ডিজেল সংকটে উত্তরাঞ্চলের চাষিরা, বোরো চাষাবাদ নিয়ে শঙ্কা

ডিজেলের তীব্র সংকটের কারণে বোরো ধানের সেচ নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন উত্তরাঞ্চলের চাষিরা। সেচ মৌসুমের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে জ্বালানির অভাবে সেচ কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এতে বোরো উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে। কৃষকরা জানান, বিভিন পেট্রোল পাম্প ঘুরেও সেচের জন্য প্রয়োজনীয় ডিজেল পাওয়া যাচ্ছে না। অন্যদিকে খুচরা বিক্রেতারা তীব্র সংকটের কথা বলে সরকার নির্ধারিত টাকার চেয়ে লিটার প্রতি ১৫-২০ টাকা আদায় করছেন। তারা বলছেন, প্রায় এক সপ্তাহ ধরে চলা এ সংকট দেশের প্রধান খাদ্যশস্য বোরো ধান চাষে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। কারণ জমি প্রস্তুত, সেচ ও ফসল কাটাসহ বেশিরভাগ কৃষিকাজেই ডিজেলচালিত যন্ত্রের ওপর নির্ভর করতে হয়। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ৭৫৪টি ডিজেলচালিত গভীর নলকূপ, ১০ লাখ ৩৯ হাজার ৩৩৭টি অগভীর নলকূপ এবং এক লাখ ৮৪ হাজার ৩৮৪টি লো-লিফট পাম্প চালু রয়েছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশে মোট ৫০ লাখ ৫৩ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো ধান চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে কৃষি বিভাগ। বুধবার (১১ মার্চ) দুপুর পর্যন্ত দেশের প্রায় ৯৬ শতাংশ জমিতে বোরোর চারা রোপণ সম্পন্ন হ

ডিজেল সংকটে উত্তরাঞ্চলের চাষিরা, বোরো চাষাবাদ নিয়ে শঙ্কা

ডিজেলের তীব্র সংকটের কারণে বোরো ধানের সেচ নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন উত্তরাঞ্চলের চাষিরা। সেচ মৌসুমের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে জ্বালানির অভাবে সেচ কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এতে বোরো উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে।

কৃষকরা জানান, বিভিন পেট্রোল পাম্প ঘুরেও সেচের জন্য প্রয়োজনীয় ডিজেল পাওয়া যাচ্ছে না। অন্যদিকে খুচরা বিক্রেতারা তীব্র সংকটের কথা বলে সরকার নির্ধারিত টাকার চেয়ে লিটার প্রতি ১৫-২০ টাকা আদায় করছেন।

তারা বলছেন, প্রায় এক সপ্তাহ ধরে চলা এ সংকট দেশের প্রধান খাদ্যশস্য বোরো ধান চাষে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। কারণ জমি প্রস্তুত, সেচ ও ফসল কাটাসহ বেশিরভাগ কৃষিকাজেই ডিজেলচালিত যন্ত্রের ওপর নির্ভর করতে হয়।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ৭৫৪টি ডিজেলচালিত গভীর নলকূপ, ১০ লাখ ৩৯ হাজার ৩৩৭টি অগভীর নলকূপ এবং এক লাখ ৮৪ হাজার ৩৮৪টি লো-লিফট পাম্প চালু রয়েছে।

চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশে মোট ৫০ লাখ ৫৩ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো ধান চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে কৃষি বিভাগ। বুধবার (১১ মার্চ) দুপুর পর্যন্ত দেশের প্রায় ৯৬ শতাংশ জমিতে বোরোর চারা রোপণ সম্পন্ন হয়েছে বলে কৃষি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

রাজশাহী, নাটোর, নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ নিয়ে গঠিত রাজশাহী কৃষি অঞ্চলে চলতি মৌসুমে প্রায় তিন লাখ ৫২ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো চাষের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এ অঞ্চলে সেচের প্রয়োজন এমন মোট জমির প্রায় ২১ শতাংশে ডিজেলচালিত পাম্পের মাধ্যমে সেচ দেওয়া হয়।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের রাজশাহী বিভাগীয় কার্যালয়ের তথ্যমতে, বিভাগের চার জেলায় ১১ হাজার ৫৩৫টি গভীর নলকূপ রয়েছে। এরমধ্যে বিদ্যুৎচালিত ১১ হাজার ২২০টি এবং ডিজেলচালিত ৩১৫টি। অগভীর নলকূপ রয়েছে এক লাখ ১০ হাজার ৪৪৯টি। এরমধ্যে বিদ্যুৎচালিত ২১ হাজার ১৯৫টি এবং ডিজেলচালিত ৮৮ হাজার ২৬৮টি। এছাড়া আট হাজার ৬৪৭টি লো-লিফট সেচ পাম্প রয়েছে, যার এক হাজার ১৮৯টি বিদ্যুৎচালিত ও সাত হাজার ৪৫৮টি ডিজেলচালিত। এর বাইরেও ৯১টি সোলারচালিত সেচ পাম্প রয়েছে।

কৃষকরা বলছেন, বোরো মৌসুমের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে ডিজেল সংকটের কারণে সেচের সময়সূচি ব্যাহত হচ্ছে, যা ফসলের ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি করছে।

দুর্গাপুর উপজেলার বাজে কলশিপুর গ্রামের কৃষক মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‌‘কয়েকটি তেল পাম্পে ঘুরেও ডিজেল পাইনি। শেষ পর্যন্ত স্থানীয় এক খুচরা বিক্রেতার কাছ থেকে প্রতি লিটার ১২০ টাকায় কিনেছি।’

একই উপজেলার ছিদ্রো কলশিপুর গ্রামের কৃষক মোসলেম উদ্দিন বলেন, বুধবার স্থানীয় বাজারের সব খুচরা দোকানে ঘুরেও এক লিটার ডিজেল সংগ্রহ করতে পারিনি।

তিনি বলেন, ‘আমার বোরো ধানের জমি শুকিয়ে যাচ্ছে। তাই ব্যবসায়ীদের প্রতি লিটার ১৫০ টাকা পর্যন্ত দিতে চেয়েছি। তারপরও তারা সংকটের কথা বলে আমাকে ডিজেল দেয়নি।’

গোদাগাড়ী উপজেলার দিয়ারমানিক চর এলাকার কৃষক আবদুল্লাহ বিন সাফি জানান, গত চারদিন ধরে তাদের চরাঞ্চলে ডিজেলের দাম ১০২ টাকা থেকে বেড়ে ১২০ টাকায় উঠেছে।

তিনি বলেন, জ্বালানির দাম বাড়ায় সেচ খরচও অনেক বেড়ে যাচ্ছে। ফলে আগে থেকেই বাড়তি উৎপাদন ব্যয়ে চাপে থাকা কৃষকদের আরও বিপাকে ফেলছে।

পাম্পচালকরা বলছেন, পরিস্থিতির কারণে তাদের সেচের চার্জও বাড়াতে হচ্ছে। ফলে কৃষকদের ওপর বাড়তি চাপ পড়ছে।

নাটোরের সিংড়া উপজেলার সাতপুকুরিয়া গ্রামের কৃষক ও সেচপাম্প মালিক লাবু মিয়া বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে স্থানীয় দোকানগুলোতে ডিজেল পাওয়া কঠিন হয়ে গেছে। তিনি বলেন, স্থানীয় দোকানগুলো প্রতি লিটার ডিজেলে প্রায় ১৫ টাকা পর্যন্ত বেশি নিচ্ছে। আমার পাম্প ১০ ঘণ্টা চালাতে প্রতিদিন ১০ লিটার ডিজেল লাগে।

কৃষি বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, সেচ মৌসুমে ডিজেলের সংকট ও অতিরিক্ত দাম দীর্ঘস্থায়ী হলে দেশের অন্যতম প্রধান ধান উৎপাদনকারী অঞ্চল উত্তরাঞ্চলে বোরো উৎপাদনে প্রভাব পড়তে পারে।

কৃষি অর্থনীতিবিদ ও বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক মহাপরিচালক ড. জাহাঙ্গীর আলম খান বলেন, ‘চলমান যুদ্ধের কারণে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেলের সংকট দেখা দিচ্ছে। এর প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ সরকার রেশনিং ব্যবস্থা চালু করেছে, যা যৌক্তিক পদক্ষেপ। তবে প্রথমে কোন খাতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে তা নির্ধারণ করা জরুরি।’

তিনি বলেন, ‘বোরো বাংলাদেশের প্রধান খাদ্যশস্য এবং এটি সেচের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। দেশে বোরো আবাদি জমির প্রায় ৬২ থেকে ৬৫ শতাংশ সেচ দেওয়া হয় ডিজেলচালিত পাম্পের মাধ্যমে। তাই এ সময়ে জ্বালানি তেল বণ্টনে কৃষিখাতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে।’

ড. জাহাঙ্গীর আলম খান আরও বলেন, ‘যেভাবে সরকার কৃষিতে ব্যবহৃত বিদ্যুতের ক্ষেত্রে ভর্তুকি দেয়, একইভাবে সেচের জন্য ব্যবহৃত ডিজেলের ক্ষেত্রেও ভর্তুকি দেওয়া প্রয়োজন।’

কোথায় কোথায় ভূ-পৃষ্ঠের পানি ব্যবহার করে সেচ দেওয়া সম্ভব তা চিহ্নিত করতে হবে। পাশাপাশি সরকারের খাল খনন কর্মসূচিগুলো দ্রুত শেষ করা জরুরি বলেও মত দেন এই কৃষি অর্থনীতিবিদ।

এসআর/জেআইএম

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow