টুপির রাজনীতি ও নির্বাচন

বাংলাদেশে ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে প্রকৃতির রূপ বদলায়, আর নির্বাচন এলে বদলায় রাজনীতিবিদদের অবয়ব। বছরের বাকি সময় যাদের আধুনিক স্যুট-কোট বা বাহারি পোশাকে দেখা যায়, ভোটের হাওয়া বইতেই তাদের আলমারি থেকে বেরিয়ে আসে ধবধবে সাদা পাঞ্জাবি আর নেকি টুপি। এ যেন এক জাদুকরী রূপান্তর! যদিও তারা কি আসলে নিজেরা টুপি পরেন নাকি জনগণকে টুপি পরান, সেটা বিস্তর চিন্তার বিষয়।   তবে এই টুপির রাজনীতি যে ভোটের মাঠে মোটের ওপর মুনাফাদায়ী, তাতে মনে হয় কারো দ্বিমত থাকবে না। আর তাই এবারও নির্বাচনের বেশ আগে থেকেই রাজনীতিবিদদের মাথায় শোভা পাচ্ছে টুপি। কারণ ভোটের মাঠে টুপির মুনাফার হিসেব বুঝতে তারা কেউ কারো থেকে পিছিয়ে নন। ভোটের এই ‘মৌসুমি টুপিপ্রীতি’র গভীরে রয়েছে এক জটিল রাজনৈতিক ও সামাজিক মনস্তত্ত্ব। বাংলাদেশের গ্রামীণ ও মফস্বল জনপদ এখনো যথেষ্ট ধর্মপ্রাণ। সাধারণ মানুষের কাছে টুপি বা তসবিহ কেবল পোশাক নয়, বরং নৈতিকতা, সততা ও শুদ্ধাচারের প্রতীক। রাজনীতিবিদরা খুব ভালো করেই জানেন, যুক্তির চেয়ে আবেগ এ দেশে দ্রুত কাজ করে। তাই একজন প্রার্থী যখন টুপি পরে মঞ্চে দাঁড়ান, তিনি আসলে নিঃশব্দে তিনটি শক্তিশালী বার্তা দেন: এক, নৈতিক

টুপির রাজনীতি ও নির্বাচন

বাংলাদেশে ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে প্রকৃতির রূপ বদলায়, আর নির্বাচন এলে বদলায় রাজনীতিবিদদের অবয়ব। বছরের বাকি সময় যাদের আধুনিক স্যুট-কোট বা বাহারি পোশাকে দেখা যায়, ভোটের হাওয়া বইতেই তাদের আলমারি থেকে বেরিয়ে আসে ধবধবে সাদা পাঞ্জাবি আর নেকি টুপি। এ যেন এক জাদুকরী রূপান্তর! যদিও তারা কি আসলে নিজেরা টুপি পরেন নাকি জনগণকে টুপি পরান, সেটা বিস্তর চিন্তার বিষয়।
 
তবে এই টুপির রাজনীতি যে ভোটের মাঠে মোটের ওপর মুনাফাদায়ী, তাতে মনে হয় কারো দ্বিমত থাকবে না। আর তাই এবারও নির্বাচনের বেশ আগে থেকেই রাজনীতিবিদদের মাথায় শোভা পাচ্ছে টুপি। কারণ ভোটের মাঠে টুপির মুনাফার হিসেব বুঝতে তারা কেউ কারো থেকে পিছিয়ে নন।

ভোটের এই ‘মৌসুমি টুপিপ্রীতি’র গভীরে রয়েছে এক জটিল রাজনৈতিক ও সামাজিক মনস্তত্ত্ব। বাংলাদেশের গ্রামীণ ও মফস্বল জনপদ এখনো যথেষ্ট ধর্মপ্রাণ। সাধারণ মানুষের কাছে টুপি বা তসবিহ কেবল পোশাক নয়, বরং নৈতিকতা, সততা ও শুদ্ধাচারের প্রতীক। রাজনীতিবিদরা খুব ভালো করেই জানেন, যুক্তির চেয়ে আবেগ এ দেশে দ্রুত কাজ করে। তাই একজন প্রার্থী যখন টুপি পরে মঞ্চে দাঁড়ান, তিনি আসলে নিঃশব্দে তিনটি শক্তিশালী বার্তা দেন: এক, নৈতিক বিশুদ্ধতা: আমি একজন খোদাভীরু মানুষ, তাই আমি দুর্নীতিমুক্ত থাকব। দুই, সাংস্কৃতিক নৈকট্য : আমি আপনাদেরই একজন, আপনাদের ধর্মীয় মূল্যবোধের অংশীদার। তিন, ঐতিহ্যের ধারক : আমি এ দেশের হাজার বছরের মুসলিম ঐতিহ্যকে ধারণ করি।

ভোটের বাজারে ধর্মের মার্কেটিং এই দেশে নতুন কোনো প্রডাক্ট নয়। সেই পাকিস্তান আমল থেকেই এই প্রডাক্টের কাটতি বেশ ভালো। শোনা যায়, ’৫৪-এর নির্বাচনে ফতোয়া এসেছিল— মুসলিম লীগকে ভোট না দিলে নাকি ‘বিবি তালাক’ হয়ে যাবে! কী ভয়ংকর অফার! স্বাধীন বাংলাদেশে এই প্রডাক্ট ব্যান করা হলেও, সামরিক শাসকরা তাকে আবার নতুন প্যাকেজিংয়ে বাজারে ফিরিয়ে আনেন।

এরপর থেকে সব বড় দলই এই লাভজনক ব্যবসায় বিনিয়োগ করেছে। ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, ধানের শীষে বিসমিল্লাহ’ কিংবা ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, নৌকার মালিক তুই আল্লাহ’— এই ধরনের স্লোগানগুলো ছিল সেই সময়ের সফল মার্কেটিং জিঙ্গেল। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে শেখ হাসিনার হিজাব ও তসবিহসহ পোস্টার ছিল এক দুর্দান্ত রি-ব্র্যান্ডিং কৌশল। সেই ধারাবাহিকতায়, টুপি এখন নির্বাচনী প্রচারণার এক অবিচ্ছেদ্য ফ্যাশন অনুষঙ্গ।

মজার ব্যাপার হলো, এই টুপি পরার হিড়িক এখন আর কোনো নির্দিষ্ট দলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। ধর্মনিরপেক্ষ বলে পরিচিত দলের নেতারাও আজকাল সমান তালে টুপি মাথায় দিয়ে আধ্যাত্মিকতার দৌড়ে শামিল হয়েছেন। নির্বাচনী আচরণবিধিতে ধর্মকে ব্যবহার করে প্রচার চালানো নিষেধ? আরে ধুর! টুপি তো কোনো প্রচার নয়, এ তো নিছকই এক 'হেডওয়্যার'! মিনার বা শঙ্খ যখন নির্বাচনী প্রতীক হতে পারে, তখন মাথায় এক টুকরো কাপড় পরা তো নস্যি!

তবে সময় বদলেছে। বিশ-ত্রিশ বছর আগে যে কৌশল অনায়াসে কাজ করত, সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে তা এখন বুমেরাং হয়ে ফিরছে। ফেসবুক-ইউটিউবের আর্কাইভ নেতাদের অতীত ও বর্তমানের বৈপরীত্য মুহূর্তেই সামনে এনে দিচ্ছে। 
সম্প্রতি এক ভাইরাল ভিডিওতে দেখা গেল, ঢাকা-৮ আসনের এক তরুণ প্রার্থীকে এক ভোটার মুখের ওপর বলে দিলেন, ‘ভাই, এই যে নির্বাচনের জন্য টুপিটা পরছেন, এতদিন তো আপনার মাথায় চুল ছাড়া আর কিছু দেখিনি!’ এই একটি ঘটনাই হলো এই মৌসুমি ধার্মিকতার নাটকের একটি বাজে রিভিউ। কুমিল্লা-৪ আসনের এক প্রার্থী তো রাখঢাক না রেখেই বলেছেন, নির্বাচনের আগে ইস্ত্রি করা পাঞ্জাবি আর লম্বা টুপি পরে মাঠে নেমে যাওয়ার এই 'হিপোক্রেসি' এখন পাবলিক ধরে ফেলেছে।

দুর্ভাগ্যজনকভাবে, নির্বাচনের পর নেতাদের এই টুপিগুলো ড্রয়ারে বন্দি হয়ে যায়। যারা নির্বাচনের আগে বড় বড় ধর্মীয় বুলি আওড়ান, গদিতে বসার পর তাদের অনেকের আচরণে সেই ধার্মিকতার লেশমাত্র থাকে না। ধর্মকে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের মাধ্যম বানানোয় ধর্ম যেমন কলুষিত হয়, তেমনি রাজনীতির প্রতিও সাধারণ মানুষের এক ধরনের বিতৃষ্ণা তৈরি হয়। একে এক প্রকার ‘পলিটিক্যাল মার্কেটিং’ বলা যেতে পারে, যেখানে ধর্ম একটি ‘পণ্য’ হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

পরিশেষে, রাজনীতিতে প্রতীক থাকবেই, কিন্তু প্রতীক যখন প্রবঞ্চনার হাতিয়ার হয়, তখন তা গণতন্ত্রের জন্য অশনিসংকেত। রাজনীতিবিদদের বোঝা উচিত, টুপি পরা অপরাধ নয়, কিন্তু টুপিকে ভোটের ফাঁদ বানানো নৈতিক অপরাধ। জনগণ এখন আর কেবল ‘লেবাস’ দেখে মুগ্ধ হওয়ার মতো বোকা নেই; তারা এখন প্রার্থীর আমলনামা আর কাজের হিসেব মেলাতে জানে।

ভোটের মাঠে টুপি পরে জনগণকে টুপি পরানোর এই পুরোনো খেলা বন্ধ হওয়া প্রয়োজন। নেতাদের মনে রাখা উচিত, যে জনগণ তাদের ভোটে জেতায়, সেই জনগণই একদিন সচেতনতার টুপি পরে নেতাদের আসল রূপ উন্মোচন করে দিতে পারে। দিনশেষে, টুপির চটকদার বিজ্ঞাপনের চেয়ে কর্মের স্বচ্ছতাই হোক রাজনৈতিক শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠি।

মুজাহিদুল ইসলাম : সংবাদকর্মী 
 

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow