ট্রাম্পের শুল্কনীতি : বাংলাদেশকে যথাযথ উদ্যোগ নিতে হবে এখনই

8 hours ago 5

 

গোটা বিশ্বকে স্তম্ভিত করে মিত্র ও প্রতিদ্বন্দ্বী নির্বিশেষে সর্বনিম্ন ১০ শতাংশ থেকে সর্বোচ্চ প্রায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপ করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। যেখানে বাংলাদেশের পণ্যেও ৩৭ শতাংশ রিটেলিয়েট (প্রতিশোধমূলক) শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ওপরে যে শুল্কের আঘাত আসবে তা অনুমেয় ছিল কিন্তু তাই বলে বাংলাদেশি পণ্যের ওপরও যে এমনভাবে শুল্ক বাড়িয়ে দেয়া হবে সেট হয়তো ভাবনাতেই ছিল না কারও।

এতদিন দেশটিতে বাংলাদেশি পণ্যের ওপর গড়ে ১৫ শতাংশ করে শুল্ক ছিল। সেটা এখন এক ধাক্কাতে ৩৭ শতাংশ হয়ে গেলো। অথাৎ এখন থেকে বাংলাদেশকে আমেরিকাতে কোনো পণ্য পাঠালে ৩৭ শতাংশ শুল্ক দিতে হবে। এই রেসিপ্রোকাল ট্যারিফে বাংলাদেশ যে বেশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে তা সহজেই অনুমান করা যায়। এর মধ্যেই রপ্তানিকারকরা তাদের শঙ্কার কথা জানাতে শুরু করেছেন। সরকারও উদ্বিগ্ন, কারণ একক দেশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি পণ্য তৈরি পোশাকের সবচেয়ে বড় বাজার।

যুক্তরাষ্ট্রের এই বাণিজ্যনীতির মূল লক্ষ্য হচ্ছে বাণিজ্য ঘাটতি কমানো। মার্কিন প্রশাসন জানিয়েছে, বাংলাদেশের সঙ্গে বাণিজ্যে ঘাটতির পরিমাণ বেশি হওয়ায় শুল্ক বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ২০২৪ সালে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রে ৮৩৬ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি করলেও আমদানি করেছে মাত্র ২২১ কোটি ডলারের পণ্য। সে হিসাবে বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৬১৫ কোটি ডলার। নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্কিন প্রশাসন বাণিজ্য ঘাটতির ভিত্তিতে শুল্কহার নির্ধারণ করেছে।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এ সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি খাত পোশাকশিল্পের ওপর সরাসরি বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে ছেদ ঘটতে পারে বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতির গতিশীলতায়। কারণ, বাংলাদেশি পোশাকের অন্যতম প্রধান রপ্তানি গন্তব্য যুক্তরাষ্ট্র। বাংলাদেশের মোট বৈশ্বিক রপ্তানির ১৭ থেকে ১৮ শতাংশই যায় যুক্তরাষ্ট্রে। যুক্তরাষ্ট্রে গত বছর প্রায় ৮ দশমিক ৪ বিলিয়ন (৮৪০ কোটি) ডলারের পণ্য রপ্তানি করে বাংলাদেশ, যার ভেতরে তৈরি পোশাক রপ্তানি ছিল ৭ দশমিক ৩৪ বিলিয়ন (৭৩৪ কোটি) ডলার। ফলে ট্রাম্পের এই শুল্কারোপের কারণে নিশ্চিতভাবেই বাংলাদেশ বেশ কিছু চ্যালেঞ্জের মধ্যে পড়বে। সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জটি হলো—এই শুল্কনীতি বাংলাদেশকে এখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানির ক্ষেত্রে তার প্রতিযোগী চীন, ভারত এমনকি পাকিস্তানের তুলনায়ও উচ্চ শুল্ক কাঠামোর সম্মুখীন করবে।

একক দেশ হিসেবে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের সব চাইতে বড় বাজার ধরা হয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে। এই বাজারে ভারতের ২৬ শতাংশ, পাকিস্তানের ২৯ শতাংশ, চীনের ৩৪ শতাংশ শুল্কের পরিবর্তে বাংলাদেশকে এখন ৩৭ শতাংশ শুল্ক দিতে হবে পণ্য রপ্তানিতে। আফ্রিকার অনেক দেশ যেখানে আমাদের মতো সস্তা শ্রমে শ্রমিক পাওয়া যায় সেখানের অনেক দেশকেও বাংলাদেশের চাইতে অনেক কম শুল্ক দিতে হবে। এই হিসাব-নিকাশ বলছে, যদি আমাদের তৈরি পোশাককে ৩৭ শতাংশ শুল্ক দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি করতে হয় তাহলে আফ্রিকা এবং এশিয়ার অনেক দেশেই আমাদের অর্ডারগুলো চলে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে। কারণ, যুক্তরাষ্ট্রে আমাদের অধিক রপ্তানির মূল কারণই হচ্ছে কম দাম। এতে পোশাকশিল্প রপ্তানির পরিমাণ কমে যাবে। আর রপ্তানি কমে গেলে তার প্রভাব পড়বে বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের ওপর। দ্রুত এ পরিস্থিতির সুরাহা না হলে অনেক পোশাক কারখানা বন্ধ হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। এতে কাজ হারাতে পারেন বিপুলসংখ্যক শ্রমিক।

তাছাড়া, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানির জন্য চীন থেকে বাংলাদেশে শিল্প স্থানান্তরের বিষয়টিও প্রশ্নের মুখে পড়বে। কারণ, ট্রাম্পের চীনবিরোধী ভূমিকার কারণে আমরা ভেবেছিলাম, এবারও ট্রাম্প যত চীন বিরোধী হবেন ততই সুবিধা পাবে বাংলাদেশ। কারণ, ট্রাম্প চীনা পণ্যে অধিক হারে শুল্ক বসাতে পারেন ফলে যুক্তরাষ্ট্রের ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলো চীন থেকে ক্রয়াদেশ সস্তা শ্রমের দেশগুলিতে সরিয়ে নিয়ে আসবে। ফলে বাংলাদেশের সামনে বাড়তি ক্রয়াদেশ বা অর্ডার পাওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। এমনকি বিনিয়োগকারীরা চীন থেকে কারখানা সরিয়ে অন্য কোনো দেশে নিতেও আগ্রহী হতে পারেন। সেই বিনিয়োগও বাংলাদেশে আসতে পারে। তবে নতুন এই শুল্কনীতি আমাদের সে আশার পালে জল ঢেলে দিয়েছে। কারণ, বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে পণ্য রপ্তানি খরচ এখন চীনের তুলনায় বেশি হবে। তাছাড়া, বাংলাদেশ যখন একটি স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের জন্য প্রস্তুত হচ্ছে, তখন উদ্ভূত নতুন পরিস্থিতিতে এই উত্তরণ মসৃণ হবে না।

গত কয়েক দশকে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের পোশাকপণ্যের খ্যাতি যে উচ্চতায় পৌঁছে গিয়েছিল তা অন্যান্য প্রতিযোগী দেশ—ভিয়েতনাম, ভারত, পাকিস্তান, মিয়ানমার, শ্রীলঙ্কা কিংবা কম্বোডিয়ার পোশাকপণ্য পৌঁছাতে পারেনি। ফলে দেশী-বিদেশী অপশক্তি, যারা বাংলাদেশের বাজার ধরতে চায় কিন্তু পারেনা তারা বিভিন্ন উপলক্ষ সৃষ্টি করে এখানকার শ্রমিকদের ক্ষেপিয়ে তোলে। তাদের বোঝানো হয়, বাংলাদেশের শ্রমিকরা শোষিত, তাদের ঠকানো হচ্ছে। নিজেদের অধিকার তাদের নিজেদেরই আদায় করতে হবে। ট্রাম্পের নতুন শুল্কনীতি এই দেশী-বিদেশী অপশক্তি—যারা বাংলাদেশের বাজার ধরতে চায় তাদের সামনেও নতুন করে সুয়োগ সৃষ্টি করবে।

তালিকা বলছে, বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের প্রতিযোগীদের মধ্যে ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়ার শুল্ক বাংলাদেশের চেয়ে বেশি। তবে, ভারত, পাকিস্তান ও তুরস্কের ওপর শুল্ক আমাদের চেয়ে কম। ফলে তারা লাভবান হবে। কারণ, ভারত এবং পাকিস্তান উভয়েই যে পণ্য রফতানি করে, সেগুলো মোটামুটি বাংলাদেশের রেঞ্জের মতোই। এবং তাদের শ্রমও বাংলাদেশের মতোই সস্তা। ফলে দামের তারতম্যের কারণে তাদের ক্রেতারা বাংলাদেশের পরিবর্তে প্রাধান্য দেবে ভারত ও পাকিস্তানকে। পাশাপাশি, হন্ডুরাসের মতো কাছাকাছি দেশগুলোর কাছেও যাবেন মার্কিন ক্রেতারা।

ক্রেতারা কিন্তু যেখানে সস্তা পাবে সেখানেই যাবে, কারণ এটা তাদের ব্যবসা। বাংলাদেশে এসেছে তারা সস্তা শ্রমের জন্য, সস্তায় পণ্য কিনতে। এই অবস্থায়, পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে এগুতে হবে বাংলাদেশকে। এখন আমেরিকার বাজারে যা হলো অন্য কোনো বড় বাজারেও যদি এমন হয়, সেটার পরিণাম আমাদের জন্য হবে খুবই ভয়াবহ। তাই আমাদের এখনই ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। এর জন্য অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য নীতি পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন। ভারত যেমন আগে থেকেই বুঝতে পেরে যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যের ওপর শুল্কের হার কমিয়ে এনেছিল। আমাদের এখনও সে সুযোগ আছে। সরকার শুল্ক কাঠামোর পুন:বিন্যাস এবং সুনির্দিষ্ট মার্কিন পণ্য আমদানিতে শুল্ক প্রত্যাহারের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রকে ইতিবাচক ইঙ্গিত দিতে পারে। এর পাশাপাশি ট্রাম্প প্রশাসনের সংশ্লিষ্টদের সাথে লবিং জোরদার করার উদ্যোগ নিতে হবে। এসবের মাধ্যমে দরকষাকষির পথ খুলে যেতেও পারে।

লেখক : কলামিস্ট।

এইচআর/এমএস

Read Entire Article