জলাধার পুনরুদ্ধার ও ‘ব্লু নেটওয়ার্ক’: টেকসই নগরের নতুন নকশা
সূচনাপ্রতি বর্ষায় কয়েক ঘণ্টার ভারী বৃষ্টিতেই রাজধানী ঢাকার প্রধান সড়ক, আবাসিক এলাকা, হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং ব্যবসাকেন্দ্র পানির নিচে তলিয়ে নাগরিক দুর্ভোগ যেন অবিচ্ছেদ্য বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাধারণভাবে এ সমস্যার জন্য অপর্যাপ্ত ড্রেনেজ, অতিবৃষ্টি কিংবা জলবায়ু পরিবর্তনকে দায়ী করা হলেও প্রকৃত চিত্র আরও গভীর। ঢাকার জলাবদ্ধতা মূলত একটি পরিকল্পনাগত সংকট। গত কয়েক দশকে নগরায়ণের চাপে রাজধানীর প্রাকৃতিক জলচক্র, অভ্যন্তরীণ খাল, জলাভূমি, বন্যাপ্রবাহ এলাকা এবং জলধারণক্ষম ভূপ্রকৃতি ধারাবাহিকভাবে ধ্বংস হয়েছে। ফলে বৃষ্টির পানি যে স্বাভাবিকভাবে মাটিতে প্রবেশ করত কিংবা খাল-নদী হয়ে বেরিয়ে যেত, সেই প্রাকৃতিক ব্যবস্থাই আজ প্রায় ভেঙে পড়েছে। ১. ঢাকা: এক সময় ছিল নদী ও খালের শহরবুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু ও শীতলক্ষ্যা নদীকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই নগরীর অভ্যন্তরে অসংখ্য খাল, বিল, জলাভূমি ও প্রাকৃতিক নিম্নাঞ্চল একটি বিস্তৃত জলপ্রবাহ ব্যবস্থা তৈরি করেছিল। বর্ষার পানি এসব খাল ও জলাভূমিতে সাময়িকভাবে সংরক্ষিত হতো, অতিরিক্ত পানি ধীরে ধীরে নদীতে নেমে যেত এবং উল্লেখযোগ্য অংশ মাটির নিচে প্রবেশ করে ভূগর্ভস্থ জলাধার
সূচনা
প্রতি বর্ষায় কয়েক ঘণ্টার ভারী বৃষ্টিতেই রাজধানী ঢাকার প্রধান সড়ক, আবাসিক এলাকা, হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং ব্যবসাকেন্দ্র পানির নিচে তলিয়ে নাগরিক দুর্ভোগ যেন অবিচ্ছেদ্য বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাধারণভাবে এ সমস্যার জন্য অপর্যাপ্ত ড্রেনেজ, অতিবৃষ্টি কিংবা জলবায়ু পরিবর্তনকে দায়ী করা হলেও প্রকৃত চিত্র আরও গভীর। ঢাকার জলাবদ্ধতা মূলত একটি পরিকল্পনাগত সংকট। গত কয়েক দশকে নগরায়ণের চাপে রাজধানীর প্রাকৃতিক জলচক্র, অভ্যন্তরীণ খাল, জলাভূমি, বন্যাপ্রবাহ এলাকা এবং জলধারণক্ষম ভূপ্রকৃতি ধারাবাহিকভাবে ধ্বংস হয়েছে। ফলে বৃষ্টির পানি যে স্বাভাবিকভাবে মাটিতে প্রবেশ করত কিংবা খাল-নদী হয়ে বেরিয়ে যেত, সেই প্রাকৃতিক ব্যবস্থাই আজ প্রায় ভেঙে পড়েছে।
১. ঢাকা: এক সময় ছিল নদী ও খালের শহর
বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু ও শীতলক্ষ্যা নদীকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই নগরীর অভ্যন্তরে অসংখ্য খাল, বিল, জলাভূমি ও প্রাকৃতিক নিম্নাঞ্চল একটি বিস্তৃত জলপ্রবাহ ব্যবস্থা তৈরি করেছিল। বর্ষার পানি এসব খাল ও জলাভূমিতে সাময়িকভাবে সংরক্ষিত হতো, অতিরিক্ত পানি ধীরে ধীরে নদীতে নেমে যেত এবং উল্লেখযোগ্য অংশ মাটির নিচে প্রবেশ করে ভূগর্ভস্থ জলাধার পুনরায় পূরণ করত। এই প্রাকৃতিক ব্যবস্থাই ছিল ঢাকার জলাবদ্ধতা নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে বড় অবকাঠামো, যা তৈরি করতে মানুষের কোনো ব্যয় হয়নি।
কিন্তু গত কয়েক দশকে অপরিকল্পিত নগরায়ণ, ভূমি ভরাট, দখল, অবৈধ নির্মাণ এবং দুর্বল প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনার ফলে এই জলপ্রবাহ ব্যবস্থা ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ে। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় ২০২০ সালে ঢাকা ওয়াসা থেকে ২৬টি খাল দুই সিটি করপোরেশনের কাছে হস্তান্তর করলেও বাস্তবে বহু খালের অস্তিত্ব ইতোমধ্যে বিলীন হয়ে গেছে। বিভিন্ন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী ঢাকায় ৬৯টিরও বেশি খালের অস্তিত্বের কথা উল্লেখ থাকলেও অনেক খাল মানচিত্রেই আর খুঁজে পাওয়া যায় না। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের গবেষণায় দেখা গেছে, গত তিন দশকে ঢাকা তার প্রায় ৮৫ শতাংশ জলাভূমি হারিয়েছে; একই সময়ে নির্মিত এলাকার পরিমাণ বেড়েছে প্রায় ৭৫ শতাংশ। অন্যদিকে রিভার অ্যান্ড ডেল্টা রিসার্চ সেন্টারের গবেষণা অনুযায়ী, গত প্রায় ৮০ বছরে ঢাকার প্রায় ১২০ কিলোমিটার খাল কার্যত হারিয়ে গেছে। এই পরিসংখ্যান শুধু পরিবেশগত ক্ষতির নয়; এটি নগরের প্রাকৃতিক নিষ্কাশন অবকাঠামো ধ্বংসেরও সরাসরি প্রমাণ।
২. জলাবদ্ধতার কারণসমূহ- প্রাকৃতিক জলচক্রের ব্যাঘাত ও অন্যান্য
বারিপাতের পানির একটি উল্লেখযোগ্য অংশ স্বাভাবিকভাবে মাটিতে অনুপ্রবেশ বা পরিস্রবণের মাধ্যমে ভূগর্ভস্থ জলাধারে সঞ্চিত হওয়ার কথা; অবশিষ্ট অংশ ভূপৃষ্ঠীয় প্রবাহ হিসেবে নালা, খাল, জলাধার ও নদীর দিকে প্রবাহিত হয়। ১৯৮৮ সালের বন্যার পর প্রণীত পরিকল্পনায় বলা হয়েছিল, বারিপাতের পানির প্রায় ৪০ শতাংশ মাটির নিচে প্রবেশ করবে এবং বাকি ৬০ শতাংশ ভূপৃষ্ঠীয় প্রবাহে পরিণত হবে। কিন্তু বর্তমানে নগরের অধিকাংশ ভূমি ভবন, রাস্তা, আঙিনা ও অন্যান্য অপরিবেশ্য পৃষ্ঠ দিয়ে ঢেকে ফেলা হয়েছে; উন্মুক্ত মাটি, সবুজ এলাকা ও পানি শোষণের উপযোগী স্থান ক্রমাগত কমে গেছে। ফলে ঢাকায় বারিপাতের পানির ৪০ শতাংশ মাটির নিচে প্রবেশ করার পূর্বধারণা এখন আর কার্যকর নয়। বাস্তবে এই হার ১৮ থেকে ২০ শতাংশ, কোনো কোনো এলাকায় আরও কম। বিপরীতে, ভূপৃষ্ঠীয় প্রবাহের পরিমাণ ৬০ শতাংশ থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ৮০ শতাংশ বা তারও বেশি হয়েছে। অর্থাৎ নগরের নিষ্কাশনব্যবস্থার ওপর একদিকে যেমন পরিকল্পিত ৬০ শতাংশ পৃষ্ঠপ্রবাহের চাপ রয়েছে, অন্যদিকে অপরিকল্পিত ভূমি আচ্ছাদনের কারণে অতিরিক্ত প্রায় ২০ শতাংশ পানির চাপ যুক্ত হয়েছে, যা বিদ্যমান অবকাঠামো ধারণ করার কথা কখনোই ছিল না।
বিশ্বের যেসব শহর তাদের নদী ও খাল ফিরিয়ে আনতে সফল হয়েছে, সেখানে শুধু সরকার একা কাজ করেনি; শহরের অধিবাসীদেরও সম্পৃক্ত করা হয়েছে। ঢাকার ক্ষেত্রেও খালকে শুধু প্রকৌশল অবকাঠামো হিসেবে না দেখে নাগরিক জীবনের অংশ হিসেবে ফিরিয়ে আনতে হবে।
ঢাকার আরেকটি মৌলিক সমস্যা হলো, নগরের ভূ-প্রাকৃতিক গঠন অনুযায়ী শহরের সড়ক ও নিষ্কাশন পরিকল্পনা করা হয়নি। ঢাকার মধ্যভাগ তুলনামূলকভাবে উঁচু এবং দুই পাশ ও উত্তরাংশ অপেক্ষাকৃত নিচু- অনেকটা কচ্ছপের পিঠের মতো। এই ভূ-গঠনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নগরের মধ্যভাগ তুলনামূলক উঁচু রেখে সড়ক ও নিষ্কাশনব্যবস্থা ধাপে ধাপে নিম্নাঞ্চলের দিকে নামানো উচিত ছিল। কিন্তু বর্তমানে বিভিন্ন সময় ও বিভিন্ন প্রকল্পে সড়ক উঁচু করার ফলে নগরজুড়ে অসামঞ্জস্যপূর্ণ উচ্চতার বিচ্ছিন্ন ব্লক তৈরি হয়েছে। এসব সড়ক অনেক ক্ষেত্রে ছোট ছোট বেষ্টনী বা পোল্ডারের মতো আচরণ করছে- ফলে পানি এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় প্রবাহিত হতে পারছে না। বিদ্যমান আড়াআড়ি নিষ্কাশন কাঠামোও (Cross-Drainage Structure) বাড়তি প্রবাহ বহন বা নিষ্কাশন করতে পারছে না।
কঠিন ও তরল বর্জ্যের অব্যবস্থাপনা ঢাকার নিষ্কাশন সংকট আরও জটিল করে তুলেছে। মানুষ নির্বিচারে খাল ও নালায় কঠিন বর্জ্য ফেলছে। একই সঙ্গে সিটি করপোরেশনগুলোও নগরে উৎপন্ন কঠিন বর্জ্যের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ, প্রায় ৪০ শতাংশ পর্যন্ত সংগ্রহ করতে পারে না। ফলে অসংগ্রহিত এই কঠিন বর্জ্যের বড় অংশ খাল, নালা, নিম্নাঞ্চল ও জলধারণ এলাকায় গিয়ে জমা হয়। প্লাস্টিকসহ বিভিন্ন কঠিন বর্জ্য নালা, পাইপ, খাল ও কালভার্টের প্রবাহপথ বন্ধ করে দেয়, ফলে নিষ্কাশনব্যবস্থার প্রকৃত ধারণক্ষমতা ও কার্যকারিতা দ্রুত কমে যাচ্ছে।
অন্যদিকে বর্তমানে রাজধানীতে ওয়াসার মাত্র ২০ শতাংশ এলাকায় পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা বিদ্যমান রয়েছে এবং প্রতিদিন তৈরি হওয়া ৬০০ মিলিয়ন লিটার পয়ঃবর্জ্যের মধ্যে মাত্র ১২০ মিলিয়ন লিটার পয়ঃবর্জ্য শোধন করতে পারে, বাকি ৪৮০ মিলিয়ন লিটার পয়ঃবর্জ্য নদী, খাল এবং জলাশয়ে পতিত হচ্ছে। ফলে খোলা নালা, খাল ও জলাশয়ে দুর্গন্ধযুক্ত, কালো ও দূষিত পানি জমে থাকে। এসব জলপথ মানুষের কাছে পরিবেশগত সম্পদ বা নগর রক্ষাকারী অবকাঠামোর পরিবর্তে অস্বাস্থ্যকর ও অনাকাঙ্ক্ষিত স্থানে পরিণত হয়েছে। পরিণামে এগুলো ভরাট করা, কঠিন বর্জ্য ফেলা অথবা সম্পূর্ণ বিলুপ্ত করার প্রতি সামাজিকভাবে এক ধরনের নীরব সমর্থন তৈরি হচ্ছে। যে খাল ও জলাধারগুলো শহরের পানি ধারণ ও নিষ্কাশনের জন্য অপরিহার্য, সেগুলোই মানুষের আগ্রহ ও রক্ষণাবেক্ষণের বাইরে চলে যাচ্ছে। সুতরাং এটা স্পষ্ট যে সিটি করপোরেশন- ওয়াসার মতো সরকারী প্রতিষ্ঠানসমূহও জলাধার, জলাভূমি, খাল ইত্যাদি দখল, দূষণ ও ভরাটে ভূমিকা রাখছে।
সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে বারিপাতের পানি ও পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার অনিয়ন্ত্রিত মিশ্রণে। এই দুই ব্যবস্থার উদ্দেশ্য, প্রবাহের প্রকৃতি ও পরিশোধনপ্রক্রিয়া সম্পূর্ণ আলাদা হওয়ার কথা থাকলেও, ঢাকার পূর্ণাঙ্গ পয়ঃনিষ্কাশন নেটওয়ার্ক দীর্ঘদিন ধরে গড়ে না ওঠায় পয়ঃবর্জ্যের একটি বড় অংশ বৃষ্টির পানি নিষ্কাশন নালায় প্রবেশ করছে। ফলে বারিপাতের পানির নিষ্কাশনব্যবস্থা কার্যত মিশ্র বারিপাতজনিত পানি ও পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার (Combined Storm-Sewer Drainage) পানিতে পরিণত হয়েছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বক্স কালভার্ট নির্মাণের প্রবণতা। এসব অবকাঠামো মাটির নিচে বা দৃষ্টির আড়ালে থাকায় ভেতরে কী পরিমাণ পলি ও বর্জ্য জমেছে, তা সহজে বোঝা যায় না। ফলে কাগজে-কলমে ধারণক্ষমতা থাকলেও বাস্তবে কালভার্ট প্রত্যাশিত পরিমাণ পানি বহন করতে পারে না, যা বিভিন্ন এলাকাকে অস্থায়ী জলাধারে পরিণত করার জন্য দায়ী।
৩. জলধারণ এলাকা হারিয়ে যাওয়ার প্রভাব
ঢাকা মহানগর উন্নয়ন পরিকল্পনার (১৯৯৫-২০১৫) কাঠামোগত পরিকল্পনায় (Structure Plan) শহরজুড়ে জলাধার ও জলধারণ এলাকা চিহ্নিত করা হয়েছিল। কিন্তু এসব এলাকা সংরক্ষণ, সীমানা নির্ধারণ ও আইনগত সুরক্ষা দেওয়ার দায়িত্ব রাজউক, ঢাকা ওয়াসা, জেলা প্রশাসন বা সিটি করপোরেশন- কোনো প্রতিষ্ঠানই কার্যকরভাবে গ্রহণ করেনি। ফলে দখল ও ভরাটের মাধ্যমে খাল এবং জলধারণ এলাকার বড় অংশ বিলুপ্ত হওয়ায় বারিপাতের পানি পূর্বনির্ধারিত পথে আর প্রবাহিত হতে পারছে না।
অন্যদিকে, ঢাকার পশ্চিমে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ নির্মাণের পর সূত্রাপুর থেকে গাবতলী পর্যন্ত বিস্তৃত এলাকার অধিকাংশ প্রাকৃতিক জলাধার পকেট বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। গাবতলীর সীমিত কিছু অংশ ছাড়া বহু এলাকা আর কার্যকর জলধারণ অঞ্চল হিসেবে কাজ করছে না। এই জলধারণ এলাকাগুলো না থাকায় বৃষ্টির পানি সরাসরি নদীতে বেরিয়ে যাওয়ার সুযোগ হারিয়েছে; ফলে পানি নগরের ভেতরেই জমে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি করছে। যেসব জলধারণ এলাকা এখনো আংশিকভাবে বিদ্যমান, সেগুলোর কার্যকারিতাও পাম্প স্টেশনের স্বল্পতা, পাম্পের অপর্যাপ্ত ধারণক্ষমতা এবং সংযোগব্যবস্থার বিচ্ছিন্নতার কারণে কমে গেছে। পাশাপাশি, দূষিত ও দুর্গন্ধযুক্ত খালকে কেন্দ্র করে কার্যকর জনসম্পৃক্ততা গড়ে তোলা কঠিন বিধায় তারা এসব জলাধার সংরক্ষণে আগ্রহী থাকে না। তাই দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ, ক্ষোভ ও অনাগ্রহের কারণে খাল উদ্ধার, জলাধার সংরক্ষণে জনসম্পৃক্ততার ক্ষেত্রে যে গভীর দুর্বলতা তৈরি হয়েছে, তা দূর না করে কোনো উদ্যোগই কার্যকর বা টেকসই করা সম্ভবপর নয়। এ কারণে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন ২০২১ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে পানি নিষ্কাশন অবকাঠামো নির্মাণে ২৬২ কোটি টাকারও বেশি ব্যয় করলেও কার্যত তা কোনো সুফল বয়ে আনছে না।
পাশাপাশি পানিপ্রবাহের যথোপযুক্ত বিকল্প না রেখেই বিভিন্ন ধরনের অবকাঠামো উন্নয়ন এবং সরকারি/বেসরকারি স্থাপনা নির্মাণের মাধ্যমে বিগত কয়েক দশক ধরে মহানগরীতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টির সর্বাঙ্গীন ক্ষেত্র প্রস্তুত করা হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের বনানী প্রান্তে যে অস্বাভাবিক জলজটের সৃষ্টি হচ্ছে তার অন্যতম কারণ রেললাইনের পার্শ্বস্থ বোরো পিট (Barrow Pit) হিসেবে খননকৃত পানিপ্রবাহের নালাসমূহের ভরাট। ওই সব নালার মাধ্যমে ওই অঞ্চলের বারিপাতজনিত পানি নিকুঞ্জ এলাকায় অবস্থিত জলাশয় হয়ে বিমানবন্দরের দক্ষিণ-পার্শ্বস্থ জলাধারে নিষ্কাশিত হতো। একইসাথে প্রধান সড়কের পূর্বপাশে নেভি হেডকোয়ার্টারের সামনে দিয়ে আরেকটি পানিপ্রবাহের নালার মাধ্যমে রেললাইনের পাশ দিয়ে খিলক্ষেতের নিম্নাঞ্চল হয়ে টঙ্গী খাল/ বালু নদীতে নিষ্কাশিত হতো। এভাবেই বিভিন্ন অবকাঠামো উন্নয়নসহ অপরাপর সামরিক/ বেসামরিক স্থাপনা নির্মাণের মধ্য দিয়ে পানিপ্রবাহের নেটওয়ার্কসমূহ দ্রুততম সময়ে ভরাটের মাধ্যমে রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে নতুন করে জলাবদ্ধতা তৈরির পথ সুগম করা হয়েছে।
চিত্রঃ ঢাকা মহানগর উন্নয়ন পরিকল্পনার (১৯৯৫-২০১৫) কাঠামোগত পরিকল্পনায় (Structure Plan) প্রস্তাবিত জলাধার ও জলধারণ এলাকা
৪. আন্তঃনীল সংযোগ (ব্লু নেটওয়ার্ক) প্রতিষ্ঠাঃ শহরের জলপ্রবাহের নতুন দর্শন
ঢাকার জলাবদ্ধতা নিরসনে এখন পর্যন্ত অধিকাংশ উদ্যোগ ছিল বিচ্ছিন্ন। কোথাও ড্রেন সম্প্রসারণ, কোথাও খাল খনন, কোথাও পাম্প বসানো, আবার কোথাও জলাশয় রক্ষার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু এসব উদ্যোগকে একটি সমন্বিত নগর জলব্যবস্থার অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়নি। ফলে একটি স্থানে সমস্যা সাময়িকভাবে কমলেও অন্যত্র নতুন সংকট তৈরি হয়েছে।
অন্যদিকে, আন্তঃনীল সংযোগ (ব্লু নেটওয়ার্ক) এমন একটি সমন্বিত জলপ্রবাহ ব্যবস্থা, যেখানে নদী, খাল, লেক, জলাভূমি, জলধারণ এলাকা, বারিপাতের পানি নিষ্কাশন নেটওয়ার্ক এবং নগরের উন্মুক্ত সবুজ অঞ্চল পরস্পর-সংযুক্ত ব্যবস্থার অংশ হিসেবে কাজ করে। অর্থাৎ বারিপাতের পানি যেখানে পড়ে, সেখান থেকে প্রাকৃতিক প্রবাহ ধরে শেষ পর্যন্ত নদীতে পৌঁছানো পর্যন্ত পুরো পথটিই পরিকল্পনার আওতায় আনা হয়। এ ধরনের ব্যবস্থা শুধু জলাবদ্ধতা কমায় না; এটি নগরের জীববৈচিত্র্য রক্ষা করে, ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণ নিশ্চিত করে, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে এবং জনসাধারণের জন্য নতুন উন্মুক্ত জলকেন্দ্রিক গণপরিসর সৃষ্টি করে।
ব্লু নেটওয়ার্ক প্রতিষ্ঠার জন্য প্রথমে ঢাকার সব নদী, খাল, লেক, জলাভূমি, জলধারণ এলাকা এবং ঐতিহাসিক জলপ্রবাহপথের একটি সমন্বিত ডিজিটাল ডাটাবেজ তৈরি করা প্রয়োজন। প্রতিটি খালের প্রস্থ, গভীরতা, প্রবাহ, পানির গুণমান, দখলের ধরন, সংযোগ, ক্যাচমেন্ট এবং আশপাশের ভূমি ব্যবহারের তথ্য একই ব্যবস্থায় সংরক্ষণ করতে হবে। পরে আধুনিক জরিপের মাধ্যমে ভূপ্রকৃতি ও বিদ্যমান অবস্থা নথিভুক্ত করে হাইড্রোলজিক্যাল ও হাইড্রোলিক মডেল তৈরি করতে হবে। এতে কতটুকু বারিপাতের কারণে কতটুকু পানি তৈরি হবে, কত দ্রুত প্রবাহিত হবে, কোন খাল কত পানি বহন করতে পারবে এবং কোথায় উপচে পড়ার ঝুঁকি আছে—তা আগেই নির্ণয় করা যাবে। তৃতীয় ধাপে ওয়াটারশেড (একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলে বৃষ্টির পানি কোথা থেকে কোন দিকে প্রবাহিত হবে, তার প্রাকৃতিক সীমানা) ও ক্যাচমেন্ট (কোনো নির্দিষ্ট খাল বা জলাশয়ে যে এলাকা থেকে পানি এসে জমা হয়) নির্ধারণ, জলধারণ এলাকার প্রয়োজনীয়তা মূল্যায়ন এবং খাল/ জলাধারগুলোর হারানো সংযোগ পুনঃস্থাপন করতে হবে। একই সঙ্গে দখল ব্যবস্থাপনা, দূষণ নিয়ন্ত্রণ, জনসম্পৃক্ততা, বাস্তবায়ন রোডম্যাপ এবং দীর্ঘমেয়াদি মনিটরিংকে একই কর্মসূচির অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে গণ্য করতে হবে।
ব্লু নেটওয়ার্ক পরিকল্পনার সঙ্গে সমন্বিতভাবে বিকেন্দ্রীকৃত বর্জ্যপানি শোধন ব্যবস্থা, পৃথক পয়ঃনিষ্কাশন নেটওয়ার্ক, স্থানীয় পর্যায়ে অন-সাইট ট্রিটমেন্ট, শিল্পবর্জ্যের কঠোর নিয়ন্ত্রণ এবং ক্যাচমেন্টভিত্তিক দূষণ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে। জলাবদ্ধতা ও দূষণ—দুটি সমস্যাকে একই সঙ্গে সমাধান না করলে পুনরুদ্ধার করা খাল/ জলাধারসমূহ অল্প সময়ের মধ্যে আবার দূষিত নর্দমায় পরিণত হবে।
ব্লু নেটওয়ার্ক পরিকল্পনা শুধু জলাবদ্ধতা নিরসনেই নয়, ঢাকার দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায়- যেমন অগ্নিকাণ্ড বা ভূমিকম্পের মতো জরুরি পরিস্থিতিতেও সহায়ক ভূমিকা রাখবে, পাশাপাশি নগর তাপীয় দ্বীপ (Urban Heat Island) প্রভাব প্রশমনেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে। প্রাকৃতিক ঢাল অনুসরণ করে নতুন ধরনের নালা (স্টর্ম ড্রেন), পানি ধারণ পুকুর, রিজার্ভার ও সড়ক বিভাজকে বায়ো-সোয়েলের মতো প্রকৃতিনির্ভর ব্যবস্থাও এই নেটওয়ার্কের অবিচ্ছেদ্য অংশ হওয়া উচিত।
ঢাকা শহরে ব্লু নেটওয়ার্ক প্রতিষ্ঠায় সবচেয়ে বড় বাধা প্রকৌশলগত নয়; বরং সামাজিক, প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক। বহু খালের ওপর বাড়ি, দোকান, মার্কেট, রাস্তা, এমনকি সরকারি স্থাপনাও গড়ে উঠেছে। এই বাস্তবতায় শুধু উচ্ছেদ অভিযান কোনো স্থায়ী সমাধান নয়; প্রয়োজন একটি সুস্পষ্ট অবৈধ দখল ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা, যেখানে বৈধ ও অবৈধ দখলের শ্রেণিবিন্যাস, সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব মূল্যায়ন, পুনর্বাসনের নীতিমালা, ক্ষতিপূরণের কাঠামো, ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন এবং ভবিষ্যৎ দখল প্রতিরোধের ব্যবস্থা থাকবে। লক্ষ্য হবে খালের ন্যূনতম প্রস্থ ও প্রবাহ পুনঃপ্রতিষ্ঠা, জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত স্থান সৃষ্টি এবং পুনরায় দখলের সুযোগ স্থায়ীভাবে বন্ধ করা।
৫. প্রয়োজন সমন্বিত প্রাতিষ্ঠানিক অংশগ্রহণ
দখল ও দূষণ বন্ধ করে জলাশয় এবং খাল পুনরুদ্ধারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানকে এই প্রক্রিয়ায় সংযুক্ত করে তাদের প্রত্যেকের কর্মকাণ্ড সুনির্দিষ্টকরণ ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। এক্ষেত্রে রাজউক, সিটি কপোরেশন, পরিবেশ ও জলবায়ু মন্ত্রণালয়, পানি উন্নয়ন বোর্ড, ঢাকা ওয়াসা, জেলা প্রশাসন, ভূমি মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার বিভাগ, সড়ক ও জনপথ বিভাগসহ অন্তত ১৫টিরও বেশি সংস্থার সমন্বিত ও সক্রিয় অংশগ্রহণ আবশ্যক। সরকারি সংস্থার পাশাপাশি বাস্থই, বিআইপি, আইইবি-র মতো পেশাজীবী সংগঠন এবং বাপা, বেলা, রিভার অ্যান্ড ডেল্টা রিসার্চ সেন্টারের (আরডিআরসি) মতো পরিবেশবিষয়ক বেসরকারি সংস্থাগুলোকেও কারিগরি সহযোগী হিসেবে যুক্ত করা প্রয়োজন- যাতে একটি প্রকৃত ‘অংশগ্রহণমূলক কাঠামোগত প্রশাসনিক বিন্যাস’ (Participatory Governance Framework) গড়ে ওঠে।
বিশ্বের যেসব শহর তাদের নদী ও খাল ফিরিয়ে আনতে সফল হয়েছে, সেখানে শুধু সরকার একা কাজ করেনি; শহরের অধিবাসীদেরও সম্পৃক্ত করা হয়েছে। ঢাকার ক্ষেত্রেও খালকে শুধু প্রকৌশল অবকাঠামো হিসেবে না দেখে নাগরিক জীবনের অংশ হিসেবে ফিরিয়ে আনতে হবে। প্রতিটি ওয়ার্ডে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের নিয়ে সচেতনতা দল, স্থানীয় নারীদের নিয়ে গৃহস্থালি দল, যুবকদের নিয়ে পরিচ্ছন্নতা দল এবং স্থানীয় মনিটরিং কমিটি গঠন করা যেতে পারে। খালের তীর হাঁটার পথ, উন্মুক্ত পার্ক, সাইকেল ট্র্যাক, পরিবেশ শিক্ষা ও সামাজিক কার্যক্রমের স্থান হিসেবে গড়ে তুললে মানুষ খালের সঙ্গে দৈনন্দিন সম্পর্ক গড়ে তুলবে। তখন মানুষই হবে খালের সবচেয়ে কার্যকর অভিভাবক।
পরিশেষ
ঢাকার জলাবদ্ধতা কোনো একদিনের সংকট নয়; এটি কয়েক দশকের অপরিকল্পিত নগরায়ণ, জলাশয় ভরাট, খাল দখল, বিচ্ছিন্ন অবকাঠামো উন্নয়ন এবং প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়ের অভাবের সম্মিলিত ফল। তাই এর সমাধানও বিচ্ছিন্ন প্রকল্পে সম্ভব নয়। যদি নদী, খাল ও জলাশয়কে নগরের অপরিহার্য অবকাঠামো হিসেবে বিবেচনা করে বিজ্ঞানভিত্তিক পরিকল্পনা, কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় এবং সক্রিয় জনসম্পৃক্ততার মাধ্যমে এগোনো যায়, তবে শুধু জলাবদ্ধতা নিয়ন্ত্রণ নয়- একটি নতুন আন্তঃনীল-সবুজ সংযোগযুক্ত সহনশীল ও মানবিক রাজধানী নির্মাণও সম্ভব। এটাই সময় নগর উন্নয়নকে প্রকৃতির সঙ্গে সংঘাতের নয়, বরং সহাবস্থানের ভিত্তিতে নতুন করে কল্পনা করার।
লেখক : স্থপতি নগরবিদ ও পরিবেশকর্মী।
এইচআর/এএসএম
What's Your Reaction?