গ্যাস সংকটে বেশি বিপাকে চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা
দেশজুড়ে চলমান এলপি গ্যাস সংকটের সবচেয়ে তীব্র প্রভাব পড়েছে চট্টগ্রামের স্ট্রিট ফুড ও ছোট খাবারের দোকানগুলোয়। লাইনের গ্যাস না থাকায় পুরোপুরি এলপিজির ওপর নির্ভরশীল এসব দোকানে রান্না চালানোই এখন কঠিন হয়ে পড়েছে। অতিরিক্ত দামে সিলিন্ডার কিনেও প্রয়োজনমতো গ্যাস না পাওয়ায় অনেক স্ট্রিট ফুড বিক্রেতা দৈনিক উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছেন, কেউ কেউ দোকান বন্ধ রাখতেও বাধ্য হচ্ছেন। সরেজমিন নগরীর আগ্রাবাদ, জিইসি মোড়, চট্টেশ্বরী রোড, জামালখান, বহদ্দারহাট ও দুই নম্বর গেট এলাকায় দেখা যায়, আগের মতো জমজমাট নেই ফুটপাতের খাবারের দোকানগুলো। কোথাও বিক্রি অর্ধেকে নেমে এসেছে, কোথাও আবার অর্ধেক দোকান খোলাই হচ্ছে না। নগরের জিইসি মোড়ের শপিংমল সানমার ওশান সিটির পাশ ঘেঁষে স্ট্রিট ফুডের দোকানের সারি। কেউ বিক্রি করেন ছোলা-পিঁয়াজু, কেউ লুচি-আলুর দম কেউবা চিকেন স্টিক-নুডলস। প্রতিদিন সন্ধ্যা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত শত শত ক্রেতার আনাগোনা আর জিইসিকেন্দ্রিক আড্ডায় জমজমাট থাকে পুরো এলাকা। এখানে প্রতিদিন কয়েক লাখ টাকার বেচাকেনা করেন ব্যবসায়ীরা। এখানে দুই বছর ধরে ভ্যানগাড়ি বসিয়ে ব্যবসা করছেন মোসলেম উদ্দিন। নামবিহীন এই দোকানে তিনি বিক্রি
দেশজুড়ে চলমান এলপি গ্যাস সংকটের সবচেয়ে তীব্র প্রভাব পড়েছে চট্টগ্রামের স্ট্রিট ফুড ও ছোট খাবারের দোকানগুলোয়। লাইনের গ্যাস না থাকায় পুরোপুরি এলপিজির ওপর নির্ভরশীল এসব দোকানে রান্না চালানোই এখন কঠিন হয়ে পড়েছে। অতিরিক্ত দামে সিলিন্ডার কিনেও প্রয়োজনমতো গ্যাস না পাওয়ায় অনেক স্ট্রিট ফুড বিক্রেতা দৈনিক উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছেন, কেউ কেউ দোকান বন্ধ রাখতেও বাধ্য হচ্ছেন।
সরেজমিন নগরীর আগ্রাবাদ, জিইসি মোড়, চট্টেশ্বরী রোড, জামালখান, বহদ্দারহাট ও দুই নম্বর গেট এলাকায় দেখা যায়, আগের মতো জমজমাট নেই ফুটপাতের খাবারের দোকানগুলো। কোথাও বিক্রি অর্ধেকে নেমে এসেছে, কোথাও আবার অর্ধেক দোকান খোলাই হচ্ছে না।
নগরের জিইসি মোড়ের শপিংমল সানমার ওশান সিটির পাশ ঘেঁষে স্ট্রিট ফুডের দোকানের সারি। কেউ বিক্রি করেন ছোলা-পিঁয়াজু, কেউ লুচি-আলুর দম কেউবা চিকেন স্টিক-নুডলস। প্রতিদিন সন্ধ্যা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত শত শত ক্রেতার আনাগোনা আর জিইসিকেন্দ্রিক আড্ডায় জমজমাট থাকে পুরো এলাকা। এখানে প্রতিদিন কয়েক লাখ টাকার বেচাকেনা করেন ব্যবসায়ীরা।
এখানে দুই বছর ধরে ভ্যানগাড়ি বসিয়ে ব্যবসা করছেন মোসলেম উদ্দিন। নামবিহীন এই দোকানে তিনি বিক্রি করেন লুচি, ডালপুরি, জিলাপি, আলু-মাংস, চনার ডাল। গ্যাস সংকটে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তি স্ট্রিট ফুড ব্যবসায়ীদের—এমন দাবি করে মোসলেম উদ্দিন বলেন, মাসে তিনটা সিলিন্ডার গ্যাস লাগে আমাদের। প্রতিটা সিলিন্ডারে যদি ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা বেশি দিতে হয়, তাহলে মাস শেষে সেটা বেড়ে যাচ্ছে দেড় হাজারের কাছাকাছি। এখন চাইলেই তো হুট করে খাবারের দাম বাড়াতে পারি না। কম্পিটিশনের ব্যবসা। পাশে আরও অনেকে একই খাবার বিক্রি করছেন। তাদেরও একই অবস্থা। তাই বাধ্য হয়ে খাবার বিক্রিই কমিয়ে দিয়েছি। সংকট কেটে যাবে, এ আশায় আপাতত এভাবেই চলছি।
একই এলাকার ভ্রাম্যমাণ খাবার বিক্রেতা আবরার বলেন, আমাদের কোনো রিজার্ভ নেই। প্রতিদিন যা বিক্রি করি, তাই দিয়ে সংসার চলে। আগে ১২০০ থেকে ১৩০০ টাকায় সিলিন্ডার পাওয়া যেত। এখন ২ হাজার টাকা দিয়েও গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। এত দামে গ্যাস কিনে আগের দামে খাবার বিক্রি করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। এখন দাম বেড়েছে সিলিন্ডারের। সেটার চাইতেও বড় কথা, সিলিন্ডার তো পাওয়াই যাচ্ছে না। যাদের থেকে সবসময় কিনি, তারাও দিতে পারছে না।
তিনি বলেন, খাবারের দাম বাড়ালে ক্রেতা কমে যায়, আর না বাড়ালে লোকসান হয়। তাই বাধ্য হয়ে নির্দিষ্ট কিছু আইটেম বন্ধ রেখেছেন।
এলপি গ্যাস সংকটের প্রভাব পড়ছে নগরীর মাঝারি রেস্তোরাঁগুলোতেও, তবে বড় রেস্তোঁরাগুলোতে এর কোনো প্রভাব নেই। কারণ, তারা কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশনের গ্যাস ব্যবহার করে। চট্টগ্রামের বড় রেস্টুরেন্টগুলোর মধ্যে অন্যতম হোটেল জামান এবং জামান হোটেল। এই দুই হোটেলের শাখা নগরীর প্রায় সব এলাকাতেই আছে। হোটেল জামান রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড বিরিয়ানি হাউস মুরাদপুর শাখার স্বত্বাধিকারী গোলাম কিবরিয়া কালবেলাকে বলেন, গ্যাস সংকটের প্রভাব আমাদের এখানে তেমন নেই। কারণ, আমরা লাইনের গ্যাস ব্যবহার করি। তবে, এর ভেতরেও আমাদের দুয়েকটি সিলিন্ডার প্রতি মাসে লাগে। কিন্তু গ্যাস সংকটের প্রভাব এখানে নেই।
তবে চকবাজারের একটি রেস্তোরাঁর ব্যবস্থাপক সুমন বণিক বলেন, আমাদের সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয় শিঙাড়া, সমুসা, ডালপুরি, ছোলা, পিঁয়াজু, বেগুনি; এসব আইটেম। এ সব আইটেমই গ্যাসের চুলায় ভাজতে হয়। রেস্তোরাঁর মোট খরচের বড় অংশই যায় জ্বালানিতে। গ্যাসের দাম বেড়ে যাওয়ায় খাবারের দাম না বাড়িয়ে উপায় নেই। কিন্তু দাম বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গেই গ্রাহক কমে যায়। ফলে বিক্রি কমছে, লোকসান বাড়ছে।
ব্যবসায়ীদের মতে, বড় রেস্তোরাঁগুলো কিছুটা সময় টিকে থাকতে পারলেও স্ট্রিট ফুড ও ছোট খাবারের দোকানগুলোর পক্ষে এই সংকট সামাল দেওয়া সবচেয়ে কঠিন। কারণ, তাদের মূলধন কম, বিকল্প জ্বালানির সুযোগ নেই এবং দাম বাড়ানোর ক্ষেত্রেও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। আগ্রাবাদের জনপ্রিয় স্ট্রিট ফুড সেফ। নগরের বড়পোল এলাকায়ও তাদের শাখা আছে। এই স্ট্রিট ফুডকার্টের দায়িত্বে থাকা ওসমান বলেন, স্ট্রিট ফুডই নগরবাসীর সবচেয়ে সাশ্রয়ী খাবারের উৎস। এই খাত ধ্বংস হয়ে গেলে সাধারণ মানুষই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আগ্রাবাদে তাদের একটি সিলিন্ডারে এক মাস চললেও মাসে তিনটা সিলিন্ডার লাগে বলে জানান এই বিক্রেতা।
চট্টগ্রামের রেস্তোরাঁ খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নগরীতে লাইনের গ্যাস সংযোগ সীমিত হওয়ায় প্রায় সব রেস্তোরাঁই এলপিজির ওপর নির্ভরশীল। ফলে বাজারে সামান্য সংকট দেখা দিলেই সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছে এই খাত। জ্বালানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় এরই মধ্যে অনেক রেস্তোরাঁ মেন্যুতে খাবারের পরিমাণ কমানো বা বিকল্প উপকরণ ব্যবহারের পথ বেছে নিচ্ছে। রেস্তোরাঁ ও স্ট্রিট ফুড ব্যবসায়ীরা দ্রুত এলপি গ্যাসের সরবরাহ স্বাভাবিক করা, কৃত্রিম সংকট সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং বড় শহরগুলোয় খাবারের দোকানগুলোর জন্য স্থায়ী জ্বালানি সমাধান নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন। তাদের আশঙ্কা, সংকট দীর্ঘ হলে চট্টগ্রামে হাজারো স্ট্রিট ফুড ব্যবসা বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এতে একদিকে কর্মসংস্থান সংকুচিত হবে, অন্যদিকে নগরীর খাদ্য ব্যবস্থা ও দৈনন্দিন জীবনে চাপ বাড়বে।
What's Your Reaction?