ঝুপড়ির বাসিন্দা থেকে ফ্ল্যাটের মালিক ৭৩০ পরিবার

পলিথিনে মোড়ানো একচালা ঘর, বর্ষায় পানি জমা উঠান, রোদে-গরমে টিনের চালার নিচে দমবন্ধ জীবন। এই ছিল পারভীন আক্তারের দৈনন্দিন বাস্তবতা। শারীরিক প্রতিবন্ধী এই নারী রিকশাচালক স্বামী মনিরুল আলম আর দুই সন্তানকে নিয়ে বছরের পর বছর কাটিয়েছেন মানবেতর জীবন। রোববার সেই বাস্তবতা বদলে গেল এক লটারির মধ্য দিয়ে। কক্সবাজারের খুরুশকুলে বহুতল আবাসন প্রকল্পে নিজের ফ্ল্যাট নিশ্চিত হওয়ার পর আবেগে ভেঙে পড়েন পারভীন। তিনি বলেন, 'মনে হচ্ছে আমি এই মুহূর্তে পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ।' পারভীনের মতো একই অনুভূতি জেলে রেজাউল করিমেরও। তালিকায় নিজের নাম দেখে প্রথমে বিশ্বাসই করতে পারেননি। তিনি বলেন, বহুতল ভবনে বসবাসের সুযোগ পাবেন- এমনটা কোনোদিন কল্পনাও করেননি। রোববার (২ আগস্ট) কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের ব্যবস্থাপনায় সর্বস্তরের মানুষের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত হয় ফ্ল্যাট বরাদ্দের লটারি। এতে পারভীন-রেজাউলসহ মোট ৭৩০টি পরিবার নিশ্চিত হয় যে অচিরেই তারা ঝুপড়িঘর ছেড়ে উঠবে আধুনিক বহুতল আবাসনে। জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ এবং কক্সবাজার বিমানবন্দর সম্প্রসারণের কারণে সমিতিপাড়া এলাকা থেকে উচ্ছেদ হওয়া ভূমি

ঝুপড়ির বাসিন্দা থেকে ফ্ল্যাটের মালিক ৭৩০ পরিবার

পলিথিনে মোড়ানো একচালা ঘর, বর্ষায় পানি জমা উঠান, রোদে-গরমে টিনের চালার নিচে দমবন্ধ জীবন। এই ছিল পারভীন আক্তারের দৈনন্দিন বাস্তবতা। শারীরিক প্রতিবন্ধী এই নারী রিকশাচালক স্বামী মনিরুল আলম আর দুই সন্তানকে নিয়ে বছরের পর বছর কাটিয়েছেন মানবেতর জীবন। রোববার সেই বাস্তবতা বদলে গেল এক লটারির মধ্য দিয়ে। কক্সবাজারের খুরুশকুলে বহুতল আবাসন প্রকল্পে নিজের ফ্ল্যাট নিশ্চিত হওয়ার পর আবেগে ভেঙে পড়েন পারভীন।

তিনি বলেন, 'মনে হচ্ছে আমি এই মুহূর্তে পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ।'

পারভীনের মতো একই অনুভূতি জেলে রেজাউল করিমেরও। তালিকায় নিজের নাম দেখে প্রথমে বিশ্বাসই করতে পারেননি। তিনি বলেন, বহুতল ভবনে বসবাসের সুযোগ পাবেন- এমনটা কোনোদিন কল্পনাও করেননি।

রোববার (২ আগস্ট) কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের ব্যবস্থাপনায় সর্বস্তরের মানুষের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত হয় ফ্ল্যাট বরাদ্দের লটারি। এতে পারভীন-রেজাউলসহ মোট ৭৩০টি পরিবার নিশ্চিত হয় যে অচিরেই তারা ঝুপড়িঘর ছেড়ে উঠবে আধুনিক বহুতল আবাসনে। জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ এবং কক্সবাজার বিমানবন্দর সম্প্রসারণের কারণে সমিতিপাড়া এলাকা থেকে উচ্ছেদ হওয়া ভূমিহীন পরিবারগুলোর জন্য নির্মিত হচ্ছে এই আবাসন। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীনে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ৩৪ ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন ব্রিগেডের তত্ত্বাবধানে ১ হাজার ৪৫৭ কোটি টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়িত হচ্ছে প্রকল্পটি। ২০২০ সালের ডিসেম্বরে শুরু হওয়া দেশের অন্যতম বৃহৎ এই মানবিক ও জলবায়ু-সহনশীল আবাসন উদ্যোগের নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার কথা চলতি বছরের ডিসেম্বরে।

জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, মোট ৪ হাজার ১২৮টি জলবায়ু উদ্বাস্তু ও বিমানবন্দর সম্প্রসারণে বাস্তুচ্যুত পরিবারকে এখানে পুনর্বাসন করা হবে। এ লক্ষ্যে নির্মাণ করা হচ্ছে ১২৯টি পাঁচতলা ভবন, যার প্রতিটিতে চারটি আবাসিক তলায় থাকছে ৩২টি করে ফ্ল্যাট। ইতোমধ্যে ১২২টি ভবনের নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে, বাকি সাতটির কাজ শেষ পর্যায়ে। এর আগে ১৯টি ভবনে ৬০০টি পরিবার পুনর্বাসিত হয়েছে। রোববারের লটারিতে নির্ধারণ হলো আরও ৭৩০টি পরিবারের ভবন ও ফ্ল্যাট নম্বর। অবশিষ্ট পরিবারগুলোও পর্যায়ক্রমে একই প্রক্রিয়ায় পুনর্বাসিত হবে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রকল্পের শুরুতে শূন্য বালুচরে নির্মাণকাজে পানির সংস্থান ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। পরে ছনখোলা এলাকায় গভীর নলকূপ স্থাপন এবং বাকখালী নদী থেকে পানি সরবরাহের ব্যবস্থা করে সমাধান করা হয় সেই সংকট। পরিবেশ সুরক্ষায় নেওয়া হয়েছে বহুমুখী উদ্যোগ- বর্জ্য শোধনাগার, কনস্ট্রাক্টেড ওয়েটল্যান্ড, ফিল্ট্রেশন পন্ড, কেন্দ্রীয় পয়ঃশোধনাগার, ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট ও রিভার্স অসমোসিস প্ল্যান্ট, যাতে ব্যবহৃত পানি বাকখালী নদীকে দূষিত না করে। প্রতিটি ভবনে বসানো হয়েছে সোলার প্যানেল ও রেইনওয়াটার হারভেস্টিং সিস্টেম। চলছে সবুজায়ন, ল্যান্ডস্কেপিং ও বনায়ন কার্যক্রম। প্রতিটি ভবনের নিচতলায় রাখা হয়েছে চারটি অতিথিকক্ষ ও দুর্যোগকালীন আশ্রয়ের ব্যবস্থা।

নিরাপত্তা ও নাগরিক সুবিধার জন্য নির্মিত হচ্ছে আধুনিক সড়কবাতি, একটি মসজিদ, একটি মন্দির, একটি কমিউনিটি সেন্টার, চারটি সাইক্লোন শেল্টার ও একটি মার্কেট কমপ্লেক্স। নদীপথে যোগাযোগ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়াতে নির্মিত হচ্ছে দুটি জেটি।

একটি পর্যটকদের জন্য, অন্যটি শুঁটকি মহল এলাকায়, যাতে জেলেরা সরাসরি মাছ এনে শুঁটকি উৎপাদন করতে পারেন। নির্মাণকাজ চলাকালে সেনাপ্রধান ও প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিবসহ সামরিক-বেসামরিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা নিয়মিত প্রকল্প পরিদর্শন করেন।

প্রকল্প পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মিরাজুল ইসলাম বলেন, গুণগত মান শতভাগ বজায় রেখে নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই প্রকল্প সম্পন্ন করতে তারা নিরলসভাবে কাজ করছেন।

তার ভাষ্য, সাধারণ বস্তি বা ঝুপড়িতে বসবাসকারী মানুষকে আন্তর্জাতিক মানের সুপরিকল্পিত ও পরিবেশবান্ধব আবাসন উপহার দেওয়াই তাদের লক্ষ্য। এটি শুধু আবাসন প্রকল্প নয়, বরং জলবায়ু উদ্বাস্তু পরিবারগুলোর জীবনে স্থায়িত্ব ও মর্যাদা ফিরিয়ে আনার একটি মানবিক উদ্যোগ।

কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান বলেন, শুরু থেকেই তালিকা যাচাই-বাছাই শেষে স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও জবাবদিহিমূলক প্রক্রিয়ায় সবার সামনে লটারি পরিচালনা করা হয়েছে, যাতে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ তাদের প্রাপ্য অধিকার পান।

কক্সবাজারের পুলিশ সুপার এএনএম সাজেদুর রহমান বলেন, প্রকল্প এলাকায় যেন কোনো ধরনের অপরাধ, মাদক, চুরি, ছিনতাই বা সামাজিক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি না হয়, সে জন্য জেলা পুলিশ সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করবে। নিয়মিত টহল ও গোয়েন্দা নজরদারির মাধ্যমে এলাকাকে নিরাপদ ও সুশৃঙ্খল আবাসন হিসেবে গড়ে তোলার প্রত্যয় জানান তিনি।

লটারি অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) ইমরান হোসাইন সজীব, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তাহমিনা আক্তার, সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. মশিউর রহমানসহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow