গ্লোবাল ভূরাজনীতির দিগন্তে আবারও একটি বড় প্রশ্ন সামনে এসেছে—চীন, রাশিয়া ও ভারত কি এবার সত্যিই একজোট হচ্ছে? বিশেষত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক শুল্কনীতি ও ভূরাজনৈতিক অবস্থান এই প্রশ্নকে আরও প্রাসঙ্গিক করেছে। আগামী ৩১ আগস্ট থেকে ১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চীনের তিয়ানজিনে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার (এসসিও) শীর্ষ সম্মেলন। সেখানে শি জিনপিং, ভ্লাদিমির পুতিন ও নরেন্দ্র মোদির একসঙ্গে উপস্থিতি বিশ্বরাজনীতিতে নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
গ্লোবাল সাউথের উত্থান:
‘গ্লোবাল সাউথ’ আজ একটি শক্তিশালী ধারণা। যেখানে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক, পরিবেশগত, সাংস্কৃতিক ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতার মাধ্যমে দক্ষিণ গোলার্ধের দেশগুলো নতুন সংহতি গড়ে তুলছে। এটিকে দক্ষিণ-দক্ষিণ সহযোগিতা (South-South Cooperation) বলা হয়। এক সময় যেখানে বিশ্ব রাজনীতির নিয়ন্ত্রণ ছিল মূলত উত্তর গোলার্ধের উন্নত দেশগুলোর হাতে, আজ সেখানে গ্লোবাল সাউথ বিকল্প শক্তি হিসেবে নিজেদের পরিচয় তুলে ধরছে। চীন বিশ্বব্যাপী এখন এই প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে। যা ব্রিকস সম্প্রসারণের মতো উদ্যোগ থেকে শুরু করে এসসিও’র আঞ্চলিক নিরাপত্তা ফোরামের মধ্যে আবর্তিত। সবই মূলত আমেরিকার নেতৃত্বাধীন বিশ্বব্যবস্থার বিকল্প হিসেবে গড়ে তোলার অংশ।
মার্কিন-ভারত সম্পর্কে টানাপড়েন:
সম্প্রতি মার্কিন শুল্কবাণ ভারতের সঙ্গে সম্পর্ককে অস্বস্তিকর পর্যায়ে নিয়ে গেছে। ট্রাম্প প্রশাসন ভারতীয় পণ্যের উপর শুল্ক দ্বিগুণ করেছে, বিশেষত রুশ তেল আমদানির কারণে দিল্লির ওপর চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র ভারতের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়াচ্ছে, অন্যদিকে ভারত বাধ্য হচ্ছে বিকল্প বাজার ও জোট খুঁজতে। এর ফলে মস্কো-দিল্লি বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হচ্ছে। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শংকরের সাম্প্রতিক মস্কো সফর এবং রাশিয়ার সঙ্গে তেলের নতুন চুক্তি প্রমাণ করছে, দিল্লি কেবল ওয়াশিংটনের ওপর নির্ভরশীল থাকতে চাইছে না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ভারত-রাশিয়ার সম্পর্ককে তিনি সবচেয়ে স্থিতিশীল বলে বর্ণনা করেছেন। এই বার্তাই ইঙ্গিত দেয়, নয়াদিল্লি পশ্চিমা চাপের বিকল্প পথ খুঁজছে।
এসসিও সম্মেলনে ২০টিরও বেশি দেশের নেতা একত্রিত হচ্ছেন। এতে যে বার্তা স্পষ্ট, তা হলো—গ্লোবাল সাউথ এক নতুন শক্তি হিসেবে দাঁড়িয়ে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা বিশ্ব এর প্রভাব অস্বীকার করতে পারবে না। একদিকে রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের ঘনিষ্ঠতা, অন্যদিকে চীন-ভারত সম্পর্কের উষ্ণতা। সব মিলিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনকে কূটনৈতিক চাপে ফেলেছে এই সম্মেলন।
চীন-ভারত সম্পর্কের উষ্ণতা:
২০২০ সালের গালওয়ান সীমান্ত সংঘর্ষের পর ভারত-চীন সম্পর্ক ছিল ঠান্ডা। কিন্তু এবারের এসসিও সম্মেলনে মোদির অংশগ্রহণ এক ভিন্ন ইঙ্গিত দিচ্ছে। সীমান্ত উত্তেজনা হ্রাস, সেনা প্রত্যাহার, বাণিজ্য ও ভিসা নিষেধাজ্ঞা শিথিলকরণ, এমনকি জলবায়ু পরিবর্তনসহ বৈশ্বিক ইস্যুতে সহযোগিতা—সবই আলোচনার টেবিলে আসতে পারে। বিশেষজ্ঞ এরিক ওল্যান্ডার বলেন, শি জিনপিং এ সম্মেলনের মাধ্যমে দেখাতে চান—আমেরিকা-নেতৃত্বাধীন বিশ্বব্যবস্থার বিকল্প কী হতে পারে। তাঁর মতে, ভারতের বর্তমান অগ্রাধিকার হলো চীনের সঙ্গে সম্পর্ককে এগিয়ে নেওয়া, যদিও কিছু অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব থাকছে।
পুতিনের কূটনৈতিক বিজয়:
ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে পশ্চিমা দেশগুলো পুতিনকে অনেকটাই বিচ্ছিন্ন করেছে। কিন্তু গ্লোবাল সাউথের জোটগুলো রাশিয়াকে কূটনৈতিক মঞ্চে আবারও ফিরিয়ে আনছে। এসসিও সম্মেলনে পুতিন, শি এবং মোদির একসঙ্গে থাকা রাশিয়ার জন্য একটি বড় কূটনৈতিক সাফল্য। রুশ দূতাবাস ইতোমধ্যেই জানিয়ে দিয়েছে, তারা শিগগির চীন-ভারত-রাশিয়া ত্রিপাক্ষিক বৈঠকের আয়োজন করতে চায়। এটি বাস্তবায়িত হলে বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্যে তাৎপর্যপূর্ণ প্রভাব ফেলবে।
এসসিও’র সীমাবদ্ধতা ও সম্ভাবনা:
যদিও এসসিওকে চীন একটি “নতুন ধরনের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক গঠনের গুরুত্বপূর্ণ শক্তি” বলে অভিহিত করছে, তবে এই জোট এখনো অনেক সীমাবদ্ধতার মধ্যে রয়েছে। কাশ্মীর ইস্যুতে ভারত তার অবস্থান পরিষ্কার করেছে। ইসরায়েলি হামলা প্রসঙ্গে ইরানকে সমর্থন জানানো নিয়েও ভারত দ্বিমত পোষণ করেছে। ফলে কার্যকর সিদ্ধান্ত গ্রহণে এই জোট এখনও দুর্বল। আসলে এসসিও মূলত একটি প্ল্যাটফর্ম, যেখানে সবাই সাড়া দেয়, কিন্তু এখনো এটি কার্যকর নীতিনির্ধারণী সংস্থা হয়ে ওঠেনি।
তিব্বত প্রশ্নে নতুন উত্তেজনা:
এসসিও সম্মেলনের ঠিক আগেই শি জিনপিংয়ের আকস্মিক তিব্বত সফর অনেক প্রশ্ন উত্থাপন করেছে। দলাই লামার উত্তরসূরি নিয়ে চীন-ভারত দ্বন্দ্ব নতুন মাত্রা পাচ্ছে। চীন স্পষ্ট বলেছে, উত্তরাধিকারী বাছাই হবে তাদের ধর্মীয় ঐতিহ্য অনুযায়ী, অন্যদিকে ভারত দলাই লামার স্বায়ত্তশাসনকে সমর্থন করছে। ফলে তিব্বত প্রশ্নে শি-মোদি আলোচনায় অস্বস্তি বাড়বে বলেই মনে করা হচ্ছে। তার উপর তো বহুদিনের সীমান্ত বিরোধ আছেই।
যুক্তরাষ্ট্রের অস্বস্তি:
এসসিও সম্মেলনে ২০টিরও বেশি দেশের নেতা একত্রিত হচ্ছেন। এতে যে বার্তা স্পষ্ট, তা হলো—গ্লোবাল সাউথ এক নতুন শক্তি হিসেবে দাঁড়িয়ে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা বিশ্ব এর প্রভাব অস্বীকার করতে পারবে না। একদিকে রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের ঘনিষ্ঠতা, অন্যদিকে চীন-ভারত সম্পর্কের উষ্ণতা। সব মিলিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনকে কূটনৈতিক চাপে ফেলেছে এই সম্মেলন।
তাহলে কি সত্যিই চীন, রাশিয়া ও ভারত একজোট হচ্ছে? উত্তরটি সরল নয়। কারণ, তিন দেশের স্বার্থ ও সীমাবদ্ধতা আলাদা। তবে সাম্প্রতিক কূটনৈতিক কর্মকাণ্ড ইঙ্গিত দিচ্ছে, ওয়াশিংটনের চাপ ভারতের কূটনীতিকে বৈচিত্র্যময় করছে। আর চীন ও রাশিয়া এর সুযোগ নিচ্ছে। এসসিও’র মঞ্চে শি-পুতিন-মোদি একসঙ্গে দাঁড়ানো নিঃসন্দেহে একটি কূটনৈতিক প্রতীক। যা গ্লোবাল সাউথের উত্থানকে আরও দৃঢ় করবে। তবে এটিই একক বৈশ্বিক শক্তি জোটে পরিণত হবে কিনা, তা নির্ভর করবে সীমান্ত বিরোধ, বাণিজ্য স্বার্থ এবং রাজনৈতিক আস্থার জটিল সমীকরণের ওপর। যা স্পষ্ট—গ্লোবাল সাউথ আর প্রান্তিক দর্শক নয়; তারা বৈশ্বিক শক্তির নতুন খেলোয়াড়। আর এর মধ্যেই লুকিয়ে আছে আগামী দশকের আন্তর্জাতিক রাজনীতির মূল দিকনির্দেশনা।
লেখক : গণমাধ্যম শিক্ষক ও আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক।
[email protected]
এইচআর/এএসএম