চলচ্চিত্রে রঙিন নজরুল, ছিলেন অভিনেতাও

2 days ago 5

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম শুধু কবি, গীতিকার বা সুরকার হিসেবেই নন, ছিলেন চলচ্চিত্র জগতেও এক বিশাল প্রতিভা। সাহিত্যের মতোই তিনি চলচ্চিত্রেও রেখে গেছেন সৃজনশীলতার অনন্য স্বাক্ষর। অভিনয়, পরিচালনা, সুর ও কাহিনি রচনা; সব ক্ষেত্রেই তিনি ছিলেন স্বতন্ত্র এবং উদ্ভাবনী।

ত্রিশের দশকে নজরুল যোগ দেন পার্সি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান ম্যাডান থিয়েটার্সে ‘সুর ভাঙারি’ হিসেবে। সেটি ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি পদ। এখানে তিনি কেবল সংগীত পরিচালক হিসেবেই নয়, অভিনয় ও প্রশিক্ষণেও রেখেছেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। শিল্পীদের গান শেখানো, উচ্চারণ ঠিক করা কিংবা অভিনয় বোঝানোর দায়িত্ব পালন করতেন নিবেদন ও দক্ষতার সঙ্গে।

১৯৩৩ সালে নির্মিত হয় চলচ্চিত্র ‘ধ্রুব’। এর কাহিনি গিরিশচন্দ্র ঘোষের ‘ধ্রুব চরিত’ থেকে নেওয়া। নজরুল এই ছবিতে সংগীত পরিচালনার পাশাপাশি অভিনয় করেন দেবর্ষি নারদ চরিত্রে।

সাধারণত নারদকে বৃদ্ধ, জটাধারী রূপে কল্পনা করা হয়। কিন্তু নজরুল নারদের চরিত্রে এনেছিলেন সম্পূর্ণ ভিন্ন এক তরুণ রূপ। স্মার্ট, চুড়ো করা চুল, রেশমি পোশাক ও হাসিমুখে দেখা গিয়েছিল নারদকে। এই অভিনব উপস্থাপনা নিয়ে অনেক সমালোচনা হলেও নজরুল বলেছিলেন, ‘আমি চিরতরুণ ও চিরসুন্দর নারদের রূপই দেওয়ার চেষ্টা করেছি।’

নজরুল নিজে পরিচালনাও করেছেন। তার পরিচালিত চলচ্চিত্র ‘ধূপছায়া’। সেখানে বিষ্ণু চরিত্রে অভিনয়ও করেন তিনি। ১৯৪১ সালে শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকের পৃষ্ঠপোষকতায় প্রতিষ্ঠা করেন চলচ্চিত্র প্রযোজনা সংস্থা ‘বেঙ্গল টাইগার্স পিকচার্স’। তার সঙ্গে ছিলেন আব্বাসউদ্দীন আহমদ, মোহাম্মদ হোসেন খসরু, হুমায়ূন কবীরসহ অনেক সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব।

নজরুল কাজ করেছেন এমন কিছু উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র হলো ‘জামাইষষ্ঠী’ (১৯৩১): সুরকার হিসেবে, ‘জলসা’ (১৯৩১): নিজের লেখা গান গাওয়া ও কবিতা আবৃত্তি, ‘সাপুড়ে’ (১৯৩৯): কাহিনিকার ও সুরকার, ‘পাতালপুরী’ (১৯৩৫): গান লিখে সুর দেন নজরুল, ‘গৃহদাহ’ (১৯৩৬): শরৎচন্দ্রের উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত ছবিটির সংগীত রচনা, ‘গ্রহের ফের’ (১৯৩৭): সুর ও সংগীত পরিচালনায় নজরুল, ‘বিদ্যাপতি’ (১৯৩৭): বৈষ্ণব কবি বিদ্যাপতির কবিতায় নজরুলের সুর, ‘গোরা’ (১৯৩৮): রবীন্দ্রনাথের উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত চলচ্চিত্রের সংগীত পরিচালক হিসেবে কাজ করেন কাজী নজরুল ইসলাম।

এছাড়াও ‘চৌরঙ্গী’ (১৯৪২): বাংলা ও হিন্দি সংস্করণে গীতিকার ও সংগীত পরিচালক, ‘দিলরুবা’ (১৯৪২): গীতিকার ও সুরকার, ‘মদিনা’ (১৯৪১-৪২): ১৫টি গানের রচয়িতা ছিলেন নজরুল (ছবিটি মুক্তি পায়নি নজরুলের অসুস্থতার কারণে)।

নজরুলের মৃত্যুর পর তার গান ব্যবহৃত হয়েছে বহু জনপ্রিয় চলচ্চিত্রে। উল্লেখ করা যায় ‘নবাব সিরাজউদ্দৌলা’: ‘পথহারা পাখি কেঁদে ফেরে একা’, ‘জীবন থেকে নেয়া’: ‘কারার ঐ লৌহকপাট’, ‘লায়লা-মজনু’: ‘লাইলি তোমার এসেছে ফিরিয়া’ ইত্যাদি গানগুলোর নাম।

নজরুলের গল্প ও কবিতা অবলম্বনেও নির্মিত হয়েছে অনেক চলচ্চিত্র। সে তালিকায় আছে ‘মেহের নেগার’ (২০০৬): মৌসুমী ও ফেরদৌস অভিনীত; পরিচালনায় মুশফিকুর রহমান ও মৌসুমী, ‘রাক্ষসী’: পরিচালনায় মতিন রহমান, অভিনয়ে রোজিনা, পূর্ণিমা ও ফেরদৌস, ‘জ্বিনের বাদশাহ’: অভিনয়ে বাপ্পারাজ, ‘মৃত্যুক্ষুধা’, ‘ব্যথার দান’, ‘পদ্মগোখরা’: উপন্যাস ও গল্প অবলম্বনে নির্মিত, ‘লিচু চোর’, ‘খুকী ও কাঠবেরালি’ ইত্যাদি।

এলআইএ/এএসএম

Read Entire Article