চামড়া এখন গলার কাঁটা

লাভ তো দূরের কথা, পকেটের টাকা খোয়া যাচ্ছে। চামড়া এখন গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তারাগঞ্জের মৌসুমি চামড়া ব্যবসায়ী আজিজুল ইসলাম এভাবেই ক্ষোভ প্রকাশ বলছিলেন কথাগুলো। তিনি বলেন, গ্রাম থেকে ৪০০ টাকা দিয়ে গরুর চামড়া কিনে বাজারে এনে দেখি পাইকাররা ১৫০ টাকার বেশি দাম বলে না। এর ওপর আছে ভ্যান ভাড়া আর টোল খরচ। রংপুরের আড়ত ও অস্থায়ী চামড়া সংগ্রহ কেন্দ্রগুলো ঘুরে দেখা গেছে, চামড়া কেনার জন্য বড় পাইকার বা আড়তদারদের কোনো বাড়তি আগ্রহ নেই। ফলে গ্রামেগঞ্জে ঘুরে মৌসুমি ব্যবসায়ীরা যে চামড়া সংগ্রহ করেছিলেন, তারা এখন মূলধন হারানোর ঝুঁকিতে পড়েছেন। সরেজমিনে দেখা যায়, সরকার নির্ধারিত মূল্যের তোয়াক্কা না করে বরাবরের মতো এবারও রংপুরে চামড়ার বাজারে চরম মন্দা দেখা দিয়েছে। মাঠপর্যায়ে পশুর চামড়ার কাঙ্ক্ষিত দাম না থাকায় ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেছেন মৌসুমি ব্যবসায়ী, মাদরাসা কর্তৃপক্ষ এবং কোরবানিদাতারা। অনেক জায়গায় ক্রেতা না থাকায় পশুর চামড়া রাস্তায় পড়ে নষ্ট হওয়ার খবরও পাওয়া গেছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এবার ঢাকার বাইরে গরুর লবণযুক্ত কাঁচা চামড়ার দাম প্রতি বর্গফুট ৫৭ থেকে ৬২ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল। যা গত বছরের ত

চামড়া এখন গলার কাঁটা

লাভ তো দূরের কথা, পকেটের টাকা খোয়া যাচ্ছে। চামড়া এখন গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তারাগঞ্জের মৌসুমি চামড়া ব্যবসায়ী আজিজুল ইসলাম এভাবেই ক্ষোভ প্রকাশ বলছিলেন কথাগুলো।

তিনি বলেন, গ্রাম থেকে ৪০০ টাকা দিয়ে গরুর চামড়া কিনে বাজারে এনে দেখি পাইকাররা ১৫০ টাকার বেশি দাম বলে না। এর ওপর আছে ভ্যান ভাড়া আর টোল খরচ।

রংপুরের আড়ত ও অস্থায়ী চামড়া সংগ্রহ কেন্দ্রগুলো ঘুরে দেখা গেছে, চামড়া কেনার জন্য বড় পাইকার বা আড়তদারদের কোনো বাড়তি আগ্রহ নেই। ফলে গ্রামেগঞ্জে ঘুরে মৌসুমি ব্যবসায়ীরা যে চামড়া সংগ্রহ করেছিলেন, তারা এখন মূলধন হারানোর ঝুঁকিতে পড়েছেন।

সরেজমিনে দেখা যায়, সরকার নির্ধারিত মূল্যের তোয়াক্কা না করে বরাবরের মতো এবারও রংপুরে চামড়ার বাজারে চরম মন্দা দেখা দিয়েছে। মাঠপর্যায়ে পশুর চামড়ার কাঙ্ক্ষিত দাম না থাকায় ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেছেন মৌসুমি ব্যবসায়ী, মাদরাসা কর্তৃপক্ষ এবং কোরবানিদাতারা। অনেক জায়গায় ক্রেতা না থাকায় পশুর চামড়া রাস্তায় পড়ে নষ্ট হওয়ার খবরও পাওয়া গেছে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এবার ঢাকার বাইরে গরুর লবণযুক্ত কাঁচা চামড়ার দাম প্রতি বর্গফুট ৫৭ থেকে ৬২ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল। যা গত বছরের তুলনায় দুই টাকা বেশি। সেই হিসাবে একটি মাঝারি আকারের গরুর চামড়ার দাম অন্তত ১২০০ থেকে ১৫০০ টাকা হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে সেই চামড়া বিক্রি হচ্ছে মাত্র একশ থেকে তিনশ টাকায়। আর ছাগলের চামড়ার অবস্থা আরও করুণ ৫ থেকে ১০ টাকায় বিক্রি হওয়া তো দূরের কথা, অনেক জায়গায় বিনামূল্যেও কেউ নিতে চাইছে না।

ক্রেতা সংকটে মাদরাসা ও এতিমখানা

সাধারণ কোরবানিদাতাদের একটি বড় অংশ প্রতি বছরই সওয়াবের উদ্দেশ্যে স্থানীয় এতিমখানা ও মাদরাসায় চামড়া দান করেন। মাদরাসাগুলোর আয়ের অন্যতম বড় একটি উৎস এই চামড়া। কিন্তু এবারও দাম না থাকায় বিপাকে পড়েছে তারা।

স্থানীয় হাফিজিয়া মাদরাসার দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষক আব্দুর রহিম জাগো নিউজকে বলেন, মানুষ অনেক চামড়া দান করেছেন। কিন্তু বিকেল পর্যন্ত কোনো ক্রেতার দেখা মেলেনি। দু-একজন যারা এসেছেন, তারা এত কম দাম বলছেন যে লবণ কেনার খরচও উঠবে না। বাধ্য হয়ে নামমাত্র মূল্যে চামড়া ছেড়ে দিতে হয়েছে।

কেন এই দরপতন?

চামড়া খাতের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য, ট্যানারি মালিকদের পক্ষ থেকে মাঠপর্যায়ে সরাসরি চামড়া না কেনা এবং লবণের বাড়তি দামের কারণেই এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হচ্ছে। তবে আড়তদারদের দাবি, ঢাকার ট্যানারি মালিকরা আগের বকেয়া টাকা পরিশোধ করেননি এবং মাঠপর্যায়ে তদারকি ও সরকারি মূল্য কার্যকর করার সুনির্দিষ্ট কোনো ব্যবস্থা না থাকায় প্রতি বছরই কোরবানির চামড়া নিয়ে এ ধরনের বিপর্যয় ঘটছে। এভাবে চলতে থাকলে দেশের অন্যতম প্রধান এই রপতানি খাতটি অচিরেই বড় ধরনের সংকটে পড়বে।

ব্যবসায়ীরা যা বলছেন

রংপুরে চামড়া কেনা-বেচার জন্য হাজীপাড়া চামড়াপট্টি বিখ্যাত। প্রতি বছর কোরবানির ঈদকে ঘিরে ব্যস্ত সময় পার করেন এখানকার ক্রেতা-বিক্রেতারা। তবে গত কয়েক বছরের মতো এবারও একই চিত্র। চামড়া কেনার ব্যাপারে ব্যবসায়ীদের তেমন আগ্রহ নেই। বেশিরভাগ ব্যবসায়ী গুদাম বন্ধ করে রেখেছেন।

প্রায় ১০-১২ জন ফড়িয়া এবং হাতেগোনা ৫/৬ ব্যবসায়ী ঈদের দিন চামড়া কিনেছেন। অথচ বছর দশেক আগেও এখানে শতাধিক ব্যবসায়ী চামড়া কিনতেন। ঈদ পরবর্তী সময়ে অন্তত সপ্তাহজুড়ে চলতো কর্মযজ্ঞ। এখন সেখানে ঈদের দ্বিতীয় দিনেই নেমে এসেছে সুনসান নীরবতা।

চামড়া ব্যবসায়ী আব্দুল মজিদ জাগো নিউজকে বলেন, আশা নিয়ে চামড়া কিনেছিলাম। কিন্তু বাজারে কোনো চাহিদা নেই। যে দামে কিনেছি, সেই দামে বিক্রি করলেও লোকসান হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে ব্যবসা টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।

পীরগাছা বাজারের আরেক ব্যবসায়ী রফিকুল ইসলাম বলেন, এমন অবস্থা আগে কখনো দেখিনি। ক্রেতা নেই, দাম নেই। চামড়া কিনে এখন গুদামে রেখে বসে আছি।

হাজীপাড়া চামড়াপট্টির ব্যবসায়ী মোখলেছুর রহমান জাগো নিউজকে জানান, ঈদের দিন বিভিন্ন মাদরাসা, এতিমখানা ও বাড়ি বাড়ি ঘুরে ১২০০ পিসের মতো চামড়া কিনেছি। যা ১০০ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ১২০০ টাকা পর্যন্ত। সবচেয়ে বড় গরু অর্থাৎ তিন লাখ টাকার ঊর্ধ্বে দামের গরুর চামড়া ১২০০ টাকা পর্যন্ত হয়েছে। মাঝারি ও ছোট সাইজের গরুর চামড়ার দাম ১০০ থেকে ৩০০ টাকা।

প্রবীণ ব্যবসায়ী রফিকুল ইসলাম বলেন, ট্যানারি ছাড়া স্থানীয়ভাবে চামড়া সংরক্ষণে বিকল্প কোনো উপায় নেই। এখন আমদানিও কম। লবণের দাম তো বেড়েই চলেছে। এত কিছুর মাঝেও ট্যানারি মালিকেরা সরকার থেকে ঋণ পাচ্ছে। কিন্তু আমাদের মতো ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা ঋণ সুবিধার বাইরে রয়েছে। আমাদের ঋণ দেওয়া হয় না। অথচ ট্যানারি মালিকেরা চামড়া ব্যবসার নামে ঋণ নিয়ে তা অন্য খাতে বিনিয়োগ করছে।

জিতু কবীর/এএইচ/এমএস

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow