জাতীয় বাজেট ২০২৬-২৭ : কওমি শিক্ষাধারার উন্নয়নে বরাদ্দ হোক

১. ভূমিকা কওমি মাদ্রাসা বাংলাদেশের শিক্ষা-সভ্যতার এক ঐতিহ্যবাহী ধারা। এটি কেবল একটি বিশেষ শিক্ষাব্যবস্থার নাম নয়, বরং ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষার এক অবিচ্ছেদ্য ভিত্তি। শতবর্ষী এই শিক্ষাব্যবস্থা সরকারি অনুদান ছাড়াই সম্পূর্ণ সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত দান ও সহযোগিতার ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হয়, যা বিশ্বব্যাপী এক বিরল দৃষ্টান্ত। অজপাড়াগাঁ থেকে শুরু করে শহর-বন্দর পর্যন্ত বিস্তৃত এই প্রতিষ্ঠানগুলো নিরক্ষরতা দূরীকরণ, চারিত্রিক ও নৈতিক উন্নয়ন, সামাজিক স্থিতিশীলতা রক্ষা, দ্বীনি শিক্ষা এবং ধর্মীয় চেতনা ও মূল্যবোধ সমুন্নত রাখতে অতন্দ্র প্রহরীর ভূমিকা পালন করে আসছে। আজকের নিবন্ধে কওমি শিক্ষাধারার অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবদান বিশ্লেষণপূর্বক আসন্ন জাতীয় বাজেটে এই খাতে যুক্তিসংগত বরাদ্দের পক্ষে সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনা তুলে ধরা হলো। ২. কওমি শিক্ষাব্যবস্থার বর্তমান চিত্র ২.১ পরিসংখ্যান মারকাযু দিরাসাতিল ইকতিসাদিল ইসলামি কর্তৃক পরিচালিত একটি গবেষণা ‘বাংলাদেশ কওমি মাদ্রাসা পরিসংখ্যান-২০২৫’ অনুযায়ী কওমি শিক্ষাব্যবস্থার সামগ্রিক চিত্র নিম্নরূপ: মোট শিক্ষার্থী ১৮,০২,০০০ জন (প্রায় ১৮ লাখ ২ হাজার)। ম

জাতীয় বাজেট ২০২৬-২৭ : কওমি শিক্ষাধারার উন্নয়নে বরাদ্দ হোক

১. ভূমিকা

কওমি মাদ্রাসা বাংলাদেশের শিক্ষা-সভ্যতার এক ঐতিহ্যবাহী ধারা। এটি কেবল একটি বিশেষ শিক্ষাব্যবস্থার নাম নয়, বরং ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষার এক অবিচ্ছেদ্য ভিত্তি। শতবর্ষী এই শিক্ষাব্যবস্থা সরকারি অনুদান ছাড়াই সম্পূর্ণ সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত দান ও সহযোগিতার ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হয়, যা বিশ্বব্যাপী এক বিরল দৃষ্টান্ত।

অজপাড়াগাঁ থেকে শুরু করে শহর-বন্দর পর্যন্ত বিস্তৃত এই প্রতিষ্ঠানগুলো নিরক্ষরতা দূরীকরণ, চারিত্রিক ও নৈতিক উন্নয়ন, সামাজিক স্থিতিশীলতা রক্ষা, দ্বীনি শিক্ষা এবং ধর্মীয় চেতনা ও মূল্যবোধ সমুন্নত রাখতে অতন্দ্র প্রহরীর ভূমিকা পালন করে আসছে। আজকের নিবন্ধে কওমি শিক্ষাধারার অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবদান বিশ্লেষণপূর্বক আসন্ন জাতীয় বাজেটে এই খাতে যুক্তিসংগত বরাদ্দের পক্ষে সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনা তুলে ধরা হলো।

২. কওমি শিক্ষাব্যবস্থার বর্তমান চিত্র

২.১ পরিসংখ্যান

মারকাযু দিরাসাতিল ইকতিসাদিল ইসলামি কর্তৃক পরিচালিত একটি গবেষণা ‘বাংলাদেশ কওমি মাদ্রাসা পরিসংখ্যান-২০২৫’ অনুযায়ী কওমি শিক্ষাব্যবস্থার সামগ্রিক চিত্র নিম্নরূপ:

মোট শিক্ষার্থী ১৮,০২,০০০ জন (প্রায় ১৮ লাখ ২ হাজার)। মোট মাদ্রাসা ৩৬,০০০টি (প্রায় ৩৬ হাজার)। বার্ষিক দাওরায়ে হাদিস সমাপ্তকারী শিক্ষার্থী প্রায় ৩০,০০০ জন। মাথাপিছু বার্ষিক ব্যয় ৫৪,০০০ টাকা। মোট বার্ষিক ব্যয় ৯৭.৩০৮ বিলিয়ন টাকা (৯,৭৩০ কোটি ৮০ লাখ টাকা)। জিডিপিতে অনুপাত (২৫-২৬ অর্থবছর) প্রায় ০.১৫৬%। জাতীয় বাজেটের (২০২৬/২৭ অর্থবছর) তুলনায় অনুপাত ১.০৪৬% (প্রায় ১.০৫%)।

উল্লেখ্য, এই পরিসংখ্যানে শুধু শিক্ষা বোর্ডগুলোর নিবন্ধিত মাদ্রাসার তথ্য অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। মসজিদ-ভিত্তিক মক্তব, বোর্ডের নিবন্ধনহীন মাদ্রাসা, নৈশ মাদ্রাসা, অন্ধ ও প্রতিবন্ধী মাদ্রাসা এবং অনলাইন মাদ্রাসার তথ্য এই পরিসংখ্যানে যোগ হয়নি। সুতরাং প্রকৃত চিত্র আরও ব্যাপক।

২.২ আইনি স্বীকৃতি

১৩ এপ্রিল ২০১৭ তারিখে তৎকালীন সরকার প্রথমবারের মতো দাওরায়ে হাদিস বা তাকমিলের সনদকে আরবি ও ইসলামিক স্টাডিজে মাস্টার্স ডিগ্রির সমমানের স্বীকৃতি দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে। পরবর্তীতে ৮ অক্টোবর ২০১৮ তারিখে উক্ত প্রজ্ঞাপনকে আইনে রূপান্তরিত করা হয়।

৩. জাতীয় অর্থনীতিতে কওমি শিক্ষার অবদান

৩.১ সরকারি অর্থায়নের বিকল্প ভূমিকা

কওমি মাদ্রাসা ব্যবস্থা সম্পূর্ণরূপে বেসরকারি অর্থায়নে পরিচালিত হলেও দেশের অর্থনীতিতে এর অবদান উল্লেখযোগ্য। মারকাযু দিরাসাতিল ইকতিসাদিল ইসলামির গবেষণা অনুযায়ী, বার্ষিক প্রায় ৯,৭৩০ কোটি টাকার এই বিশাল ব্যয়ভার কওমি মাদ্রাসাগুলো নিজস্বভাবে বহন করে সরকারের ওপর থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক চাপ লাঘব করছে। আসন্ন জাতীয় বাজেটের ১.০৫% সমপরিমাণ একটি শিক্ষাখাত রাষ্ট্রীয় সহায়তা ছাড়াই পরিচালিত হচ্ছে, এটি বাংলাদেশের শিক্ষা অর্থনীতির এক বিস্ময়কর বাস্তবতা।

৩.২ রেমিট্যান্সে কওমি শিক্ষার্থীদের অবদান

প্রতি বছর বিভিন্ন দেশে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক কোরআন প্রতিযোগিতায় কওমি শিক্ষার্থীরা বিজয়ী হয়ে কোটি কোটি টাকা রেমিট্যান্স দেশে নিয়ে আসছেন। এর বাইরে কওমি শিক্ষিত হাফেজ ও আলেমদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ প্রবাসে বিভিন্ন মসজিদ ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে কর্মরত রয়েছেন। কাতারে ২,৪০০ মসজিদে প্রায় ১,৩০০ ইমাম ও মুআজ্জিনের মাসিক রেমিট্যান্স প্রায় ২৫ কোটি টাকা। সংযুক্ত আরব আমিরাতে ৭০% মসজিদে বাংলাদেশি প্রায় ৩,৫০০ জনের মাসিক রেমিট্যান্স প্রায় ৭০ কোটি টাকা। বাহরাইনে ৮৫% মসজিদে বাংলাদেশি ৩০০-এর বেশি ইমাম-মুআজ্জিনের বেতন: ৪৫,০০০–১,০০,০০০+ টাকা। যুক্তরাজ্যে ২,০০০-এর বেশি ইমাম, খতিব ও মুআজ্জিনের মাসিক রেমিট্যান্স প্রায় ২০ কোটি টাকা (সূত্র: বিভিন্ন দৈনিক পত্রিকা)।
 
২০১৭ সালে দৈনিক কালের কণ্ঠের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিভিন্ন দেশে কর্মরত বাংলাদেশি আলেম ও ইমামরা প্রতি মাসে সম্মিলিতভাবে প্রায় ১৫০ কোটি টাকা রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছেন। ইউরোপ, আমেরিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের পাশাপাশি পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন অমুসলিম দেশ থেকেও মানসম্পন্ন ইমাম ও খতিবের চাহিদা ক্রমাগত বাড়ছে। এই রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের বিশাল অংশই কওমি মাদ্রাসায় শিক্ষিত; সরকারি কোনো সহায়তা না পেয়েও তারা দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে অবিরাম ভূমিকা রাখছেন।

৪. জাতীয় সমাজ জীবনে কওমি মাদ্রাসার অবদান

অর্থনৈতিক অবদানের পাশাপাশি সামাজিক, নৈতিক ও মানবিক বিকাশেও কওমি মাদ্রাসা ও এর আলেমগণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছেন। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে শুরু করে শহরাঞ্চল পর্যন্ত তারা ধর্মীয় শিক্ষা, নৈতিক চরিত্র গঠন, পারিবারিক ও সামাজিক বিরোধ নিষ্পত্তি, মানবিক মূল্যবোধের প্রচার এবং সামাজিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় নিরলসভাবে কাজ করছেন। সমাজে সততা, ন্যায়পরায়ণতা, পারস্পরিক সহমর্মিতা ও মানবকল্যাণের চেতনা জাগ্রত করার ক্ষেত্রে কওমি মাদ্রাসার অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

৪.১ দরিদ্র শিশুদের মাঝে শিক্ষার প্রসার

গ্রাম-গঞ্জ ও দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে কওমি মাদ্রাসার আলেমরা দীর্ঘদিন ধরে অগণিত প্রভাতি মক্তব প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনা করে আসছেন। এসব মক্তবের মাধ্যমে সমাজের এমন অসংখ্য শিশু প্রাথমিক শিক্ষার সুযোগ লাভ করছে, যাদের পক্ষে বিভিন্ন কারণে নিয়মিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অধ্যয়ন করা কঠিন। বিশেষত দরিদ্র, নিম্ন আয়ের ও শিক্ষাবঞ্চিত পরিবারের সন্তানদের কাছে এই মক্তবগুলো শিক্ষার প্রথম দ্বার হিসেবে কাজ করছে।

প্রভাতি মক্তবগুলোতে শিশুদের কুরআন তিলাওয়াত, মৌলিক দ্বীনি শিক্ষা, নৈতিক মূল্যবোধ এবং প্রাথমিক সাক্ষরতা শিক্ষা প্রদান করা হয়। ফলে তারা ছোটবেলা থেকেই শৃঙ্খলা, সততা, মানবিকতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার মতো গুণাবলির সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পায়। অনেক ক্ষেত্রে এসব মক্তব গ্রামীণ অঞ্চলের শিশুদের আনুষ্ঠানিক শিক্ষার প্রতি আগ্রহী করে তোলে।

৪.২ এতিম ও অসহায়দের আশ্রয় ও শিক্ষা

দেশের অধিকাংশ কওমি মাদ্রাসা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি এতিমখানাও পরিচালনা করে থাকে। সুবিধাবঞ্চিত, এতিম ও অসহায় শিশুদের আশ্রয় দেওয়ার পাশাপাশি তাদের সুশিক্ষায় শিক্ষিত করে জনসংখ্যাকে জনশক্তিতে রূপান্তরিত করার এই নিরলস প্রচেষ্টা রাষ্ট্রের একটি বড় সামাজিক দায়িত্ব পালনে সহায়তা করছে। শুধু খাদ্য, বস্ত্র ও বাসস্থানের ব্যবস্থা করাই নয়, এসব প্রতিষ্ঠানে এতিম শিশুদের নৈতিকতা, চরিত্র গঠন এবং কর্মমুখী জীবনের উপযোগী করে গড়ে তোলার প্রচেষ্টাও অব্যাহত থাকে। ফলে তারা সমাজের বোঝা না হয়ে বরং দেশের উৎপাদনশীল ও দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে আত্মপ্রকাশের সুযোগ পায়। এভাবে কওমি মাদ্রাসা ও এতিমখানাগুলো একদিকে মানবিক কল্যাণ সাধন করছে, অন্যদিকে সামাজিক নিরাপত্তা ও মানবসম্পদ উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে।

৪.৩ নৈতিকতার প্রসারে ভূমিকা

ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে শুরু করে সমাজের সকল অঙ্গনে নৈতিকতার প্রসারে কওমি মাদরাসা শিক্ষিত আলেমগণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। মসজিদের মিম্বর থেকে শুরু করে ওয়াজ, মাহফিল, নসিহত ও তারবিয়াতের মাধ্যমে তারা মানুষদের নৈতিক উন্নয়নে নিয়মিত অনুপ্রাণিত করে যাচ্ছেন। তাদের নিরলস প্রচেষ্টা ও ত্যাগের ফলে সমাজে সততা ও ন্যায়পরায়ণতার ভিত্তি সুদৃঢ় হচ্ছে, যা একটি আদর্শ সমাজ গঠনে অপরিহার্য।

৪.৪ বিশুদ্ধ ভাষা, সাহিত্য ও সাংবাদিকতায় অবদান

সভ্যতার বিনির্মাণ ও সমাজের উৎকর্ষে বিশুদ্ধ ভাষা ও সাহিত্য চর্চার বিকল্প নেই। রচনা, গবেষণা, প্রকাশনা ও সাংবাদিকতায় কওমি আলেমদের অবদান উল্লেখযোগ্য। এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে স্মরণীয় কয়েকজন আলেম-মনীষী হলেন মাওলানা শামসুল হক ফরিদপুরী, মাওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী, মাওলানা নূর মুহাম্মদ আজমী, মাওলানা আকরাম খাঁ, মাওলানা আব্দুর রহীম, মাওলানা মুহিউদ্দীন খান, মাওলানা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ, মাওলানা আবু তাহের মিসবাহ, মাওলানা আবুল ফাতাহ মুহাম্মদ ইয়াহইয়া, মাওলানা ইসহাক ওবায়দী এবং মাওলানা ইসহাক ফরিদী প্রমুখ।

ইসলামিক ফাউন্ডেশন ও বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত নানা গ্রন্থ ও সম্পাদনায় কওমি আলেমদের উল্লেখযোগ্য অংশগ্রহণ রয়েছে। বর্তমানে শতাধিক সাপ্তাহিক, পাক্ষিক ও মাসিক ইসলামি পত্রিকা কওমি আলেমদের সম্পাদনা ও পরিচালনায় প্রকাশিত হচ্ছে। দৈনিক কালবেলা, ইনকিলাব, আমার দেশ, নয়া দিগন্ত, যুগান্তর, কালেরকণ্ঠ, সময় টিভিসহ বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক ও অনলাইন গণমাধ্যমে কওমি আলেমদের সক্রিয় অংশগ্রহণ দৃশ্যমান। মাদানি গার্লস স্কুল, লন্ডন ইসলামিক স্কুল ও বার্মিংহাম জামিয়া ইসলামিয়ার মতো প্রতিষ্ঠানগুলো প্রবাসে বাংলাদেশি আলেমদের প্রতিষ্ঠিত এবং শিক্ষামানে চমকপ্রদ অগ্রগতি দেখাচ্ছে।

৪.৫ দুর্যোগ-ব্যবস্থাপনা ও মানবসেবা

জাতীয় যে কোনো দুর্যোগে কওমি মাদ্রাসা ও আলেমরা সবার আগে মানুষের পাশে দাঁড়ান। ২০২৪ সালের ভয়াবহ বন্যায় এই দৃশ্য বিশেষভাবে প্রতীয়মান হয়েছে। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত ফেনী, নোয়াখালী, কুমিল্লাসহ বিভিন্ন অঞ্চলে কওমি মাদ্রাসাগুলো আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে কাজ করেছে :

  • ফেনীর জামিয়া রশিদিয়া মাদ্রাসায় পাঁচ হাজারের বেশি মানুষ আশ্রয় নিয়েছিলেন; প্রতিদিন গড়ে ছয় হাজার মানুষের খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। পঞ্চাশটিরও বেশি হিন্দু পরিবার এই মাদ্রাসায় অবস্থান করেছেন।
  • ফেনী সদরের দারুল উলুম শর্শদি মাদ্রাসায় প্রতিদিন দুই বেলা দুই হাজার মানুষের খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
  • কুমিল্লার জামিয়া মাদানিয়া রওজাতুল উলুমে পাঁচশতাধিক মানুষ আশ্রয় নিয়েছিলেন।

আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশন, জাতীয় ওলামা মাশায়েখ আইম্মা পরিষদ, ফি সাবিলিল্লাহ ফাউন্ডেশন, তাকওয়া ফাউন্ডেশন, খিদমতে খালক ফাউন্ডেশন ও দাওয়াহ ফাউন্ডেশন বাংলাদেশসহ কওমি আলেমদের পরিচালিত বহু সংস্থা এই বন্যায় সক্রিয় ভূমিকা রেখেছে। একমাত্র আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশনে অনুদানের পরিমাণ ১০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে বলে সংবাদমাধ্যমে উঠে এসেছে (দৈনিক ইত্তেফাক: ৩০ আগস্ট ২০২৪)।

২০১৭ সালে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সেবায়ও আলেম সমাজ এগিয়ে এসেছিলেন। আর্থিক সহায়তা ও কায়িক শ্রম উভয়ভাবে তারা এই মানবিক সংকটে পাশে ছিলেন। প্রচারবিমুখতার কারণে এসব তথ্য মূলধারার মিডিয়ায় তেমন আসেনি।

৪.৬ টেকসই ও ন্যায়সংগত অর্থনীতি চর্চায় ভূমিকা

দেশে টেকসই, অংশগ্রহণমূলক, বৈষম্যহীন ও ইনসাফভিত্তিক অর্থনীতি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টায়ও কওমি আলেমগণ অগ্রণী ভূমিকা রাখছেন। আইএফএ কনসালটেন্সি এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য— এটি সম্পূর্ণরূপে কওমি আলেমদের দ্বারা গঠিত ও পরিচালিত। এর মাধ্যমে মানুষকে হালাল-হারামের হাতে-কলমে শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে। দেশের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে শরিয়াহ পরামর্শ সেবা প্রদান করা হচ্ছে এবং ইসলামি অর্থনীতি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে নিয়মিত গবেষণা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ জনবল গড়ে তোলা হচ্ছে।

৪.৭ খসড়া বিধি প্রণয়নে অবদান

সরকারি পর্যায়ে বিভিন্ন খসড়া বিধি প্রণয়ন ও নীতি-পরামর্শ প্রদানেও কওমি আলেমগণ কার্যকর ভূমিকা রেখেছেন। ২০২২ সালে ‘ইসলামি বীমা বিধিমালা (খসড়া)’ প্রণয়নে তাদের অবদান উল্লেখযোগ্য। সম্প্রতি জাতীয় জাকাত ব্যবস্থাপনা বিষয়ক সরকারি উচ্চতর কমিটিতেও কওমি উলামায়ে কেরাম যুক্ত হয়ে সরকারকে বিভিন্ন দিক নির্দেশনা ও পরামর্শ প্রদানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন।

৪.৮ গবেষণায় আলেম সমাজ

হাদিস, তাফসির, ফিকহ, উসূলে ফিকহ, ইসলামি অর্থনীতি, রাষ্ট্রনীতি, ইতিহাস ও দাওয়াহ বিষয়ে গবেষণামূলক বহু প্রতিষ্ঠান কওমি মাদ্রাসার অধীনে গড়ে উঠেছে। ‘সেন্টার ফর এথিক্যাল রিসার্চ অ্যান্ড থটস’ (সিইআরটি) এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। সম্প্রতি এই প্রতিষ্ঠানের অধীনে পাঠ্যপুস্তক-২০২৪-এর অসঙ্গতি বিষয়ে সাড়ে পাঁচশত পৃষ্ঠার একটি গবেষণাকর্ম তৈরি করে প্রাক্তন শিক্ষা উপদেষ্টার কাছে পেশ করা হয়েছে। সরকারের বিভিন্ন সংস্কার-সংক্রান্ত অর্ধ-ডজন গবেষণা প্রতিবেদনও জমা দেওয়া হয়েছে।

৫. বর্তমান বাজেটে মাদ্রাসা শিক্ষা বরাদ্দ: একটি পর্যালোচনা

২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে কারিগরি ও আলিয়া মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের জন্য ১২,৬৭৮ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছিল, যেখানে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এ খাতে বরাদ্দ ছিল ১১,৭৮৩ কোটি টাকা (বাংলাদেশ সরকার, অর্থ মন্ত্রণালয়। বাজেট বক্তব্য ২০২৫-২৬, পৃ. ২১-২২)। উক্ত বাজেট বক্তব্যে সরকারি মাদ্রাসা শিক্ষায় নিম্নোক্ত কার্যক্রমের তথ্য উঠে এসেছে:

  • ৪৯৩টি মাদ্রাসায় মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম স্থাপন
  • ইবতেদায়ী পর্যায়ে বৃত্তি প্রদান ও মাদ্রাসায় এমপিওভুক্তি বাবদ ৭২৮ কোটি টাকা বরাদ্দ
  • ১,১৩৫টি মাদ্রাসা ভবনের নির্মাণকাজ সম্পন্ন এবং ৫১৩টি বহুতল ভবনের কাজ চলমান
  • সারা দেশের ১,৫১৯টি মাদ্রাসায় এমপিওভুক্তি কার্যক্রম বাস্তবায়নাধীন

উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই সমুদয় বরাদ্দ ও কার্যক্রম আলিয়া মাদ্রাসা ব্যবস্থার জন্য প্রযোজ্য। কিন্তু কওমি মাদ্রাসাগুলো এর বাইরে থেকেও দেশের শিক্ষা, অর্থনীতি ও সমাজসেবায় বিরাট অবদান রাখলেও এখনও সরকারি বরাদ্দের আওতায় আসেনি। এই বৈষম্য নীতিগতভাবে পর্যালোচনার দাবি রাখে।

৬. জাতীয় বাজেটে কওমি শিক্ষাধারার জন্য নীতি-প্রস্তাব

কওমি মাদ্রাসার স্বকীয়তা, দ্বীনি শিক্ষার মূলনীতি ও প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা অক্ষুণ্ণ রেখে এই খাতে সরকারি সহায়তার সুযোগ তৈরি করা সম্ভব। নিচে আটটি সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব উপস্থাপন করা হলো।

প্রস্তাব ১: কওমি শিক্ষা কমিশন গঠন

কওমি মাদ্রাসার শিক্ষা উন্নয়নে যে কোনো সরকারি পদক্ষেপের পূর্বশর্ত হলো এই শিক্ষাব্যবস্থার প্রকৃতি ও চাহিদা সঠিকভাবে বোঝা। এ লক্ষ্যে কওমি শীর্ষ প্রবীণ ও তরুণ আলেমদের সমন্বয়ে একটি স্বাধীন ‘কওমি শিক্ষা কমিশন’ গঠন করা প্রয়োজন, যারা এই শিক্ষাব্যবস্থার স্বকীয়তা ও দ্বীনী শিক্ষার মান অক্ষুণ্ণ রেখে প্রয়োজনীয় সংস্কার ও উন্নয়নের রূপরেখা প্রস্তুত করবেন। সরকারের ভূমিকা হবে সহায়তাকারী হিসেবে, হস্তক্ষেপকারী হিসেবে নয়।

প্রস্তাব ২: আইটি সহায়তার মাধ্যমে রেমিট্যান্স বৃদ্ধি

বিদেশ থেকে এখনও সরকারি চ্যানেলে জাকাত সংগ্রহ করা যায় না। পূর্ণাঙ্গ দাওরায়ে হাদিস মাদ্রাসাগুলো বিদেশ থেকে যেনো জাকাত ও অন্যান্য অনুদান সহজে সংগ্রহ করতে পারেন, এ লক্ষ্যে ১০০টি পূর্ণাঙ্গ দাওরায়ে হাদিস মাদ্রাসাকে সরকারি উদ্যোগে আইটি সহায়তা ও ডিজিটাল পেমেন্ট ইনফ্রাস্ট্রাকচার সেবা প্রদান করা হোক। এর ফলে একদিকে বৈদেশিক রেমিট্যান্স বাড়বে, অন্যদিকে আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত হবে।

প্রস্তাব ৩: মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম স্থাপন

দাওরায়ে হাদিসপর্যন্ত পূর্ণাঙ্গ শিক্ষাক্রম পরিচালনাকারী এবং ১০০ বা তার বেশি শিক্ষার্থী রয়েছে এমন মাদ্রাসাগুলোয় মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম স্থাপন করা হোক। এই অর্থবছরেই অন্তত ১০০টি মাদ্রাসায় এ উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব। ইতিমধ্যে আলিয়া মাদ্রাসায় ৪৯৩টি মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম স্থাপন করা হয়েছে। কওমি মাদ্রাসায়ও একই মানদণ্ডে এটি প্রদান করা নীতিগতভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

প্রস্তাব ৪: উচ্চতর তাখাসসুস বিভাগে গবেষণা সহায়তা

৪০০টি কওমি মাদ্রাসায় ইফতা ও অন্যান্য ন্যূনতম দুই বছর মেয়াদি উচ্চতর তাখাসসুস বিভাগগুলোতে গবেষণা, রেফারেন্স গ্রন্থ ও একাডেমিক সামগ্রী সংগ্রহের জন্য প্রতিটি বিভাগে বার্ষিক ১ লাখ টাকা হারে বরাদ্দ প্রদান করা হোক। এতে মোট ব্যয় হবে ৪ কোটি টাকা, যা বাজেটের তুলনায় অত্যন্ত নগণ্য, কিন্তু গবেষণার মানোন্নয়নে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলবে।

প্রস্তাব ৫: কম্পিউটার ও তথ্যপ্রযুক্তি উন্নয়ন কর্মসূচি

দাওরায়ে হাদিস পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গ শিক্ষাক্রম পরিচালনাকারী ১০০টি কওমি মাদ্রাসায় তথ্যপ্রযুক্তি দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচির আওতায় প্রতিটি মাদ্রাসায় ১০টি করে কম্পিউটার স্থাপন ও সংশ্লিষ্ট প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ করা যায়। এই বিনিয়োগ কওমি শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তি-দক্ষ করে জাতীয় ডিজিটাল উন্নয়নে অংশীদার করবে।

প্রস্তাব ৬: গ্রামীণ মাদ্রাসায় খাদ্য সহায়তা কর্মসূচি

মফস্বল ও গ্রামীণ অঞ্চলের ১০,০০০ কওমি মাদ্রাসাকে বার্ষিক খাদ্য সহায়তা কর্মসূচির আওতায় প্রতিটি মাদ্রাসাকে বার্ষিক ১০০ বস্তা উন্নত মানের চাল সরবরাহ করার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হোক। এই কর্মসূচি একই সাথে দেশের দরিদ্র শিশুদের শিক্ষা ধরে রাখতে এবং ঝরে পড়া হ্রাস করতে সহায়ক হবে।

প্রস্তাব ৭: মেধাবৃত্তি কর্মসূচি

হাইআতুল উলয়া, বেফাক ও সরকার-স্বীকৃত অন্যান্য বোর্ডের পরীক্ষায় মেধাতালিকায় উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের জন্য বৃত্তির ব্যবস্থা করা হোক। এই বৃত্তির জন্য বাজেটে বরাদ্দ রাখা হলে মেধাবী শিক্ষার্থীদের মনোবল বাড়বে এবং শিক্ষার মান উন্নয়নে প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ তৈরি হবে। বিদ্যমান আলিয়া মাদ্রার বৃত্তি-কাঠামোর সাথে সামঞ্জস্য রেখে এটি প্রণয়ন করা সম্ভব।

প্রস্তাব ৮: বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য বৃত্তি

মক্কা, মদিনা, মিসরসহ বিশ্বের বিভিন্ন ইসলামি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে উচ্চশিক্ষা গ্রহণে আগ্রহী কওমি শিক্ষার্থীদের জন্য বাজেটে বৃত্তি বরাদ্দ রাখা হোক। বিদেশে শিক্ষিত আলেমরা দেশে ফিরে আরবি ভাষা, ইসলামী আইন, তুলনামূলক ফিকহ ও বৈশ্বিক ইসলামি চিন্তাধারায় উচ্চমানের অবদান রাখতে পারবেন এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করবেন।

৭. উপসংহার

সরকারের সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা ও সহযোগিতা থেকে বঞ্চিত থেকেও কওমি মাদ্রাসার আলেমর দেশের অর্থনীতি, শিক্ষা, নৈতিকতা ও মানবসেবায় অবিরাম অবদান রেখে চলেছেন। রাষ্ট্র যে শিক্ষাখাতে কোনো ব্যয় বহন করছে না, সেই খাত থেকেই লক্ষ লক্ষ শিক্ষার্থী বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের মাধ্যমে দেশীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে, হাজারো দরিদ্র শিশু শিক্ষার সুযোগ পাচ্ছে এবং সমাজের নৈতিক ভিত্তি মজবুত হচ্ছে। এই প্রেক্ষিতে কওমি শিক্ষাধারার জন্য জাতীয় বাজেটে বরাদ্দ রাখা কোনো অনুগ্রহ নয়, বরং এটি একটি ন্যায়সংগত রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব। আশা করা যায়, বাজেট-প্রণেতারা এই বিষয়টি গভীর মনোযোগের সাথে বিবেচনা করবেন এবং কওমি শিক্ষাব্যবস্থার স্বকীয়তা ও মর্যাদা সম্পূর্ণ অক্ষুণ্ণ রেখে এই শিক্ষাধারার উন্নয়নে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করবেন।

মুফতি আব্দুল্লাহ মাসুম: ইসলামি অর্থনীতি বিশ্লেষক ও শরিআহ কনসালটেন্ট

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow