টার্ফ ঘিরে খেলাধুলা-বিনোদনের নতুন জোয়ার
একসময় বিকেল গড়ালেই রাজশাহীর তরুণদের আড্ডা সীমাবদ্ধ থাকতো চায়ের দোকান কিংবা মোবাইল ফোনের পর্দায়। খেলার মাঠ কমে যাওয়ায় নিয়মিত খেলাধুলার সুযোগও ছিল সীমিত। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে সেই চিত্র দ্রুত বদলেছে। কৃত্রিম ঘাসে নির্মিত টার্ফের মাঠকে কেন্দ্র করে রাজশাহীতে গড়ে উঠেছে খেলাধুলার এক নতুন সংস্কৃতি। শুধু ফুটবল বা ক্রিকেট নয়, পরিবার ও বন্ধুদের মিলনমেলা, বিনোদন, এমনকি ক্ষুদ্র ব্যবসা-বাণিজ্যের নতুন সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে এসব টার্ফ ঘিরে। মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে নগরীতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে পাঁচটি আধুনিক টার্ফ মাঠ। বিশেষ করে শহরের উত্তরাঞ্চলের নাদের হাজীর মোড় এলাকায় কয়েকশ মিটারের মধ্যেই গড়ে উঠেছে একাধিক টার্ফ। সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে আলোকসজ্জায় ঝলমল করে ওঠে পুরো এলাকা। দিন শেষে কর্মব্যস্ত মানুষ, শিক্ষার্থী, কিশোর-তরুণ থেকে শুরু করে মধ্যবয়সীরাও দল গঠন করে ছুটে আসেন খেলতে। অনেক সময় গভীর রাত পর্যন্ত চলে প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচ, দর্শকদের উল্লাস আর আড্ডা। শুধু খেলার জায়গা নয়, টার্ফগুলো এখন ধীরে ধীরে রূপ নিয়েছে বিনোদনকেন্দ্রে। মাঠের পাশে গড়ে উঠছে রেস্তোরাঁ, ক্যাফে, সুইমিংপুল, বিশ্রামাগারসহ নানা সেবা। ফলে একটি
একসময় বিকেল গড়ালেই রাজশাহীর তরুণদের আড্ডা সীমাবদ্ধ থাকতো চায়ের দোকান কিংবা মোবাইল ফোনের পর্দায়। খেলার মাঠ কমে যাওয়ায় নিয়মিত খেলাধুলার সুযোগও ছিল সীমিত। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে সেই চিত্র দ্রুত বদলেছে। কৃত্রিম ঘাসে নির্মিত টার্ফের মাঠকে কেন্দ্র করে রাজশাহীতে গড়ে উঠেছে খেলাধুলার এক নতুন সংস্কৃতি। শুধু ফুটবল বা ক্রিকেট নয়, পরিবার ও বন্ধুদের মিলনমেলা, বিনোদন, এমনকি ক্ষুদ্র ব্যবসা-বাণিজ্যের নতুন সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে এসব টার্ফ ঘিরে।
মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে নগরীতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে পাঁচটি আধুনিক টার্ফ মাঠ। বিশেষ করে শহরের উত্তরাঞ্চলের নাদের হাজীর মোড় এলাকায় কয়েকশ মিটারের মধ্যেই গড়ে উঠেছে একাধিক টার্ফ। সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে আলোকসজ্জায় ঝলমল করে ওঠে পুরো এলাকা। দিন শেষে কর্মব্যস্ত মানুষ, শিক্ষার্থী, কিশোর-তরুণ থেকে শুরু করে মধ্যবয়সীরাও দল গঠন করে ছুটে আসেন খেলতে। অনেক সময় গভীর রাত পর্যন্ত চলে প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচ, দর্শকদের উল্লাস আর আড্ডা।
শুধু খেলার জায়গা নয়, টার্ফগুলো এখন ধীরে ধীরে রূপ নিয়েছে বিনোদনকেন্দ্রে। মাঠের পাশে গড়ে উঠছে রেস্তোরাঁ, ক্যাফে, সুইমিংপুল, বিশ্রামাগারসহ নানা সেবা। ফলে একটি টার্ফকে ঘিরেই সৃষ্টি হচ্ছে ছোট পরিসরের একটি বিনোদন পরিবেশ, যা রাজশাহীর মানুষের কাছে নতুন অভিজ্ঞতা হিসেবে ধরা দিয়েছে।
