সরকার রাজধানীর বেশিরভাগ এলাকায় ভবন নির্মাণে ফ্লোর এরিয়া রেশিও (এফএআর/ফার) বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। এতে ঢাকা মহানগরীর বাসযোগ্যতা ও সামগ্রিক পরিবেশ আরও হুমকিতে পড়বে বলে মনে করছে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি)।
বুধবার (২৭ আগস্ট) বিআইপির কনফারেন্স হলে অনুষ্ঠিত ‘ঢাকার বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা (ড্যাপ) সংশোধনের উদ্যোগ: বিআইপির পর্যবেক্ষণ’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে এ মতামত তুলে ধরা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে বিআইপি সংশ্লিষ্টরা জানান, পরিকল্পনাবিদসহ বিভিন্ন সামাজিক, পরিবেশবাদী, পেশাজীবী ও নাগরিক সংগঠনের মতামত ও দাবিকে উপেক্ষা করেই সরকার এই সংশোধনের পথে হাঁটছে। এর ফলে জনবহুল ঢাকা শহরে উঁচু ভবনের সংখ্যা বাড়বে। এরই মধ্যে স্থবির হয়ে যাওয়া শহরে পরিবহন, পরিসেবাসহ সব ধরনের নাগরিক সেবার ওপর অসহনীয় চাপ পড়বে। এই চাপ বহন করবার ক্ষমতা এই শহরের নেই। এ ধরনের উদ্যোগ ঢাকা মহানগরীর বাসযোগ্যতাকেও একেবারে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেবে।
তারা বলেন, আবাসিক এলাকার ভবনসমূহের ভারসাম্য ও শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে ভবনের উচ্চতার সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ করতে হবে। মানুষের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ও অগ্নিদুর্ঘটনার ক্ষয়ক্ষতি কমাতে সরু রাস্তার পাশে বহুতল ভবন নির্মাণ অনুমোদন বন্ধ করতে হবে। এ ছাড়া ছয়তলার উপরের ভবনকে বহুতল ভবন বিবেচনায় নিয়ে ইমারত নির্মাণ বিধিমালার সংশোধনী এনে ভবনে অগ্নি নিরাপত্তামূলক প্রতিরোধক ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। পরিকল্পনা প্রণয়নে স্বার্থ সংশ্লিষ্ট মহলের অনৈতিক প্রভাব দূর করে পরিকল্পনাবিদদের স্বাধীনভাবে কাজ করবার সুযোগ না দিলে শহরকে বাসযোগ্য করা এবং পরিকল্পিত ও টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়।
অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন বিআইপির সহ-সভাপতি পরিকল্পনাবিদ সৈয়দ শাহরিয়ার আমিন। এতে ঢাকার বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা (ড্যাপ) সংশোধনের উদ্যোগ সংক্রান্ত বিআইপির পর্যবেক্ষণ ও প্রস্তাবনা তুলে ধরেন বিআইপি সভাপতি পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান।
- আরও পড়ুন
- ড্যাপ সংশোধন: ঢাকায় ভবন নির্মাণে ফ্লোর এরিয়া রেশিও দ্বিগুণ হচ্ছে
- বৈষম্যমূলক ড্যাপের কারণেই আবাসন সেক্টরে স্থবিরতা
তিনি বলেন, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা (ড্যাপ) দীর্ঘ অপেক্ষার পর ২০২২ সালে গেজেট আকারে প্রকাশ হয়। এর মাধ্যমে জনঘনত্ব নিয়ন্ত্রণ ও টেকসই নগরায়ণের জন্য এলাকাভিত্তিক এফএআর বা ফার মান নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু ব্যবসায়ী ও স্বার্থ সংশ্লিষ্ট মহলের চাপের কারণে বারবার ড্যাপ সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, যা ঢাকার পরিকল্পিত উন্নয়নের পথে বড় বাধা।
অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ড্যাপের সাম্প্রতিক প্রস্তাবনায় অধিকাংশ এলাকায় ফার ২০ থেকে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর ফলে নির্দিষ্ট এলাকায় অতিরিক্ত তলা নির্মাণের অনুমতি মিলবে, যা যানজট, জলাবদ্ধতা, আলো-বাতাস সংকট ও ইউটিলিটি সেবায় মারাত্মক চাপ সৃষ্টি করবে। খিলক্ষেত, বাড্ডা, বাসাবো-খিলগাঁও, রামপুরা ও মিরপুরসহ অনেক এলাকায় ফার বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। অথচ পরিকল্পনাবিদদের দাবি উপেক্ষা করে গুলশান-বনানী ও ধানমন্ডির মতো অভিজাত এলাকায় সামান্য কমানো হয়েছে মাত্র। এতে ফার মানের বৈষম্য আবারও জিইয়ে রাখা হয়েছে।
তবে বিআইপিসহ অনেক পরিবেশবাদী সংগঠনের দীর্ঘদিনের দাবি অনুযায়ী কৃষিজমি, জলাভূমি ও বন্যা প্রবাহ এলাকায় উন্নয়ন বন্ধের সুপারিশকে আদিল মুহাম্মদ খান ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি আরও বলেন, এরই মধ্যে দুই কোটির বেশি মানুষের চাপের মধ্যে থাকা ঢাকার জন্য এই ধরনের সংশোধনী টেকসই উন্নয়নকে আরও বিপন্ন করবে। ড্যাপের মূল উদ্দেশ্য ছিল সুষম জনঘনত্ব ও মানসম্মত নাগরিক সেবা নিশ্চিত করা। কিন্তু বর্তমান সংশোধনী সেই উদ্দেশ্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
বিআইপির সহ-সভাপতি পরিকল্পনাবিদ সৈয়দ শাহরিয়ার আমিন বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে ড্যাপ পুনরায় সংশোধনের ক্ষেত্রে জনস্বার্থের পরিবর্তে ক্ষমতাশালীদের স্বার্থই প্রাধান্য পাচ্ছে। শহরের উচ্চ জনসংখ্যা, অর্থনৈতিক নীতি ও শাসনব্যবস্থার দুর্বলতা মিলিত হয়ে অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও ঢাকাকেন্দ্রিক উন্নয়নই কেবল গুরুত্ব পাচ্ছে। অথচ আবাসিক এলাকার ফার বাড়ানো, অতিরিক্ত জনসংখ্যা বরাদ্দ এবং রাস্তার পরিকল্পনা উপেক্ষা করলে শহরের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাপকভাবে ব্যাহত হবে।
সংবাদ সম্মেলনে বিআইপির বোর্ড সদস্য পরিকল্পনাবিদ আবু নাইম সোহাগ, পরিকল্পনাবিদ মো. ফাহিম আবেদীন প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
এমএমএ/কেএসআর/এএসএম