ট্রাম্প–পুতিনের চীন সফর: নতুন ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ ও বাংলাদেশের কৌশল

বর্তমান বিশ্ব রাজনীতিতে কূটনৈতিক নাটকের অন্যতম প্রধান মঞ্চ এখন বেইজিং। কয়েক বছর আগেও যেখানে আন্তর্জাতিক কূটনীতির বড় ঘটনাগুলো মূলত ওয়াশিংটন, মস্কো বা ব্রাসেলসকে ঘিরে আবর্তিত হতো, সেখানে এখন চীনকে কেন্দ্র করে নতুন এক সমীকরণ গড়ে উঠছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের চীন সফর শেষ হতে না হতেই ভ্লাদিমির পুতিনের বেইজিংগামী যাত্রা সেই পরিবর্তনকে যেন চোখে আঙুল দিয়ে দেখাল। এই দুই সফরকে কেবল আলাদা দু’টি দ্বিপাক্ষিক সফর হিসেবে দেখলে পুরো চিত্র বোঝা যাবে না; এর ভেতরে বর্তমান বৈশ্বিক শক্তি-বিন্যাসের গভীর পরিবর্তনের ইঙ্গিত লুকিয়ে আছে, যা আগামী দিনের আন্তর্জাতিক সম্পর্ককে নতুনভাবে গড়ে দিতে পারে। চীন এখন এমন এক অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে একদিকে সে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তীব্র অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত প্রতিদ্বন্দ্বিতায় লিপ্ত, অন্যদিকে রাশিয়ার সঙ্গে কৌশলগত ঘনিষ্ঠতা বাড়িয়ে নিজের অবস্থানকে আরও শক্ত করছে। ফলে বেইজিং শুধু আঞ্চলিক শক্তি নয়, বরং বৈশ্বিক কূটনৈতিক দরকষাকষির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। ট্রাম্প ও পুতিন—এই দুই প্রভাবশালী নেতার পরপর চীন সফর সেই পরিবর্তিত বাস্তবতারই প্রতিচ্ছবি। ট্রাম্পের চীন সফর: প্রতিদ্বন্দ্বিতার

ট্রাম্প–পুতিনের চীন সফর: নতুন ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ ও বাংলাদেশের কৌশল

বর্তমান বিশ্ব রাজনীতিতে কূটনৈতিক নাটকের অন্যতম প্রধান মঞ্চ এখন বেইজিং। কয়েক বছর আগেও যেখানে আন্তর্জাতিক কূটনীতির বড় ঘটনাগুলো মূলত ওয়াশিংটন, মস্কো বা ব্রাসেলসকে ঘিরে আবর্তিত হতো, সেখানে এখন চীনকে কেন্দ্র করে নতুন এক সমীকরণ গড়ে উঠছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের চীন সফর শেষ হতে না হতেই ভ্লাদিমির পুতিনের বেইজিংগামী যাত্রা সেই পরিবর্তনকে যেন চোখে আঙুল দিয়ে দেখাল। এই দুই সফরকে কেবল আলাদা দু’টি দ্বিপাক্ষিক সফর হিসেবে দেখলে পুরো চিত্র বোঝা যাবে না; এর ভেতরে বর্তমান বৈশ্বিক শক্তি-বিন্যাসের গভীর পরিবর্তনের ইঙ্গিত লুকিয়ে আছে, যা আগামী দিনের আন্তর্জাতিক সম্পর্ককে নতুনভাবে গড়ে দিতে পারে।

চীন এখন এমন এক অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে একদিকে সে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তীব্র অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত প্রতিদ্বন্দ্বিতায় লিপ্ত, অন্যদিকে রাশিয়ার সঙ্গে কৌশলগত ঘনিষ্ঠতা বাড়িয়ে নিজের অবস্থানকে আরও শক্ত করছে। ফলে বেইজিং শুধু আঞ্চলিক শক্তি নয়, বরং বৈশ্বিক কূটনৈতিক দরকষাকষির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। ট্রাম্প ও পুতিন—এই দুই প্রভাবশালী নেতার পরপর চীন সফর সেই পরিবর্তিত বাস্তবতারই প্রতিচ্ছবি।

ট্রাম্পের চীন সফর: প্রতিদ্বন্দ্বিতার ভেতরে সহযোগিতার সন্ধান

এ মাসের ১৩ থেকে ১৫ মে পর্যন্ত ট্রাম্পের বেইজিং সফরটি এমন এক সময়েই হলো, যখন মার্কিন–চীন সম্পর্ক নানা স্তরে টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বাণিজ্যযুদ্ধ, শুল্ক আরোপ, প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণ, ৫জি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় প্রতিযোগিতা, সেমিকন্ডাক্টর সরবরাহ শৃঙ্খল, এর সঙ্গে যোগ হয়েছে তাইওয়ানকে ঘিরে সামরিক উত্তেজনা এবং ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল; সব মিলিয়ে দুই দেশের সম্পর্ক এখন “কোল্ড ওয়ার-পরবর্তী নতুন শীতল প্রতিযোগিতা”র এক ধরনের রূপ পাচ্ছে। এমন প্রেক্ষাপটে মার্কিন প্রেসিডেন্টের চীন সফর স্বাভাবিকভাবে অতিরিক্ত মনোযোগ কাড়ে।

এক অর্থে এই সফর একটি বাস্তব স্বীকারোক্তিও বটে: চীনকে সম্পূর্ণভাবে পাশ কাটিয়ে আজকের বিশ্ব অর্থনীতি বা উচ্চপ্রযুক্তি শিল্পকে কল্পনা করা কঠিন। চীন এখনো বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি, বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলের একটি কেন্দ্র এবং বহু প্রযুক্তি পণ্যের উৎপাদনঘাঁটি। ফলে “ডিকাপলিং” কিংবা সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্নতার কথা তাত্ত্বিকভাবে আকর্ষণীয় শোনালেও বাস্তবে তা মার্কিন অর্থনীতি ও কোম্পানিগুলোর জন্যও ব্যয়সাধ্য হয়ে দাঁড়ায়। তাই মার্কিন নীতিনির্ধারকরা এখন “ডি-রিস্কিং” বা ঝুঁকি কমানোর কৌশলে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন—চীনকে পুরোপুরি বাদ না দিয়ে নির্ভরতার মাত্রা কমিয়ে আনার চেষ্টা করছেন।

এই প্রেক্ষাপটে ট্রাম্পের সফরে তাইওয়ান, বাণিজ্য ভারসাম্য, প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সেমিকন্ডাক্টর সরবরাহ, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা—এসব বিষয় আলোচনায় এসেছে বলে ধারণা করা যায়। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র চীনের প্রযুক্তি শিল্পকে নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে নিজের প্রাধান্য ধরে রাখতে চায়, অন্যদিকে বৈশ্বিক বাজার ও সরবরাহ শৃঙ্খলের স্থিতিশীলতার জন্য চীনের সঙ্গে ন্যূনতম কার্যকর সম্পর্ক বজায় রাখাও তার জন্য অপরিহার্য। এই দ্বৈত বাস্তবতা থেকেই ট্রাম্পের সফরকে “ম্যানেজড প্রতিদ্বন্দ্বিতা” বা নিয়ন্ত্রিত প্রতিযোগিতার অংশ হিসেবে দেখা যেতে পারে।

সফরটিতে দ্বিপাক্ষিক মতবিরোধ কমানোর কোনো নাটকীয় অগ্রগতি না হলেও দু’পক্ষই যে সরাসরি সংঘাত এড়িয়ে সীমিত সহযোগিতার কিছু ক্ষেত্র ধরে রাখতে চায়, সেই বার্তা এই সফর থেকে স্পষ্টভাবে বেরিয়ে এসেছে। কূটনৈতিক ভাষায় এটা অনেক সময় “কম্পিটিশন উইথ গার্ডরেইলস”—অর্থাৎ, প্রতিযোগিতা থাকবে, তবে এমন কিছু নিয়ন্ত্রণ থাকবে, যা পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণের বাইরে যেতে দেবে না।

পুতিনের চীন সফর: চাপের মধ্যে কৌশলগত ঘনিষ্ঠতা

ট্রাম্পের সফরের মাত্র কয়েকদিন পর, ১৯–২০ মে পুতিনের বেইজিং সফর এই পুরো প্রেক্ষাপটকে ভিন্ন একটি মাত্রা দিয়েছে। ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার ফলে রাশিয়ার অর্থনীতি মারাত্মক চাপে পড়েছে, বিশেষ করে জ্বালানি রপ্তানি ও আর্থিক লেনদেনের ক্ষেত্রে। ইউরোপীয় বাজারের বড় অংশ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় মস্কোকে নতুন ক্রেতা ও নতুন আর্থিক চ্যানেল খুঁজতে হয়েছে; এই সংকটে চীন তার অন্যতম প্রধান ঠিকানা হয়ে উঠেছে।

চীনের জন্যও রাশিয়া গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অংশীদার। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সঙ্গে ক্রমবর্ধমান প্রতিদ্বন্দ্বিতার ভেতর দিয়ে চীন এমন এক অবস্থানে যেতে চায় না, যেখানে সে সম্পূর্ণ একা পড়ে যাবে। রাশিয়ার বিশাল জ্বালানি সম্পদ, সামরিক সক্ষমতা এবং ইউরেশীয় অঞ্চলে প্রভাব—এসব মিলিয়ে মস্কোকে পাশে রাখা বেইজিংয়ের জন্য তাৎপর্যপূর্ণ। ফলে দুই দেশের সম্পর্ককে অনেক বিশ্লেষক “নো লিমিটস পার্টনারশিপ” বলে বর্ণনা করছেন, যদিও বাস্তবে সেই সম্পর্কও পারস্পরিক স্বার্থ ও প্রয়োজনের ভিত্তিতেই পরিচালিত হচ্ছে।

পুতিনের এবারের চীন সফরে জ্বালানি সহযোগিতা, বিশেষ করে “পাওয়ার অব সাইবেরিয়া-২” গ্যাস পাইপলাইন প্রকল্প, সামরিক সমন্বয়, প্রযুক্তি আদান-প্রদান এবং ইউরেশীয় ভূ-রাজনীতিতে দুই দেশের যৌথ অবস্থান নিয়ে গভীর আলোচনা হয়েছে বলে ধারণা করা যায়। ইউরোপীয় বাজার সীমিত হয়ে যাওয়ার পর চীনা বাজার রাশিয়ার গ্যাস ও তেলের জন্য একটি বড় আশ্রয়স্থল হয়ে উঠছে, এবং চীনও তুলনামূলক সুবিধাজনক দামে জ্বালানি আমদানির সুযোগ পাচ্ছে। এ ধরনের প্রকল্প শুধু দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে নয়, বরং আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারকেও প্রভাবিত করতে পারে।

এই প্রেক্ষাপটে পুতিনের চীন সফরকে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার মুখে রাশিয়ার “এশিয়া পিভট” বা পূর্বমুখী বিকল্প কূটনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে দেখা যেতে পারে। একই সঙ্গে এটি চীন–রাশিয়া কৌশলগত ঘনিষ্ঠতার নতুন এক পর্যায়কেও সামনে এনেছে, যা ভবিষ্যতে ব্রিকস বা শাংহাই সহযোগিতা সংস্থার মতো প্ল্যাটফর্মে আরও স্পষ্ট হতে পারে।

চীনের ভারসাম্যের কৌশল: স্ট্র্যাটেজিক ব্যালান্সিং

এই দুই সফরের আলোচনায় সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—চীন আসলে কী চায়? বেইজিংয়ের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্যকে সংক্ষেপে বলা যায়: এমন একটি বিশ্বব্যবস্থা, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র এককভাবে আর সব সিদ্ধান্ত নির্ধারণ করতে পারবে না, তবে সরাসরি সামরিক সংঘাতের ঝুঁকিও যেন নিয়ন্ত্রণের বাইরে না যায়। অর্থাৎ, একদিকে মার্কিন আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করা, অন্যদিকে একটি “ম্যানেজড মাল্টি-পোলারিটি” বা নিয়ন্ত্রিত বহুমেরুকেন্দ্রিক পরিস্থিতি তৈরি করা।

এই উদ্দেশ্য থেকেই চীনের কূটনৈতিক কৌশল অনেকটা “স্ট্র্যাটেজিক ব্যালান্সিং”–এর মতো। একদিকে সে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও আর্থিক সম্পর্ক পুরোপুরি ভাঙছে না; অন্যদিকে রাশিয়ার সঙ্গে নিরাপত্তা ও ভূ-রাজনৈতিক সমন্বয় জোরদার করছে। চীন জানে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে খোলামেলা সংঘাত তার অর্থনীতিকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে, আবার রাশিয়াকে সম্পূর্ণ দূরে ঠেলে দিলে পশ্চিমা চাপের মুখে সে কৌশলগতভাবে আরও দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। ফলে দুই দিকেই একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্য রক্ষা করাই এখন বেইজিংয়ের মূল কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ।

ট্রাম্প ও পুতিন—দুই পরাশক্তির নেতার সফর পরপর সফলভাবে আয়োজন করতে পারা এই ভারসাম্য-রাজনীতিরই বাস্তব উদাহরণ। এতে বোঝা যায়, চীন নিজেকে এখন কেবল একটি বড় বাজার বা উৎপাদন কেন্দ্র হিসেবে নয়, বরং এক ধরনের কৌশলগত “মধ্যমণি” হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে, যার দরজা খোলা রাখার প্রয়োজন পড়ছে প্রায় সব বড় শক্তিরই।

বৈশ্বিক রাজনীতিতে নতুন ধারা ও সম্ভাব্য প্রভাব

ট্রাম্প–পুতিনের চীন সফরকে বিস্তৃত পরিসরে দেখলে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবণতা স্পষ্ট হয়। প্রথমত, বিশ্ব রাজনীতি ক্রমান্বয়ে আরও বহুমেরুকেন্দ্রিক হয়ে উঠছে। যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও রাশিয়ার পাশাপাশি ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ভারত, মধ্যপ্রাচ্যের কিছু আঞ্চলিক শক্তি এবং গ্লোবাল সাউথের নতুন জোটগুলো মিলে বহু-অক্ষীয় এক ক্ষমতার ভারসাম্য গড়ে তুলছে। এই বহুমেরুকেন্দ্রিকতার ভেতরেই নানা ধরনের জোট, অংশীদারিত্ব ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে উঠছে এবং ভেঙে যাচ্ছে।

দ্বিতীয়ত, ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে কৌশলগত প্রতিযোগিতা আরও বাড়বে বলেই অনুমান করা যায়। যুক্তরাষ্ট্র একদিকে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, অস্ট্রেলিয়া ও ভারতের সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতা জোরদার করছে; অন্যদিকে চীন রাশিয়া এবং গ্লোবাল সাউথের বিভিন্ন অংশীদারের সঙ্গে নতুন কৌশলগত অবস্থান গড়ে তোলার চেষ্টা করছে। এর প্রভাব শুধু সামরিক মহড়া বা প্রতিরক্ষা বাজেটে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বন্দর, সামুদ্রিক যোগাযোগপথ, বিনিয়োগ এবং প্রযুক্তি–নির্ভর অবকাঠামোর ওপরও এর প্রভাব পড়বে।

তৃতীয়ত, বৈশ্বিক অর্থনীতিতে ডি-ডলারাইজেশনের প্রবণতা আরও গতি পেতে পারে। চীন ও রাশিয়ার মধ্যে নিজস্ব মুদ্রায় বাণিজ্য, ব্রিকস জোটের সম্প্রসারণ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বিকল্প মুদ্রা ব্যবহারের আলোচনা—এসবই ডলারের দীর্ঘমেয়াদি প্রাধান্যের ওপর নতুন চাপ তৈরি করছে। যদিও ডলারকে রাতারাতি সরিয়ে দেওয়ার মতো কোনো পরিস্থিতি এখনই তৈরি হয়নি, তবুও এই ধারা ভবিষ্যৎ আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য একটি নতুন প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে।

চতুর্থত, উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য নতুন কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরি হচ্ছে। একক কোনো শক্তির ওপর পুরোপুরি নির্ভর না করে বিভিন্ন অক্ষের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলার সুযোগ এখন বেশি। তবে একই সঙ্গে ঝুঁকিও আছে—বড় শক্তিগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতার ভেতরে ভুল বার্তা দেওয়া বা অতিরিক্ত পক্ষপাত দেখালে ছোট ও মাঝারি শক্তির দেশগুলোর ওপর চাপ তৈরি হতে পারে, যা অর্থনীতি ও নিরাপত্তা উভয় ক্ষেত্রেই নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

বাংলাদেশের জন্য করণীয়: বাস্তববাদী ও ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি

এই পরিবর্তিত বৈশ্বিক বাস্তবতায় বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য কূটনৈতিক কৌশল নির্ধারণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া—তিন পক্ষই বাংলাদেশের জন্য ভিন্ন ভিন্ন ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার; ফলে কারো সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলতে গিয়ে কারো সঙ্গে অপ্রয়োজনীয়ভাবে সম্পর্ক খারাপ করা বাংলাদেশের স্বার্থের পক্ষে নয়।

প্রথমত, পররাষ্ট্রনীতির কেন্দ্রে অর্থনৈতিক স্বার্থকে আরও স্পষ্টভাবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। চীন এখন বাংলাদেশের বড় অবকাঠামো প্রকল্প, বিদ্যুৎকেন্দ্র, সেতু ও যোগাযোগব্যবস্থায় অন্যতম প্রধান অংশীদার। অন্যদিকে, তৈরি পোশাকসহ নানা পণ্যের জন্য যুক্তরাষ্ট্র আমাদের অন্যতম বৃহৎ রপ্তানি বাজার; শ্রমমান, মানবাধিকার ও গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা–সংক্রান্ত আলোচনাতেও ওয়াশিংটনের অবস্থান বাংলাদেশের অর্থনীতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। রাশিয়া আবার জ্বালানি, এলএনজি, পারমাণবিক বিদ্যুৎ এবং প্রতিরক্ষা সহযোগিতার মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এই বাস্তবতায় বড় শক্তিগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক নির্ধারণের আগে প্রশ্ন হওয়া উচিত—কোন সিদ্ধান্ত আমাদের রপ্তানি, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও কর্মসংস্থানের জন্য কতটা সহায়ক।

দ্বিতীয়ত, কৌশলগত ভারসাম্য রক্ষা করা এখন বাংলাদেশের অন্যতম বড় কূটনৈতিক কাজ। ঢাকা–ওয়াশিংটন, ঢাকা–বেইজিং এবং ঢাকা–মস্কো সম্পর্ককে আলাদা আলাদা সিলো হিসেবে না দেখে একই কৌশলগত ছবির বিভিন্ন অংশ হিসেবে দেখতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নিরাপত্তা ও বাজার–সংক্রান্ত সহযোগিতা জোরদার রেখেও চীনের সঙ্গে উন্নয়ন ও বিনিয়োগ প্রকল্প এবং রাশিয়ার সঙ্গে জ্বালানি ও প্রযুক্তি সহযোগিতা সমান্তরালভাবে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব—যদি নীতিনির্ধারকরা ভারসাম্য রক্ষায় সচেতন থাকেন। মূল চ্যালেঞ্জ হবে, কোনো এক অক্ষের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা যেন অন্য অক্ষের চোখে অতিরিক্ত সন্দেহের কারণ না হয়।

তৃতীয়ত, আঞ্চলিক ও আন্তঃআঞ্চলিক কূটনীতি আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন। বঙ্গোপসাগর ও ভারত মহাসাগরের সংযোগস্থলে বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান আঞ্চলিকভাবে তাকে একটি কৌশলগত সুবিধা দিয়েছে। ভারত, আসিয়ান দেশগুলো, জাপান, মধ্যপ্রাচ্য এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে অর্থনীতি, অবকাঠামো, সমুদ্র-নিরাপত্তা, অভিবাসন ও মানবসম্পদ উন্নয়ন ইস্যুতে সক্রিয় ভূমিকা নেওয়ার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ বড় শক্তিগুলোর কাছে কেবল “নির্ভরশীল” নয়, বরং “প্রাসঙ্গিক ও উপকারী” অংশীদার হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করতে পারে।

বড় প্রকল্প গ্রহণের আগে ঋণের শর্ত, সুদের হার, পরিশোধ সময়সীমা, প্রযুক্তি হস্তান্তরের সুযোগ, পরিবেশগত প্রভাব এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক লাভ–ক্ষতির হিসাব খুব স্বচ্ছভাবে যাচাই করা জরুরি। একই সঙ্গে মানবসম্পদ উন্নয়ন, প্রযুক্তি শিক্ষা, শিল্পখাতের বৈচিত্র্য এবং জ্বালানি নিরাপত্তা—এসবকে জাতীয় কৌশলের কেন্দ্রে আনতে হবে। কেবল অবকাঠামো নির্মাণ দিয়ে উন্নয়ন টেকসই হয় না; তার সঙ্গে দক্ষ জনশক্তি, উদ্ভাবন এবং নীতিনির্ধারণের ধারাবাহিকতাও জরুরি।

“সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়”-বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির এই অন্যতম মূলনীতিকে আজকের বৈশ্বিক বাস্তবতায় অর্থবহ করে তুলতে হলে এর বাস্তব প্রয়োগ দরকার। এর মানে এই নয় যে, আমরা সব বিষয়ে নিরপেক্ষ থাকব বা কোনো অবস্থান নেব না; বরং এর মানে হলো—সব পক্ষের সঙ্গে কাজ করব, কিন্তু সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় নিজের জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে স্বাধীন ও আত্মমর্যাদাশীল অবস্থান বজায় রাখব।

পরিশেষে বলা যায়, ট্রাম্প ও পুতিনের পরপর চীন সফর কেবল প্রোটোকল–নির্ভর কূটনৈতিক কর্মসূচি নয়; বরং এটি বিশ্ব রাজনীতির পরিবর্তিত বাস্তবতার একটি স্পষ্ট চিত্র। চীন এখন শুধু আঞ্চলিক শক্তি নয়, বরং বৈশ্বিক শক্তি-বিন্যাসের কেন্দ্রে অবস্থান করছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র–চীন প্রতিযোগিতা, চীন–রাশিয়া কৌশলগত ঘনিষ্ঠতা এবং গ্লোবাল সাউথের ক্রমবর্ধমান আত্মপ্রকাশ এক নতুন ভূ-রাজনৈতিক যুগের সূচনা করছে। এই নতুন যুগে ছোট ও মাঝারি শক্তির দেশগুলোর সামনে যেমন নতুন সুযোগ খুলে যাচ্ছে, তেমনি ভুল কৌশল গ্রহণের ঝুঁকিও কম নয়।

বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে কার্যকর পথ তাই একটাই—আবেগ নয়, ঠান্ডা মাথায় হিসাব কষে বাস্তববাদী, ভারসাম্যপূর্ণ এবং বহুমাত্রিক পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করা। যেখানে বড় শক্তির প্রতিযোগিতাকে হুমকি হিসেবে নয়, বরং সতর্কতার সঙ্গে ব্যবহৃত একটি সুযোগ হিসেবে দেখা হবে, এবং জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে স্বাধীন অবস্থানই হবে সব কূটনৈতিক সিদ্ধান্তের মূল ভিত্তি।

লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, লোক প্রশাসন বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।
ইমেইল: [email protected]

এইচআর/এমএস

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow