মানুষের একসঙ্গে ইবাদতের প্রস্তুতি।
এবার শোলাকিয়ায় অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ১৯৯তম ঈদুল ফিতরের জামাত। এতে ইমামতি করবেন বড়বাজার জামে মসজিদের খতিব মুফতি আবুল খায়ের মোহাম্মদ সাইফুল্লাহ। যদিও এই ঈদগাহের যাত্রা শুরু ১৭৫০ সালে। প্রায় ২৭৬ বছরের ইতিহাসে নিয়মিতভাবে এখানে ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার জামাত অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে।
ইতিহাস বলছে, ১৮২৮ সালে এখানে সোয়া লাখ মুসল্লির অংশগ্রহণে এক বিশাল ঈদ জামাত অনুষ্ঠিত হয়। সেই ‘সোয়ালাখ’ শব্দের বিবর্তনেই ‘শোলাকিয়া’ নামটির উৎপত্তি বলে প্রচলিত আছে। ঈদ জামাতকে কেন্দ্র করে এবারও নেওয়া হয়েছে নজিরবিহীন নিরাপত্তা ব্যবস্থা।
কিশোরগঞ্জের পুলিশ সুপার ড. এস এম ফরহাদ হোসেন জানান, চার স্তরের নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলা হয়েছে। ইউনিফর্মের পাশাপাশি সাদা পোশাকেও দায়িত্ব পালন করবেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। মাঠে থাকবে র্যাব ও এন্টিটেরোরিজম বোম ডিসপোজাল ইউনিট।
তিনি বলেন, ঈদগাহে প্রবেশের আগে মুসল্লিদের একাধিক চেকপোস্ট অতিক্রম করতে হবে-কোথাও কোথাও পাঁচ থেকে ছয় স্তরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছে। যেকোনো জরুরি পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত রাখা হয়েছে ফায়ার সার্ভিস, অ্যাম্বুলেন্স, মেডিক্যাল টিম ও কুইক রেসপন্স ইউনিট।
শোলাকিয়া ঈদগাহ পরিচালনা কমিটির সভাপতি ও জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আসলাম মোল্লা জানান, সকাল ১০টায় জামাতকে ঘিরে সব প্রস্তুতি সম্পন্ন। মুসল্লিদের শুধু জায়নামাজ নিয়ে মাঠে প্রবেশের অনুরোধ জানানো হয়েছে। মোবাইল ফোন ও ব্যাগ বহনে আরোপ করা হয়েছে বিধিনিষেধ। নিরাপত্তা জোরদারে বসানো হয়েছে ৬৪টি সিসিটিভি ক্যামেরা ও ৬টি ওয়াচ টাওয়ার। প্রায় ১১০০ পুলিশ সদস্য, র্যাবের ৬টি টিম, ৫ প্লাটুন বিজিবি, ৫ প্লাটুন আনসার ও ৪ প্লাটুন সেনাবাহিনী দায়িত্ব পালন করবে। থাকবে ড্রোন নজরদারি, মেটাল ডিটেক্টর, আর্চওয়ে ও একাধিক চেকপোস্ট। মাঠে দায়িত্বে থাকবেন ১৩ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট। দূর-দূরান্ত থেকে আগত মুসল্লিদের যাতায়াত সহজ করতে বাংলাদেশ রেলওয়ে চালু করেছে ‘শোলাকিয়া স্পেশাল’ নামে দুটি বিশেষ ট্রেন। একটি ভোর ৬টায় ভৈরব থেকে এবং অপরটি সকাল ৫টা ৪৫ মিনিটে ময়মনসিংহ থেকে ছেড়ে আসবে।
তিনি আরও জানান, মুসল্লিদের সুবিধার্থে রাখা হয়েছে ৩টি পানির ভ্যান, যেখানে প্রায় ৩ হাজার লিটার বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা থাকবে। এছাড়া ৬টি নলকূপ, ৫টি অস্থায়ী অজুখানা ও ১৫টি অস্থায়ী টয়লেট স্থাপন করা হয়েছে।