ডিজেলের মজুত পর্যাপ্ত, পেট্রোল-অকটেনে শঙ্কা
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের জেরে হরমুজ প্রণালিতে অচলাবস্থা দীর্ঘায়িত হওয়ায় অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের সরবরাহে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। পরিশোধিত তেলের সরবরাহে কিছুটা স্বস্তি ফিরলেও ক্রুড অয়েলের ঘাটতিতে সরকারি শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড উৎপাদন ঝুঁকিতে পড়েছে। আগামী ১০ দিনের মধ্যে নতুন চালান না এলে বন্ধ হয়ে যেতে পারে উৎপাদন এমন আশঙ্কা সংশ্লিষ্টদের। ইস্টার্ন রিফাইনারি বছরে প্রায় ১৫ লাখ টন অপরিশোধিত তেল পরিশোধন করে দেশের বাজারে সরবরাহ করে। এর ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ ক্রুড অয়েল আসে সৌদি আরব থেকে। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত শুরুর পর সৌদি আরবের রাস তানুরা টার্মিনালে এক লাখ টন তেল নিয়ে আটকা পড়ে একটি জাহাজ। যুক্তরাষ্ট্রের মালিকানাধীন হওয়ায় নিরাপত্তা ঝুঁকিতে জাহাজটি হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করতে পারছে না। ইস্টার্ন রিফাইনারী পিএলসির উপমহাব্যবস্থাপক (প্ল্যানিং অ্যান্ড শিপিং) মো. মোস্তাফিজার রহমান কালবেলাকে বলেন, বর্তমানে প্রায় ১২ দিনের অপরিশোধিত তেলের মজুত রয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নতুন চালান দেশে না পৌঁছালে শোধনাগারের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। তিনি জানান, নির্ধারিত দুটি চালানে
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের জেরে হরমুজ প্রণালিতে অচলাবস্থা দীর্ঘায়িত হওয়ায় অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের সরবরাহে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
পরিশোধিত তেলের সরবরাহে কিছুটা স্বস্তি ফিরলেও ক্রুড অয়েলের ঘাটতিতে সরকারি শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড উৎপাদন ঝুঁকিতে পড়েছে। আগামী ১০ দিনের মধ্যে নতুন চালান না এলে বন্ধ হয়ে যেতে পারে উৎপাদন এমন আশঙ্কা সংশ্লিষ্টদের।
ইস্টার্ন রিফাইনারি বছরে প্রায় ১৫ লাখ টন অপরিশোধিত তেল পরিশোধন করে দেশের বাজারে সরবরাহ করে। এর ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ ক্রুড অয়েল আসে সৌদি আরব থেকে। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত শুরুর পর সৌদি আরবের রাস তানুরা টার্মিনালে এক লাখ টন তেল নিয়ে আটকা পড়ে একটি জাহাজ। যুক্তরাষ্ট্রের মালিকানাধীন হওয়ায় নিরাপত্তা ঝুঁকিতে জাহাজটি হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করতে পারছে না।
ইস্টার্ন রিফাইনারী পিএলসির উপমহাব্যবস্থাপক (প্ল্যানিং অ্যান্ড শিপিং) মো. মোস্তাফিজার রহমান কালবেলাকে বলেন, বর্তমানে প্রায় ১২ দিনের অপরিশোধিত তেলের মজুত রয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নতুন চালান দেশে না পৌঁছালে শোধনাগারের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
তিনি জানান, নির্ধারিত দুটি চালানের মধ্যে একটি জাহাজ আবুধাবির ফুজাইরাতে তেল লোড করে প্রস্তুত অবস্থায় রয়েছে। তবে অপর একটি জাহাজের টেন্ডার বাতিল হয়ে যাওয়ায় সরবরাহ পরিস্থিতিতে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিকল্প উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে উল্লেখ করে সংশ্লিষ্টরা বলেন, সৌদি আরবের ইয়ানবু বন্দর থেকে প্রায় আড়াই লাখ টন অ্যারাবিয়ান লাইট ক্রুড অয়েল আনার ব্যবস্থা করা হয়েছে, যা আগামী ২০ এপ্রিল লোড হওয়ার কথা রয়েছে। এছাড়া আরও একটি চালান আনার জন্য প্রস্তাব অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।
তিনি আরও জানান, নাইজেরিয়া, আজারবাইজান ও রাশিয়াসহ বিভিন্ন দেশ থেকে বিকল্প উৎসে তেল আমদানির সম্ভাবনা, খরচ ও লজিস্টিক সুবিধা নিয়ে বিশ্লেষণ চলছে।
এদিকে ‘প্রোলাক্স’ নামের একটি মার্কিন জাহাজ বর্তমানে আটকে রয়েছে জানিয়ে তারা বলেন, জাহাজটি ছাড়িয়ে আনার জন্য উচ্চ পর্যায়ে এবং আন্তর্জাতিকভাবে যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে সেটি ইরান ত্যাগ করতে পারবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
নতুন চালানে তেলের দাম কিছুটা বাড়তে পারে জানিয়ে কর্মকর্তা বলেন, প্রতি ব্যারেলে প্রায় ০.২৫ সেন্ট পর্যন্ত মূল্য বৃদ্ধি হতে পারে। তবে দেশের জ্বালানির খুচরা মূল্য সরাসরি ক্রুড অয়েলের দামের ওপর নির্ভর করে না; সরকার নির্ধারিত একটি ফর্মুলার ভিত্তিতে তা সমন্বয় করা হয়।
তিনি আরও জানান, দেশে মোট জ্বালানি চাহিদার প্রায় ২০ শতাংশ অপরিশোধিত তেল হিসেবে আমদানি করা হয়, আর বাকি অংশ পরিশোধিত জ্বালানি হিসেবে আসে। আগামী ১ তারিখে নতুন গেজেট প্রকাশের মাধ্যমে সরকার জ্বালানির দামের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানাবে।
এ অবস্থায় জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়লেও কিছুটা স্বস্তির খবর দিয়েছে বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন (বিএসসি)।
সংস্থাটি জানিয়েছে, আগামী এপ্রিলের মাঝামাঝি লোহিত সাগর হয়ে সৌদি আরবের ইয়ানবু বন্দর থেকে এক লাখ টন অপরিশোধিত তেল দেশে আনা হবে। পাশাপাশি রাস তানুরায় আটকে থাকা তেল বিকল্প উপায়ে অন্য জাহাজে স্থানান্তর করে আনার পরিকল্পনাও চলছে।
বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমোডর মাহমুদুল মালেক বলেন, সব ধরনের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে, যাতে আটকে পড়া জাহাজটি নিরাপদে বের করে আনা যায়। বিকল্প ব্যবস্থাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়ামে করপোরেশন (বিপিসি) সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে ডিজেলের মজুত রয়েছে ১৪ দিনের, যা তুলনামূলক স্বস্তিদায়ক। তবে সবচেয়ে উদ্বেগজনক পরিস্থিতি পেট্রোল ও অকটেন নিয়ে। অকটেনের মজুত মাত্র ৯ দিনের এবং পেট্রোল ১১ দিনের। এই দুই জ্বালানির বড় অংশই দেশীয় শোধনাগারে উৎপাদিত হওয়ায় ক্রুড অয়েলের ঘাটতি সরাসরি সরবরাহে প্রভাব ফেলছে।
অপরিশোধিত তেলের মজুত কমে যাওয়ায় ইতোমধ্যে সরবরাহ কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। ফলে অনেক পেট্রোল পাম্প সীমিত পরিসরে কার্যক্রম চালাচ্ছে। ভোক্তাদের অভিযোগ, পর্যাপ্ত জ্বালানি পাওয়া যাচ্ছে না, বিশেষ করে অকটেনের ঘাটতি তীব্র।
অন্যদিকে ফার্নেস অয়েল (২৯ দিন) ও জেট ফুয়েল (২৩ দিন) মজুত থাকায় আপাতত এ দুই খাতে তেমন শঙ্কা নেই। কেরোসিন ও মেরিন ফুয়েলের মজুতও সন্তোষজনক।
চট্টগ্রাম বন্দরের তথ্যানুযায়ী, ২২ মার্চ পর্যন্ত ২৩ দিনে মোট ২৫টি জ্বালানিবাহী জাহাজ বন্দরে ভিড়েছে, যার মধ্যে ২৩টি ইতোমধ্যে পণ্য খালাস করে চলে গেছে। বর্তমানে দুটি জাহাজ থেকে খালাস চলছে এবং পথে রয়েছে আরও দুটি ‘বেওয়েক বর্নহোল্ম’ ও ‘মর্নিং জেইন’, যেগুলো ২৫ মার্চ বন্দরে পৌঁছানোর কথা।
বিশ্ববাজারে অস্থিরতার প্রভাব পড়েছে দেশের জ্বালানি মজুতেও। বিপিসির হিসাবে, ২১ মার্চ পর্যন্ত মোট জ্বালানি মজুত ছিল ২ লাখ ৫৯ হাজার ৬৫৯ মেট্রিক টন, যা দিয়ে চাহিদা অনুযায়ী মাত্র ৮ থেকে ১২ দিন চলা সম্ভব। অথচ সংরক্ষণ সক্ষমতা রয়েছে ৮ লাখ ১২ হাজার ৫৬১ মেট্রিক টন-এর মাত্র ২০ শতাংশ এখন পূর্ণ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু আমদানির ওপর নির্ভরতা নয়, সংরক্ষণ ও বিতরণ ব্যবস্থার দুর্বলতাও পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলছে। সাপ্লাই চেইন বিশেষজ্ঞ মো. মজিবুল হক বলেন, স্টোরেজ সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি বিতরণ চ্যানেল শক্তিশালী না করলে কৃষি, শিল্প ও পরিবহন খাত বড় ঝুঁকিতে পড়বে।
তবে বিপিসি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে থাকার দাবি করেছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, জ্বালানি সংরক্ষণ সক্ষমতা বর্তমান ৫৫ দিন থেকে বাড়িয়ে ৯০ দিনে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
এদিকে ঈদের পর চাহিদা বেড়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে জ্বালানির সাশ্রয়ী ব্যবহারের আহ্বান জানিয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
তিনি বলেন, ‘যুদ্ধ পরিস্থিতি আমাদের নিয়ন্ত্রণে নয়, তবে এর প্রভাব মোকাবিলায় সবাইকে সংযমী হতে হবে।’
সব মিলিয়ে, বিকল্প উৎস ও রুট সক্রিয় না হলে এবং দ্রুত নতুন চালান না এলে দেশের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।
What's Your Reaction?