মাঠ কমে যাওয়ায় বেড়েছে টার্ফের চাহিদা
রাজশাহী দীর্ঘদিন ধরেই শিক্ষা ও সবুজ নগরী হিসেবে পরিচিত। তবে নগরায়নের বিস্তারে ধীরে ধীরে কমেছে খোলা মাঠের সংখ্যা। আবাসন, সড়ক ও বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণের কারণে অনেক ঐতিহ্যবাহী খেলার মাঠ হারিয়ে গেছে। ফলে নিয়মিত খেলাধুলার জন্য বিকল্প জায়গার প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হচ্ছিল।
‘নগরায়ণের ফলে খোলা মাঠের সংখ্যা ক্রমেই কমে যাচ্ছে। এ বাস্তবতায় টার্ফ মাঠ তরুণদের খেলাধুলার সুযোগ তৈরি করছে। তবে পরিকল্পিত নগর উন্নয়নের অংশ হিসেবে শুধু বাণিজ্যিক টার্ফ মাঠের ওপর নির্ভর না করে পর্যাপ্ত উন্মুক্ত খেলার মাঠও সংরক্ষণ করতে হবে।’
সেই প্রয়োজন থেকেই কয়েকজন তরুণ উদ্যোক্তা কৃত্রিম ঘাসের মাঠ তৈরির উদ্যোগ নেন। শুরুতে বিষয়টি নিয়ে অনেকের সংশয় থাকলেও সময়ের সঙ্গে সেই ধারণা পাল্টে যায়। এখন নির্ধারিত সময়ের অনেক আগেই মাঠ বুকিং দিতে হচ্ছে। বিশেষ করে ছুটির দিন, সরকারি ছুটি কিংবা ঈদের মতো উৎসবের সময় ১০ থেকে ১৫ দিন আগেই অধিকাংশ স্লট পূর্ণ হয়ে যায়।
টার্ফে খেলাধুলা করছে তরুণরা/ ছবি: জাগো নিউজ
টার্ফ উদ্যোক্তা শিবলি সাদিক জানান, শুরুতে তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও তরুণদের লক্ষ্য করে মাঠ নির্মাণ করেছিলেন। কিন্তু বর্তমানে স্কুলপড়ুয়া শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী, প্রবাসফেরত তরুণ, এমনকি বিভিন্ন গ্রামের খেলাপ্রেমীরাও নিয়মিত টার্ফে খেলতে আসছেন।
উত্তরাঞ্চলের প্রথম টার্ফ থেকে নতুন সম্ভাবনা
২০২৪ সালে রাজশাহীর কয়েকজন তরুণ নাদের হাজীর মোড় এলাকায় নিচু একটি জমি ইজারা নিয়ে মাটি ভরাটের কাজ শুরু করেন। কয়েক মাসের প্রস্তুতির পর ওই বছরের ডিসেম্বরে ১১০ ফুট দৈর্ঘ্য ও ৭৬ ফুট প্রস্থের প্রথম টার্ফ মাঠ চালু হয়। উদ্যোক্তাদের দাবি, এটিই ছিল রাজশাহীসহ উত্তরাঞ্চলের প্রথম কৃত্রিম টার্ফ মাঠ।
প্রথম মাঠটি জনপ্রিয়তা পাওয়ার পর ২০২৫ সালে আরও বড় পরিসরে ১৪০ ফুট দৈর্ঘ্য ও ৯৫ ফুট প্রস্থের আরেকটি মাঠ নির্মাণ করা হয়। আন্তর্জাতিক মান বিবেচনায় মাঠটির নকশা প্রস্তুত করা হয়েছে বলে জানান উদ্যোক্তারা। এরপর আশপাশে আরও কয়েকটি টার্ফ গড়ে ওঠে এবং পুরো এলাকাই ধীরে ধীরে খেলাধুলাকেন্দ্রিক একটি নতুন জোনে পরিণত হয়।

প্রকল্প বাড়লেও ভাঙন কমেনি যমুনায়
রাজশাহী টার্ফের আরেক উদ্যোক্তা সরকার শামীম আহমেদ বলেন, আধুনিক অবকাঠামো, নিরাপদ পরিবেশ এবং নির্দিষ্ট সময়ভিত্তিক খেলার সুযোগ থাকায় মানুষ টার্ফের প্রতি দ্রুত আগ্রহী হয়ে উঠেছেন। বর্তমানে প্রতিদিন সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত প্রায় প্রতিটি স্লটেই খেলোয়াড়দের উপস্থিতি দেখা যায়।
শুধু মাঠ ভাড়া নয়, মিলছে পূর্ণাঙ্গ খেলার পরিবেশ
রাজশাহীর টার্ফগুলোতে খেলতে আসা দলগুলোর জন্য আলাদা করে খুব বেশি প্রস্তুতি নিতে হয় না। নির্ধারিত সময়ের একটি স্লট বুকিং করলেই মাঠ কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় অধিকাংশ খেলার সরঞ্জাম সরবরাহ করে। ফুটবল, ক্রিকেট বল, স্টাম্প, গোলপোস্ট, গোলকিপারের গ্লাভস, জার্সিসহ প্রয়োজন সবই পাওয়া যায়। খেলোয়াড়দের নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হয়। কেউ ছোটখাটো আঘাত পেলে তাৎক্ষণিক প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থাও রয়েছে।
‘রাজশাহীতে দিন দিন টার্ফের খেলার মাঠ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। টার্ফ মাঠের সংখ্যা বাড়ায় রাজশাহীর তরুণরা খেলাধুলার প্রতি বেশি ঝুঁকছেন। ফলে একদিকে তারা মাদকাসক্তি থেকে দূরে থাকছেন, অন্যদিকে মোবাইল গেমের আসক্তিও কমছে। এছাড়া এসব টার্ফ মাঠ থেকেই ভবিষ্যতে দক্ষ খেলোয়াড় তৈরি হবে এবং জাতীয় পর্যায়ের খেলোয়াড়ও উঠে আসবে।’
রাজশাহী টার্ফের ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা মো. মাহি বলেন, খেলতে আসা দলগুলোর প্রধান চাহিদা হলো মানসম্মত পরিবেশ। সেই বিষয়টি মাথায় রেখেই মাঠ রক্ষণাবেক্ষণ, আলোকসজ্জা, নিরাপত্তা এবং পরিচ্ছন্নতার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ফলে পরিবার কিংবা বন্ধুদের নিয়ে নির্ভার পরিবেশে খেলাধুলা করা সম্ভব হচ্ছে।
মোবাইলের পর্দা ছেড়ে মাঠে ফিরছে তরুণরা
প্রযুক্তির এই সময়ে অনেক তরুণের অবসর কাটে স্মার্টফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কিংবা অনলাইন গেমে। তবে টার্ফ সংস্কৃতি সেই চিত্রে ইতিবাচক পরিবর্তন আনছে বলে মনে করছেন উদ্যোক্তা ও খেলোয়াড়রা।
প্রায় প্রতিদিনই বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত বিভিন্ন বয়সী তরুণদের উপস্থিতিতে মুখর থাকে মাঠগুলো। কেউ অফিস শেষে, কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস শেষ করে, আবার কেউ বন্ধুদের সঙ্গে নির্ধারিত সময় মিলিয়ে মাঠে হাজির হন। সপ্তাহজুড়ে ব্যস্ততা থাকলেও অন্তত একটি দিন খেলাধুলার জন্য সময় রাখার প্রবণতা বাড়ছে।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষার্থী আসাদুল্লাহ গালিব বলেন, টার্ফের মাঠ তৈরি হওয়ায় আমার মতো অনেক তরুণ এখানে খেলতে আসেন। রাত হলেই তরুণ মোবাইল ফোন নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। পাবজি থেকে শুরু করে মোবাইলের বিভিন্ন গেমসে আসক্ত হয়ে যাচ্ছেন অনেক তরুণ। এই টার্ফ খেলার মাঠ হওয়া তরুণ খেলাধুলায় সময় দিচ্ছেন পাশাপাশি স্কুল শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী, এমনকি মধ্যবয়সীরাও নিয়মিত খেলছেন। এতে স্বাস্থ্য সচেতনতার পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগও বাড়ছে এবং তরুণরা কিছুটা হলেও মোবাইলের আসক্তি থেকে বের হতে পারবেন।
গ্রামের দলও আসছে শহরের টার্ফে
টার্ফের জনপ্রিয়তা এখন শুধু নগরীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। আশপাশের উপজেলা ও গ্রাম থেকেও দলবেঁধে খেলতে আসছেন অনেকে।
সম্প্রতি পবা উপজেলার একটি গ্রামের প্রায় ৭০ জনের একটি দল রাতের সময় দুটি স্লট বুকিং করে টার্ফে খেলতে আসে। চারটি দলে বিভক্ত হয়ে কয়েক ঘণ্টা ধরে ফুটবল খেলার পর মাঠের পাশেই সবাই একসঙ্গে খাবারের আয়োজন করে। খেলাকে কেন্দ্র করে এমন মিলনমেলা এখন প্রায় নিয়মিত দৃশ্য।
ওই দলের একজন সদস্য তারিক হোসেন জানান, বছরে কয়েকবার বন্ধু ও স্বজনদের নিয়ে এমন আয়োজন করা হয়। সবার থেকে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ সংগ্রহ করা হয়। খেলার আনন্দের সঙ্গে একসঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগই তাদের কাছে সবচেয়ে বড় বিষয়।
খরচ ভাগ করলে সবার নাগালে
টার্ফে খেলতে নির্দিষ্ট সময়ভিত্তিক ভাড়া দিতে হলেও দলগতভাবে অংশ নেওয়ায় একজনের ওপর খুব বেশি অর্থের চাপ পড়ে না। সাধারণত ১৪ থেকে ১৬ জন খেলোয়াড় মিলে খরচ ভাগ করে নেওয়ায় মাথাপিছু ব্যয় অনেকটাই সহনীয় হয়ে যায়।
রাজশাহীর কয়েকজন তরুণ জানান, তারা প্রতি সপ্তাহে নির্দিষ্ট দিনে টাকা জমিয়ে খেলতে আসেন। এতে নিয়মিত শরীরচর্চা যেমন হয়, তেমনি বন্ধুদের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎও হয়। দীর্ঘ সময় পড়াশোনা বা কাজের চাপের পর মাঠে নামলে মানসিক প্রশান্তিও পাওয়া যায়।
খেলাধুলা ফিরিয়ে আনছে ইতিবাচক পরিবর্তন
স্থানীয়দের মতে, টার্ফ মাঠ শুধু বিনোদনের জায়গা নয়; এটি তরুণদের জন্য ইতিবাচক সামাজিক পরিবেশও তৈরি করছে।
অত্র এলাকার বাসিন্দা আরিফুর রহমান বলেন, আগে অনেক তরুণ সন্ধ্যার পর উদ্দেশ্যহীনভাবে সময় কাটাত। এখন তারা নিয়মিত খেলাধুলায় অংশ নিচ্ছে। এতে মাদকাসক্তি ও বিভিন্ন নেতিবাচক কর্মকাণ্ড থেকে দূরে থাকার প্রবণতা তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে শৃঙ্খলা, দলগত মনোভাব এবং পারস্পরিক সম্পর্কও শক্তিশালী হচ্ছে।
‘টার্ফের মাঠ হওয়ার পর থেকে এলাকা জমজমাট। দিনের থেকে রাতে জমজমাট বেশি হয়। দূরদূরান্ত থেকে লোক এসে এখানে খেলাধুলা করছেন নিয়মিত। একসময় এই এলাকায় রাত হলেই মানুষ পাওয়া যেতো না–আর সেই এলাকা এখন লোক লোকারণ্য।’
রাজশাহীর কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের কর্মীরাও সপ্তাহে অন্তত একদিন দল গঠন করে টার্ফে খেলতে আসেন। ব্যস্ত কর্মজীবনের মাঝেও খেলাধুলার এই সুযোগ তাদের মানসিক চাপ কমাতে সহায়তা করছে বলে জানান তারা।
টার্ফ ঘিরে বদলে গেছে নাদের হাজীর মোড়
একসময় রাজশাহী নগরের উত্তর প্রান্তের নাদের হাজীর মোড় ছিল অনেকটাই নিরিবিলি এলাকা। আশপাশে ছিল ফসলি জমি ও বিল। সন্ধ্যার পর মানুষের চলাচলও ছিল খুবই কম। তবে বাইপাস সড়ক নির্মাণের পর ধীরে ধীরে বদলাতে শুরু করে পুরো এলাকার চিত্র। আর কৃত্রিম টার্ফ মাঠ চালু হওয়ার পর সেই পরিবর্তনের গতি যেন কয়েক গুণ বেড়ে যায়।
বর্তমানে সন্ধ্যা নামার পর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত এলাকায় মানুষের আনাগোনা লেগেই থাকে। খেলোয়াড়, দর্শক, অভিভাবক, বন্ধু-স্বজন-সব মিলিয়ে প্রতিদিনই মুখর থাকে পুরো এলাকা। এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে চা-স্টল, ফাস্টফুডের দোকান, রেস্তোরাঁ, জুস কর্নার, কফিশপ ও ছোট ছোট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা। ফলে টার্ফকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে নতুন ধরনের রাতের অর্থনীতি।
স্থানীয় বাসিন্দা সিদ্দিক মোল্লা জানান, টার্ফের মাঠ হওয়ার পর থেকে এলাকা জমজমাট। দিনের থেকে রাতে জমজমাট বেশি হয়। দূরদূরান্ত থেকে লোক এসে এখানে খেলাধুলা করছেন নিয়মিত। একসময় এই এলাকায় রাত হলেই মানুষ পাওয়া যেতো না–আর সেই এলাকা এখন লোক লোকারণ্য।
বাড়ছে ক্ষুদ্র ব্যবসা, বাড়ছে কর্মসংস্থান
স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মতে, কয়েক বছর আগেও সন্ধ্যার পর দোকান খোলা রাখার প্রয়োজন হতো না। কিন্তু এখন রাত ২টা থেকে ৩টা পর্যন্ত ক্রেতার উপস্থিতি থাকে। বিশেষ করে ছুটির দিনগুলোতে ব্যবসা আরও জমজমাট হয়ে ওঠে।
নাদের হাজীর মোড়ে ১১ বছর ধরে চায়ের দোকান পরিচালনা করেন মো. সেলিম। আগে শুধু দিনের বেলায় চা বিক্রি করতেন। এখন এলাকার বাইরের অনেকে চা পান করেন। দুই বছর ধরে তার ব্যবসা ভালো চলছে।
সেলিম বলেন, আগে দিনের বেলার বিক্রির ওপরই নির্ভর করতে হতো। এখন রাতের বিক্রিই অনেক সময় দিনের তুলনায় বেশি হয়। শুধু স্থানীয় নয়, শহরের বিভিন্ন প্রান্ত এবং আশপাশের উপজেলা থেকেও মানুষ এখানে আসছেন। ফলে ব্যবসার পরিধিও বেড়েছে।
শুধু খাবারের দোকান নয়, পার্কিং, খেলাধুলার সরঞ্জাম বিক্রি, পানীয়, ফটোগ্রাফি, এমনকি ছোটখাটো ইভেন্ট আয়োজনের মতো নতুন সেবাও গড়ে উঠছে। এতে স্থানীয় অনেক তরুণের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
বুকিং পেতে অপেক্ষা, জনপ্রিয়তার শীর্ষে টার্ফ
টার্ফ পরিচালনাকারীরা জানান, সপ্তাহের সাধারণ দিনেও বেশিরভাগ সময়সূচি আগেই বুকিং হয়ে যায়। আর সরকারি ছুটি, ঈদ কিংবা উৎসবের সময়ে ১০ থেকে ১৫ দিন আগে থেকেই স্লট পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
বন্ধুদের ছোট দল থেকে শুরু করে করপোরেট প্রতিষ্ঠানের কর্মী, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী, প্রবাসফেরত তরুণ-সবাই এখন টার্ফকেই খেলাধুলার নির্ভরযোগ্য ঠিকানা হিসেবে বেছে নিচ্ছেন। অনেকে জন্মদিন, পুনর্মিলনী কিংবা বিভিন্ন সামাজিক আয়োজনের অংশ হিসেবেও টার্ফ ভাড়া নিচ্ছেন।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োকেমিস্ট্রি অ্যান্ড মলিকুলার বায়োলজি বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী মিনারুল বলেন, টার্ফে খেলতে গিয়ে তিনদিন অপেক্ষা করতে হয়েছে। তিনদিন আগে বলে তিনদিন পর সিরিয়াল পেয়েছি আমরা। বর্তমানে রাজশাহীতে টার্ফের খুব চাহিদা ফলে সিরিয়াল পেতে বেগ পেতে হয়। যারা খেলতে চান, নির্দিষ্ট সময়ের তিনদিন আগেই যেন যোগাযোগ করে সিরিয়াল নিয়ে রাখেন।
সামনে বড় পরিকল্পনা উদ্যোক্তাদের
চাহিদা বাড়তে থাকায় উদ্যোক্তারাও নতুন বিনিয়োগের পরিকল্পনা করছেন। কেউ বড় আকারের আন্তর্জাতিক মানের মাঠ নির্মাণ করতে চান, আবার কেউ একই স্থানে একাধিক খেলার ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নিয়েছেন। ফুটবলের পাশাপাশি ক্রিকেট, ব্যাডমিন্টন, টেবিল টেনিসসহ ইনডোর ও আউটডোর খেলাধুলার সুযোগ বাড়ানোর পরিকল্পনাও রয়েছে।
তাদের আশা, রাজশাহীতে বিনোদনের সুযোগ যত বাড়বে, ততই মানুষ স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের দিকে ঝুঁকবেন। একই সঙ্গে নতুন নতুন উদ্যোক্তা তৈরি হবে এবং স্থানীয় অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
রাজশাহীতে বিনোদনের জায়গা কম হওয়ায় টার্ফের জনপ্রিয়তা বাড়ছে বলে মনে করেন প্লে ল্যান্ড টার্ফের উদ্যোক্তা মো. জাহিদ হাসান।
তিনি বলেন, আমরা আরও বড় পরিসরে মাঠ তৈরির পরিকল্পনা করছি, যাতে আরও বেশি মানুষ খেলাধুলার সুযোগ পায়।
জেলা ক্রীড়া কর্মকর্তা মো. জাহাঙ্গীর হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, রাজশাহীতে দিন দিন টার্ফের খেলার মাঠ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। টার্ফ মাঠের সংখ্যা বাড়ায় রাজশাহীর তরুণরা খেলাধুলার প্রতি বেশি ঝুঁকছেন। ফলে একদিকে তারা মাদকাসক্তি থেকে দূরে থাকছেন, অন্যদিকে মোবাইল গেমের আসক্তিও কমছে। এছাড়া এসব টার্ফ মাঠ থেকেই ভবিষ্যতে দক্ষ খেলোয়াড় তৈরি হবে এবং জাতীয় পর্যায়ের খেলোয়াড়ও উঠে আসবে।
সরকারি তত্ত্বাবধানে টার্ফ মাঠ চালুর উদ্যোগ রয়েছে জানিয়ে তিনি আরও বলেন, জেলা স্টেডিয়ামের পাশে একটি টার্ফ মাঠ নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। এ বিষয়ে ইতোমধ্যে আমরা সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি। এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে তরুণরা খেলাধুলার প্রতি আরও বেশি আগ্রহী হবে। একই সঙ্গে কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে, বেকারত্ব কমবে এবং দেশের অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
রাজশাহী সিটি করপোরেশনের নগর পরিকল্পনাবিদ বনি আহসান জাগো নিউজকে বলেন, নগরায়ণের ফলে খোলা মাঠের সংখ্যা ক্রমেই কমে যাচ্ছে। এ বাস্তবতায় টার্ফ মাঠ তরুণদের খেলাধুলার সুযোগ তৈরি করছে। তবে পরিকল্পিত নগর উন্নয়নের অংশ হিসেবে শুধু বাণিজ্যিক টার্ফ মাঠের ওপর নির্ভর না করে পর্যাপ্ত উন্মুক্ত খেলার মাঠও সংরক্ষণ করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, খেলাধুলার সুযোগ বাড়লে তরুণদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের পাশাপাশি সামাজিক বন্ধনও শক্তিশালী হবে। তাই ভবিষ্যৎ নগর পরিকল্পনায় খেলার মাঠ ও ক্রীড়া অবকাঠামোকে রাজশাহী সিটি করপোরেশন বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে বলে জানান তিনি।
এনএইচআর/এএসএম
What's Your Reaction?

