জলাতঙ্ক থেকে বাঁচতে যা করতে হবে

বাংলাদেশে জলাতঙ্কের প্রকোপ আগের তুলনায় অনেক কমেছে। তারপরও প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক মানুষ কুকুর, বিড়ালসহ বিভিন্ন প্রাণীর কামড় বা আঁচড়ের শিকার হন। সময়মতো চিকিৎসা না নেওয়ার কারণে এখনও প্রতিবছর কয়েক ডজন মানুষের মৃত্যু হচ্ছে এই প্রাণঘাতী রোগে। জলাতঙ্ক বা র‍্যাবিস একটি ভাইরাসজনিত রোগ, যা সাধারণত সংক্রমিত প্রাণীর লালার মাধ্যমে মানুষের শরীরে প্রবেশ করে। আগে কুকুরের কামড়কে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হিসেবে দেখা হলেও বর্তমানে বিড়ালের কামড় ও আঁচড় থেকেও সংক্রমণের ঘটনা বাড়ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভাইরাসটি একবার স্নায়ুতন্ত্রে ছড়িয়ে পড়ে লক্ষণ প্রকাশ শুরু করলে রোগীর জীবন বাঁচানো অত্যন্ত কঠিন হয়ে যায়। তবে আশার বিষয় হলো, দ্রুত ক্ষত পরিষ্কার করা, নির্ধারিত টিকা গ্রহণ এবং চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চললে জলাতঙ্ক প্রায় শতভাগ প্রতিরোধ করা সম্ভব। বছরে কত মানুষ ঝুঁকিতে পড়ছেন? জলাতঙ্ক মূলত আক্রান্ত প্রাণীর কামড়, আঁচড় বা লালার সংস্পর্শে ছড়ায়। যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র (সিডিসি) জানায়, সেখানে বাঁদুড়, স্কাঙ্ক, র‍্যাকুন ও শিয়ালের মধ্যে সবচেয়ে বেশি জলাতঙ্ক শনাক্ত হয়। সম্ভাব্য সংক্রমণের ঝুঁকিতে প্রতি বছর প্রায় এক লাখ

জলাতঙ্ক থেকে বাঁচতে যা করতে হবে

বাংলাদেশে জলাতঙ্কের প্রকোপ আগের তুলনায় অনেক কমেছে। তারপরও প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক মানুষ কুকুর, বিড়ালসহ বিভিন্ন প্রাণীর কামড় বা আঁচড়ের শিকার হন। সময়মতো চিকিৎসা না নেওয়ার কারণে এখনও প্রতিবছর কয়েক ডজন মানুষের মৃত্যু হচ্ছে এই প্রাণঘাতী রোগে।

জলাতঙ্ক বা র‍্যাবিস একটি ভাইরাসজনিত রোগ, যা সাধারণত সংক্রমিত প্রাণীর লালার মাধ্যমে মানুষের শরীরে প্রবেশ করে। আগে কুকুরের কামড়কে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হিসেবে দেখা হলেও বর্তমানে বিড়ালের কামড় ও আঁচড় থেকেও সংক্রমণের ঘটনা বাড়ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ভাইরাসটি একবার স্নায়ুতন্ত্রে ছড়িয়ে পড়ে লক্ষণ প্রকাশ শুরু করলে রোগীর জীবন বাঁচানো অত্যন্ত কঠিন হয়ে যায়। তবে আশার বিষয় হলো, দ্রুত ক্ষত পরিষ্কার করা, নির্ধারিত টিকা গ্রহণ এবং চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চললে জলাতঙ্ক প্রায় শতভাগ প্রতিরোধ করা সম্ভব।

বছরে কত মানুষ ঝুঁকিতে পড়ছেন?

জলাতঙ্ক মূলত আক্রান্ত প্রাণীর কামড়, আঁচড় বা লালার সংস্পর্শে ছড়ায়। যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র (সিডিসি) জানায়, সেখানে বাঁদুড়, স্কাঙ্ক, র‍্যাকুন ও শিয়ালের মধ্যে সবচেয়ে বেশি জলাতঙ্ক শনাক্ত হয়। সম্ভাব্য সংক্রমণের ঝুঁকিতে প্রতি বছর প্রায় এক লাখ মানুষ সেখানে প্রতিরোধমূলক টিকা গ্রহণ করেন। বাংলাদেশের পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে জলাতঙ্ক সংক্রমণের প্রধান উৎস কুকুর ও বিড়াল। এছাড়া বেজি ও শিয়ালের মাধ্যমেও এই রোগ ছড়াতে পারে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কমিউনিকেবল ডিজিজ কন্ট্রোল (সিডিসি) বিভাগের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. হালিমুর রশিদের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর দেশে প্রায় ৭ থেকে ৮ লাখ মানুষ প্রাণীর কামড়ের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ ক্ষেত্রে দায়ী ছিল বিড়াল, আর ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ ক্ষেত্রে কুকুর। তার মতে, বর্তমানে অনেক পরিবারে বিড়াল পালন করা হয় বলেই বিড়ালের কামড়ের ঘটনা তুলনামূলক বেশি দেখা যাচ্ছে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, বাংলাদেশে কুকুর ও বিড়ালের নাম বেশি শোনা গেলেও বাস্তবে যেকোনো জলাতঙ্ক আক্রান্ত স্তন্যপায়ী প্রাণীর মাধ্যমে এই রোগ ছড়াতে পারে।

কেন এত ভয়ংকর জলাতঙ্ক?

বাংলাদেশে একসময় বছরে প্রায় দুই হাজার মানুষ জলাতঙ্কে আক্রান্ত হতেন। বর্তমানে সেই সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে প্রায় ৫০ জনে নেমে এসেছে। টিকাদান কর্মসূচি সম্প্রসারণের ফলে এই অগ্রগতি সম্ভব হয়েছে।

তবে রোগটির সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো-লক্ষণ প্রকাশের পর চিকিৎসার কার্যকারিতা প্রায় নেই বললেই চলে। সংক্রমিত প্রাণীর কামড় বা আঁচড়ের মাধ্যমে ভাইরাস শরীরে প্রবেশ করে ধীরে ধীরে স্নায়ুতন্ত্রের মাধ্যমে মস্তিষ্কে পৌঁছে যায়। এ প্রক্রিয়াটি কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক মাস পর্যন্ত সময় নিতে পারে। এই সময়কে ইনকিউবেশন পিরিয়ড বলা হয়। এ সময় সাধারণত আক্রান্ত ব্যক্তি কোনো উপসর্গ অনুভব করেন না। কিন্তু একবার লক্ষণ দেখা দিলে পরিস্থিতি দ্রুত জটিল হয়ে ওঠে।

আরও পড়ুন:

জলাতঙ্কের লক্ষণ কী?

রোগের শুরুতে সাধারণ ফ্লুর মতো কিছু উপসর্গ দেখা দিতে পারে। যেমন- জ্বর, মাথাব্যথা, দুর্বলতা বা অবসাদ, শরীরে অস্বস্তি, কামড়ের স্থানে ব্যথা, ঝিনঝিনি বা চুলকানি।

পরবর্তী পর্যায়ে রোগটি মস্তিষ্কে প্রভাব ফেলতে শুরু করে। তখন দেখা দিতে পারে- উদ্বেগ ও অস্থিরতা, আচরণগত পরিবর্তন, বিভ্রান্তি, হ্যালুসিনেশন, অতিরিক্ত লালা নিঃসরণ, খিঁচুনি ও পক্ষাঘাত।

অনেক রোগীর ক্ষেত্রে পানির প্রতি অস্বাভাবিক ভয় (হাইড্রোফোবিয়া) তৈরি হয়। তৃষ্ণা থাকা সত্ত্বেও তারা পানি পান করতে পারেন না। কারও কারও মধ্যে বাতাসের প্রতিও ভয় দেখা দেয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব লক্ষণ দেখা দেওয়া মানে ভাইরাস ইতোমধ্যে মস্তিষ্কে গুরুতর প্রদাহ সৃষ্টি করেছে। এ অবস্থায় রোগীর বেঁচে থাকার সম্ভাবনা অত্যন্ত কম।

প্রাণী কামড়ালে কী করবেন?

জলাতঙ্ক প্রতিরোধে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া। প্রাণীর কামড় বা আঁচড়ের পর অবহেলা না করে যত দ্রুত সম্ভব চিকিৎসা নিতে হবে। প্রাথমিকভাবে যা করবেন-

  • ক্ষতস্থান সঙ্গে সঙ্গে সাবান ও প্রবাহমান পানি দিয়ে কমপক্ষে ১৫ মিনিট ধুয়ে ফেলুন।
  • সম্ভব হলে অ্যান্টিসেপটিক ব্যবহার করুন।
  • ক্ষতস্থান কাপড় বা ময়লা দিয়ে ঢেকে রাখবেন না।
  • যত দ্রুত সম্ভব নিকটস্থ হাসপাতাল বা চিকিৎসকের কাছে যান।

বিশেষজ্ঞদের মতে, চিকিৎসা নিতে দেরি হওয়ার আশঙ্কা থাকলে হেল্পলাইন বা চিকিৎসকের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করাও উপকারী হতে পারে।

পোস্ট-এক্সপোজার প্রফিল্যাক্সিস (পিইপি) কী?

কোনো ব্যক্তি জলাতঙ্কে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকলে তাকে পোস্ট-এক্সপোজার প্রফিল্যাক্সিস (পিইপি) দেওয়া হয়। এতে সাধারণত অন্তর্ভুক্ত থাকে ক্ষতস্থান ভালোভাবে পরিষ্কার করা, প্রয়োজন হলে হিউম্যান র‍্যাবিস ইমিউনোগ্লোবিউলিন প্রয়োগ ও নির্ধারিত ডোজ অনুযায়ী র‍্যাবিস টিকা গ্রহণ। সম্ভাব্য সংক্রমণের পর যত দ্রুত এই চিকিৎসা শুরু করা যায়, রোগ প্রতিরোধের সম্ভাবনা তত বেশি থাকে। সঠিকভাবে সম্পূর্ণ টিকা গ্রহণ করলে জলাতঙ্ক প্রায় শতভাগ প্রতিরোধ করা সম্ভব। তবে অনেকেই প্রাথমিক চিকিৎসা নেওয়ার পর টিকার পুরো কোর্স সম্পন্ন করেন না, যা বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করে।

সব কামড়ের পর কি টিকা নিতে হবে?

বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো প্রাণী কামড়ালেই ঝুঁকিকে হালকাভাবে নেওয়া উচিত নয়। প্রাণীটি আগে টিকা পেয়েছে কি না বা সে জলাতঙ্কে আক্রান্ত কি না-এসব তথ্য অনেক সময় নিশ্চিতভাবে জানা যায় না।

বিশেষ করে যদি প্রাণীটি পালিয়ে যায় বা পর্যবেক্ষণে রাখা সম্ভব না হয়, তাহলে ঝুঁকি বিবেচনায় চিকিৎসক সাধারণত টিকা নেওয়ার পরামর্শ দেন। কারণ ভাইরাস শরীরে প্রবেশ করার পর সেটি শনাক্ত হওয়ার অপেক্ষা করলে অনেক সময় দেরি হয়ে যেতে পারে। আর লক্ষণ দেখা দিলে চিকিৎসার সুযোগ প্রায় শেষ হয়ে যায়।

কীভাবে জলাতঙ্ক প্রতিরোধ করা যায়?

  • পোষা কুকুর ও বিড়ালকে নিয়মিত টিকা দেওয়া
  • রাস্তার প্রাণী নিয়ন্ত্রণে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া
  • শিশুদের অপরিচিত প্রাণীর কাছ থেকে দূরে থাকতে শেখানো
  • প্রাণীকে উসকানি না দেওয়া
  • ঝুঁকিপূর্ণ পেশায় থাকা ব্যক্তিদের আগাম টিকা নেওয়া

পশুচিকিৎসক, প্রাণী উদ্ধারকর্মী বা নিয়মিত প্রাণীর সংস্পর্শে থাকা ব্যক্তিরা প্রয়োজন হলে প্রি-এক্সপোজার ভ্যাকসিন গ্রহণ করতে পারেন।

টিকার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আছে কি?

র‍্যাবিস টিকা সাধারণত নিরাপদ। তবে কিছু মানুষের ক্ষেত্রে সামান্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে। যেমন- ইনজেকশন দেওয়ার স্থানে ব্যথা, জ্বর, মাথাব্যথা ও
শরীরে অস্বস্তি। তবে এসব পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সাধারণত সাময়িক এবং জলাতঙ্কের মতো প্রাণঘাতী রোগ প্রতিরোধের তুলনায় খুবই সামান্য।

জলাতঙ্ক এমন একটি রোগ, যার লক্ষণ প্রকাশের পর বাঁচার সম্ভাবনা প্রায় নেই। কিন্তু সময়মতো চিকিৎসা ও টিকা গ্রহণ করলে এটি সম্পূর্ণভাবে প্রতিরোধ করা সম্ভব। তাই কুকুর, বিড়াল বা অন্য কোনো স্তন্যপায়ী প্রাণীর কামড় কিংবা আঁচড়কে কখনোই অবহেলা করা উচিত নয়। দ্রুত চিকিৎসা নেওয়াই হতে পারে জীবন বাঁচানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায়।

তথ্যসূত্র: বিবিসি

জেএস/

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow