জলবায়ুর অভিঘাতে বদলে যাচ্ছে বাংলাদেশ

অভিলাষ মাহমুদ বাংলাদেশ প্রকৃতিগতভাবেই নদীমাতৃক ও দুর্যোগপ্রবণ একটি দেশ। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এ দেশের মানুষ প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে টিকে আছে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব যে মাত্রায় দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে, তা শুধু পরিবেশ নয়, মানুষের জীবনযাত্রা, অর্থনীতি, কৃষি, স্বাস্থ্য এবং সামাজিক কাঠামোকেও গভীরভাবে প্রভাবিত করছে। জলবায়ুর অভিঘাতে বাংলাদেশ আজ এক নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি। একসময় ঋতুভিত্তিক আবহাওয়া ছিল বাংলাদেশের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরৎ, হেমন্ত, শীত ও বসন্তের স্বাভাবিক চক্র মানুষের জীবনকে প্রভাবিত করত। কিন্তু বর্তমানে সেই চিত্র দ্রুত বদলে যাচ্ছে। কখনো তীব্র তাপপ্রবাহ, কখনো অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাত, আবার কখনো দীর্ঘস্থায়ী খরা জনজীবনে নতুন সংকট সৃষ্টি করছে। ঋতুর স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য ক্রমেই অস্পষ্ট হয়ে পড়ছে। বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চল জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগীদের মধ্যে অন্যতম। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে উপকূলের বিস্তীর্ণ এলাকা লবণাক্ততার ঝুঁকিতে পড়েছে। কৃষিজমি হারাচ্ছে উর্বরতা, মিঠা পানির উৎস সংকুচিত হচ্ছে, আর জীবিকা হারিয়ে অনেক মানুষ বাধ্য হচ্ছে অন্

জলবায়ুর অভিঘাতে বদলে যাচ্ছে বাংলাদেশ

অভিলাষ মাহমুদ

বাংলাদেশ প্রকৃতিগতভাবেই নদীমাতৃক ও দুর্যোগপ্রবণ একটি দেশ। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এ দেশের মানুষ প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে টিকে আছে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব যে মাত্রায় দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে, তা শুধু পরিবেশ নয়, মানুষের জীবনযাত্রা, অর্থনীতি, কৃষি, স্বাস্থ্য এবং সামাজিক কাঠামোকেও গভীরভাবে প্রভাবিত করছে। জলবায়ুর অভিঘাতে বাংলাদেশ আজ এক নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি।

একসময় ঋতুভিত্তিক আবহাওয়া ছিল বাংলাদেশের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরৎ, হেমন্ত, শীত ও বসন্তের স্বাভাবিক চক্র মানুষের জীবনকে প্রভাবিত করত। কিন্তু বর্তমানে সেই চিত্র দ্রুত বদলে যাচ্ছে। কখনো তীব্র তাপপ্রবাহ, কখনো অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাত, আবার কখনো দীর্ঘস্থায়ী খরা জনজীবনে নতুন সংকট সৃষ্টি করছে। ঋতুর স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য ক্রমেই অস্পষ্ট হয়ে পড়ছে।

বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চল জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগীদের মধ্যে অন্যতম। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে উপকূলের বিস্তীর্ণ এলাকা লবণাক্ততার ঝুঁকিতে পড়েছে। কৃষিজমি হারাচ্ছে উর্বরতা, মিঠা পানির উৎস সংকুচিত হচ্ছে, আর জীবিকা হারিয়ে অনেক মানুষ বাধ্য হচ্ছে অন্যত্র চলে যেতে। ফলে জলবায়ুজনিত অভ্যন্তরীণ অভিবাসনের সংখ্যা বাড়ছে।

নদীভাঙনও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে আরও জটিল হয়ে উঠেছে। প্রতিবছর হাজার হাজার পরিবার বসতভিটা হারিয়ে নিঃস্ব হচ্ছে। একদিকে নদী গিলে খাচ্ছে জনপদ, অন্যদিকে নতুন চর জেগে উঠলেও সেখানে টেকসই বসতি গড়ে তোলা কঠিন হয়ে পড়ে। নদীভাঙনের ফলে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ থেকেও অনেক মানুষ বঞ্চিত হচ্ছে।

কৃষিখাত জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে সংবেদনশীল ক্ষেত্রগুলোর একটি। বাংলাদেশের অর্থনীতি ও খাদ্যনিরাপত্তার সঙ্গে কৃষি সরাসরি সম্পর্কিত। কিন্তু অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, অতিবৃষ্টি, খরা এবং ঘূর্ণিঝড় কৃষি উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। অনেক এলাকায় ধান, গম ও সবজির উৎপাদন কমে যাচ্ছে। কৃষকদের বাড়ছে উৎপাদন খরচ, কমছে লাভের পরিমাণ। ফলে গ্রামীণ অর্থনীতিও চাপের মুখে পড়ছে।

স্বাস্থ্য খাতেও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব স্পষ্ট। তীব্র গরমে হিটস্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ছে। আবার বন্যা ও জলাবদ্ধতার কারণে পানিবাহিত রোগের প্রকোপ বৃদ্ধি পাচ্ছে। ডেঙ্গুসহ মশাবাহিত রোগও নতুন নতুন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ভবিষ্যতে জনস্বাস্থ্য আরও বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে পারে।

জলবায়ুর প্রভাব শুধু গ্রামাঞ্চলে সীমাবদ্ধ নয়। শহরাঞ্চলেও এর অভিঘাত ক্রমশ দৃশ্যমান হচ্ছে। রাজধানী ঢাকাসহ বড় শহরগুলোতে তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে নগরজীবন কঠিন হয়ে উঠছে। অপরিকল্পিত নগরায়ন, সবুজের সংকোচন এবং জলাধার ভরাটের ফলে নগরাঞ্চল আরও বেশি ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে। অল্প বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে, যা নাগরিক দুর্ভোগ বাড়িয়ে দিচ্ছে।

তবে চ্যালেঞ্জের পাশাপাশি বাংলাদেশ অভিযোজনের ক্ষেত্রেও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রশংসা অর্জন করেছে। ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ, আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং জলবায়ু সহনশীল কৃষি প্রযুক্তির ব্যবহার ইতিবাচক পরিবর্তন এনেছে। জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলায় স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় শুধু সরকারি উদ্যোগই যথেষ্ট নয়। পরিবেশ সংরক্ষণ, বৃক্ষরোপণ, নদী ও জলাশয় রক্ষা, কার্বন নিঃসরণ কমানো এবং টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। একই সঙ্গে উন্নত দেশগুলোরও দায়িত্ব রয়েছে জলবায়ু সংকটে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর পাশে দাঁড়ানোর।

বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য সবচেয়ে কম দায়ী দেশগুলোর একটি হলেও এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি অনুভব করছে। তাই জলবায়ু পরিবর্তন আজ শুধু পরিবেশগত ইস্যু নয়, এটি উন্নয়ন, অর্থনীতি, মানবাধিকার এবং টিকে থাকার প্রশ্ন। প্রকৃতির সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বাসযোগ্য বাংলাদেশ রেখে যাওয়ার লক্ষ্যে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।

কেএসকে

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow