ছেলের স্মৃতিতে বিনামূল্যে তৃষ্ণার্ত ট্রেনযাত্রীদের পানি পান করান মুন্নু শেখ

এক বোতল ঠান্ডা পানি- কারও কাছে হয়তো খুব সাধারণ একটি বিষয়। কিন্তু প্রচণ্ড গরমে দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়া একজন ট্রেনযাত্রীর কাছে সেটিই হয়ে উঠতে পারে পরম স্বস্তির নাম। আর সেই স্বস্তি বিনামূল্যে পৌঁছে দিচ্ছেন রাজবাড়ীর কালুখালী উপজেলার মুন্নু শেখ। কোনো প্রতিষ্ঠান, দাতা সংস্থা কিংবা প্রচারণার অংশ হিসেবে নয়; শুধু হারিয়ে যাওয়া ছেলের স্মৃতিকে বুকে ধারণ করে গত চার বছর ধরে তিনি ট্রেনযাত্রীদের হাতে তুলে দিচ্ছেন ঠান্ডা ও বিশুদ্ধ পানি। রাজবাড়ীর কালুখালী রেলস্টেশনের পাশেই একটি ছোট্ট চটপটির দোকান চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন মুন্নু শেখ। সংসারের একমাত্র আয়ের উৎস এ দোকান। তবুও প্রতিদিন দুপুরে ট্রেন চলাচলের সময় প্রায় দেড় থেকে দুই ঘণ্টা দোকান বন্ধ রেখে তিনি টিউবওয়েলের ঠান্ডা পানি খালি বোতলে ভরে ট্রেনের প্রতিটি বগিতে গিয়ে যাত্রীদের হাতে তুলে দেন। বিনিময়ে নেন না কোনো অর্থ। মানুষের মুখের হাসি আর আন্তরিক দোয়াকেই তিনি নিজের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি বলে মনে করেন। মুন্নু শেখের এই মানবিক উদ্যোগের পেছনে রয়েছে এক হৃদয়বিদারক গল্প! ২০১৭ সালে তার ১০ বছর বয়সী ছেলে সবুজ শেখ ব্লাড ক্যানসারে আক্রান্ত হয়। উন্নত চিকিৎসার জন্য প্রায় প্

ছেলের স্মৃতিতে বিনামূল্যে তৃষ্ণার্ত ট্রেনযাত্রীদের পানি পান করান মুন্নু শেখ
এক বোতল ঠান্ডা পানি- কারও কাছে হয়তো খুব সাধারণ একটি বিষয়। কিন্তু প্রচণ্ড গরমে দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়া একজন ট্রেনযাত্রীর কাছে সেটিই হয়ে উঠতে পারে পরম স্বস্তির নাম। আর সেই স্বস্তি বিনামূল্যে পৌঁছে দিচ্ছেন রাজবাড়ীর কালুখালী উপজেলার মুন্নু শেখ। কোনো প্রতিষ্ঠান, দাতা সংস্থা কিংবা প্রচারণার অংশ হিসেবে নয়; শুধু হারিয়ে যাওয়া ছেলের স্মৃতিকে বুকে ধারণ করে গত চার বছর ধরে তিনি ট্রেনযাত্রীদের হাতে তুলে দিচ্ছেন ঠান্ডা ও বিশুদ্ধ পানি। রাজবাড়ীর কালুখালী রেলস্টেশনের পাশেই একটি ছোট্ট চটপটির দোকান চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন মুন্নু শেখ। সংসারের একমাত্র আয়ের উৎস এ দোকান। তবুও প্রতিদিন দুপুরে ট্রেন চলাচলের সময় প্রায় দেড় থেকে দুই ঘণ্টা দোকান বন্ধ রেখে তিনি টিউবওয়েলের ঠান্ডা পানি খালি বোতলে ভরে ট্রেনের প্রতিটি বগিতে গিয়ে যাত্রীদের হাতে তুলে দেন। বিনিময়ে নেন না কোনো অর্থ। মানুষের মুখের হাসি আর আন্তরিক দোয়াকেই তিনি নিজের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি বলে মনে করেন। মুন্নু শেখের এই মানবিক উদ্যোগের পেছনে রয়েছে এক হৃদয়বিদারক গল্প! ২০১৭ সালে তার ১০ বছর বয়সী ছেলে সবুজ শেখ ব্লাড ক্যানসারে আক্রান্ত হয়। উন্নত চিকিৎসার জন্য প্রায় প্রতি সপ্তাহেই ছেলেকে নিয়ে ট্রেনে করে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যেতে হতো। কিন্তু চরম দারিদ্র্যের কারণে অনেক সময় ছেলের জন্য এক বোতল পানি কিনে দেওয়ার সামর্থ্যও ছিল না তার। শুধু নিজের সন্তানের কষ্টই নয়, একই ট্রেনে থাকা আরও অনেক যাত্রীকেও পানির জন্য কষ্ট করতে দেখেছেন তিনি। দীর্ঘ চিকিৎসার পরও ২০১৯ সালে মারা যায় সবুজ শেখ। সন্তানের মৃত্যুতে ভেঙে পড়লেও সেই শোককে মানবসেবায় রূপ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন মুন্নু শেখ। এরপর থেকেই তিনি প্রতিজ্ঞা করেন, জীবনে যতদিন সক্ষম থাকবেন, গরমের মৌসুমে ট্রেনে চলাচলকারী যাত্রীদের সাধ্য অনুযায়ী বিনামূল্যে পানি পান করাবেন। মঙ্গলবার (৭ জুলাই) দুপুরে রাজবাড়ীর কালুখালী রেলওয়ে স্টেশনে সরেজমিনে দেখা গেছে, স্টেশনের পাশেই ছোট্ট একটি চটপটির দোকান। দুপুর গড়াতেই দোকানের কাজ গুছিয়ে কয়েকটি খালি প্লাস্টিকের বোতল, দুটি বালতি ও পানির পাত্র নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েন মুন্নু শেখ। স্টেশনের টিউবওয়েল থেকে ঠান্ডা ও বিশুদ্ধ পানি সংগ্রহ করে বোতলগুলো একে একে ভর্তি করেন তিনি। এরপর রাজবাড়ী থেকে ট্রেন ছাড়ার খবর পেয়ে প্ল্যাটফর্মে অপেক্ষা করতে থাকেন। ট্রেনটি স্টেশনে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে হাতে পানিভর্তি বোতল নিয়ে দ্রুত এক বগি থেকে আরেক বগিতে ছুটে যান মুন্নু শেখ। জানালার পাশে বসা কিংবা দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা তৃষ্ণার্ত যাত্রীদের হাতে হাসিমুখে তুলে দেন এক বোতল ঠান্ডা পানি। কেউ পানি পান করে বোতল ফিরিয়ে দেন, আবার কেউ ধন্যবাদ জানিয়ে তার জন্য দোয়া করেন। প্রচণ্ড গরমে এই সামান্য পানিই অনেক যাত্রীর কাছে স্বস্তির পরশ হয়ে ওঠে। এ সময় মুন্নু শেখকে কোনো ধরনের ক্লান্তি বা বিরক্তি প্রকাশ করতে দেখা যায়নি। বরং প্রতিটি যাত্রীর হাতে পানি পৌঁছে দিতে তিনি আন্তরিকভাবে ছুটে বেড়াচ্ছিলেন। পানি বিতরণ শেষ হলে আবার বোতলগুলো সংগ্রহ করে নিজের দোকানে ফিরে যান।  স্থানীয়রা জানান, গরমের মৌসুমজুড়ে তিনি প্রায় প্রতিদিনই একইভাবে ট্রেনের যাত্রীদের বিনামূল্যে পানি পান করান। নিজের ব্যবসার কিছুটা ক্ষতি হলেও মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে পারাই তার কাছে সবচেয়ে বড় আনন্দ। এ বিষয়ে মুন্নু শেখ বলেন, আমার একটা ছেলে ছিল। ১০ বছর বয়সে ব্লাড ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়। তাকে নিয়ে প্রতি সপ্তাহে রাজশাহী মেডিকেল হাসপাতালে যেতাম। এমন অনেক দিন গেছে, ছেলেটার জন্য এক বোতল পানি কিনে দেওয়ার সামর্থ্যও আমার ছিল না। শুধু আমার ছেলে নয়, ট্রেনে অনেক যাত্রীকে পানির জন্য কষ্ট করতে দেখেছি। চিকিৎসার মধ্যেই আমার ছেলেটা মারা যায়। এরপর আমি আল্লাহর কাছে ওয়াদা করি, যতদিন বেঁচে থাকব, গরমের সময় ট্রেনের যাত্রীদের যতটা পারি বিনামূল্যে পানি খাওয়াব। তিনি আরও বলেন, আমার ছোট একটা চটপটির দোকান। দোকান দুই ঘণ্টা বন্ধ রাখলে আয় কমে যায়। তারপরও ট্রেন এলেই বালতি আর পানিভর্তি বোতল নিয়ে ছুটে যাই। মানুষকে পানি খাওয়ানোর পর যে মানসিক শান্তি পাই, সেটা দোকান খোলা রেখে যে আয় হয়, তার চেয়েও অনেক বড়। স্থানীয় বাসিন্দারা আরও জানান, বর্তমান সময়ে যখন অনেকেই নিজের স্বার্থ নিয়েই ব্যস্ত, তখন মুন্নু শেখ নিজের সীমিত সামর্থ্য দিয়েও প্রতিদিন মানুষের পাশে দাঁড়াচ্ছেন। কোনো প্রচার বা স্বীকৃতির প্রত্যাশা ছাড়াই তিনি যে মানবিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, তা সত্যিই অনুকরণীয়। কালুখালী উপজেলার পশ্চিম রতনদিয়া গ্রামের বাসিন্দা মুন্নু শেখের এই উদ্যোগ এখন অনেকের কাছেই অনুপ্রেরণার গল্প। হারিয়ে যাওয়া সন্তানের স্মৃতিকে বাঁচিয়ে রাখতে প্রতিদিন অসংখ্য অচেনা মানুষের তৃষ্ণা মেটাচ্ছেন তিনি। ব্যক্তিগত শোককে মানবসেবার শক্তিতে রূপ দিয়ে তিনি প্রমাণ করেছেন, ছোট ছোট উদ্যোগও সমাজে বড় পরিবর্তনের বার্তা দিতে পারে। একজন বাবার ব্যক্তিগত বেদনা কীভাবে শত শত মানুষের স্বস্তির কারণ হতে পারে- তারই জীবন্ত উদাহরণ মুন্নু শেখ। তার হাতে দেওয়া এক বোতল ঠান্ডা পানি শুধু তৃষ্ণাই মেটায় না, মানুষের প্রতি ভালোবাসা, সহমর্মিতা ও মানবিকতার এক অনন্য বার্তাও পৌঁছে দেয়। এ ব্যাপারে মুন্নু শেখের স্ত্রী শাহিদা বেগম বলেন, আমাদের সংসার ছোট একটি চটপটির দোকানের আয়ের ওপর নির্ভরশীল। প্রতিদিন দুই ঘণ্টার মতো দোকান বন্ধ রেখে তিনি ট্রেনের যাত্রীদের পানি পান করান, এতে কিছু আর্থিক ক্ষতি হলেও আমি কখনো তাকে বাধা দিই না। কারণ, এই কাজের সঙ্গে আমাদের ছেলে সবুজের স্মৃতি জড়িয়ে আছে। ছেলের চিকিৎসার সময় পানির জন্য যে কষ্ট আমরা করেছি, সেই কষ্ট যেন আর কাউকে না করতে হয়- এই চিন্তা থেকেই তিনি এই উদ্যোগ নিয়েছেন। মানুষের দোয়া, ভালোবাসা আর হাসিমুখ দেখে তিনিও মানসিক শান্তি পান। আমি চাই, আল্লাহ তাঁকে সুস্থ রাখুন এবং যতদিন সম্ভব এভাবেই মানুষের সেবা করার তৌফিক দান করুন। ৭৫ বছর বয়সী মো. হাসান আলী বলেন, বর্তমান সময়ে মানুষের মধ্যে এমন নিঃস্বার্থ সেবার মানসিকতা খুব কমই দেখা যায়। মুন্নু শেখ নিজের কষ্টের কথা ভুলে প্রতিদিন ট্রেনের যাত্রীদের বিনামূল্যে পানি পান করান। তাঁর এই উদ্যোগ সত্যিই প্রশংসনীয়। আল্লাহ যেন তাঁকে সুস্থ রাখেন এবং এই মানবিক কাজ চালিয়ে যাওয়ার তৌফিক দান করেন। কালাম বেপারী নামের স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন, মুন্নু শেখ কোনো প্রচারের জন্য নয়, মানুষের সেবার উদ্দেশ্যেই এই কাজ করে যাচ্ছেন। নিজের সীমিত সামর্থ্য দিয়েও প্রতিদিন ট্রেনের যাত্রীদের বিনামূল্যে পানি পান করান। তার এই মানবিক উদ্যোগ আমাদের সমাজের জন্য অনুকরণীয় এবং অন্যদেরও এমন ভালো কাজে এগিয়ে আসতে উৎসাহিত করবে। সুমন নামের এক স্থানীয় দোকানদার বলেন, প্রতিদিন নিজের চোখে দেখি, মুন্নু শেখ দোকান বন্ধ রেখে ট্রেনের যাত্রীদের পানি পান করাতে ছুটে যান। এতে তার ব্যবসার কিছুটা ক্ষতি হলেও তিনি কখনো বিরক্ত হন না। মানুষের প্রতি তার এই ভালোবাসা ও মানবিকতা সত্যিই প্রশংসার দাবি রাখে। জুয়েল সরদার নামের এক ব্যবসায়ী বলেন, মুন্নু শেখের এই উদ্যোগ সত্যিই ব্যতিক্রমী। বর্তমান সময়ে নিজের স্বার্থের বাইরে গিয়ে মানুষের জন্য কাজ করেন এমন মানুষ খুবই কম। তিনি যেভাবে প্রতিদিন ট্রেনের যাত্রীদের বিনামূল্যে পানি পান করাচ্ছেন, তা সমাজে মানবিকতার একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। কালুখালী জংশন রেলওয়ে স্টেশনের গেট কিপার মো. রবিউল আওয়াল বলেন, মুন্নু শেখ দীর্ঘদিন ধরে ট্রেনযাত্রীদের বিনামূল্যে পানি পান করাচ্ছেন। ছেলের ক্যান্সারের চিকিৎসার সময় দারিদ্র্যের কারণে এক বোতল পানিও কিনতে না পারার কষ্ট থেকেই তিনি এই উদ্যোগ নেন। এখন প্রতিদিন ট্রেনের সময় স্টেশন থেকে পানি সংগ্রহ করে যাত্রীদের হাতে তুলে দেন। প্রচণ্ড গরমে তার এই মানবিক উদ্যোগ অসংখ্য মানুষের দোয়া ও ভালোবাসা অর্জন করেছে। সমাজে এমন মানবিক কাজ সত্যিই অনুকরণীয়। কালুখালী জংশন রেলওয়ে স্টেশনের স্টেশন মাস্টার শিমুল কুমার বিশ্বাস বলেন, মুন্নুর বিনামূল্যে পানি বিতরণের উদ্যোগটি অত্যন্ত প্রশংসনীয়। বিশেষ করে স্বল্প স্টপেজের কারণে যেসব তৃষ্ণার্ত ও অসচ্ছল যাত্রী পানি পান করতে পারেন না, তাদের জন্য এটি বড় সহায়তা। তিনি যাত্রীসেবায় মানবিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। আমরা তার এই উদ্যোগকে স্বাগত জানাই। তিনি আরও বলেন, শাটল ট্রেন, মেইল ট্রেন এবং ঝাটিয়াপাড়া ট্রেনের যাত্রীদের বিনামূল্যে পানি পান করিয়ে জনসাধারণকে উপকৃত করছেন। বিশেষ করে তৃষ্ণার্ত, গরিব ও অসচ্ছল মানুষদের জন্য এটি অত্যন্ত উপকারী উদ্যোগ। অনেক যাত্রী স্টেশন থেকে বোতলজাত পানি কিনতে পারেন না, আবার অনেক ট্রেনের স্টপেজ সময়ও খুব কম থাকে। ফলে ট্রেন থেকে নেমে পানি পান করার সুযোগও অনেক সময় হয় না। এমন পরিস্থিতিতে তার এই মানবিক উদ্যোগ সত্যিই প্রশংসার দাবিদার।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow