গ্রামে হারিয়ে যাচ্ছে বড় ও পুরোনো গাছ

একসময় গ্রামাঞ্চলে দেখা যেত প্রাচীন ও বিশাল আকৃতির গাছ। এসব গাছ শুধু গাছই ছিল না, ছিল গ্রামীণ জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। প্রকৃতির নীরব সাক্ষী হয়ে চারদিকে বিস্তার করতো ডালপালা। সেই ছায়া ঢেকে রাখতো বিশাল জায়গা। গ্রীষ্মের তপ্ত দুপুরে যখন সূর্যের প্রখর তাপে মাটি যেন পুড়ে যেত; তখন গ্রামের কৃষকসহ সব বয়সের মানুষ এসব গাছের শীতল ছায়ায় আশ্রয় নিতেন। ক্লান্ত শরীরকে একটু বিশ্রাম দেওয়ার জন্য। এটাই ছিল সবচেয়ে প্রিয় স্থান। কেউ বসে গল্প করতো, কেউ আড্ডায় মেতে উঠতো আর শিশুরা হাসি-খেলায় মুখর করে তুলতো চারপাশ। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে সেই দৃশ্য আজ অনেকটাই হারিয়ে যেতে বসেছে। গ্রাম মানেই বিশাল গাছের ছায়ায় মোড়া সবুজ পৃথিবী। গ্রামের প্রবেশমুখে, রাস্তার মোড়ে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাঠে, ঈদগাহে, পুকুরপাড়ে কিংবা বিস্তীর্ণ ফসলি জমির মাঝখানে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকতো আম, জাম, কাঁঠাল, বট, পাকুড়, শিমুলসহ নানা ধরনের গাছ। এর মধ্যে অনেক গাছের বয়স ছিল ৫০ বছরেরও বেশি। এসব গাছ শুধু প্রকৃতির অংশ ছিল না; তারা ছিল গ্রামীণ জীবনযাত্রার অবিচ্ছেদ্য সঙ্গী। তাদের ছায়া ছিল আশ্রয়, ডালপালা ছিল খেলার অংশ আর নীরব উপস্থিতি ছিল এক ধরনের নিরাপত্তা

গ্রামে হারিয়ে যাচ্ছে বড় ও পুরোনো গাছ

একসময় গ্রামাঞ্চলে দেখা যেত প্রাচীন ও বিশাল আকৃতির গাছ। এসব গাছ শুধু গাছই ছিল না, ছিল গ্রামীণ জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। প্রকৃতির নীরব সাক্ষী হয়ে চারদিকে বিস্তার করতো ডালপালা। সেই ছায়া ঢেকে রাখতো বিশাল জায়গা। গ্রীষ্মের তপ্ত দুপুরে যখন সূর্যের প্রখর তাপে মাটি যেন পুড়ে যেত; তখন গ্রামের কৃষকসহ সব বয়সের মানুষ এসব গাছের শীতল ছায়ায় আশ্রয় নিতেন। ক্লান্ত শরীরকে একটু বিশ্রাম দেওয়ার জন্য। এটাই ছিল সবচেয়ে প্রিয় স্থান। কেউ বসে গল্প করতো, কেউ আড্ডায় মেতে উঠতো আর শিশুরা হাসি-খেলায় মুখর করে তুলতো চারপাশ। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে সেই দৃশ্য আজ অনেকটাই হারিয়ে যেতে বসেছে।

গ্রাম মানেই বিশাল গাছের ছায়ায় মোড়া সবুজ পৃথিবী। গ্রামের প্রবেশমুখে, রাস্তার মোড়ে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাঠে, ঈদগাহে, পুকুরপাড়ে কিংবা বিস্তীর্ণ ফসলি জমির মাঝখানে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকতো আম, জাম, কাঁঠাল, বট, পাকুড়, শিমুলসহ নানা ধরনের গাছ। এর মধ্যে অনেক গাছের বয়স ছিল ৫০ বছরেরও বেশি। এসব গাছ শুধু প্রকৃতির অংশ ছিল না; তারা ছিল গ্রামীণ জীবনযাত্রার অবিচ্ছেদ্য সঙ্গী। তাদের ছায়া ছিল আশ্রয়, ডালপালা ছিল খেলার অংশ আর নীরব উপস্থিতি ছিল এক ধরনের নিরাপত্তার প্রতীক।

গ্রামের রাস্তা দিয়ে হাঁটলে তখন রোদ আর মানুষের মাঝে একটি প্রাকৃতিক বিরতি তৈরি করতো গাছের ছায়া। দূরের কোনো গ্রামে যেতে হলে পথের ধারে থাকা পুরোনো বটগাছ ছিল এক ধরনের মাইলফলক। কোনো পথচারী ক্লান্ত হলে সেখানেই একটু থেমে বিশ্রাম নিতেন। কৃষকেরাও কৃষিকাজের ফাঁকে গাছের ছায়ায় বসে মাথার ঘাম মুছতেন এবং শীতল বাতাসে কিছুটা স্বস্তি পেতেন।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাঠেও ছিল বড় বড় গাছ। ক্লাসের বিরতিতে শিক্ষার্থীরা শ্রেণিকক্ষ ছেড়ে ছুটে যেত সেই গাছের নিচে। কেউ দৌড়াতো, কেউ লুকোচুরি খেলতো, কেউ আবার গাছের ডালে উঠে দূরের মাঠ দেখতো। কেউ গাছের গুঁড়িতে হেলান দিয়ে স্বপ্ন দেখতো। গ্রীষ্মের দুপুরে যখন চারদিক উত্তপ্ত হয়ে উঠতো; তখন সেই গাছগুলোই ছিল শান্তির একমাত্র আশ্রয়। অনেক সময় শ্রেণিকক্ষ অতিরিক্ত গরম হয়ে উঠলে শিক্ষকরাও গাছের ছায়ায় বসেও পাঠদান করতেন।

tree

ঈদগাহ বা খোলা মাঠের বড় ও পুরাতন গাছগুলো ছিল সামাজিক মিলনস্থল। ঈদের সময় মানুষ এসব গাছের ছায়ায় আরাম করে নামাজ আদায় করতেন। অন্য সময়ে কৃষকরা মাঠে কাজের ফাঁকে সেখানে বসে বিশ্রাম নিতেন। শুধু কৃষকরাই নন; শিশু, কিশোর, যুবক ও বয়োজ্যেষ্ঠ—সব বয়সের মানুষই গাছতলাকে মিলনস্থল হিসেবে ব্যবহার করতেন। অনেকে গাছের ডালে দোলনা বেঁধে আনন্দ-উৎসবে মেতে উঠতেন। বিশেষ করে উৎসবের দিনগুলোতে সেখানে প্রাণবন্ত পরিবেশের সৃষ্টি হতো।

গ্রীষ্মের প্রখর রোদে গ্রামের প্রবীণরা এসব গাছের ছায়ায় বসে নানা বিষয়ে গল্প-আড্ডা দিতেন। গ্রামের বিচার-সালিশও বসতো গাছতলায়। অন্যদিকে শিশুরা বিভিন্ন খেলাধুলায় মেতে উঠতো। তাদের হাসি-আনন্দে চারপাশ মুখরিত হয়ে উঠতো। বিশেষ করে পুকুরপাড়ের গাছগুলো কিশোরদের কাছে ছিল অত্যন্ত আকর্ষণীয়। তারা সুযোগ পেলেই গাছে উঠে ডালপালায় বসে গল্প করতো এবং পুকুরের পানিতে লাফিয়ে পড়তো। গরমের দিনে এমন দৃশ্য ছিল খুবই সাধারণ।

গ্রামের মোড়ের বড় গাছগুলোর নিচে থাকতো ছোট ছোট দোকান। সেই দোকানের বেঞ্চে বসে চলতো আড্ডা, রাজনীতি, গল্প, হাসি আর জীবনের নানা আলোচনা। অনেক এলাকায় বড় গাছের নিচেই বসতো হাট-বাজারের অস্থায়ী দোকান। গাছের ছায়াই ছিল তাদের দোকানের ছাদ।

তবে দিনদিন গ্রামাঞ্চলের সেই বৃহৎ ও ছায়াঘেরা গাছগুলোর সংখ্যা কমে যাচ্ছে। বাড়িঘর নির্মাণ, রাস্তা সম্প্রসারণ এবং বিভিন্ন স্থাপনা গড়ে তোলার জন্য অসংখ্য পুরোনো ও বড় বড় গাছ কেটে ফেলা হয়েছে। পাশাপাশি ঘূর্ণিঝড়, কালবৈশাখী, বজ্রপাত ও অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগেও বহু গাছ ক্ষতিগ্রস্ত বা উপড়ে গেছে। তবে সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয়েছে মানুষের হাতেই।

treeদুঃখজনক বিষয় হলো, বড় গাছ কাটা বা নষ্ট হওয়ার হার যেভাবে বেড়েছে, সেই তুলনায় নতুন করে বড় ও ছায়াদানকারী গাছ রোপণের উদ্যোগ খুবই সীমিত। বিভিন্ন সড়ক ও খোলা জায়গায় সরকার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং বিভিন্ন সংগঠন বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি পরিচালনা করে। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই এসব গাছ পর্যাপ্ত ছায়া দিতে পারে না। কিছু গাছ কেবল উচ্চতায় বাড়ে, কিন্তু বিস্তৃত ডালপালা ও ঘন ছায়া সৃষ্টি করতে পারে না। ফলে রাস্তার পাশে সারি সারি গাছ থাকলেও গরমের দিনে পথচারীরা কাঙ্ক্ষিত স্বস্তি পান না। সব মিলিয়ে এসব গাছ পুরোনো বট, পাকুড়, রেইনট্রি কিংবা অন্যান্য বৃহৎ গাছের বিকল্প হয়ে উঠতে পারেনি।

ফলে বর্তমানে তপ্ত রোদের মধ্যে পথচারীদের বিশ্রাম নেওয়ার মতো ছায়াঘেরা গাছের সংখ্যা অনেক কমে গেছে। গরমের দিনে গ্রামের রাস্তা ধরে হাঁটলে আগের মতো শীতল ছায়ার দেখা মেলে না। চারদিকে খোলা রোদে রাস্তা উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এবং পথচলা কষ্টকর হয়ে পড়ে। একসময় যেসব গাছ মানুষকে স্বস্তি, শীতলতা ও প্রশান্তি দিতো, তাদের অভাব আজ গ্রামীণ পরিবেশ ও জনজীবনে স্পষ্টভাবে অনুভূত হচ্ছে।

শুধু গাছ নয়, বদলে গেছে মানুষের জীবনযাত্রাও। আগে মানুষ বেশি সময় বাইরে কাটাতো। এখন অনেকেই ঘরের ভেতরে মোবাইল ফোন ও প্রযুক্তিনির্ভর বিনোদনে বেশি সময় ব্যয় করে। আগে যেখানে গ্রামের মোড়ে গাছের নিচে আড্ডা হতো, এখন সেখানে গড়ে উঠেছে দোকান বা সিমেন্টের কাঠামো। শিশুদের খেলাধুলার জায়গাও কমে গেছে। গাছের ডালে উঠে খেলার সেই শৈশব এখন অনেকটাই হারিয়ে যাওয়া গল্প।

তবুও সবকিছু পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি। এখনো দেশের কিছু গ্রামে পুরোনো ও বড় গাছ দেখা যায়, যেখানে মানুষ বসে। এখনো কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও পুকুরপাড়ে পুরাতন ও বড় গাছ আছে। যেখানে শিশু-কিশোররা খেলাধুলা করে। তপ্ত রোদে গরম কমানো এবং মানুষের আরাম নিশ্চিত করতে প্রয়োজন পরিকল্পিত বৃক্ষরোপণ। শুধু গাছ লাগালেই হবে না, এমন গাছ লাগাতে হবে যা দীর্ঘস্থায়ী, ছায়াদানকারী এবং স্থানীয় পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতে সক্ষম।

tree

পুরোনো ও বৃহৎ গাছ শুধু পরিবেশের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করতো না বরং গ্রামের মানুষের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িয়ে ছিল। মানুষের বিশ্রাম, বিনোদন, মিলনমেলা এবং পারস্পরিক সম্পর্ক গড়ে তোলার ক্ষেত্রে এসব গাছ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতো। তাই গ্রামের এসব ছায়াঘেরা গাছ ছিল মানুষের আবেগ, স্মৃতি ও ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

এসইউ

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow