টিফিনের ঘণ্টা বাজলেই বদলে যায় মাহিমের পরিচয়

স্কুলের ইউনিফর্ম পরা ছোট্ট ছেলেটিকে দেখে প্রথমে অন্য শিক্ষার্থীদের মতোই মনে হবে। কিন্তু টিফিনের ঘণ্টা বাজতেই তার পরিচয় বদলে যায়। সে তখন আর শুধু একজন শিক্ষার্থী নয়, হয়ে ওঠে পরিবারের উপার্জনকারী। এই গল্প মেহেরপুরের আট বছরের মাহিমের। মাহিম মেহেরপুর সদর উপজেলার ইসলামপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্র। দেড় বছর আগে স্ট্রোকে তার বাবা মান্নান আলীর মৃত্যু হয়। এরপর থেকেই মা শিল্পী খাতুন, এক বোন ও মাহিমকে নিয়ে সংসারে নেমে আসে চরম অনিশ্চয়তা। কোনো স্থায়ী আয়ের উৎস না থাকায় বাধ্য হয়েই ছোট্ট মাহিমের হাতে তুলে দেওয়া হয় বাদামের প্যাকেট। প্রতিদিন সকালে স্কুলে আসে মাহিম। ক্লাসে মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনা করে। টিফিনের ঘণ্টা বাজতেই অন্য শিক্ষার্থীরা যখন মাঠে খেলায় মেতে ওঠে, তখন মাহিম হাতে বাদাম নিয়ে স্কুল প্রাঙ্গণ ও আশপাশে বাদাম বিক্রি শুরু করে। স্কুল ছুটির পরও বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত চলে তার এই সংগ্রাম। বাড়ি ফিরে ক্লান্ত শরীর নিয়েই বসতে হয় পড়ার টেবিলে। মাহিম জানায়, লেখাপড়া করে বড় মানুষ হতে চাই। বাবার মতো কষ্ট করতে চাই না। বাদাম বিক্রি করি, কারণ বাসায় টাকা লাগে। স্কুলে সবাই খেলাধুলা করে, আমারও খে

টিফিনের ঘণ্টা বাজলেই বদলে যায় মাহিমের পরিচয়

স্কুলের ইউনিফর্ম পরা ছোট্ট ছেলেটিকে দেখে প্রথমে অন্য শিক্ষার্থীদের মতোই মনে হবে। কিন্তু টিফিনের ঘণ্টা বাজতেই তার পরিচয় বদলে যায়। সে তখন আর শুধু একজন শিক্ষার্থী নয়, হয়ে ওঠে পরিবারের উপার্জনকারী। এই গল্প মেহেরপুরের আট বছরের মাহিমের।

মাহিম মেহেরপুর সদর উপজেলার ইসলামপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্র। দেড় বছর আগে স্ট্রোকে তার বাবা মান্নান আলীর মৃত্যু হয়। এরপর থেকেই মা শিল্পী খাতুন, এক বোন ও মাহিমকে নিয়ে সংসারে নেমে আসে চরম অনিশ্চয়তা। কোনো স্থায়ী আয়ের উৎস না থাকায় বাধ্য হয়েই ছোট্ট মাহিমের হাতে তুলে দেওয়া হয় বাদামের প্যাকেট।

প্রতিদিন সকালে স্কুলে আসে মাহিম। ক্লাসে মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনা করে। টিফিনের ঘণ্টা বাজতেই অন্য শিক্ষার্থীরা যখন মাঠে খেলায় মেতে ওঠে, তখন মাহিম হাতে বাদাম নিয়ে স্কুল প্রাঙ্গণ ও আশপাশে বাদাম বিক্রি শুরু করে। স্কুল ছুটির পরও বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত চলে তার এই সংগ্রাম। বাড়ি ফিরে ক্লান্ত শরীর নিয়েই বসতে হয় পড়ার টেবিলে।

মাহিম জানায়, লেখাপড়া করে বড় মানুষ হতে চাই। বাবার মতো কষ্ট করতে চাই না। বাদাম বিক্রি করি, কারণ বাসায় টাকা লাগে। স্কুলে সবাই খেলাধুলা করে, আমারও খেলতে ইচ্ছা করে। কিন্তু আগে বাদাম বিক্রি করতে হয়। কথাগুলো বলতে বলতে শিশুটির চোখে ফুটে ওঠে একরাশ স্বপ্ন আর বাস্তবতার নির্মম চাপ।

মা শিল্পী খাতুন চোখের পানি মুছতে মুছতে শিল্পী খাতুন বলেন, স্বামী দেড় বছর আগে স্ট্রোকে মারা যান। এরপর সংসার চালানো খুব কঠিন হয়ে পড়ে। অনেক জায়গায় কাজ খুঁজেছি, কিন্তু নিয়মিত কাজ পাইনি। বাধ্য হয়েই ছেলের হাতে বাদাম তুলে দিয়েছি। একজন মা হিসেবে এটা খুব কষ্টের। আমি চাই ছেলে শুধু লেখাপড়া করুক। কিন্তু না খেয়ে তো থাকা যায় না।

তিনি আরও বলেন, সরকার বা কোনো সহৃদয় ব্যক্তি যদি আমাদের পাশে দাঁড়ায়, তাহলে ছেলেটাকে আর বাদাম বিক্রি করতে হবে না।

মাহিমের সহপাঠী লাবিব হাসান জানায়, টিফিনের সময় খেলি। মাহিম তখন বাদাম বিক্রি করে। আমরা চাই ও আমাদের সঙ্গে খেলুক।

সহপাঠী রাসেল হোসেন জানায়, মাহিম খুব ভালো। স্যার যা পড়ান, সে সেগুলো পারে। ওর যেন আর কষ্ট না করতে হয়।

আরেক সহপাঠী রাজ জানায়, মাঝে মাঝে মাহিমের কাছ থেকে বাদাম কিনি ও সবসময় হাসিমুখে থাকে। কিন্তু বুঝি ও অনেক কষ্ট করে।

স্থানীয় বাসিন্দা আলেক হোসেন বলেন, মাহিম শুধু একটি নাম নয়, সে সমাজের অসংখ্য সুবিধাবঞ্চিত শিশুর প্রতিচ্ছবি। দারিদ্র্য তাদের শৈশব কেড়ে নিচ্ছে, খেলাধুলার মাঠ থেকে ঠেলে দিচ্ছে জীবিকার সংগ্রামে। অথচ যথাসময়ে সরকারি সহায়তা, সামাজিক উদ্যোগ এবং মানবিক সহযোগিতা পেলে এই শিশুরাও স্বপ্ন নিয়ে এগিয়ে যেতে পারে।

আরেক বাসিন্দা আরিফ হোসেন বলেন, মাহিমের ছোট্ট দুটি হাত আজ বাদাম বিক্রি করছে, কিন্তু সেই হাতেই হয়ত একদিন গড়ে উঠতে পারে সুন্দর ভবিষ্যৎ। প্রয়োজন শুধু সমাজ ও রাষ্ট্রের আন্তরিক সহযোগিতা।

ইসলামপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রফিকুল ইসলাম জানান, মাহিম নিয়মিত বিদ্যালয়ে আসে। পারিবারিক অসচ্ছলতার কারণে তাকে পড়াশোনার পাশাপাশি বাদাম বিক্রি করতে হচ্ছে। বিষয়টি ব্যথিত করে। বিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে যতটা সম্ভব সহযোগিতা করছি। তবে শিশুটির জন্য সরকারি ও সামাজিক সহায়তা খুবই প্রয়োজন।

মেহেরপুর জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উপপরিচালক আসাদুল ইসলাম বলেন, মাহিমের বিষয়ে তারা অবগত হয়েছেন। শিশুটির পরিবারকে যাচাই-বাছাই করে সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় আনা হবে। পাশাপাশি শিশুটির শিক্ষা যেন বাধাগ্রস্ত না হয়, সে বিষয়েও প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করা হবে।

আসিফ ইকবাল/এসজেডএইচ/জেআইএম

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow