‘টুয়েলভথ ফেইল’ গল্পের মতো বিসিএস ক্যাডার আমিনুল

4 days ago 3

মো. আমিনুল ইসলাম ৪৪তম বিসিএসে শিক্ষা ক্যাডারে (অর্থনীতি) উত্তীর্ণ হয়েছেন। তিনি মলাজানী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি এবং মুক্তাগাছা মহাবিদ্যালয় থেকে এইচএসসি পাস করেন। এরপর আনন্দ মোহন কলেজ থেকে অর্থনীতিতে প্রথম শ্রেণিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পাস করেন। তার বিসিএস যাত্রার গল্প ও নতুনদের পরামর্শ নিয়ে কথা বলেছেন জাগো নিউজের সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আনিসুল ইসলাম নাঈম—

জাগো নিউজ: আপনার শৈশব ও বেড়ে ওঠা সম্পর্কে বলুন—
মো. আমিনুল ইসলাম: আমার শৈশব ও কৈশোর কেটেছে গ্রামে। বাড়ি ময়মনসিংহের মুক্তাগাছা উপজেলার দুল্লা ইউনিয়নের নবীনগর চতল। এটি ছিল প্রত্যন্ত একটি গ্রাম। বর্ষাকালে রাস্তায় হাঁটুসম কাদামাটি থাকতো। স্কুলে যাওয়ার সময় নদীর ওপর নির্মিত বাশের সেতু পার হতে হতো। বর্ষাকালে যখন সেতুটি তলিয়ে যেত; তখন কলাগাছের ভেলায় চড়ে নদী পার হতে হতো। এ জন্য মাঝে মাঝে লুঙ্গি পরে খালি পায়ে স্কুলে যেতাম।

জাগো নিউজ: আপনার পড়াশোনা সম্পর্কে বলুন—
মো. আমিনুল ইসলাম: আমি বরাবরই মাঝারি মানের ছাত্র ছিলাম। ছাত্র অবস্থায় কখনো বৃত্তি কিংবা জিপিএ-৫ পাওয়া ছাত্র ছিলাম না। নিজের গ্রামের প্রাইমারি স্কুল শেষ করে ষষ্ঠ শ্রেণিতে পার্শ্ববর্তী গ্রামের হাইস্কুলে ভর্তি হই। আমার স্কুল অবকাঠামোগত দিক থেকে তেমন ভালো ছিল না। যেখানে কোনো বিদ্যুৎ কিংবা স্কুলের দরজা, জানালা কিছুই ছিল না। শুধু ছিল টিনের একটা লম্বা ঘর; ক্লাসরুমের অপর্যাপ্ততা ছিল। নবম শ্রেণিতে আমিসহ মোট ৫ জন বিজ্ঞান বিভাগ নিই; যেখানে ৪ জনই আবার মেয়ে। আমিই একমাত্র ছাত্র হিসেবে উচ্চতর গণিত নিয়েছিলাম। আমাদের বিজ্ঞান বিভাগের ক্লাস করতে হতো মাঝে মাঝে খোলা মাঠে কিংবা গাছের তলায়—ল্যাব ক্লাসের কথা না-ই বললাম। এভাবে এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ ৪.৪৪ পেয়ে উত্তীর্ণ হলাম।

এরপর উপজেলার মুক্তাগাছা মহাবিদ্যালয়ে বিজ্ঞান বিভাগে এইচএসসিতে ভর্তি হই। আমার জীবনের কালো অধ্যায় হচ্ছে এইচএসসি জীবন। টেস্ট পরীক্ষার আগে কখনো সব বিষয়ে কোনো দিন পাস করিনি। পদার্থে পাস করলে রসায়নে ফেল; না হয় গণিতে ফেল। আমি ছিলাম ১০ জন ব্যাকবেঞ্চারের মধ্যে অন্যতম। অনেকটা বলিউডের টুয়েলভথ ফেইল গল্পের মতো। ইন্টার লাইফে একদম পড়ালেখা করতাম না; কেন করতাম না তা এখন আমারও বুঝে আসে না। হয়তো মা-বাবার শাসন ছেড়ে শহরে এসে অবাধ স্বাধীনতা পেয়ে উচ্ছন্নে গিয়েছিলাম। অবধারিত ভাবেই ইন্টারের ফাইনাল রেজাল্ট খারাপ করি। মাত্র জিপিএ ৩.৬০ পেয়ে উত্তীর্ণ হই। আমারা যারা ৪৪তম বিসিএসে ক্যাডার পেয়েছি, মনে হয় না এত কম পয়েন্ট পেয়ে কেউ ক্যাডার হয়েছে।

খারাপ রেজাল্ট করাতে কোনো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দেইনি। আমি আসলে অ্যাডমিশন কোচিংই করিনি। রেজাল্ট পরবর্তী অনেকেই আমাকে উপদেশ দিতেন গার্মেন্টসের চাকরি করতে। কারণ আমাকে দিয়ে নাকি কিছু হবে না। পরে ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে ভর্তি হই আনন্দ মোহন কলেজের অর্থনীতি বিভাগে। আমার জীবনের টার্নিং পয়েন্ট এখান থেকেই। আমি যখন অনার্স ২য় বর্ষে ডিপার্টমেন্টে সিজিপিএ ৩.৭১ পেয়ে প্রথম হই; তখন আমার ভালো কিছু করার একটা স্পৃহা জাগলো; আমার দ্বারাও ভালো কিছু হবে। এভাবে সিজিপিএ ৩.৪২ নিয়ে ডিপার্টমেন্টে ৩য় হয়ে অনার্স এবং ৩.৫৩ সিজিপিএ নিয়ে ডিপার্টমেন্টে ১ম হয়ে মাস্টার্স শেষ করি।

জাগো নিউজ: ৪৪তম বিসিএসে শিক্ষা (অর্থনীতি) ক্যাডার পেয়েছেন, অনুভূতি কেমন?
মো. আমিনুল ইসলাম: আসলে আমাদের ৪৪তম বিসিএসের রেজাল্ট দিতে দিতে রাত তখন ১১টা বেজে ৪০ মিনিট। যখন রেজাল্ট দিলো, সাথে সাথেই মোবাইল অফ করে দিয়ে ‘আল্লাহ আল্লাহ’ করছিলাম। আমরা একসঙ্গে ৭ জন থাকি। তার মধ্যে ৫ জন বিসিএস ভাইভা দিয়েছিলাম। ভাইদের জেনারেল ক্যাডার ছিল। তাই তাদের যখন আসলো না, আমি তখন ভয় পেয়ে রেজাল্ট দেখার সাহস হারিয়ে ফেলি। কারণ ভাইয়েরা প্রত্যেকেই ছিল অনেক মেধাবী। তাই আমি প্রকৃতপক্ষে রেজাল্ট দেখার সাহস হারিয়ে ফেলি। যদি ক্যাডার না হই, তাহলে তো আমারও স্বপ্নভঙ্গ হয়ে যাবে এই ভেবে। অবশেষে প্রায় ২০ মিনিট অতিবাহিত হওয়ার পর এক ভাই রেজাল্ট দেখে বলে, ‘আপনার ক্যাডার আসছে’। সত্যি সত্যিই দেখি আমার রোল মেধাক্রম দশমে! সে সময়টা আমার জীবনের সেরা মুহূর্ত ছিল।

জাগো নিউজ: বিসিএসের স্বপ্ন দেখেছিলেন কখন থেকে?
মো. আমিনুল ইসলাম: মানুষ তার স্বপ্নের সমান বড়। আমি যখন ডিপার্টমেন্টে ভালো করা শুরু করি; তখন থেকেই আমার মনের ভেতরে বিসিএসের স্বপ্ন ধীরে ধীরে জাগতে শুরু করে।

জাগো নিউজ: বিসিএস যাত্রার গল্প শুনতে চাই, প্রস্তুতি কীভাবে নিয়েছেন?
মো. আমিনুল ইসলাম: আসলে আমাকে সেভাবে গাইড করার মতো কেউ ছিল না। তাই বিসিএস শুরু করতে করতেই অনার্স ফাইনাল ইয়ার হয়ে যায়। আমার প্রথম বিসিএস ছিল ৩৮তম। তখন মাত্রই অনার্স পাস করেছি—প্রস্তুতি একদম শূন্যের কোটায়। এরপর একটি কোচিংয়ে প্রিলিমিনারির জন্য ভর্তি হই। সেখান থেকেই মূলত বিসিএসের একটা ভালো বেজমেন্ট গড়ে ওঠে। এরপর রিটেনের জন্য অন্য একটি কোচিংয়ে ভর্তি হয়েছিলাম। এভাবে টানা ৪টি (৪০, ৪১, ৪৩ ও ৪৪) প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হই। ৪০তম বিসিএসের লিখিত পরীক্ষা দেওয়া হয়নি ব্যক্তিগত কারণে। এরপর ৪১তম বিসিএস থেকে নন-ক্যাডার হই; যদিও কিছুই পাইনি, খালি হাতেই ফিরি। খুবই অপ্রত্যাশিতভাবে ৪৩তম লিখিত পরীক্ষায় ফেল করি। অবশেষে আমার ৫ম বিসিএস ৪৪তম থেকে আমার কাঙ্ক্ষিত ক্যাডার পাই।

জাগো নিউজ: বিসিএস জার্নিতে কোনো প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে হয়েছিল?
মো. আমিনুল ইসলাম: আসলে আমার সেরকম প্রতিবন্ধকতা ছিল না। পরিবার থেকে সব সময় সাপোর্ট দিয়েছে। বেকার লাইফে সবারই স্ট্রাগল করতে হয়, এটাই স্বাভাবিক। হয়তো ভালো একটা শার্ট না কিনে ২-৩টি বই কিনতাম। কষ্ট আছে বলেই মানুষের জীবন এত সুন্দর হয়। হয়তো আমার নিজের গাফিলতির জন্য ক্যাডার পেতে পেতে পাঁচটা বিসিএস পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছে। হয়তোবা আমার রিজিকে আগের বিসিএসে বা অন্য কোনো জব ছিল না।

জাগো নিউজ: আড়াল থেকে কেউ অনুপ্রেরণা জুগিয়েছেন?
মো. আমিনুল ইসলাম: আসলে সব সফল ব্যক্তির পেছনে একজন ব্যক্তি থাকেন, যিনি তাকে তার লক্ষ্যে পৌছে দেওয়া পর্যন্ত নিরলসভাবে কাজ করে যান। তেমনই আমার আব্বা আমার পাশে সব সময় ছিলেন। আমি রেজাল্ট পেয়ে প্রথম আব্বাকেই জানাই। তিনি আমার এই দীর্ঘ পথচলায় সব সময় সাহস ও আর্থিকভাবে সাপোর্ট দিয়ে গেছেন। আমার খুশির চেয়ে আমার আব্বাই অনেক বেশি খুশি হয়েছেন যে, একজন কৃষক হয়েও ছেলেকে বিসিএস ক্যাডার বানাতে পেরেছেন। এ ছাড়া আমার বড় ভাই, বোন, ভগ্নিপতি, কয়েকজন বন্ধু—এই দীর্ঘ পথচলায় সাহস জুগিয়েছেন, সাপোর্ট দিয়েছেন। সবার কাছেই চির কৃতজ্ঞ।

জাগো নিউজ: নতুনরা বিসিএসের জন্য কীভাবে প্রস্তুতি নেবেন?
মো. আমিনুল ইসলাম: বাংলাদেশের সবচেয়ে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় বসার জন্য নিজেকে সেভাবেই প্রস্তুতি নিতে হবে। বিসিএস হচ্ছে একটা দীর্ঘমেয়াদী প্রক্রিয়া। তাই আপনাকে পরিশ্রমী, ধৈর্যশীল এবং কৌশলী হতে হবে। আপনাদের প্রিলিমিনারি প্রস্তুতিটা একবারেই এমনভাবে নিতে হবে, যাতে আপনার প্রায় ৫০% লিখিত পরীক্ষার সিলেবাসও কভার হয়ে যায়। কারণ পিএসসির রোডম্যাপ অনুযায়ী এখন প্রিলি রেজাল্টের দুই মাস পরেই লিখিত পরীক্ষা হয়ে যাবে। তাই আপনার বেসিক শক্ত করার জন্য নিয়মিত বাংলা, ইংরেজি, গণিত—বিষয়গুলো পড়বেন নিয়মিত। বিষয়গুলো সব চাকরির পরীক্ষার ক্ষেত্রেই কমন।

জাগো নিউজ: আপনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী?
মো. আমিনুল ইসলাম: আমার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা হচ্ছে, আমার সাবজেক্ট অর্থনীতির ওপর উচ্চতর ডিগ্রি নেওয়া। একজন আদর্শ শিক্ষক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা। কারণ শিক্ষকতা হচ্ছে মহান পেশা, যা আপনার কর্মের মাধ্যমেই অর্জন করে নিতে হবে।

এসইউ/এএসএম

Read Entire Article