জ্বালানি সংকট সাময়িক নয়, কাঠামোগত দুর্বলতার ইঙ্গিত

বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা এবং অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত সীমাবদ্ধতার দ্বৈত চাপে রয়েছে। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, দীর্ঘস্থায়ী ডলার সংকট এবং আমদানিনির্ভর অর্থনৈতিক কাঠামো উৎপাদন খাত, কৃষি, পরিবহনসহ সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে। এই পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠছে—এটি কি কেবল সাময়িক চাপ, নাকি অর্থনীতি ধীরে ধীরে একটি ‘এনার্জি ট্র্যাপ’-এ আটকে পড়ছে? এই প্রেক্ষাপটে শনিবার (২ মে) বেলা ১১টায় পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) আয়োজিত ফ্ল্যাগশিপ ওয়েবিনার ‘আজকের অ্যাজেন্ডা: জ্বালানির ফাঁদে বন্দি অর্থনীতি’ অনুষ্ঠিত হয়। ওয়েবিনারে জ্বালানি ও অর্থনীতির পারস্পরিক সম্পর্কের পরিবর্তনশীল বাস্তবতা এবং তা প্রবৃদ্ধি ও সামষ্টিক স্থিতিশীলতার ওপর কী ধরনের প্রভাব ফেলছে—সে বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়। এতে অংশ নেন সেক্টর বিশেষজ্ঞ, বেসরকারি খাতের প্রতিনিধি, এনজিও কর্মী ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বরা। তারা চলমান জ্বালানি সংকটের স্বল্পমেয়াদি ধাক্কা এবং মধ্যমেয়াদি কাঠামোগত ঝুঁকি তুলে ধরেন। ওয়েবিনারটি সঞ্চালনা করেন পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান

জ্বালানি সংকট সাময়িক নয়, কাঠামোগত দুর্বলতার ইঙ্গিত

বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা এবং অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত সীমাবদ্ধতার দ্বৈত চাপে রয়েছে। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, দীর্ঘস্থায়ী ডলার সংকট এবং আমদানিনির্ভর অর্থনৈতিক কাঠামো উৎপাদন খাত, কৃষি, পরিবহনসহ সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে। এই পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠছে—এটি কি কেবল সাময়িক চাপ, নাকি অর্থনীতি ধীরে ধীরে একটি ‘এনার্জি ট্র্যাপ’-এ আটকে পড়ছে?

এই প্রেক্ষাপটে শনিবার (২ মে) বেলা ১১টায় পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) আয়োজিত ফ্ল্যাগশিপ ওয়েবিনার ‘আজকের অ্যাজেন্ডা: জ্বালানির ফাঁদে বন্দি অর্থনীতি’ অনুষ্ঠিত হয়। ওয়েবিনারে জ্বালানি ও অর্থনীতির পারস্পরিক সম্পর্কের পরিবর্তনশীল বাস্তবতা এবং তা প্রবৃদ্ধি ও সামষ্টিক স্থিতিশীলতার ওপর কী ধরনের প্রভাব ফেলছে—সে বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়।

এতে অংশ নেন সেক্টর বিশেষজ্ঞ, বেসরকারি খাতের প্রতিনিধি, এনজিও কর্মী ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বরা। তারা চলমান জ্বালানি সংকটের স্বল্পমেয়াদি ধাক্কা এবং মধ্যমেয়াদি কাঠামোগত ঝুঁকি তুলে ধরেন।

ওয়েবিনারটি সঞ্চালনা করেন পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান। আলোচনায় অংশ নেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য এ. সত্তার মন্ডল, ট্রেড সার্ভিসেস ইন্টারন্যাশনাল (টিএসআই)-এর চেয়ারম্যান সৈয়দ মাহমুদুল হক, পদ্মা অয়েল কোম্পানি লিমিটেডের চেয়ারম্যান ও সাবেক জ্বালানি সচিব এ কে এম জাফর উল্লাহ খান, বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজ (বিসিআই) এর চেয়ারম্যান আনোয়ার-উল আলম পারভেজ এবং বাংলাদেশ পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোহাম্মদ নাজমুল হক।

এছাড়া সাংবাদিক ও সমাজ উন্নয়নকর্মীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ছিল। আলোচনায় উঠে আসে, সরবরাহ সীমাবদ্ধতা, চাহিদানির্ভর প্রতিক্রিয়া এবং যোগাযোগ ঘাটতির সমন্বয়ে সংকটের তীব্রতা বেড়েছে। প্রাথমিক পর্যায়ের বিঘ্ন দ্রুতই আতঙ্কজনিত ক্রয় আচরণে রূপ নেয়। ফলে কয়েক দিনের মধ্যেই জ্বালানির চাহিদা হঠাৎ বেড়ে যায়। রেশনিংয়ের মতো প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ নেওয়া হলেও অনিশ্চয়তার কারণে সাধারণ ভোক্তা ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা জ্বালানি মজুত করতে শুরু করে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।

সাবেক জ্বালানি সচিব এ কে এম জাফর উল্লাহ খান সংকটের মূল কারণ তুলে ধরে বলেন, আমাদের মজুত ক্ষমতা কী পরিমাণ আছে, কতদিনের জন্য আমরা মজুত রাখতে পারি— এই প্রশ্নটা উঠছে। এনার্জির এই দাম আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয় করে আজ হোক কাল হোক বাড়াতেই হবে এবং এই প্রক্রিয়া চলবেই। কিন্তু যতই দাম বাড়ুক বা কমুক, আমাদের দরকার নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা। আমাদের স্টোরেজ ক্যাপাসিটি ওভারফ্লো করার মতো পরিস্থিতি নেই যে পরিমাণ তেল আসবে বা যাবে।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য এ সত্তার মন্ডল মাঠ পর্যায়ের পরিস্থিতি তুলে ধরে বলেন, কৃষির মাসল পাওয়ার এখন অনেকটাই মেশিন পাওয়ার দ্বারা রিপ্লেস হয়েছে। প্রায় ৪২ লাখ ডিজেল ইঞ্জিন কৃষিতে বিভিন্নভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। শুধু সেচ নয়, কৃষি সেক্টরে ছোট-বড় নানা ধরনের ইঞ্জিন চালু রয়েছে। আগামী দিনে কৃষিখাতে এসব মেশিনের সংখ্যা আরও বাড়বে এবং সেই অনুপাতে ডিজেলের চাহিদাও বাড়বে।

ট্রেড সার্ভিসেস ইন্টারন্যাশনালের (টিএসআই) চেয়ারম্যান সৈয়দ মাহমুদুল হক বলেন, আন্তর্জাতিকভাবে প্রতি ব্যারেল তেলের দাম ৫ ডলার বাড়লে আমাদের ৪০০-৫০০ ডলার অতিরিক্ত ব্যয় হয়। এই বাড়তি আর্থিক চাপ পুরো জাতীয় অর্থনীতির ওপর পড়ে। তাই আমাদের বিকল্প উৎস নিয়ে ভাবতে হবে। আগে আমাদের সোর্সিং মূলত মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক ছিল, এখন অন্য জায়গাতেও সেই সোর্সিং বাড়ানো যায় কি না তা দেখতে হবে।

বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের চেয়ারম্যান আনোয়ার-উল আলম পারভেজ বলেন, আমি মনে করি আগামীতে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ দীর্ঘমেয়াদে গড়াতে পারে এবং বাংলাদেশের জন্য এনার্জি সিকিউরিটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এনার্জি সেক্টরকে সুরক্ষিত করতে শর্ট, মিড ও লং টার্ম পলিসি নিতে হবে। তাৎক্ষণিকভাবে কয়লাভিত্তিক বেইজ প্ল্যান্টগুলো সক্ষমতার ভিত্তিতে চালানো উচিত। আদানি ও ভারত থেকে যতটুকু বিদ্যুৎ আসে, তা দিয়েও আমাদের ডোমেস্টিক সক্ষমতা ধরে রাখতে হবে। এছাড়া গ্যাস সরবরাহ শিল্প ও সার কারখানায় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ব্যবহারের বিষয়টিও দেখতে হবে।

প্যানেলিস্টরা বলেন, সরবরাহ পরিস্থিতিতে বড় ধরনের উন্নতি না হলেও চাহিদা ব্যবস্থাপনা ও নজরদারি জোরদারের মাধ্যমে ধীরে ধীরে পরিস্থিতি স্থিতিশীল হয়। তবে বিভিন্ন পাম্পে জ্বালানির অসম বণ্টন এবং গণমাধ্যমে স্থানীয় সংকটের অতিরিক্ত প্রচার জনমনে উদ্বেগ বাড়ায়, যা সংকটের ধারণাকে আরও তীব্র করে তোলে। এ থেকে বোঝা যায়, এমন পরিস্থিতিতে শুধু সরবরাহ নয়, জনসংযোগ ব্যবস্থাপনাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশ পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি মোহাম্মদ নাজমুল হক বলেন, আমাদের এখন রিনিউএবল এনার্জির রিসোর্সগুলো কাজে লাগাতে হবে এবং গ্যাসের ক্ষেত্রে কূপ খননের ওপর জোর দিতে হবে। আশার বিষয় হলো, এই সরকার আসার পর ১৪০টি কূপ খননের কাজ শুরু করেছে।

আলোচনায় ভারসাম্যপূর্ণ ও দূরদর্শী নীতির প্রয়োজনীয়তার বিষয়টিও গুরুত্ব পায়। সংকটকালে ভোক্তার আচরণ নিয়ে সমালোচনা থাকলেও নীতিনির্ধারণ, সমন্বয়ের ঘাটতি এবং প্রস্তুতির দুর্বলতাও সমানভাবে পর্যালোচনার প্রয়োজন রয়েছে বলে মত দেন বক্তারা। ভবিষ্যতে এ ধরনের সংকট এড়াতে জ্বালানি সংরক্ষণ সক্ষমতা বৃদ্ধি, চাহিদা পূর্বাভাস উন্নয়ন, সমন্বিত যোগাযোগ এবং জ্বালানি ব্যবস্থার স্থিতিস্থাপকতা বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হয়।

সমাপনী বক্তব্যে হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, বর্তমানে জ্বালানির সংকট চলছে, যা আমরা মোকাবিলাও করছি। কিন্তু ম্যানেজমেন্ট প্রক্রিয়া, আমদানি ব্যবস্থাপনা ও মধ্যমেয়াদি কার্যক্রম আরও জোরালোভাবে বাস্তবায়ন করতে না পারলে এ সংকট আরও গভীরভাবে থেকে যাবে, এমনকি বারবার ফিরে আসতে পারে।

তিনি আরও বলেন, কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন পদক্ষেপ নিলেও অনেক ক্ষেত্রে সেগুলো একমাত্রিকভাবে চাহিদা নিয়ন্ত্রণের ওপর কেন্দ্রীভূত ছিল। নীতিগত সিদ্ধান্তের সুদূরপ্রসারী প্রভাব বিবেচনায় নিতে হবে। আমলাতান্ত্রিক সীমাবদ্ধতা সময়মতো কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণে বাধা সৃষ্টি করতে পারে।

গণমাধ্যমের ভূমিকা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, গণমাধ্যমের আরও তথ্যভিত্তিক আলোচনা এবং সঠিক তথ্য তুলে ধরা প্রয়োজন। ম্যাসেজিংয়ের দুর্বলতার কারণে নতুন সমস্যাও তৈরি হতে পারে। আমরা প্যানিক ও মজুতের বিষয় শুনেছি, যা অন্য প্রক্রিয়ায় ম্যানেজ করা হয়েছে। তবে ম্যাসেজিংয়ের ক্ষেত্রেও সমন্বয় দরকার।

সার্বিকভাবে আলোচনায় একটি অভিন্ন উপলব্ধি উঠে আসে— বাংলাদেশের জ্বালানি সংকট কেবল সাময়িক নয়, বরং গভীর কাঠামোগত দুর্বলতার প্রতিফলন। এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রয়োজন সমন্বিত নীতি, শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় এবং দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি বৈচিত্র্য ও দক্ষতার প্রতি প্রতিশ্রুতি।

এনএস/এমএএইচ/

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow