গৃহকত্রীকে ‘মা’ ডাকতো শিশু মোহনা, তবুও চলতো অকথ্য নির্যাতন

বিমানের এমডি সাফিকুর রহমানের বাসায় কাজ নিয়ে তার স্ত্রী বিথী বেগমকে ‌‘মা’ বলে ডাকতো মা হারা গৃহকর্মী মোহনা (১১)। কিন্তু মায়ের ভূমিকায় না থেকে বিথী আক্তার থেকেছেন জল্লাদের ভূমিকায়। দিনের পর দিন অমানুষিক নির্যাতনের শিকার শিশুটি এখনো গাজীপুরে শহীদ তাজউদ্দনি আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সার্জারী বিভাগের ভর্তি রয়েছে। এখনো সে যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে। শিশুটির দাদি ও বাবা তার দেখাশোনা করছেন। শিশুটির বাবা গোলাম মোস্তফা কোনাবাড়ী এলাকার একটি ছোট্ট হোটেলে শ্রমিকের কাজ করেন। তিন বছর বয়সে শিশুটির মা মারা যায়। এরপর তিনি আর বিয়ে করেননি। মেয়েটি তার বাবার সঙ্গে গাজীপুর মহানগরীর কোনাবাড়ী থানার কুদ্দুস নগর (পেয়ারা বাগান) এলাকায় বসবাস করতো। তাদের গ্রামের বাড়ি পঞ্চগড়ে। হাসপাতালে সার্জারি বিভাগের ১৫ নম্বর কক্ষে কথা হয় নির্যাতনের শিকার শিশুটির সঙ্গে। চিকিৎসাধীন শিশুটি বলে, ‘গৃহকত্রী বিথী বেগম আমাকে নির্যাতন করতো। যখন তখন মারধর করতো। খুন্তি গরম করে শরীরের বিভিন্ন জায়গায় ছ্যাঁকা দিতো। মাথার চুল টেনে ছিঁড়ে ফেলতো। আমাকে কখনো স্যারের (গৃহকর্তা) কাছে যাইতে দিতো না। সবসময় আমাকে ভাতরুমে (ওয়াশরুম) আটকে রাখতো। খাইতে দিতো না।

গৃহকত্রীকে ‘মা’ ডাকতো শিশু মোহনা, তবুও চলতো অকথ্য নির্যাতন

বিমানের এমডি সাফিকুর রহমানের বাসায় কাজ নিয়ে তার স্ত্রী বিথী বেগমকে ‌‘মা’ বলে ডাকতো মা হারা গৃহকর্মী মোহনা (১১)। কিন্তু মায়ের ভূমিকায় না থেকে বিথী আক্তার থেকেছেন জল্লাদের ভূমিকায়। দিনের পর দিন অমানুষিক নির্যাতনের শিকার শিশুটি এখনো গাজীপুরে শহীদ তাজউদ্দনি আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সার্জারী বিভাগের ভর্তি রয়েছে। এখনো সে যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে। শিশুটির দাদি ও বাবা তার দেখাশোনা করছেন।

শিশুটির বাবা গোলাম মোস্তফা কোনাবাড়ী এলাকার একটি ছোট্ট হোটেলে শ্রমিকের কাজ করেন। তিন বছর বয়সে শিশুটির মা মারা যায়। এরপর তিনি আর বিয়ে করেননি। মেয়েটি তার বাবার সঙ্গে গাজীপুর মহানগরীর কোনাবাড়ী থানার কুদ্দুস নগর (পেয়ারা বাগান) এলাকায় বসবাস করতো। তাদের গ্রামের বাড়ি পঞ্চগড়ে।

হাসপাতালে সার্জারি বিভাগের ১৫ নম্বর কক্ষে কথা হয় নির্যাতনের শিকার শিশুটির সঙ্গে। চিকিৎসাধীন শিশুটি বলে, ‘গৃহকত্রী বিথী বেগম আমাকে নির্যাতন করতো। যখন তখন মারধর করতো। খুন্তি গরম করে শরীরের বিভিন্ন জায়গায় ছ্যাঁকা দিতো। মাথার চুল টেনে ছিঁড়ে ফেলতো। আমাকে কখনো স্যারের (গৃহকর্তা) কাছে যাইতে দিতো না। সবসময় আমাকে ভাতরুমে (ওয়াশরুম) আটকে রাখতো। খাইতে দিতো না। পেটে খিদা লাগলেও আমি ভয়ে খাবার চাইতাম না। আমি আমার মায়ের (গৃহকত্রী) বিচার চাই, ফাঁসি চাই।’

গৃহকত্রীকে ‘মা’ ডাকতো শিশু মোহনা, তবুও চলতো অকথ্য নির্যাতন

শিশুটি আরও বলে, ‘মায়ের (গৃহকত্রী) সঙ্গে বাড়ির মহিলা বুয়া ও ছেলে বুয়াও আমাকে মারধর করতো। আমাকে তারা মারধর করলে মা তাদেরকে কিছু বলতো না।’

‘তোমাকে মারার সময় স্যার কোথায় ছিলেন’—জানতে চাইলে সে বলে, ‘স্যারের (গৃহকর্তা) সামনে আমাকে কখনো যাইতে দিতো না। স্যার বাসায় আসলে আমাকে ভাতরুমে আটকে রাখতো। আমি একটু একটু কাজ করতাম, বাসায় বাবুকে দেখতাম। তরকারি কেটেকুটে দিতাম, ঘর মুছতাম। বাথরুমে বসে থাকি কিল্লিগা, বাবু দেখি না, কাজ করি না তার জন্য আমাকে খুন্তি দিয়া, লাঠি দিয়ে মারতো। সারা শরীরেই এরকম মারছে। খুন্তি পোড়া দিয়ে আমাকে এভাবে মারতো। বাথরুমে দরজা আটকে সারাদিন বসায়ে রাখতো।’

শিশুটির বাবা গোলাম মোস্তফা বলেন, ‘গত কোরবানির ঈদের পর আমি উত্তরায় এক দোকানে বসে চা খাচ্ছিলাম। ওই চা দোকানের সামনের উত্তরা ৯ নম্বর সেক্টরের ৭/ সি, ২৬ নম্বর বাড়ির সিকিউরিটি গার্ড (দারোয়ান) জাহাঙ্গীর কথায় কথায় চা দোকান মালিকের সঙ্গে আলাপ করছিল, বিমান কর্মকর্তা স্যারের বাসায় একটা কাজের মেয়ে লাগবে। তখন আমি তার সঙ্গে কথা বলি এবং আমার মেয়ে আছে জানাই। তখন বলে, নিয়ে আসেন। ম্যাডাম খুব ভালো মানুষ। পরে দারোয়ানের কথামতো যেদিন মেয়ে নিয়ে আসি, সেদিন বাসায় উঠে দেখি টেবিলে খাওয়ার অভাব নাই। হিসাব ছাড়া টেবিল ভর্তি খাবার ছিল।’

আরও পড়ুন:
সেই শিশুর খোঁজ নিলেন প্রধান উপদেষ্টা, হাসপাতালে গেলেন বাণিজ্য উপদেষ্টা
সাফিকুরের নিয়োগ বাতিল, বিমানের এমডির দায়িত্বে হুমায়রা
বিমানের এমডির বাসায় ৭ মাস ‘নরক যন্ত্রণায়’ ছিল সেই গৃহকর্মী শিশুটি
বিয়েসহ সব খরচ বহনের আশ্বাসে শিশুটিকে এনে দেওয়া হয় গরম খুন্তির সেঁকা

তিনি বলেন, ‘বাসায় নিয়ে গেলে ম্যাডাম আমাকে বলে, কী হিসেবে তোমার মেয়েকে দিবা? কন্ট্রাক্ট দিবা? তখন আমি বলি, আমি কন্ট্রাকে মেয়েকে দেবো না। আমার মেয়ের ভবিষ্যতের (বিয়েশাদি এবং ব্যাংক ব্যালেন্স) জন্য আপনার কাছে রেখে যাবো। আর কিছু চাই না। এটা বললে তিনি রাজি হলে মেয়েকে রেখে যাই।’

‘প্রায় আট মাস ম্যাডামের বাসায় ছিল। ৩০ জানুয়ারি ম্যাডাম আমাকে ফোন দেয়, তোমার মেয়েকে এসে নিয়ে যাও। ৩১ জানুয়ারি দুপুরে আমি মাকে সঙ্গে নিয়ে উত্তরায় আসি। ম্যাডাম তখন বাসায় ছিল না। দারোয়ানকে বলি, ম্যাডামকে বলেন আমি আসছি। তখন সে আমাকে বলে, তুমি আসবা আমি জানি। বিকেলের দিকে ম্যাডাম বাইরে থেকে এসে সরাসরি বাসায় ষষ্ঠ তলায় উঠে পড়ে। হাতে সাদা একটা কাগজ নিয়ে সন্ধ্যায় নিচে নামে। আমাকে সাদা কাগজে সাইন দিতে বলে। পরে আমার কাছে মেয়েকে এনে দেয়।’

গৃহকত্রীকে ‘মা’ ডাকতো শিশু মোহনা, তবুও চলতো অকথ্য নির্যাতন

গোলাম মোস্তফা বলেন, ‘মেয়েকে দেখে আমি বলি, ম্যাডাম এরকম হলো কেন আমার মেয়ের? আমি তো আমার মেয়েকে এমন দেইনি আপনার কাছে? তখন ম্যাডাম বলে, বাথরুমে পড়ে গিয়ে এরকম হয়েছে এবং শরীরে চুলকানি হয়েছে। তখন ম্যাডাম আমাকে বলে, একটা ঠিকানা দিয়ে দেই। সেখানে যাও কবিরাজের কাছে। তোমার মেয়ের মাথায় সমস্যা আছে। কবিরাজের কাছে নিয়ে যাও। সাদা কাগজে সাইন দেওয়ার পর দারোয়ান এবং ম্যাডাম বলে, তোমার মেয়ে বুঝে পাইছো? আমি, বলি পাইছি। আট মাসের মধ্যে আমি কোনোদিন স্যারের (গৃহকর্তা) সঙ্গে দেখা করতে পারিনি। শুধু কাজের বুয়া এবং ম্যাডামের সঙ্গে দেখা করেছি।’

নির্যাতনের শিকার শিশুটির বাবা আরও বলেন, “প্রথম দিন ছাড়া আমাকে কোনোদিন বাসায় ওঠায়নি। এলে নিচ থেকে দেখা করে চলে যেতে হয়েছে। আমার মেয়েকে নির্যাতনের বিষয়ে স্যার (বিমানের এমডি) কিচ্ছু জানতো না। স্যার খুব ভালো মানুষ, দারোয়ান বলেছে। উত্তরা থেকে বাসায় আসার পথে আমার মেয়ে সারা রস্তায় আমাকে শুধু বলছে, ‘আব্বা, আমি খাবো, খাবো’। যা দিয়েছি তাই খাইছে। আমার মেয়েকে না খেয়ে রাখতো এবং খালি মারতো। সবসময় বাথরুমে মেয়েকে রেখে দিতো। রাতেও বাথরুমে রাখতো।”

গোলাম মোস্তফা বলেন, ‘আমি চারজনের বিরুদ্ধে মামলা করেছি। আমি সবার শাস্তি চাই। গৃহকত্রীর ফাঁসি চাই।’

গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সার্জারি বিভাগের সিনিয়র কনসালটেন্ট ও বিভাগীয় প্রধান চিকিৎসক মোহাম্মদ খলিলুর রহমান বলেন, ‘মোহনার শরীরের আঘাতগুলো দীর্ঘমেয়াদি। সিরিয়াল অনুযায়ী বা রুটিন মাফিক শিশুর হাতে, পায়ে, পিঠে আঘাত করা হয়েছে। প্রকারভেদে আঘাতের সময়সীমা ১০ দিন, ১৫ দিন এবং ২০ দিন। কোনো কোনো আঘাত এক মাস বা দুই মাস। গুণগত মানসম্পন্ন খাবারও খেতে দেয়নি শিশুটিকে।’

এ বিষয়ে রাজধানীর উত্তরা পশ্চিম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কাজী রফিক আহমেদ জানান, শিশু গৃহকর্মীকে নির্যাতনের মামলায় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) সাফিকুর রহমান এবং তার স্ত্রী বিথি, বাসার দুই গ্রহকর্মী রুপালী খাতুন ও সুফিয়া বেগমকে গ্রেফতার করে আদালতে পাঠানো হয়েছে।

আমিনুল ইসলাম/এসআর/জেআইএম

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow