জীবনমুখী যে শিক্ষা দেয় ‘ফ্রাঙ্কেনস্টাইন’

10 hours ago 3

‘ফ্রাঙ্কেনস্টাইন’ ইংরেজ নাট্যকার ও লেখক মেরি শেলির অমর সৃষ্টি। উপন্যাসের কেন্দ্রিয় এই চরিত্র এতটাই খ্যাতি লাভ করেছিল যে, লেখকের জন্মদিনে প্রতি বছর ৩০ আগস্ট সাহিত্যপ্রেমী ও ভয় পেতে ভালোবাসা মানুষেরা ‘ফ্রাঙ্কেনস্টাইন দিবস’ উদযাপন করেন।

আজ থেকে ২০৭ বছর আগে মাত্র ১৮ বছর বয়সে ফ্রাঙ্কেনস্টাইন লিখেছিলেন শেলি। যে বয়সে বেশিরভাগ তরুণ পড়ালেখা বা সোশাল মিডিয়ায় ডুবে থাকে, সেই বয়সে বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনি লিখে অমর হয়েছেন তিনি। গল্পটি যাদের জানা নেই বা ভুলে বসে আছেন, তাদের একটু মনে করিয়ে দেওয়া যাক।

তরুণ বিজ্ঞানী ভিক্টর প্রাণের সৃষ্টি করতে গিয়ে একটি দানব বানিয়ে ফেলে। নিজের সৃষ্টি দেখে সে নিজেই ভয় পেয়ে যায়। দানবটিকে সে ত্যাগ করে। সবার অবহেলা ও উপেক্ষায় দানবটি প্রতিশোধ পরায়ন হয়ে ওঠে। কারণ ভিক্টর তাকে জন্ম দিয়েছে, কিন্তু ভালোবাসেনি।

আজ এটি কেবল একটি গল্পই নয়, পেছনে রয়েছে শিক্ষা। অতি উচ্চাকাঙ্ক্ষা, দায়িত্বজ্ঞানহীনতা এবং যেকোনো মূল্যে সাফল্যের পেছনে ছুটতে থাকার পরিণতি কী হয় সেই শিক্ষা। আজকের দুনিয়ায় চটজলদি অর্থ-খ্যাতি অর্জনের চাপ বেড়েছে মানুষের ভেতরে, সেটা যেভাবেই হোক। তাই ফ্রাঙ্কেনস্টাইনের গল্পটি আজও প্রাসঙ্গিক।

২০২৫ সালের ফ্রাঙ্কেনস্টাইন দিবসে ‘ফ্রাঙ্কেনস্টাইন’ উপন্যাসটি আমাদের যে ৫টি জীবনমুখী শিক্ষা দেয়:

১. সীমাহীন উচ্চাকাঙ্ক্ষার ফল উল্টো হতে পারে : 
অতি উচ্চাকাঙ্ক্ষী তরুণ বিজ্ঞানী ভিক্টর ফ্রাঙ্কেনস্টাইনের লক্ষ্য ছিল যুগান্তকারী কিছু করার। কেবল রোগ নিরাময় বা জীবনকে উন্নত করা নয়, তিনি চেয়েছিলেন জীবন সৃষ্টি করতে। এ ধরণের উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে কাগজে-কলমে প্রশংসার যোগ্য মনে করা হয় বটে, কিন্তু ফলাফল যদি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়? ভিক্টর সেটি মনে রাখেননি। তার মতো আমরা অনেকেই ভুলে যাই যে, উদ্দেশ্যহীন অতি উচ্চাকাঙ্ক্ষা ধ্বংসাত্মক হয়ে উঠতে পারে। পদোন্নতির জন্য কঠোর পরিশ্রম বা ব্যক্তিগত লক্ষ্যের পেছনে ছুটতে থাকা হয়তো মন্দ নয়। কিন্তু কেউ যদি সেসব অর্জনের জন্য নিজেকে ধ্বংস করে ফেলে, নীতি-নৈতিকতা বিসর্জন করে ফেলে তাহলে তার সাফল্যের মূল্য থাকে না। তাই মনে রাখা দরকার, উচ্চাকাঙ্ক্ষা থাকা ভালো, তবে সেটার ভারসাম্যও থাকতে হবে। নয়তো এটি আপনাকে গিলে ফেলতে পারে।

২. আপনার সৃষ্টির দায়িত্ব আপনারই : 
‘ফ্রাঙ্কেনস্টাইন’ উপন্যাসের সবচেয়ে দুঃখজনক জায়গাটি হলো প্রাণীটি দানব হয়ে জন্ম নেয়নি। সে আদর, সহানুভূতি ও সুযোগ চেয়েছিলেন। কিন্তু নিজের সৃষ্টিকে লালন-পালনের বদলে বিজ্ঞানী ভিক্টর নিজেই ভীত হয়ে পড়েন, তাকে পরিত্যাগ করেন এবং এমন ভান করেন যে, কিছুই ঘটেনি। গল্পটির শিক্ষা এখানেই। আমরা যা সৃষ্টি করি, তার দায় আমাদেরই। সেটা হতে পারে একটি শিশু, একটি প্রযুক্তি, এমনকি আমরা অন্যদের সঙ্গে যে আচরণ করি। অর্থাৎ কোনো কিছু তৈরির পর দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। সেটাকে ফেলে দূরে চলে গেলে সেটার প্রভাব মুছে যায় না। তাই কিছু তৈরি করলে এর দায়িত্ব নিতে শিখুন। কারণ কেবল সৃজনই সাফল্য নয়, এর পেছনে লেগে থাকা ও সেটার যত্ন করাও জরুরি। খেয়াল রাখতে হয়, অযত্নে সৃষ্টি যেন দানবে পরিণত না হয়।

৩. সৃষ্টিকর্তার ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে যাবেন না : 
বিজ্ঞানী ভিক্টর তার সৃষ্টির হাতে নানান ভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হন। তিনি জীবন সৃষ্টি করতে চেয়েছিলেন, ঠিক যেন ঈশ্বরের ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে চেয়েছিলেন তিনি। যা করছেন, তা করা উচিত কি না, তা ভেবে থেমে যাননি। তিনি কেবল ভেবেছিলেন যে, তিনি পারবেন কি না। এ এক বিপজ্জনক মানসিকতা যা আজও সমাজে দেখা যায়। বায়োটেক, এআই, এমনকি সোশ্যাল মিডিয়ার ব্যবহার তার উদাহরণ। বিপুল ক্ষমতা আজ মানুষের হাতে, পাশাপাশি দায়িত্বও থাকা দরকার। এই ক্ষমতা যেন সীমা লঙ্ঘন না করে।

৪. একাকীত্ব দানব তৈরি করে : 
উপন্যাসের সবচেয়ে হৃদয়বিদারক দিকগুলির একটি হল একাকীত্ব কীভাবে একটি প্রাণীকে রূপান্তরিত করে খুনি দানবে। ভিক্টর যাকে ফেলে চলে যায়, সমাজ যাকে ভয় পায় যার কারণে বিরক্ত হয় সে ধ্বংসাত্মক হয়ে ওঠে। যদিও জন্মগতভাবে সে ধ্বংসাত্মক ছিল না। আজকের সমাজে তাকালেও এমনটি দেখা যায়। কর্মক্ষেত্র, স্কুল বা সম্পর্কের ক্ষেত্রে, মানুষকে উপেক্ষা করলে, একাকী করে দিলে তার ফলাফল ভালো হয় না। অবহেলা এবং প্রত্যাখ্যান একজন সাধারণ মানুষকে ভয়ংকর অপরাধী করে তুলতে পারে।

৫. অর্জনটুকুই আপনার অবদান নয়, যদি সেটি উপকার না করে : 
ভিক্টর ফ্রাঙ্কেনস্টাইন একজন মেধাবী বিজ্ঞানী হিসেবে স্মরণীয় হতে চেয়েছিলেন। তার বদলে তার অবদান ছিল ধ্বংসাত্মক। প্রাণ সৃজনে তার অর্জন ছিল ক্ষতিকর। আমাদের কর্ম কীভাবে অন্যদের ওপর প্রভাব ফেলে, সেটাই আসলে অবদান। ধরা যাক, আপনার ক্যারিয়ারের অর্জন বা সোশ্যাল মিডিয়ায় আপনার পোস্টগুলো আপনাকে তুলে ধরছে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে? মানুষ মনে রাখে আপনি তাদের কেমন অনুভূতি উপহার দিয়েছেন, কতগুলো পুরস্কার জিতেছেন তা কেউ মনে রাখবে না।

২০২৫ সালে ফ্রাঙ্কেনস্টাইন আমাদের যা শেখায়: 
দুই শতাব্দী পর ফ্রাঙ্কেনস্টাইন এখনও কেবল একটি দানবের গল্প নয়, তার চেয়েও বেশি কিছু। এটি দায়িত্বজ্ঞানহীন উচ্চাকাঙ্ক্ষা বিষয়ক একটি সতর্কবার্তা। তাই, বিশ্বের অনেক জায়গায় আজ যখন ফ্রাঙ্কেনস্টাইন দিবস উদযাপন করছে শেলির ভক্তরা, তখন হয়তো আমাদের সকলের একটু থামা উচিত, নিজেদের জিজ্ঞেস করা উচিত:

  • আমি কী উদ্দেশে উচ্চাকাঙ্ক্ষার পেছনে ছুটছি?
  • পৃথিবীতে আমি যা প্রকাশ করেছি, তার দায়িত্ব কি আমি নিয়েছি বা নিচ্ছি?
  • আমি কি আজ এমন পথ বেছে নিচ্ছি, যা ভবিষ্যতে আমার একটি আলোকিত স্মৃতি রেখে যাবে?

মেরি শেলির গল্পটি হয়তো ছিল একটি দানবকে নিয়ে, কিন্তু আমাদের জন্য আসল মেসেজ ছিল – আমাদের উচ্চাকাঙ্ক্ষা, আমাদের দায়িত্ব এবং কত সহজে আমরা এ দুটি বিষয় ভুলে যেতে পারি। কারণ দিনশেষে উচ্চাকাঙ্ক্ষা মহত্ত্ব তৈরি করতে পারে কিংবা দানব।

সূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া


আরএমডি

Read Entire Article