‘জলাতঙ্কে আক্রান্ত’ কুকুর কি পানিতে নামতে পারে?

বাগেরহাটের হযরত খানজাহান আলী (রহ.) মাজারের দিঘিতে একটি কুকুর কুমিরের আক্রমণের শিকার হওয়ার পর তদন্ত কমিটি জানিয়েছে, প্রাণীটি জলাতঙ্কে আক্রান্ত ছিল এবং কেউ এটিকে ইচ্ছা করে পানিতে ফেলে দেয়নি। এখন প্রশ্ন উঠছে, জলাতঙ্কে আক্রান্ত প্রাণী কি এভাবে পানির কাছে গিয়ে বসে থাকতে পারে অথবা পানিতে নামতে পারে? ইউরোপিয়ান সোসাইটি ফর মেডিক্যাল অনকোলজির সদস্য তাজকিয়া ইসাবা শুক্রবার (১৭ এপ্রিল) এক ফেসবুক পোস্টে এই প্রশ্ন তুলে লিখেছেন, ‘জলাতঙ্কে আক্রান্ত কুকুর এভাবে পানিতে গিয়ে বসে থাকে- জীবনে এই প্রথম দেখলাম!’ তিনি লেখেন, ‘র‍্যাবিস ভাইরাস হলো একটি নিউরোট্রপিক ভাইরাস, অর্থাৎ এটি শুধুমাত্র স্নায়ুকোষের মাধ্যমেই চলাচল করে। কামড়ের স্থান থেকে ভাইরাসটি পেরিফেরাল নার্ভ হয়ে স্পাইনাল কর্ড এবং সবশেষে ব্রেইনে পৌঁছায়। ভাইরাসটি যখন ব্রেইনের নিচে ব্রেইনস্টেমে, স্পেশালি করে মেডুলা অবলংগাটায় পৌঁছায়, তখন এটি সেখানে থাকা ক্রেনিয়াল নার্ভের নিউক্লিয়াসগুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। এখানেই গ্লোসোফ্যারিঞ্জিয়াল এবং ভেগাস ক্রেনিয়াল নার্ভের কন্ট্রোল সেন্টার থাকে।’ ‘এই গ্লোসোফ্যারিঞ্জিয়াল এবং ভেগাস ক্রেনিয়াল নার্ভ দুটি আমাদের ফ্যারিংস এবং

‘জলাতঙ্কে আক্রান্ত’ কুকুর কি পানিতে নামতে পারে?

বাগেরহাটের হযরত খানজাহান আলী (রহ.) মাজারের দিঘিতে একটি কুকুর কুমিরের আক্রমণের শিকার হওয়ার পর তদন্ত কমিটি জানিয়েছে, প্রাণীটি জলাতঙ্কে আক্রান্ত ছিল এবং কেউ এটিকে ইচ্ছা করে পানিতে ফেলে দেয়নি। এখন প্রশ্ন উঠছে, জলাতঙ্কে আক্রান্ত প্রাণী কি এভাবে পানির কাছে গিয়ে বসে থাকতে পারে অথবা পানিতে নামতে পারে?

ইউরোপিয়ান সোসাইটি ফর মেডিক্যাল অনকোলজির সদস্য তাজকিয়া ইসাবা শুক্রবার (১৭ এপ্রিল) এক ফেসবুক পোস্টে এই প্রশ্ন তুলে লিখেছেন, ‘জলাতঙ্কে আক্রান্ত কুকুর এভাবে পানিতে গিয়ে বসে থাকে- জীবনে এই প্রথম দেখলাম!’

তিনি লেখেন, ‘র‍্যাবিস ভাইরাস হলো একটি নিউরোট্রপিক ভাইরাস, অর্থাৎ এটি শুধুমাত্র স্নায়ুকোষের মাধ্যমেই চলাচল করে। কামড়ের স্থান থেকে ভাইরাসটি পেরিফেরাল নার্ভ হয়ে স্পাইনাল কর্ড এবং সবশেষে ব্রেইনে পৌঁছায়। ভাইরাসটি যখন ব্রেইনের নিচে ব্রেইনস্টেমে, স্পেশালি করে মেডুলা অবলংগাটায় পৌঁছায়, তখন এটি সেখানে থাকা ক্রেনিয়াল নার্ভের নিউক্লিয়াসগুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। এখানেই গ্লোসোফ্যারিঞ্জিয়াল এবং ভেগাস ক্রেনিয়াল নার্ভের কন্ট্রোল সেন্টার থাকে।’

‘এই গ্লোসোফ্যারিঞ্জিয়াল এবং ভেগাস ক্রেনিয়াল নার্ভ দুটি আমাদের ফ্যারিংস এবং ল্যারিংসের পেশী সংকোচন ও প্রসারণ নিয়ন্ত্রণ করে। র‍্যাবিসের সংক্রমণে এই নার্ভগুলোর কার্যক্ষমতা নষ্ট হয় না, বরং এগুলো হাইপারসেনসিটিভ হয়ে পড়ে। স্বাভাবিক অবস্থায় আমরা যখন কিছু গিলি, তখন ব্রেইন পেশীগুলোকে স্ট্রং সিগনাল পাঠায়। কিন্তু জলাতঙ্কে আক্রান্ত রোগীর ক্ষেত্রে যখনই তরল পদার্থ গলার কাছে আসে, তখন অতি-সংবেদনশীল নার্ভগুলো তীব্র সংকেত পাঠায়। ব্রেইন এর প্রতিক্রিয়ায় গলার মাসলগুলোকে প্রচণ্ড জোরে সংকুচিত করার নির্দেশ দেয়। এটা এতটাই তীব্র হয় যে শ্বাসপ্রশ্বাস সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যেতে পারে এবং প্রাণী দমবন্ধ হওয়ার মতো যন্ত্রণাদায়ক অনুভূতি পায়। একে Exaggerated Protective Reflex বলে।’

‘এজন্য পানি বা কোনো লিকুইড পান করতে গেলে প্রচণ্ড ব্যথা হওয়ায় মস্তিষ্কের লিম্বিক সিস্টেম, যা আমাদের ভয় ও আবেগ নিয়ন্ত্রণ করে, সেটা পানির উদ্দীপনাকে একটি “বিপদ” হিসেবে চিহ্নিত করে ফেলে। এর ফলে একটি “শর্ট-সার্কিট” তৈরি হয়। তখন কেবল চোখে দেখলে, পানির কাছাকাছি গেলে বা পানির শব্দ সরাসরি র‍্যাবিস আক্রান্ত প্রাণীর ব্রেইনস্টেমের সেই অতি-সংবেদনশীল স্নায়ুগুলোকে উত্তেজিত করে দেয়। এজন্য র‍্যাবিস আক্রান্ত প্রাণী পানি বা কোনো লিকুইড পান তো দূর, পানির কাছাকাছিই যাবে না।’

গবেষণা কী বলছে?

আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গবেষণায় দাবি করা হচ্ছে, জলাতঙ্কে আক্রান্ত কুকুর সাধারণত পানিতে যেতে চায় না বা পানি দেখে আতঙ্কিত হয়, যাকে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় হাইড্রোফোবিয়া বলা হয়।

স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা বিষয়ক সংবাদভিত্তিক ওয়েবসাইট মেডিকেল টুডের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, জলাতঙ্কে আক্রান্তদের পানি সম্পর্কে তীব্র ভয় থাকে। যে কারণে তারা পানির সংস্পর্শ থেকে দূরে থাকতে পারেন।

বিখ্যাত জার্নাল ও বিশ্বখ্যাত কয়েকটি স্বাস্থ্য সংস্থার গবেষণা থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে নিচে এর বিস্তারিত কারণ দেওয়া হলো—

গলার তীব্র খিঁচুনি : এনসিবিআই-তে প্রকাশিত গবেষণা অনুসারে, জলাতঙ্ক ভাইরাস মস্তিষ্কের সেই অংশকে ক্ষতিগ্রস্ত করে, যা গিলে ফেলা (Swallowing) এবং শ্বাস-প্রশ্বাস নিয়ন্ত্রণ করে। ফলে আক্রান্ত প্রাণী পানি পান করার চেষ্টা করলেই তার গলার পেশিতে প্রচণ্ড খিঁচুনি ও অসহ্য যন্ত্রণা শুরু হয়। পানির সংস্পর্শ বা এমনকি পানি পানের চিন্তা থেকেই এই যন্ত্রণাদায়ক খিঁচুনি শুরু হতে পারে, যা প্রাণীর মনে পানির প্রতি তীব্র ভীতি বা হাইড্রোফোবিয়া তৈরি করে (মেডিকেল নিউজ টুডে)।

মানুষ বনাম কুকুর : জার্নাল অব দ্য আমেরিকান মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন (জামা)-এর একটি নিবন্ধ অনুযায়ী, ‘হাইড্রোফোবিয়া’ বা পানি-ভীতির লক্ষণটি মানুষের ক্ষেত্রে যতটা স্পষ্ট, কুকুরের ক্ষেত্রে সবসময় ততটা তীব্র নাও হতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে আক্রান্ত কুকুর পানি পানের চেষ্টা করতে গিয়ে ব্যর্থ হয় এবং যন্ত্রণার কারণে পরবর্তীতে পানি এড়িয়ে চলে।

ভাইরাসের কৌশল : গবেষণায় দেখা গেছে, ভাইরাসটি চায় না যে আক্রান্ত প্রাণী পানি পান করুক। কারণ পানি পান করলে মুখ থেকে ভাইরাসযুক্ত লালা ধুয়ে পেটে চলে যাবে। পরিবর্তে ভাইরাসটি চায় লালা যেন মুখেই জমে থাকে (ফোমিং), যাতে কামড়ানোর সময় এটি অন্য শরীরে সহজে ছড়াতে পারে। এটি ভাইরাসের একটি বিবর্তনীয় কৌশল (পেনি পজ রিসার্চ)।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) তথ্য : WHO-এর ফ্যাক্ট শিট অনুযায়ী, ‘ফিউরিয়াস র‍্যাবিস’-এ আক্রান্ত প্রাণীদের প্রধান লক্ষণগুলোর একটি হলো হাইড্রোফোবিয়া।

সারসংক্ষেপ : জলাতঙ্কে আক্রান্ত প্রাণী শারীরিকভাবে পানিতে নামতে সক্ষম হলেও, পানি পানের চেষ্টা করলে যে তীব্র যন্ত্রণা হয়, তা থেকে বাঁচতে তারা পানি থেকে দূরে থাকে।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow