ডিজেল সংকটে কৃষিতে বিপর্যয়, কৃষকদের হাহাকার

• কৃষক কার্ডেও মিলছে না তেল• ডিজেল পেতে ১৫-২০ ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা • পানির অভাবে ধানে চিটা পড়ছে• তেলের অভাবে বন্ধ সেচযন্ত্র ‘ডিজেল না থাকায় সময়মতো জমিতে পানি (সেচ) দিতে পারছি না। ধানের চারা শুকিয়ে যাচ্ছে। এখন যদি সেচ দিতে না পারি, তাহলে সব ফসল নষ্ট হয়ে যাবে।’ এভাবেই আশঙ্কার কথা জানাচ্ছিলেন মুন্সিগঞ্জের শ্রীনগর উপজেলার আলমপুর এলাকার আড়িয়াল বিলের ধান চাষি বাচ্চু মাঝি। তবে এ আশঙ্কা শুধু তার নয়, বিলের অন্যান্য কৃষকদেরও দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে। ডিজেল সংকটে তারা চরম বেকায়দায় পড়েছেন। হতাশা প্রকাশ করে কৃষক বাচ্চু মাঝি বলেন, ‘উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আমাদেরকে কৃষক কার্ড করে দেওয়া হয়েছে, তবুও ফিলিং স্টেশনে গিয়ে তেল পাই না। আবার বাইরে কিনতে গেলে অনেক বেশি দাম দিতে হয়। এত খরচ করে চাষবাদে লাভ তো দূরের কথা, এইবার মূলধনই উঠবে না।’ খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জ্বালানি তেলের অভাবে ভয়াবহ সংকটে মুন্সিগঞ্জের আড়িয়াল বিলের কৃষকরা। বোরো ধান আবাদ মৌসুমে তারা ডিজেল সংকটে পড়েছেন। জমিতে পর্যাপ্ত সেচ দিতে না পারায় গ্রীস্মের তীব্র গরমে শুকিয়ে নষ্ট হচ্ছে ধানগাছ। অভিযোগ রয়েছে, স্থানীয় কৃষি বিভাগ ও উপজেলা

ডিজেল সংকটে কৃষিতে বিপর্যয়, কৃষকদের হাহাকার

কৃষক কার্ডেও মিলছে না তেল
ডিজেল পেতে ১৫-২০ ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা
পানির অভাবে ধানে চিটা পড়ছে
তেলের অভাবে বন্ধ সেচযন্ত্র

‘ডিজেল না থাকায় সময়মতো জমিতে পানি (সেচ) দিতে পারছি না। ধানের চারা শুকিয়ে যাচ্ছে। এখন যদি সেচ দিতে না পারি, তাহলে সব ফসল নষ্ট হয়ে যাবে।’

এভাবেই আশঙ্কার কথা জানাচ্ছিলেন মুন্সিগঞ্জের শ্রীনগর উপজেলার আলমপুর এলাকার আড়িয়াল বিলের ধান চাষি বাচ্চু মাঝি। তবে এ আশঙ্কা শুধু তার নয়, বিলের অন্যান্য কৃষকদেরও দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে। ডিজেল সংকটে তারা চরম বেকায়দায় পড়েছেন।

হতাশা প্রকাশ করে কৃষক বাচ্চু মাঝি বলেন, ‘উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আমাদেরকে কৃষক কার্ড করে দেওয়া হয়েছে, তবুও ফিলিং স্টেশনে গিয়ে তেল পাই না। আবার বাইরে কিনতে গেলে অনেক বেশি দাম দিতে হয়। এত খরচ করে চাষবাদে লাভ তো দূরের কথা, এইবার মূলধনই উঠবে না।’

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জ্বালানি তেলের অভাবে ভয়াবহ সংকটে মুন্সিগঞ্জের আড়িয়াল বিলের কৃষকরা। বোরো ধান আবাদ মৌসুমে তারা ডিজেল সংকটে পড়েছেন। জমিতে পর্যাপ্ত সেচ দিতে না পারায় গ্রীস্মের তীব্র গরমে শুকিয়ে নষ্ট হচ্ছে ধানগাছ।

অভিযোগ রয়েছে, স্থানীয় কৃষি বিভাগ ও উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে চাষিদের কৃষক ও ফুয়েল কার্ড দেওয়া হলেও পাম্পে গেলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও তেল মিলছে না।

রোববার (২৬ এপ্রির) বিভিন্ন স্থানে ঘুরে দেখা গেছে, খালি বোতল ও গ্যালন নিয়ে শ্রীনগর পেট্রোল পাম্পে লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন কৃষকরা। তাদের হাতে কৃষক কার্ড। ৫-১০ লিটার ডিজেল পেতে তাদের ১৫-২০ ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে। কোনো কোনো পাম্পে তেলের অপেক্ষায় কৃষকদের দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে এক থেকে দুদিন।

কৃষকরা বলছেন, তেলের তীব্র সংকট ফসল উৎপাদনে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এরমধ্যে জ্বালানি তেলের নতুন করে মূল্যবৃদ্ধি মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দাঁড়িয়েছে কৃষকদের জন্য।

‘বিস্তীর্ণ বোরো ধানের জমিগুলোর বেশিরভাগই সেচের জন্য ডিজেলচালিত পাম্পের ওপর নির্ভর করতে হয়। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে জ্বালানি তেলের সংকট দেখা দেওয়ায় সেসব সেচযন্ত্র বন্ধ রয়েছে। ফলে সঠিক সময়ে জমিতে সেচ দিতে পারছেন না কৃষকরা। পানির অভাবে ধানগাছ শুকিয়ে যাচ্ছে। ধানে চিটা পড়ছে’

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় দুই হাজার ২০২টি নলকূপের মধ্যে এক হাজার ৮২১টি ডিজেলচালিত। এর মধ্যে ডিজেলচালিত অগভীর নলকূপ এক হাজার ৮২০টি, গভীর নলকূপ একটি। আর বিদ্যুৎচালিত অগভীর নলকূপ ৩৭৩টি, গভীর নলকূপ রয়েছে মাত্র সাতটি।

ডিজেল সংকটে কৃষিতে বিপর্যয়, কৃষকদের হাহাকার

এবার মুন্সিগঞ্জের ২৪ হাজার ৬১৭ হেক্টর জমিতে বোরো চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে আবাদ হয়েছে ২৪ হাজার ৫২৯ হেক্টর জমিতে। ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহ থেকে শুরু হওয়া বোরো চাষ চলবে চলতি বছরের মার্চ মাসের শেষ সপ্তাহ পর্যন্ত।

আরও পড়ুন:
হাওরে কৃষকের ওপর নতুন ‘জুলুম’, ৪৫ কেজিতে ধানের মণ!
‘বাপুরে, ১০০ মণ ধান পেতাম এখন এক মণও পামু না’
মেশিন মাথায় নিয়ে তেল পাম্পে কৃষক
শুকিয়ে যাচ্ছে ধানের জমি, তেলের খোঁজে পাম্পে পাম্পে ঘুরছে কৃষক
জ্বালানি সংকটে স্বস্তি দিচ্ছে জিকে ক্যানাল, কৃষকের মুখে হাসি

আড়িয়াল বিল ছাড়াও জেলার অন্যান্য উপজেলার কৃষক ও কৃষি কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তীব্র জ্বালানি তেলের সংকটে মুন্সিগঞ্জের ছয়টি উপজেলায় আবাদ করা বোরো ধানের জমিতে সেচ দিতে পারছেন না কৃষকরা। তেলের অভাবে সেচযন্ত্র বন্ধ থাকায় রোদে শুকিয়ে যাচ্ছে ধানের চারাগাছ।

মুন্সিগঞ্জের শ্রীনগর উপজেলার হরপাড়া এলাকায় ফিলিং স্টেশনে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সারিবদ্ধ লাইনে দাঁড়িয়েও জ্বালানি তেল সংগ্রহ করতে পারেননি পাচলদিয়া গ্রামের কৃষক সবুর আলী।

তিনি বলেন, ‘সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত তেলের জন্য পাম্পে লাইনে ছিলাম। সারাদিন অপেক্ষা করেও তেল পাইনি। এভাবে চলতে থাকলে আমরা চাষাবাদ করবো কীভাবে?’

বিস্তীর্ণ বোরো ধানের জমিগুলোর বেশিরভাগই সেচের জন্য ডিজেলচালিত পাম্পের ওপর নির্ভর করতে হয়। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে জ্বালানি তেলের সংকট দেখা দেওয়ায় সেসব সেচযন্ত্র বন্ধ রয়েছে। ফলে সঠিক সময়ে জমিতে সেচ দিতে পারছেন না কৃষকরা। পানির অভাবে ধানগাছ শুকিয়ে যাচ্ছে। ধানে চিটা পড়ছে।

‘উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আমাদেরকে কৃষক কার্ড করে দেওয়া হয়েছে, তবুও ফিলিং স্টেশনে গিয়ে তেল পাই না। আবার বাইরে কিনতে গেলে অনেক বেশি দাম দিতে হয়। এত খরচ করে চাষবাদে লাভ তো দূরের কথা, এইবার মূলধনই উঠবে না’—ভুক্তভোগী কৃষক

সিরাজদিখান উপজেলার বাসাইল ইউনিয়নের বেজেরহাটি গ্রামের কৃষক সুমন দেওয়ান। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘পাম্পে গিয়েও ডিজেল কিনতে পারছি না। লিটারপ্রতি ১১৫ টাকার ডিজেল খোলা বাজার থেকে ১৭৫ টাকায় কিনতে হচ্ছে। স্থানীয় আরেকটি ফিলিং স্টেশনে গিয়ে ডিজেল না পেয়ে ফিরে এসেছি।’

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. হাবিবুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, ‘চলমান তেল সংকটের বিষয়টি আমরা গুরুত্বের সঙ্গে পর্যেবক্ষণ করছি। মাঠ পর্যায়ের কৃষি কর্মকর্তাদের মাধ্যমে কৃষকদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছি। বিকল্প ব্যবস্থায় সেচ কার্যক্রম সচল রাখতে পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।’

তিনি আরও বলেন, জেলা প্রশাসন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার চেষ্টা চলছে।

জেলায় জ্বালানি তেলের পর্যাপ্ত মজুত আছে বলে দাবি করেন জেলা প্রশাসক সৈয়দা নুরমহল আশরাফী। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, কৃষকদের তেল পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করতে যা যা করণীয় রয়েছে সব ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। পেট্রোল পাম্পগুলোতে যাতে জ্বালানি তেল নিয়ে কোনো নয়ছয় না হয়, সে বিষয়েও তদারকি চলছে।

এসআর/এমএস

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow