ট্রাম্পের ‘শুল্ক আঘাত’ সামলাতে চীনের কাঁধে ভর করছে ভারত?

9 hours ago 2

ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্কের চাপে ভারতের অর্থনীতি যখন টালমাটাল, ঠিক সেই সময় চীনে গেছেন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। সেখানে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

গত বুধবার থেকে যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি হওয়া ভারতীয় পণ্যের ওপর শুল্ক বেড়ে ৫০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। ট্রাম্প বলেছেন, রাশিয়া থেকে তেল আমদানি অব্যাহত রাখার শাস্তি হিসেবে দিল্লির ওপর বাড়তি এই শুল্ক আরোপ করা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের শুল্ক ভারতের রপ্তানি খাতকে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির মুখে ফেলতে পারে এবং দেশের উচ্চাভিলাষী প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যকে হুমকির মুখে ঠেলে দিতে পারে।

এই প্রেক্ষাপটে বিশ্বের দুই জনবহুল দেশের নেতারা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারেন। যদিও তাদের সম্পর্ক এতদিন সীমান্ত বিরোধ ও অবিশ্বাসে ভরপুর ছিল।

চ্যাথাম হাউসের চিয়েটিজ বাজপেই ও ইউ জি একটি সম্পাদকীয়তে লিখেছেন, ‘সরলভাবে বললে, ভারত-চীনের সম্পর্কের প্রভাব গোটা বিশ্বের ওপর পড়ে।’

তার মতে, পশ্চিমা বিশ্ব—বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র— ভেবেছিল, ভারত কোনোদিনই চীনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারবে না। সেদিক থেকে মোদীর এই সফর একটি সম্ভাব্য মোড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত বহন করছে।

অর্থনৈতিক সম্ভাবনা

চীন এবং ভারত উভয়ই অর্থনৈতিক পরাশক্তি। যথাক্রমে বিশ্বের দ্বিতীয় ও পঞ্চম বৃহত্তম অর্থনীতি তারা। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) বলছে, ভারতের প্রবৃদ্ধি ছয় শতাংশের ওপরে থেকে গেলে দেশটি ২০২৮ সালের মধ্যে বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি হয়ে উঠবে।

বেইজিংভিত্তিক পরামর্শক সংস্থা উসাওয়া অ্যাডভাইজরির প্রতিষ্ঠাতা চিয়ান লিউ বলেন, বিশ্ব সবসময় যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্কের দিকে নজর দিয়েছে। কিন্তু এখন সময় এসেছে চীন ও ভারতের মতো বৃহৎ অর্থনীতি কিভাবে একসঙ্গে কাজ করতে পারে, তা ভেবে দেখার।

চ্যালেঞ্জ ও দ্বন্দ্ব

তবে সম্পর্কের পথে বড় বাধা হলো সীমান্ত বিরোধ। ২০২০ সালের জুনে লাদাখের গালওয়ান উপত্যকায় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ ঘটে—যা চার দশকের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ শত্রুতার ঘটনা।

এর প্রভাব পড়ে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও—সরাসরি ফ্লাইট স্থগিত হয়, ভারতে চীনা বিনিয়োগ থেমে যায়, অবকাঠামো প্রকল্প ধীর হয়ে যায় এবং ভারত ২০০টিরও বেশি চীনা অ্যাপ নিষিদ্ধ করে।

দুই দেশের মধ্যে অন্যান্য বিতর্কিত ইস্যুগুলোর মধ্যে রয়েছে তিব্বত, দালাই লামা, পানিবণ্টন, চীনের প্রস্তাবিত বৃহৎ জলবিদ্যুৎ প্রকল্প এবং পাকিস্তানের সঙ্গে উত্তেজনা।

এই মুহূর্তে দক্ষিণ এশিয়ার বেশিরভাগ প্রতিবেশীর সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক ভালো নয়। বিপরীতে, চীন বাংলাদেশ, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা ও আফগানিস্তানের বড় বাণিজ্য অংশীদার।

সম্ভাব্য সহযোগিতা

মোদীর চীন সফরকালে সরাসরি ফ্লাইট চালু, ভিসা সহজীকরণসহ কয়েকটি অর্থনৈতিক চুক্তি হতে পারে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারত-চীন সম্পর্ক আপাতত এক ধরনের ‘অস্বস্তিকর জোট’।

ভারত একসময় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হয়ে চীনের সঙ্গে ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু ওয়াশিংটনের সাম্প্রতিক অবস্থান দিল্লিকে দ্বিধায় ফেলেছে। ফলে বেইজিংয়ের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়ানো এখন ভারতের কাছে একটি বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ।

মোদীর এবারের সফর সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার (এসসিও) বৈঠক উপলক্ষে। এতে চীন, ভারত, রাশিয়া, পাকিস্তান ও ইরানসহ কয়েকটি দেশ সদস্য। সমালোচকদের মতে, সংস্থাটি এখনো কার্যকর সাফল্য দেখাতে পারেনি। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতির কারণে ভারত এখন এর গুরুত্ব নতুনভাবে উপলব্ধি করছে।

ভবিষ্যৎ কী?

ভারত এখনো উৎপাদন খাতে চীনের ওপর নির্ভরশীল। তাই শুল্ক কমানো ও ভিসা সহজীকরণ ভারতের প্রধান দাবি হতে পারে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের বাজার সঙ্কুচিত হওয়ায় চীন ভারতের ১৪৫ কোটি মানুষের কাছে বাজার খুলতে আগ্রহী।

যদিও একটি বৈঠকে বড় পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা কম, তবে মোদীর সফর কিছুটা শীতলতা কাটিয়ে দিল্লি-বেইজিং সম্পর্ককে নতুন মাত্রা দিতে পারে। একই সঙ্গে, ওয়াশিংটনকে এমন একটি বার্তা দিতে পারে যে, ভারতের সামনে বিকল্প পথ খোলা রয়েছে।

সূত্র: বিবিসি
কেএএ/

Read Entire Article