জিয়াউর রহমান: অন্তহীন প্রেরণার বাতিঘর

আজ শোকাবহ ৩০ মে। এই দিনে জাতি হারিয়েছিল দক্ষিণ এশিয়ার বৃহৎ জনগোষ্ঠীর প্রাণপ্রিয় ক্ষণজন্মা এক মহান নেতাকে, যিনি তার সততা, মেধা, অক্লান্ত পরিশ্রম, বিচক্ষণ নেতৃত্বে বারংবার ক্রান্তিকালীন সময়ে বাঙালি জাতি ও সরলমনা জনগণকে দেখিয়েছেন পথের দিশা। মাত্র ৪৫ বছরের স্বল্পকালীন জীবনে অতি দ্রুত সময়ের ব্যবধানে তিনি তার অসাধারণ ব্যক্তিত্ব ও নেতৃত্বের গুনে নিজেকে দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এক ব্যতিক্রমধর্মী ও সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হন। তার নাতি দীর্ঘ জীবনের অসামান্য কীর্তি পর্যালোচনা করলে সকলকেই হতে হয় বিস্ময়ে বিস্মিত। জিয়াউর রহমান একজন সত্যিকারের দেশপ্রেমিক সৈনিক হিসেবে তার পেশাগত জীবনের শুরু থেকেই বীরত্বগাঁথা রচনা করতে শুরু করেন।  তরুণ ক্যাপ্টেন জিয়াউর রহমান ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধে খেমকারান সেক্টরে কোম্পানি কমান্ডার হিসেবে অসামান্য বীরত্ব ও নেতৃত্ব প্রদর্শন করেন, যার ফলে তার কোম্পানি সর্বোচ্চ সংখ্যক সামরিক পদক লাভ করে। বেদিয়ান এলাকায় তার ব্যাটালিয়নের পক্ষে সাহসিকতাপূর্ণ যুদ্ধের নেতৃত্বে তিনি বিশেষ প্রশংসা কুড়ান।  খেমকারান যুদ্ধে জিয়াউর রহমানের কৃতিত্ব

জিয়াউর রহমান: অন্তহীন প্রেরণার বাতিঘর
আজ শোকাবহ ৩০ মে। এই দিনে জাতি হারিয়েছিল দক্ষিণ এশিয়ার বৃহৎ জনগোষ্ঠীর প্রাণপ্রিয় ক্ষণজন্মা এক মহান নেতাকে, যিনি তার সততা, মেধা, অক্লান্ত পরিশ্রম, বিচক্ষণ নেতৃত্বে বারংবার ক্রান্তিকালীন সময়ে বাঙালি জাতি ও সরলমনা জনগণকে দেখিয়েছেন পথের দিশা। মাত্র ৪৫ বছরের স্বল্পকালীন জীবনে অতি দ্রুত সময়ের ব্যবধানে তিনি তার অসাধারণ ব্যক্তিত্ব ও নেতৃত্বের গুনে নিজেকে দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এক ব্যতিক্রমধর্মী ও সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হন। তার নাতি দীর্ঘ জীবনের অসামান্য কীর্তি পর্যালোচনা করলে সকলকেই হতে হয় বিস্ময়ে বিস্মিত। জিয়াউর রহমান একজন সত্যিকারের দেশপ্রেমিক সৈনিক হিসেবে তার পেশাগত জীবনের শুরু থেকেই বীরত্বগাঁথা রচনা করতে শুরু করেন।  তরুণ ক্যাপ্টেন জিয়াউর রহমান ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধে খেমকারান সেক্টরে কোম্পানি কমান্ডার হিসেবে অসামান্য বীরত্ব ও নেতৃত্ব প্রদর্শন করেন, যার ফলে তার কোম্পানি সর্বোচ্চ সংখ্যক সামরিক পদক লাভ করে। বেদিয়ান এলাকায় তার ব্যাটালিয়নের পক্ষে সাহসিকতাপূর্ণ যুদ্ধের নেতৃত্বে তিনি বিশেষ প্রশংসা কুড়ান।  খেমকারান যুদ্ধে জিয়াউর রহমানের কৃতিত্বসমূহ:  সাহসী কোম্পানি কমান্ডার: তিনি খেমকারান সেক্টরের বেদিয়ান যুদ্ধক্ষেত্রে একটি কোম্পানির নেতৃত্ব দেন। সর্বোচ্চ পদক অর্জন: তার দলের বীরত্বপূর্ণ পারফরম্যান্সের কারণে তার কোম্পানি সর্বোচ্চ সংখ্যক গ্যালান্ট্রি অ্যাওয়ার্ড বা বীরত্বের পদক পেয়েছিল। হিলাল-ই-জুরুত পদক: ১৯৬৫ সালের যুদ্ধে অসামান্য সাহসিকতার জন্য তিনি 'হিলাল-ই-জুরুত' পদক লাভ করেন। ১৯৭০ সালের ৭ই ডিসেম্বর পাকিস্তানের জাতীয় নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামীলীগ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে জাতীয় পরিষদের জন্য নির্ধারিত ১৬৯টি আসনের মধ্যে ১৬৭টি এবং প্রাদেশিক পরিষদে ৩০০টি আসনের মধ্যে ২৮৮টি আসনে জয়লাভ করে পাকিস্তানে সরকার গঠন করার সাংবিধানিক, নৈতিক এবং আইনগত  বৈধতা লাভ করে। ১৯৭০ সালের নভেম্বর মাসে পূর্ব পাকিস্তানে ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত সাধারণ মানুষ ও জনপদের পুনর্বাসনের অজুহাত এবং নতুন নির্বাচিত জন প্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের ক্ষেত্রে কিছু আইন সংশোধনী এবং সংশ্লিষ্ট সকলের সাথে আলাপ আলোচনার মাধ্যমে একটি গ্রহণযোগ্য নতুন সংবিধানের খসড়া প্রস্তুতের স্বার্থে কিছুটা সময় প্রয়োজন এমন দোহাই দিয়ে তৎকালীন সামরিক স্বৈরশাসক জেনারেল ইয়াহিয়া খান ৩রা মার্চ ১৯৭১ ঢাকায় জাতীয় পরিষদের প্রথম অধিবেশন ডাকেন। স্বাধিকার আদায়ের জন্য দীর্ঘ সংগ্রামরত পূর্ব পাকিস্তানের নেতা শেখ মুজিব ও তার দল নিয়মতান্ত্রিক এবং শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা গ্রহণের লক্ষ্যে সামরিক শাসকের প্রস্তাবে সম্মত হন। কিন্তু ইয়াহিয়া তার কথার বরখেলাপ করে ১ লা মার্চ সংসদ অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা করলে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। তারা তাৎক্ষনিক স্বাধীনতার ঘোষণা করতে শেখ মুজিবের উপর প্রবল চাপ প্রয়োগ করতে থাকে।  শেখ মুজিব এবং তার দল সকলকে শান্ত থাকার জন্য এই বলে আশ্বস্ত করেন যে, খুব শীঘ্রই আলোচনার মাধ্যমে ক্ষমতা হস্তান্তরের জটিলতার সমাধান করা হবে। অবিলম্বে পরিষদের অধিবেশনের নতুন তারিখ নির্ধারণ এবং ক্ষমতা হস্তান্তর প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করার পরিবর্তে জেনারেল ইয়াহিয়া কালক্ষেপণের এক নতুন ভাঁওতাবাজি শুরু করেন শেখ মুজিব এর সাথে আলোচনা প্রক্রিয়া শুরু করে। পাক সামরিক বাহিনীতে কর্মরত বাঙালী সদস্যরা পশ্চিম পাকিস্তানীদের কর্মকাণ্ড ও সার্বিক পরিস্থিতির উপর গভীর পর্যবেক্ষণ দ্বারা বুঝতে সক্ষম হন যে, জেনারেল ইয়াহিয়া ক্ষমতা হস্তান্তরের পরিবর্তে সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে বাঙালীর স্বায়ত্ত শাসন ও স্বাধিকারের স্বপ্নকে চুরমার করার এক ভয়াবহ ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছেন।  সমগ্র পূর্ব পাকিস্তান তখন সংগ্রামী চেতনায় এক বিস্ফোরন্মুখ অগ্নিগিরিতে রূপান্তরিত, বিস্ফোরণের জন্য প্রয়োজন কেবল একটি মাত্র অগ্নি স্ফুলিঙ্গ- একটি নির্দেশনা। বাঙালী সামরিক সদস্যরা পাকিস্তানীদের গতিবিধি খুব কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করে নিশ্চিত হন যে “আক্রমণই প্রতিরক্ষার শ্রেষ্ঠ উপায়“নীতি অবলম্বন ছাড়া আর কোন বিকল্প নেই।   মার্চের শুরুতে যখন ইয়াহিয়া পূর্ব ঘোষিত সংসদ অধিবেশন স্থগিত করেন, তার পূর্ব থেকেই নিজেদের মধ্যে ভবিষ্যৎ নিয়ে আলাপচারিতা চললেও মূলত পরিষদ অধিবেশন স্থগিত ঘোষণার পর থেকেই বাঙালি সামরিক অফিসারগন এবং তাদের গোপন তত্ত্বাবধানে বাঙালি সৈনিকরা এক ধরনের প্রতিরোধ যুদ্ধের মানসিক প্রস্তুতি গ্রহণ করেন। সেই লক্ষ্যে ২০শে মার্চ চট্টগ্রাম সেনানিবাসের সিনিয়র বাঙালি সেনা অফিসার লেফটেনেন্ট কর্নেল এম আর চৌধুরী (যাকে ২৫ শে মার্চ রাতে পাকিস্তানি কর্নেল ফাতমির নির্দেশে নির্মমভাবে হত্যা কর হয়), ৮ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের উপ-অধিনায়ক মেজর জিয়াউর রহমান ও ইস্ট পাকিস্তান রাইফেল এ কর্মরত বাঙালী ক্যাপ্টেন রফিকুল ইসলাম চট্টগ্রামে রেলওয়ে বোর্ডের সদস্য (পরিকল্পনা) সফি আহমেদের বাসভবনে মিলিত হন এবং আসন্ন বিপদসংকুল পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য একটি পরিকল্পনার রূপরেখা প্রণয়ন করেন। চট্টগ্রামের এরিয়া কমান্ডারের অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত ইষ্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টাল সেন্টারের কমান্ড্যান্ট ব্রিগেডিয়ার মজুমদারকেও এই পরিকল্পনা সম্পর্কে অবহিত করা হয়। এছাড়াও মেজর জিয়া স্থানীয় নেতৃস্থানীয় আওয়ামীলীগ নেতাদের সাথে গোপনে যোগাযোগ রক্ষা করেন সঠিক সময়ে শেখ মুজিবের সঠিক নির্দেশনা পাবার প্রত্যাশায়। মেজর জিয়া ও ক্যাপ্টেন অলির অনুরোধে চট্টগ্রাম আওয়ামীলীগ নেতা জহুর আহমেদ চৌধুরী ও এম আর সিদ্দিকী ৮ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের স্বাধীনতাযুদ্ধ প্রস্তুতির বিষয়ে শেখ মুজিবকে অবহিত করার জন্য ২৩শে মার্চ'৭১ গাড়ি নিয়ে ঢাকার উদ্দেশ্য চট্টগ্রাম ত্যাগ করেন।  উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বাঙালি সেনা কর্মকর্তারা তাদের করণীয় সম্পর্কে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের সুস্পষ্ট নির্দেশনা প্রত্যাশা করছিলেন। মেজর জিয়া এবং তার অনুগত বাঙালী অফিসার ও সৈনিকরা যে কোন সময় পাকিস্তানী বাহিনীর চূড়ান্ত আক্রমণের শঙ্কায় ছিলেন।  দুর্ভাগ্যক্রমে ঢাকা থেকে ফেরার পথে জহুর আহমেদ চৌধুরী ও এম আর সিদ্দিকী চট্টগ্রাম থেকে ৩১ মাইল দূরে নিজামপুর কলেজের সামনে দুর্ঘটনার কবলে পড়েন। পরদিন সকালে এম আর সিদ্দিকী জানান, এই পর্যায়ে শেখ মুজিব কোন নির্দেশনা দেননি, শুধু বলেছেন সোয়াত জাহাজ থেকে যেন গোলা বারুদ খালাস করতে না দেয়া হয় যা ছিল সামরিক কৌশলের দিক থেকে একটি অসম্পূর্ণ এবং প্রস্তুতিবিহীন ভাবে নিজেদেরকে অধিক ঝুঁকির মধ্যে ঠেলে দেবার মত একটি নির্দেশ ফলে আপাতত সমরবিদরা সেই নির্দেশ পালন করা থেকে বিরত থাকেন।   এদিকে পূর্ব পাকিস্তান পরিস্থিতির  দ্রুত অবনতি ঘটতে থাকে, অন্যদিকে প্রতারক ও হিংস্র ইয়াহিয়া সহজ সরল বাঙালীর নেতা শেখ মুজিবের সাথে সমঝোতার নামে আলোচনা চালিয়ে যেতে থাকেন। চারিদিকে অজানা শঙ্কা ও উত্তেজনা- সেই আলোচনার ফলাফল নিয়ে কেননা সুচতুর ভুট্টোর প্ররোচনায় ইয়াহিয়া গনতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত দলের নেতা শেখ মুজিবের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরে ভীষণ গড়িমসি ও ছল চাতুরীর আশ্রয় নিচ্ছিল, আলোচনার আবরণে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে গোলা বারুদ, অস্ত্র ও সৈন্য পূর্ব পাকিস্তানে জড়ো করছিলেন। তাদের ভয়ঙ্কর পরিকল্পনার সংবাদ বাঙালি সামরিক বাহিনীর সদস্যরা খুব কাছ থেকে জানতে পারছিলেন। ২৪ মার্চ ’৭১, ৮ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের পাকিস্তানি অধিনায়ক লে. কর্নেল জানজুয়া উপ-অধিনায়ক মেজর জিয়ার অলক্ষ্যে সকল বাঙালি সৈনিকদের কাছ থেকে অস্ত্র জমা নেয়ার জন্য তার অধীনস্থ পাকিস্তানী অফিসার ও সৈনিকদের নির্দেশ প্রদান করেন। বিকেল ৪ ঘটিকায় বাঙালী হাবিলদার কাদির সৈনিক নুরুল হক (সার্ভিস নং- ৩৯৩৫৮৮৭)কে নির্দেশ দেন - “তুমি জিয়া স্যার এর বাসায় গিয়ে অস্ত্র জমা নেয়ার বিষয়টি উনাকে  অবগত কর।” সেই মোতাবেক নূরুল হক মেজর জিয়ার বাসায় যায় এবং   বাসার সামনে বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে দেখা হয়, সে তাকে সালাম দিয়ে বলেন,“ আমি স্যারকে একটা জরুরী সংবাদ জানাতে এসেছি”। মেজর জিয়া বাসায় নেই জানিয়ে তার আগমনের হেতু এবং তাকে কে  পাঠিয়েছে জানতে পেরে বেগম জিয়া নুরুল হককে বলেন যে “যাও, তুমি হাবিলদার কাদিরকে গিয়ে বলবে,  মেজর জিয়ার অনুমতি ছাড়া একটি সুঁইও এই ষোলশহর থেকে বের হবে না।”  পরবর্তীকালে এই নুরুল হক হাবিলদার হিসেবে অবসর জীবনে সেই স্মৃতি রোমন্থন করে আবেগ আপ্লুত হয়ে বলেন, “যদি বেগম সাহেব সেই সময় আমাকে এই কথা না বলতেন তাহলে এই হাতিয়ার গুলো নিয়ে গেলে আমাদের ১১০০ সৈন্যকে হানাদার বাহিনীরা মেরে ফেলতো।  ২৫ শে মার্চ ‘৭১ রাত  ১০ টার পরে ৮ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের পাকিস্তানি অধিনায়ক লে: কর্নেল জানজুয়া অতি সুচতুর পরিকল্পনার মাধ্যমে মেজর জিয়াকে হত্যা করার লক্ষ্যে ব্রিগেডিয়ার আনসারীর কাছে রিপোর্ট করার জন্য চট্টগ্রাম বন্দরের উদ্দেশ্য রওয়ানা হবার নির্দেশ দেন। প্রচণ্ড ক্ষোভ আর উত্তেজনা নিয়ে মেজর জিয়া বন্দরের উদ্দেশ্য রওয়ানা দেন কিন্তু রাস্তায় বিক্ষুব্ধ জনগণ দ্বারা সৃষ্ট ব্যারিকেডের দরুন তিনি বেশী দূর যেতে পারেননি, মাথার মধ্যে তখন তার সর্বক্ষণ লড়াইয়ের ভাবনা এবং রাজনৈতিক নির্দেশনার অপেক্ষা। মেজর জিয়া  তখন ব্যাটালিয়ন হেডকোয়ার্টার থেকে ৩ মাইল দূরে দেওয়ানহাট রেলক্রসিং-এর সামনে এবং এখানেই  ক্যাপ্টেন খালেকুজ্জামানের মাধ্যমে ক্যাপ্টেন অলি আহমেদের পাঠানো ভয়াবহ বিপদ সংকেত (ঢাকায় ক্র্যাক ডাউনের খবর) পেয়ে আর কারও নির্দেশের অপেক্ষা না করে মেজর জিয়া  চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন এবং উচ্চারণ করেন সেই ক্ষুদ্র কিন্তু গভীর অর্থবহ সময়ের দাবী মেটানো শব্দটি- ‘উই রিভোল্ট’ তার পাহারায় সঙ্গে দেয়া পাকিস্তানী সেনাদের কব্জা করে ব্যাটালিয়ন হেড কোয়ার্টারে ফিরে আসেন। প্রথমেই তার অধিনায়ক লে. কর্নেল জানজুয়াকে গ্রেফতার করেন এবং ফোর্সের কমান্ড হাতে নন। বাঙালী অফিসার, সৈনিকদের একত্রিত করে সকলের উদ্দেশ্য সংক্ষিপ্ত কিন্তু জ্বালাময়ী বক্তব্যে দেশের স্বাধীনতার জন্য লড়াইয়ে অবতীর্ণ হওয়ার কথা জানান। বাহিনীকে প্রয়োজনীয় দিক নির্দেশনা দিয়ে ২৬ শে মার্চ ৭১ ভোর ৩ টায় ক্যাপ্টেন অলি ও অন্যান্য অফিসার এবং সৈনিকদের নিয়ে ব্যাটালিয়ন হেডকোয়ার্টার ত্যাগ করে বোয়ালখালী থানার অদূরে করলডাঙ্গা পাহাড় নামক স্থানের উদ্দেশ্য রওয়ানা দেন। এ যেন অন্ধকার ও দুঃশাসনের বেড়াজাল ছিন্ন করে নতুন আলোর সন্ধানে এক দুঃসাহসিক যোদ্ধার জীবন বাজি রেখে  উজ্জীবিত পথ চলা। যদি কোনো কারণে উদ্ভূত সঙ্কটের রাজনৈতিক সমাধান হয়ে যেত, তবে প্রথম যে সেনানায়ককে ফাঁসিকাষ্ঠ কিংবা ফায়ারিং স্কোয়াডে প্রাণ দিতে হত, সে আর কেউ নন- স্বাধীন রাষ্ট্রের স্বপ্নে বিভোর এক দেশপ্রেমিক সৈনিক মেজর জিয়া এবং ঐ পরিস্থিতিতে সেই শঙ্কাটিও ছিল প্রবল। অকুণ্ঠ দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ অকুতোভয় বীর সেনানী মেজর জিয়ার বজ্রকণ্ঠে কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে উচ্চারিত হল সেই বহুল প্রত্যাশিত ও কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতার ঘোষণাটি, যা ছিল বিস্ফোরন্মুখ আগ্নেয়গিরির উৎস মুখে এক অগ্নি স্ফুলিঙ্গ- যার ছোঁয়ায় সেই আগ্নেয়গিরি মুক্তি পাগল কিন্তু দিশাহারা জনগণের হৃদয়ে দাবানলের মত জেগে উঠে, তাদের এলোমেলো পথ চলায় এনে দেয় স্থির লক্ষ্য – স্বাধীনতা এবং কেবলই স্বাধীনতা। প্রথম স্বাধীনতার ঘোষণায় নিজেকে মেজর জিয়া “রাষ্ট্রপতি” হিসেবে উল্লেখ করলেও পরবর্তী ঘোষণায় তা সংশোধন করে বঙ্গবন্ধুর পক্ষে “বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র”বেতারে প্রচার করতে থাকেন এবং দেশ-বিদেশের সকলের প্রতি তিনি স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতি সমর্থন ও সহায়তা কামনা করেন।  দেশ স্বাধীনের পর মাত্র সাড়ে তিন বছরের মাথায় ১৯৭৫ সালের  মর্মান্তিক ঘটনাবলীর পর জাতি আরেকবার নিমজ্জিত হয় এক কঠিন সংকটে। দিকনির্দশনাহীন জাতির এমন দুঃসময়ে আবারও ত্রাতা হিসেবে দৃশ্যপটে আবির্ভূত হন জিয়াউর রহমান। তার ভাগ্যটাই যেন সঙ্কট আর সমাধানের মিহি সুতোয় গাঁথা কোন কালজয়ী মহাকাব্যের সার্থক মহানায়কের মতন। জাতির সেই ক্রান্তিলগ্নে অস্থির রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করে, সশস্ত্র বাহিনীতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে এনে সুসংগঠিত করে নেমে পড়লেন আরেক নতুন যুদ্ধে - দেশ পুনর্গঠনের কঠিন চ্যালেঞ্জকে আলিঙ্গন করে। অনেক ঘাত, প্রতিঘাত, শঙ্কা আর অনিশ্চয়তার পথ মাড়িয়ে অদম্য সাহস, দূরদর্শিতা, প্রশ্নাতীত সততা, সৃষ্টিকর্তার প্রতি অবিচল আস্থা রেখে, জনগণের ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে তিনি এগিয়ে চললেন সামনের দিকে- দেশ গড়তে সকল দল ও মতের জ্ঞানী গুণীদের সহযাত্রী করে। দুর্ভিক্ষপীড়িত ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’র দেশকে তিনি ’সবুজ বিপ্লব’ দিয়ে দ্বিগুণ ফসল ফলিয়ে কি করে খাদ্যে স্বয়ম্ভর করলেন, সে গল্পটি প্রবীণদের স্মৃতিতে এখনো ভাস্বর।   যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট অফিস হোয়াইট হাউজে একটি দলিলে এই বিষয়ে একটি মন্তব্য লেখা রয়েছে, এভাবে “President Ziaur and I (President Carter) have been discussing, in the last few minutes, the possibility--he says the inevitability- that Bangladesh will in the near future be self-sufficient in food production--perhaps even able to export food to other countries” (The Carter Center).” ভারতের রাষ্ট্রপতি সঞ্জীব রেড্ডি ১৯৭৭ সালের ২৭ শে ডিসেম্বর প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সম্মানে আয়োজিত এক রাষ্ট্রীয় নৈশ ভোজে জিয়াকে উদ্দেশ্য করে তার বক্তৃতায় বলেন “"Your position is already assured in the annals of the history of your country as a brave fighter who was first to declare independence of Bangladesh.”  খুব অল্প সময়েই বিশ্বজুড়ে জিয়ার নেতৃত্বের সুনাম ছড়িয়ে পড়েছিল। প্রাচ্য থেকে পশ্চিমা বিশ্বে সর্বত্রই ছিল তার সমান গ্রহণ যোগ্যতা। মিশরের জনতা তাকে দেশের সর্বোচ্চ পদক অর্ডার অব দ্য নাইলে ভূষিত করে ধন্য হয়েছে, মার্শাল টিটোর দেশ থেকে তিনি পেয়েছেন সে দেশের সর্বোচ্চ সম্মান অর্ডার অব দ্য ইয়োগোস্লাভ স্টার, তার শাহাদাত বরনের বহু বছর পরও জাতির উন্নয়নে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরে তার নামে একটি সড়কের নামকরণ করা হয়।   দেখা গেছে, জিয়ার সংস্পর্শে যারাই এসেছেন তারাই হয়েছেন মুগ্ধ এবং আলোকিত। তার এই ব্যতিক্রমধর্মী নেতৃত্ব গুণ আমাদের মনে করিয়ে দেয় সেই বিখ্যাত প্রবাদটি “Great leaders communicate a vision that captures the imagination and fires the hearts and minds of those around them.”   বাংলাদেশের মেহনতি মানুষের প্রাণপ্রিয় মজলুম জননেতা মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী প্রেসিডেন্ট জিয়া কে কেন পছন্দ করতেন এবং তার ব্যাপারে কেন এতো উচ্চ ধারনা পোষণ করতেন সেই বিষয়ে তার নিকটতম রাজনৈতিক সহকর্মীদের প্রশ্নের উত্তরে মাওলানা ভাসানী যা বলতেন তা চমৎকার ভাবে উপস্থাপিত হয়েছে বিশিষ্ট সাংবাদিক ও গবেষক সৈয়দ আবুল মকসুদ এর লেখা “ভাসানী কাহিনী” বই এর নিম্নোল্লেখিত কথোপকথনে: “... অসুস্থ মওলানা ভাসানীকে হাসপাতালে দেখতে যান তমদ্দুন মজলিশের অধ্যাপক আবদুল গফুরসহ কেউ কেউ। তখন জিয়াউর রহমানকে প্রকাশ্যেই সমর্থন দিচ্ছিলেন ভাসানী।  সেদিকে তার দৃষ্টি আকর্ষণ করে অধ্যাপক গফুর বলেন : 'আপনি ছিলেন আওয়ামী লীগের প্রধান নেতা। সেই আওয়ামী লীগ ছিল ক্ষমতায়। প্রকাশ্য জনসভায় আপনি আওয়ামী লীগের মন্ত্রীদের বলেছেন, দুর্নীতি করলে, জনগণের জন্য কাজ না করলে তোমাদের পিঠে চাবুক মারা হবে। আপনার নিজের দলের নেতাদেরও এমন কঠোর ভাষায় সমালোচনা করেছেন, আর আজ একজন সামরিক শাসককে আপনি সমর্থন দিচ্ছেন? জিয়ার প্রতি কেন আপনার এই দুর্বলতা?' মওলানা বললেন : 'আবদুল গফুর, আমি তোমার বাবার বয়সী। আমি আমার জীবনে তোমার চেয়ে বেশি সরকার ও বেশি নেতাদের দেখেছি। ব্রিটিশ আমলে দেখেছি, পাকিস্তান আমলে দেখেছি, বাংলাদেশ আমলেও দেখেছি। তুমি আমাকে একটা এক্সাম্পল দেখাও, কোন রাজনৈতিক নেতা কম-বেশি দুর্নীতি করে নাই বা দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেয় নাই এবং কোন নেতা স্বজনপ্রীতি করে নাই।' অধ্যাপক গফুর চুপ করে রইলেন।  মওলানা বললেন : এখন পর্যন্ত জিয়াউর রহমানের ব্যক্তিগত দুর্নীতির কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় নাই। কোনোরকম স্বজনপ্রীতিও তার মধ্যে নাই। তার আত্মীয়-স্বজনকে কেউ চেনে না। তাদেরকে সে কোনো সুযোগ-সুবিধা দেয় না। ইন্ডিয়ান সাব-কন্টিনেন্টে এ ধরণের শাসককে মানুষ পছন্দ করে। একজন সৎ শাসকের তো প্রশংসাই প্রাপ্য। দেখা যাক কিছুদিন, জনগণের জন্য কী করে। রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে নূন্যতম ঐক্য নাই। আত্মশুদ্ধির চেষ্টা নাই। দেখা যাক, আগামী নির্বাচনে কারা আসে।"  এছাড়াও বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় লেখক এবং উপন্যাসিক হুমায়ুন আহমেদ তার “দেয়াল” উপন্যাসে প্রেসিডেন্ট জিয়া সম্পর্কে লেখেন “বাংলাদেশের মানুষ মনে করতে লাগলো অনেক দিন পর তারা এমন এক রাষ্ট্রপ্রধান পেয়েছে যিনি সৎ। নিজের জন্য বা নিজের আত্মীয়স্বজনের জন্য টাকা পয়সা লুটপাটের চিন্তা তার মাথায় নেই। বরং তার মাথায় আছে দেশের জন্য চিন্তা। তিনি খাল কেটে দেশ বদলাতে চান। জিয়া মানুষটা সৎ ছিলেন, এতে কোনো সন্দেহ নেই। লোক দেখানো সৎ না, আসলেই সৎ । তার মৃত্যুর পর দেখা গেল জিয়া পরিবারের কোনো সঞ্চয় নেই “।  ব্যক্তি ও শাসক জিয়ার সততার অগুনিত বাস্তব গল্প রয়েছে যার মাঝে একটি ঘটনা এখানে উল্লেখ করছি। ক্যাপ্টেন মাযাহার ছিলেন প্রেসিডেন্ট জিয়ার এ ডি সি।রুটিন মাফিক সকাল বেলা প্রেসিডেন্টের সাথে একই গাড়ীতে করে অফিসে যাওয়ার সময় প্রেসিডেন্ট জিয়া মাঝে মাঝে তার এ ডি সি ক্যাপ্টেন মাযাহারকে জিজ্ঞেস করে জানতে চাইতেন ঘড়িতে তখন কটা বাজে? এ ডি সি মনে মনে ভাবতেন প্রেসিডেন্ট তাকে কেন সময়ের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করেন,রহস্য কি? তার হাতেও তো ঘড়ি রয়েছে! একদিন মাযাহারের কাছে সেই রহস্যের বিষয়টি খোলাসা হলো যখন প্রেসিডেন্টের সামরিক সচিব ব্রিগেডিয়ার সাদেকুর রহমান চৌধুরী তাকে ডেকে একটি ঘড়ি দিয়ে বললেন- এটা মহামান্যের ঘড়ি, ঘড়িটা বন্ধ হয়ে গেছে, ঘড়ির মেকানিককে তড়িৎ খবর দাও এটা যেন আজকের মধ্যেই ঠিক করে দেয়। এ ডি সি ঘড়িটি হাতে নিয়ে দেখেন যে একটা সাধারণ মানের পুরনো ক্যামি ব্রান্ডের ঘড়ি। যাই হোক, এডিসি অতি দ্রুত বায়তুল মোকারমের এক ঘড়ির দোকানের মালিককে খবর দিতেই তিনি এসে বঙ্গভবনে হাজির হয়ে ঘড়ির সমস্যার কথা শুনলেন যদিও তাকে তখনও বলা হলো না ঘড়িটি কার? তিনি ঘড়িটি হাতে নিয়ে বললেন- এই ঘড়ি তো অতি পুরাতন এবং ব্যবহার না করাই উত্তম,এটা ফেলে দিয়ে নতুন একটি ঘড়ি কিনে নেন। এডিসি তখন তাকে জানায় যে এটা প্রেসিডেন্টের ঘড়ি এবং তিনি এই ঘড়িটিই ব্যবহার করতে চান। এই কথা শুনে ঘড়ির দোকানের মালিক বিস্মিত চোখে এডিসির দিকে তাকিয়ে থাকেন। প্রেসিডেন্ট জিয়া ছিলেন এমনই সাদামাটা জীবনে অভ্যস্ত এক শাসক, একজন নেতা, জাতির একজন অভিভাবক যিনি কখনো কোনোরকম ভোগ বিলাসিতা পছন্দ করতেন না এমনকি তার সহকর্মীদেরও এই ব্যাপারে তিনি সতর্ক থাকার নির্দেশ দিতেন। জিয়া কেবল দেশের খাদ্য ও শিল্প উৎপাদন বাড়িয়ে দুর্ভিক্ষ দূর করেননি জিয়া, কৃষির সম্প্রসারণের জন্য নিজে হাতে স্বেচ্ছাশ্রমে খাল খনন করলেন দেশব্যাপী। অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার করলেন, কালোবাজারি মজুদদারদের শক্ত হাতে দমন করলেন, আইন শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে আনলেন। সশস্ত্র-বাহিনীতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে এনে একে শক্তিশালী ও সুসংগঠিত বাহিনীতে পরিণত করলেন। একদলীয় শাসন (বাকশাল)ব্যবস্থা রদ করে বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রবর্তন করলেন। ‘ইয়ুথ কমপ্লেক্সে’র মাধ্যমে দেশের হাজার হাজার যুবকদের জন্য ট্রেনিং ও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করলেন, কর্মদক্ষ করে দেশ গড়ার কাজে নিয়োজিতের পাশাপাশি পাঠালেন বিদেশে। বাংলাদেশিদের জন্য মধ্যপ্রাচ্যে শ্রমবাজার উন্মুক্ত হলো।  পরিবার পরিকল্পনা চালু করে দেশে জনসংখ্যা বিস্ফোরণ নিয়ন্ত্রণ করলেন। গণশিক্ষা প্রবর্তন করে সারাদেশে স্বাক্ষরতা বাড়ালেন। জাতিধর্ম নির্বিশেষে দেশের সকল মানুষের একক পরিচয়- “বাংলাদেশি” নির্ধারণ করলেন। ফারাক্কা বাঁধের সমস্যাকে জাতিসংঘে তুলে ভারতকে বাধ্য করলেন বাংলাদেশের জন্য নূন্যতম পানির গ্যারান্টিসহ গঙ্গা চুক্তি করতে। দেশের সার্বিক উন্নয়নে জিয়া ঘোষণা করলেন ১৯ দফা কর্মসূচি এবং তাতে দারুণভাবে সফল হলেন তিনি-  জিয়ার আমলেই ১৯৭৬ সালে  একুশে পদক স্বাধীনতা দিবস পুরস্কার প্রবর্তন করা হয়। কবি হাসান হাফিজুর রহমান কে সম্পাদক হিসেবে অধিষ্ঠিত করে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস রচনা প্রকল্প শুরু করা হয়,  লক্ষণীয় যে, বাংলাদেশের হেন কোনো সেক্টর নেই, যেখানে জিয়ার হাত পড়েনি এবং তা সাফল্যের মুখ দেখেনি, এ যেন আগুনের এক পরশমণি, যার ছোঁয়ায় সকল অন্ধকার ভেসে গেছে প্রবল আলোর বন্যায়।  আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশকে অতি উচ্চ আসনে প্রতিষ্ঠিত করে গেছেন জিয়া। তার আমলেই বাংলাদেশের সাথে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, সৌদি আরবসহ প্রভাবশালী বিশ্বের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক স্থাপিত হয়। নবীন রাষ্ট্র হয়েও ১৯৭৮ সালে  বাংলাদেশ জাপানকে পরাজিত করে অস্থায়ী সদস্য হিসেবে স্থান করে নেয় জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে যা ছিল আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সফলতার এক উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত। জিয়ার যুক্তরাষ্ট্র সফরকালে প্রেসিডেন্ট কার্টার জাতিসংঘে বাংলাদেশের ভূমিকার ভূয়সী প্রশংসা করে বলেন “ “It's a great pleasure for me this afternoon to welcome to the White House and to our Nation, President Ziaur, the very fine leader of Bangladesh”  “দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ঘটানোর পাশাপাশি জিয়া সারা দুনিয়ায় ছুটে বেড়ান আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে। আজ আমেরিকা, তো কাল জার্মানি, পরশু প্যালেষ্টাইন, তার পরের দিন চীন। ইরাক-ইরান উপসাগরীয় যুদ্ধ বন্ধে ছুটোছুটি ,  জোট নিরপেক্ষ আন্দোলন, ওআইসি, আল কুদস- কোথায় নেই জিয়া?  ১৯৮০ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার হোয়াইট হাউজ লনে শতাধিক বিদেশী সাংবাদিকের সামনে জিয়ার প্রশংসা করে বলেছিলেন, “শুধু মুসলিম দেশ ও সমাজের মধ্যেই নয়, প্রকৃতপক্ষে গোটা বিশ্বসমাজে তিনি ব্যক্তিগতভাবে যে নেতৃত্ব দিয়েছেন আমরা তার জন্যেও কৃতজ্ঞ”।  আঞ্চলিক সহযোগিতা বাড়াতে একটি সংগঠন তৈরির জন্য জিয়া চিঠি দিলেন দক্ষিণ এশিয়ার রাষ্ট্রগুলোতে। পাঠালেন দূত। তার ঐকান্তিক প্রচেষ্টা ও বুদ্ধিদীপ্ত পদক্ষেপের ফলশ্রুতিতে পরবর্তীতে জন্ম হলো- দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা- SAARC. এই  ভিশনারী রাষ্ট্রনায়কের কর্মের যথার্থ  মূল্যায়ন করেছিলেন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার ও রোনাল্ড রেগ্যান, জাতিসংঘের মহাসচিব কূট ওয়ারল্ডহেইম, ওআইসি মহাসচিব হাবিব সাত্তি, ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থেচার, কিউবার প্রেসিডেন্ট ফিদেল ক্যাস্ট্রো, যুগোস্লাভিয়ার প্রেসিডেন্ট মার্শাল টিটো, ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট ইয়াসির আরাফাত, কুয়েতের আমির শেখ জাবের আল সাবাহ, গিনির প্রেসিডেন্ট আহমেদ সেকুতুরে, ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট সুহার্তো, ইরাকের প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হুসেন, আরব আমিরাতের খলিফা শেখ জায়েদ বিন সুলতান আল নাহিয়ান, ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোরারজী দেশাই ও ইন্দিরা গান্ধী, শ্রীলংকার প্রেসিডেন্ট রিচার্ড জয়বর্ধনে, ভুটানের রাজা জিগমে সিংমে ওয়াংচুক, মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট মামুন আবদুল গাইউম, নেপালের রাজা বীরেন্দ্র, পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জিয়াউল হক, জর্ডানের বাদশাহ হুসেনের মত বিশ্ব নেতৃবৃন্দ। ১৯৮১ সালের ৩০ মে কিছু বিপথগামী  উচ্ছৃঙ্খল সেনা সদস্যের হাতে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে নিহত হন এই কর্মচঞ্চল, উদ্যমী এক ভিশনারী রাষ্ট্রনায়ক। তার মৃত্যু সংবাদে সমগ্র জাতি স্তম্ভিত হয়ে পড়ে, শোকের মাতম উঠে চারিদিক।  তার শেষ যাত্রায় অংশগ্রহণ করেন শোকে মুহ্যমান বাংলাদেশের  লক্ষ লক্ষ  মানুষ, যা ছিল এক অভাবনীয় আবেগঘন দৃশ্য। এই ক্ষণজন্মা যাদুকরী ও সম্মোহনী ব্যক্তিত্বের অধিকারী নেতা প্রগতি, সততা এবং উন্নয়নের আলোকবর্তিকা হয়ে যুগে যুগে বেচে থাকবেন কোটি মানুষের হৃদয়ে। তার রেখে যাওয়া দিক নির্দেশনা- আগুনের পরশমণি হয়ে সকলের জীবনে পূর্ণতা এনে দেবে দহন দানে......  লেখক: কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক। Email: [email protected]

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow