ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গনে আচমকাই ঝড় তুলেছে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি)। প্রথম দেখায় অনেকের কাছে এটি বিজেপিবিরোধী তরুণদের নতুন অনলাইন বিদ্রোহ বলে মনে হলেও, বিশ্লেষকদের মতে বিষয়টি এর চেয়েও গভীর। কারণ, এই ব্যঙ্গাত্মক আন্দোলন শুধু ক্ষমতাসীন বিজেপিকেই নয়, বরং গোটা বিরোধী রাজনীতিকেও কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে।
শুক্রবার (২২ মে) এনডিটিভির এক বিশ্লেষণে এমন তথ্যই উঠে এসেছে।
সম্প্রতি ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের একটি মন্তব্য ঘিরে শুরু হয় বিতর্ক। অভিযোগ ওঠে, তিনি বেকার তরুণদের ‘তেলাপোকা’ ও ‘পরজীবী’র সঙ্গে তুলনা করেছিলেন। পরে অবশ্য তিনি দাবি করেন, মন্তব্যটি তরুণদের উদ্দেশে নয়, ভুয়া ডিগ্রিধারীদের নিয়ে ছিল। তবে ততক্ষণে সামাজিক মাধ্যমে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে।
এই প্রেক্ষাপটেই জন্ম নেয় ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ বা সিজেপি। কয়েক দিনের মধ্যেই ইনস্টাগ্রামে তাদের অনুসারীর সংখ্যা কোটি ছুঁইছুঁই হয়ে যায়। এক পর্যায়ে বিজেপির অফিসিয়াল ইনস্টাগ্রাম পেজকেও ছাড়িয়ে যায় তাদের ফলোয়ার সংখ্যা। যদিও পরে ভারতে সিজেপির এক্স (সাবেক টুইটার) অ্যাকাউন্ট ব্লক করা হয়।
সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে বলেন, ভারতের তরুণ প্রজন্ম মূলধারার রাজনৈতিক আলোচনায় প্রায় অদৃশ্য হয়ে গেছে। বস্টন থেকে পরিচালিত এই আন্দোলনের ভাষ্য, তারা অলস ও বেকারদের কণ্ঠস্বর। তাদের স্লোগান, ওরা আমাদের পিষে ফেলতে চেয়েছিল, আমরা আবার ফিরে এসেছি।
বিশ্লেষকদের মতে, এই বার্তাই ভারতের তরুণদের হতাশা ও ক্ষোভকে সবচেয়ে বেশি স্পর্শ করেছে। কারণ, চাকরি সংকট, মূল্যবৃদ্ধি, পরীক্ষা দুর্নীতি ও রাজনৈতিক বংশবাদ নিয়ে তরুণদের দীর্ঘদিনের ক্ষোভ এখন বিস্ফোরিত হচ্ছে ব্যঙ্গ ও মিমের মাধ্যমে।
কংগ্রেস নেতা উমাং সিংঘার ও সাংসদ শশী থারুর সিজেপিকে ইতিবাচকভাবে দেখলেও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিরোধীদের এই আন্দোলনকে শুধুই বিজেপিবিরোধী ঢেউ ভাবলে ভুল হবে।
নির্বাচনী কৌশলবিদ নরেশ অরোরা মন্তব্য করেছেন, সিজেপির উত্থান শুধু শাসকদলের বিরুদ্ধে ক্ষোভ নয়, বিরোধীদের প্রতিও তরুণদের হতাশার প্রতিফলন।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ভারতের তরুণ ভোটাররা এখন আর শুধু বিজেপি-বিরোধিতা শুনতে চায় না। তারা চায় চাকরি, স্বচ্ছ নিয়োগ, সাশ্রয়ী জীবনযাপন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং পরিবারতন্ত্রমুক্ত রাজনীতি।
সিজেপির জনপ্রিয়তা এমন এক সময়ে বাড়ছে, যখন ভারতের জেন জি প্রজন্ম অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তায় ভুগছে। ডেলয়েটের এক জরিপে উঠে এসেছে, চাকরির সংকট ও মূল্যস্ফীতির কারণে ভারতের বহু তরুণ বাড়ি কেনা বা বিয়ে করার মতো বড় সিদ্ধান্তও পিছিয়ে দিচ্ছেন।
এদিকে, তামিলনাড়ুতে অভিনেতা বিজয়ের দল টিভিকের উত্থানকেও একই প্রবণতার অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, তরুণ ভোটাররা এখন নতুন মুখ ও সরাসরি যোগাযোগ খুঁজছেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ভারতের তরুণদের রাজনৈতিক মনোযোগ এখন প্রচলিত সংবাদ সম্মেলন বা টিভি বিতর্কের বদলে ছড়িয়ে পড়ছে ইউটিউব শো, মিম, ব্যঙ্গাত্মক ভিডিও ও সোশ্যাল মিডিয়া কনটেন্টে।
কমেডিয়ান কুনাল কামরা, বরুণ গ্রোভার বা আনফিল্টার্ড বাই সমদীশ-এর মতো প্ল্যাটফর্মগুলো তরুণদের কাছে বেশি গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সিজেপির সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো, তারা অপমানকে প্রতিবাদে, আর ব্যঙ্গকে রাজনৈতিক ভাষায় রূপ দিতে পেরেছে।
সিজেপি ‘তেলাপোকা’ শব্দটিকেই প্রতিরোধের প্রতীকে পরিণত করেছে। যাদের ‘অলস’ বলা হচ্ছিল, তারাই এখন সামাজিক মাধ্যমে সবচেয়ে সক্রিয় সংগঠক। যাদের বেকার বলা হচ্ছিল, তারাই রাজনৈতিক আলোচনার নতুন কেন্দ্রবিন্দু।
পর্যবেক্ষকদের মতে, এই আন্দোলন বাস্তবে রাজনৈতিক দলে রূপ নিক বা না নিক, এটি স্পষ্ট করে দিয়েছে, ভারতের তরুণরা আর পুরনো ধাঁচের রাজনীতিতে সন্তুষ্ট নয়।