জনপ্রিয় শেয়ারভিত্তিক আবাসনের স্বপ্নে আতঙ্ক ‘দ্বৈত কর’
ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন শহরে শেয়ারভিত্তিক আবাসন ব্যবস্থা দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। কয়েকজন মিলে ছোট ছোট বিনিয়োগের মাধ্যমে জমি কিনে নিজেদের জন্য আবাসন গড়ে তুলছেন। আবার অনেক ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত অর্থের অভাবে জমির মালিকরা আবাসন কোম্পানির সঙ্গে যৌথ উন্নয়ন চুক্তি (জয়েন্ট ভেঞ্চার) করে প্রকল্প বাস্তবায়ন করছেন। এতে মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত মানুষের নিজস্ব ফ্ল্যাটের স্বপ্ন পূরণের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। তবে সেই স্বপ্নে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের ‘ডুয়েল ট্যাক্স’ ব্যবস্থা। বাজেটে আবাসন কোম্পানির পাশাপাশি জমির মালিকদেরও করের আওতায় আনার প্রস্তাব করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, এতে আবাসন খাতে বিনিয়োগ কমতে পারে, নতুন প্রকল্প নিরুৎসাহিত হতে পারে এবং শেষ পর্যন্ত ফ্ল্যাটের দাম বাড়ার চাপ তৈরি হতে পারে। জমির মালিক ও আবাসন খাতের উদ্যোক্তারা বলছেন, মধ্যবিত্তের আবাসনের স্বপ্ন বাস্তবায়নে সরকারের উচিত এ প্রস্তাব পুনর্বিবেচনা করা। বাজেটে কী প্রস্তাব করা হয়েছে? প্রস্তাবিত বাজেটে জমির মালিকদের প্রাপ্ত ফ্ল্যাটের মূল্যমানের ওপর ১৫ শতাংশ কর আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে। বর্তমানে আবাসন কোম্পানি
ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন শহরে শেয়ারভিত্তিক আবাসন ব্যবস্থা দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। কয়েকজন মিলে ছোট ছোট বিনিয়োগের মাধ্যমে জমি কিনে নিজেদের জন্য আবাসন গড়ে তুলছেন। আবার অনেক ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত অর্থের অভাবে জমির মালিকরা আবাসন কোম্পানির সঙ্গে যৌথ উন্নয়ন চুক্তি (জয়েন্ট ভেঞ্চার) করে প্রকল্প বাস্তবায়ন করছেন। এতে মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত মানুষের নিজস্ব ফ্ল্যাটের স্বপ্ন পূরণের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
তবে সেই স্বপ্নে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের ‘ডুয়েল ট্যাক্স’ ব্যবস্থা। বাজেটে আবাসন কোম্পানির পাশাপাশি জমির মালিকদেরও করের আওতায় আনার প্রস্তাব করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, এতে আবাসন খাতে বিনিয়োগ কমতে পারে, নতুন প্রকল্প নিরুৎসাহিত হতে পারে এবং শেষ পর্যন্ত ফ্ল্যাটের দাম বাড়ার চাপ তৈরি হতে পারে।
জমির মালিক ও আবাসন খাতের উদ্যোক্তারা বলছেন, মধ্যবিত্তের আবাসনের স্বপ্ন বাস্তবায়নে সরকারের উচিত এ প্রস্তাব পুনর্বিবেচনা করা।
বাজেটে কী প্রস্তাব করা হয়েছে?
প্রস্তাবিত বাজেটে জমির মালিকদের প্রাপ্ত ফ্ল্যাটের মূল্যমানের ওপর ১৫ শতাংশ কর আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে। বর্তমানে আবাসন কোম্পানি ও জমির মালিকের মধ্যে যৌথ উন্নয়ন চুক্তির (জয়েন্ট ভেঞ্চার) সময় দেওয়া ‘সাইনিং মানি’র ওপর ১৫ শতাংশ কর পরিশোধ করতে হয়। তবে নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী, সাইনিং মানির পাশাপাশি চুক্তির আওতায় জমির মালিক যে ফ্ল্যাট পাবেন, সেগুলোর মূল্যমানের ওপরও অতিরিক্ত ১৫ শতাংশ কর দিতে হবে।
আবাসন ব্যবসায়ীদের মতে, এতে একই প্রকল্পে একাধিক স্তরে করের বোঝা তৈরি হবে, যা শেষ পর্যন্ত ফ্ল্যাট ক্রেতাদের ওপরই চাপিয়ে দেওয়া হবে।
জমির মালিকদের দুশ্চিন্তা
আবরার আহনাফ ও তার আরও নয়জন বন্ধু দীর্ঘ ছয় বছর ধরে সঞ্চয় করে রাজধানীর বনশ্রী এলাকায় পাঁচ কাঠা জমি কিনেছেন। এখন ব্যাংক ঋণের সহায়তায় সেখানে একটি আবাসন প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করছেন তারা। তবে, নতুন কর প্রস্তাব তাদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
আবরার বলেন, ‘অনেক কষ্ট করে আমরা জমিটি কিনেছি। এখন ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা করছি। কিন্তু নতুন করের প্রস্তাব আমাদের জন্য বড় ধরনের চাপ তৈরি করবে। আমাদের মধ্যে সবার আর্থিক সক্ষমতা এক নয়— কেউ চাকরিতে আছেন, কেউ বেকার। এমন অবস্থায় ব্যাংক ঋণ নিয়ে বাড়ি করতে চাইছি। এর ওপর অতিরিক্ত করের বোঝা এলে সেই স্বপ্ন অধরাই থেকে যেতে পারে।’
ফিকে হতে পারে সাইনিং মানির স্বপ্নও
একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানান আফতাবনগরের জমির মালিক মহিবুল ইসলাম। তিনিও কয়েকজন অংশীদারের সঙ্গে মিলে একটি জমি কিনেছেন এবং সেটি একটি আবাসন কোম্পানির কাছে উন্নয়নের জন্য দেওয়ার পরিকল্পনা করেছেন।
মহিবুল বলেন, ‘আমরা জমিটি একটি ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানের কাছে পাওয়ার অব অ্যাটর্নি দিয়েছি। চুক্তি অনুযায়ী কিছু সাইনিং মানি পাওয়ার কথা। কিন্তু নতুন কর কাঠামো কার্যকর হলে সেই সুবিধা অনেকটাই কমে যাবে। আমরা যে ফ্ল্যাটগুলো পাবো, সেগুলোর ওপরও কর দিতে হবে। ফলে প্রকল্পের আর্থিক হিসাব পুরোপুরি বদলে যাবে।’
তার মতে, ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানের ওপর কর থাকলেও জমির মালিকের ওপর আলাদা করারোপ করা হলে মধ্যবিত্তের আবাসনের স্বপ্ন পূরণ কঠিন হয়ে পড়বে।
‘প্রকৃত মূল্য নির্ধারণ করলে ডুয়েল ট্যাক্স লাগবে না’
মগবাজারের বেপারীগলির জমির মালিক রিপন আহমেদ মনে করেন, বিদ্যমান মৌজামূল্যের পরিবর্তে জমির প্রকৃত বাজারমূল্য নির্ধারণ করা হলে সরকারের রাজস্ব আয় আরও বাড়তে পারে।
তারমতে, ‘মৌজামূল্যের পরিবর্তে বাজারভিত্তিক প্রকৃত মূল্য নির্ধারণ করা হলে সরকার আরও বেশি রাজস্ব পাবে। সেক্ষেত্রে ডেভেলপমেন্টের সময় জমির মালিকের ওপর আলাদা কর আরোপের প্রয়োজন হবে না। এতে মধ্যবিত্তের ওপরও চাপ কমবে।’
আবাসন খাতকে ‘রাজস্ব আদায়ের মেশিন’ বানানো হচ্ছে?
আবাসন ব্যবসায়ী আবদুর রাজ্জাক বলেন, ‘জমির মালিকরা এই অতিরিক্ত ব্যয় ডেভেলপারদের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করবেন। ডেভেলপাররা তা প্রকল্প ব্যয়ের সঙ্গে সমন্বয় করবেন। শেষ পর্যন্ত এর পুরো প্রভাব পড়বে ফ্ল্যাট ক্রেতাদের ওপর। ফলে ফ্ল্যাটের দাম আরও বাড়বে এবং সাধারণ মানুষের জন্য নিজস্ব আবাসন কেনা কঠিন হয়ে উঠবে।’
তিনি বলেন, ‘সরকারের রাজস্ব আহরণ গুরুত্বপূর্ণ। তবে সেইসঙ্গে আবাসন খাতের স্বাভাবিক বিকাশ এবং সাধারণ মানুষের আবাসনের সুযোগও নিশ্চিত করতে হবে। তাই প্রস্তাবিত করনীতি পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন।’
এ বিষয়ে আবাসন ব্যবসায়ীদের সংগঠন রিহ্যাবের সভাপতি ড. আলী আফজাল বলেন, আবাসন খাত দেশের অন্যতম কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী খাত। অথচ নতুন কর প্রস্তাব দেখে মনে হচ্ছে এই খাতকে অতিরিক্ত রাজস্ব আদায়ের উৎস হিসেবে দেখা হচ্ছে।
আবাসন খাত কর্মসংস্থান সৃষ্টির অন্যতম বড় ক্ষেত্র। অথচ নতুন কর প্রস্তাবে এ খাতকে অতিরিক্ত রাজস্বের উৎস হিসেবে দেখা হচ্ছে।সাইনিং মানির পর জমির মালিকের প্রাপ্ত ফ্ল্যাটের মূল্যমানেও ১৫ শতাংশ করের প্রস্তাব আবাসন খাতে সংকট তৈরি করতে পারে।— রিহ্যাবের সভাপতি ড. আলী আফজাল
তিনি বলেন, ‘জমির মালিককে দেওয়া সাইনিং মানির ওপর এরই মধ্যে ১৫ শতাংশ কর দিতে হয়। এখন নতুন করে জমির মালিক যে ফ্ল্যাট পাবেন, সেগুলোর মূল্যমানের ওপরও ১৫ শতাংশ কর আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে। এটি আবাসন খাতে বড় ধরনের সংকট তৈরি করতে পারে।’
তার ভাষ্য, ২৪টি ফ্ল্যাটের একটি প্রকল্পে যদি জমির মালিক ১২টি ফ্ল্যাট পান এবং সেগুলোর মোট মূল্য ১২ কোটি টাকা হয়, তাহলে তাকে ১ কোটি ৮০ লাখ টাকা কর দিতে হবে। অর্থাৎ কর পরিশোধ করতে গিয়ে প্রায় দুটি ফ্ল্যাটের সমপরিমাণ অর্থ ব্যয় করতে হবে। এ প্রস্তাব বাতিল করা না হলে মধ্যবিত্তের স্বপ্নের আবাসন ফিকে হয়ে যেতে পারে।
ইএআর/এমএএইচ/
What's Your Reaction?



