ট্রাম্পের শুল্ক নীতি বাংলাদেশের পোশাক শিল্পে বড় আঘাত, সুবিধা পাবে ভারত

17 hours ago 5

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নতুন শুল্ক নীতি বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের জন্য বড় ধাক্কা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বৃহস্পতিবারের (৩ এপ্রিল) ঘোষণা অনুযায়ী, বাংলাদেশি পণ্যের ওপর ওপর ৩৭ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছে ট্রাম্প প্রশাসন, যা এশিয়ার এই স্বল্পোন্নত দেশের অন্যতম প্রধান রপ্তানি খাতকে কঠিন সংকটে ফেলতে পারে।

বৃহস্পতিবার সকালে এই ঘোষণা শুনে বাংলাদেশের পোশাক রফতানিকারক শাহিদুল্লাহ আজিম হতবাক হয়ে পড়েন। তিনি বলেন, আমরা জানতাম যে কিছু একটা আসছে, কিন্তু এত বড় ধাক্কা আসবে তা কল্পনাও করিনি। এটি আমাদের ব্যবসার জন্য ও হাজার হাজার শ্রমিকের জন্য ভয়ংকর খবর।

আজিমের প্রতিষ্ঠান উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপের বিভিন্ন খুচরা বিক্রেতাদের জন্য পোশাক সরবরাহ করে। তিনি জানান, এই নতুন শুল্কের কারণে বিদেশি ক্রেতারা বিকল্প বাজারের দিকে ঝুঁকতে পারে, যা বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানকে দুর্বল করবে।

বাংলাদেশের বাজার ও অর্থনীতি বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যদি যথাযথ পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের এই শুল্ক নীতির প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

সরকারের কাছে সহায়তা চায় পোশাক খাত

বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প দেশের মোট রফতানি আয়ের ৮০ শতাংশের এর বেশি যোগান দেয় ও প্রায় ৪০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে। এছাড়া দেশের জিডিপির প্রায় ১০ শতাংশ এই শিল্প থেকে আসে। তাই, এই নতুন শুল্ক বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। ট্রাম্পের ঘোষণার পরপরই বাংলাদেশের পোশাক শিল্প উদ্যোক্তারা সরকারের কাছে সাহায্যের আবেদন করেছেন।

বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) একজন প্রতিনিধি বলেছেন, আমরা সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি ও তারা বিষয়টিকে গুরুত্ব সহকারে দেখছে।

কী করতে পারে বাংলাদেশ?

বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশকে এখন কৌশলগত পদক্ষেপ নিতে হবে। সবার আগে প্রয়োজন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কূটনৈতিক আলোচনা বাড়ানো। সেই সঙ্গে বিকল্প বাজার খোঁজা ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন, চীন ও মধ্যপ্রাচ্যে রফতানি বাড়ানোর কৌশল নিতে হবে

আবার রফতানিকারকদের জন্য সরকারকে বিশেষ সহায়তা প্রদান করতে হবে, যাতে তারা প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারে। বাংলাদেশের পোশাক শিল্প নেতারা বলছেন, এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকার, ব্যবসায়ী ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য অংশীদারদের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সমন্বয় প্রয়োজন।

বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রেস সচিব শফিকুল আলম এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি গন্তব্য ও ঘনিষ্ঠ বন্ধু। আমরা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য বিষয়ক আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছি ও আমরা আশা করছি যে আলোচনা এই শুল্ক ইস্যু সমাধানে সহায়ক হবে।

বাংলাদেশের ক্ষতি, ভারতের সুবিধা?

বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের এই বিপর্যয় ভারতের জন্য সুযোগ তৈরি করতে পারে।

পোশাক প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান ইভিন্স গ্রুপের প্রধান আনোয়ার-উল-আলম চৌধুরী বলেন, গত বছর বাংলাদেশের রাজনৈতিক অস্থিরতার পর থেকেই মার্কিন ক্রেতারা ভারতকে বিকল্প হিসেবে দেখছিল। এখন নতুন শুল্কের কারণে এই প্রবণতা আরও বাড়বে।

ভারতীয় পোশাক রপ্তানির ওপর ট্রাম্পের শুল্ক হার ২৭ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে, যা বাংলাদেশের তুলনায় অনেক কম।

এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ ৩০টি পোশাক ব্র্যান্ড বাংলাদেশ থেকে ভারতমুখী হওয়ার পরিকল্পনা করছে, যা বাংলাদেশের জন্য বড় ধাক্কা হতে পারে।

বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক আমদানির মাত্র ৬-৭ শতাংশ আসে ভারত থেকে, যা বাংলাদেশ ও ভিয়েতনামের তুলনায় কম। তবে নতুন পরিস্থিতিতে ভারত এই বাজারে আরও বড় অংশ দখল করতে পারে।

শ্রীলঙ্কার পোশাক শিল্পেও আঘাত

বাংলাদেশের পাশাপাশি শ্রীলঙ্কার পোশাক শিল্পও ট্রাম্পের নতুন শুল্ক নীতির বড় ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। শ্রীলঙ্কান পণ্যের ওপর ৪৪ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়েছে, যা বাংলাদেশের চেয়েও বেশি।

শ্রীলঙ্কার প্রায় ৪০ শতাংশ পোশাক রপ্তানি যুক্তরাষ্ট্রে হয়ে থাকে, যার মাধ্যমে গত বছর দেশটি ১ দশমিক ৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় করেছে। পোশাক শিল্প শ্রীলঙ্কার দ্বিতীয় বৃহত্তম বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী খাত, যেখানে প্রায় ৩ লাখ মানুষ কাজ করে।

শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট অনুরা কুমারা দিসানায়েকের কার্যালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, সরকার একটি বিশেষ কমিটি গঠন করেছে, যা নতুন শুল্কের সম্ভাব্য প্রভাব বিশ্লেষণ করবে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।

শ্রীলঙ্কার যৌথ পোশাক সমিতির সেক্রেটারি জেনারেল ইয়োহান লরেন্স বলেন, শ্রীলঙ্কা দ্রুতই যুক্তরাষ্ট্রের বাজার হারাতে পারে, কারণ ক্রেতারা কম শুল্কের দেশে অর্ডার স্থানান্তর করতে পারেন। এটিকে জাতীয় জরুরি ইস্যু হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।

সূত্র: রয়টার্স

এসএএইচ

Read Entire Article