ড্রেন হয়েছে, দুর্ভোগ কমেনি- সামান্য বৃষ্টিতেই ডুবছে খুলনা
সামান্য বৃষ্টির ছোঁয়াতেই থমকে যায় খুলনা নগরীর ছন্দ। রাস্তাঘাট ডুবে যায় পানিতে, আর সেই পানির সঙ্গে ডুবে যায় হাজারো মানুষের স্বস্তি, সময় আর দৈনন্দিন জীবন। প্রতিবছর বর্ষায় এই জলাবদ্ধতার যন্ত্রণা যেন খুলনাবাসীর নিত্যসঙ্গী হয়ে উঠেছে, অথচ এই দুর্ভোগের স্থায়ী সমাধানের অপেক্ষা এখনও ফুরায়নি। বুধবার (৮ জুলাই) রাতভর দফায় দফায় বর্ষণে নগরীর প্রধান সড়কগুলোর পাশাপাশি অলিগলিও তলিয়ে গেছে পানিতে। অনেক এলাকায় বাসাবাড়ি ও দোকানপাটে পানি ঢুকে পড়ে, ফলে দুর্ভোগে পড়েন নগরবাসী। খুলনা আবহাওয়া অফিস বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) ভোর ৬টা পর্যন্ত ৭৮ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করেছে। এই বৃষ্টিতে তলিয়ে গেছে শহরের গুরুত্বপূর্ণ সড়কসহ নিচু এলাকা। জলাবদ্ধতা নিরসনে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ের পরও দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে খুলনাবাসীকে। খুলনা সিটি করপোরেশন (কেসিসি) এলাকার মধ্যে মোট সড়ক আছে ১ হাজার ২১৫টি। সরেজমিন নগরীর একাধিক এলাকা ঘুরে দেখা যায়, নতুন রাস্তা মোড় থেকে খুলনা বিশেষায়িত হাসপাতাল (আবু নাসের হাসপাতাল) মোড় এবং মুজগুন্নি সড়কের বড় অংশ পানির নিচে। এ ছাড়াও উল্লাস পার্ক মোড়, আহসান আহমেদ রোড, রয়েল মোড়, খানজাহান আলী সড়ক, ব
সামান্য বৃষ্টির ছোঁয়াতেই থমকে যায় খুলনা নগরীর ছন্দ। রাস্তাঘাট ডুবে যায় পানিতে, আর সেই পানির সঙ্গে ডুবে যায় হাজারো মানুষের স্বস্তি, সময় আর দৈনন্দিন জীবন। প্রতিবছর বর্ষায় এই জলাবদ্ধতার যন্ত্রণা যেন খুলনাবাসীর নিত্যসঙ্গী হয়ে উঠেছে, অথচ এই দুর্ভোগের স্থায়ী সমাধানের অপেক্ষা এখনও ফুরায়নি।
বুধবার (৮ জুলাই) রাতভর দফায় দফায় বর্ষণে নগরীর প্রধান সড়কগুলোর পাশাপাশি অলিগলিও তলিয়ে গেছে পানিতে। অনেক এলাকায় বাসাবাড়ি ও দোকানপাটে পানি ঢুকে পড়ে, ফলে দুর্ভোগে পড়েন নগরবাসী।
খুলনা আবহাওয়া অফিস বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) ভোর ৬টা পর্যন্ত ৭৮ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করেছে। এই বৃষ্টিতে তলিয়ে গেছে শহরের গুরুত্বপূর্ণ সড়কসহ নিচু এলাকা। জলাবদ্ধতা নিরসনে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ের পরও দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে খুলনাবাসীকে।
খুলনা সিটি করপোরেশন (কেসিসি) এলাকার মধ্যে মোট সড়ক আছে ১ হাজার ২১৫টি। সরেজমিন নগরীর একাধিক এলাকা ঘুরে দেখা যায়, নতুন রাস্তা মোড় থেকে খুলনা বিশেষায়িত হাসপাতাল (আবু নাসের হাসপাতাল) মোড় এবং মুজগুন্নি সড়কের বড় অংশ পানির নিচে। এ ছাড়াও উল্লাস পার্ক মোড়, আহসান আহমেদ রোড, রয়েল মোড়, খানজাহান আলী সড়ক, বাস্তুহারা, বাইতিপাড়া, চানমারী, লবণচরা, টুটপাড়া, মিস্ত্রিপাড়া, রূপসা নতুন বাজারসহ অধিকাংশ নিম্নাঞ্চল পানিতে তলিয়ে আছে।
অভিযোগ রয়েছে, বিগত সরকারের সময়ে অপরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা, ড্রেনের কাজ সময়মতো শেষ না করা, রূপসার পাম্প হাউস বন্ধ থাকা এবং স্লুইস গেটগুলো অকেজো থাকায় নগরে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে। উন্নয়নের নামে ড্রেনগুলোর বেড উঁচু করে ফেলায় বাড়িগুলো নিচু হয়ে গেছে। ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই রাস্তা ও বাড়ির নিচতলা ডুবে যাচ্ছে।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দৌলতপুর, খালিশপুর, বয়রা, মুজগুন্নি ও কবির বটতলা এলাকার পানি কারিকরপাড়া খাল হয়ে ময়ূর নদে যাওয়ার কথা। কিন্তু দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় এই পানি ঠিকমতো প্রবাহিত হতে পারছে না। এর ওপর বৃষ্টির সঙ্গে রূপসা নদীতে জোয়ার এলে নদীর পানি নালা দিয়ে উল্টো শহরের ভেতরে ঢুকে পড়ে স্ট্যান্ড রোড, চানমারী, কেএমপি সদরদপ্তর এলাকা ও দাদা ম্যাচ ফ্যাক্টরি সড়ক প্লাবিত করছে।
নগরীর এই দুর্বিষহ অবস্থার জন্য সিটি করপোরেশনের দূরদর্শিতার অভাব, পরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা না থাকা, খাল-বিল দখল আর সঠিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অভাবকে দায়ী করছেন নগরবাসী। তারা বলছেন, শুধু ড্রেন নির্মাণ করলেই হবে না, নিয়মিত পরিষ্কার করতে হবে। বর্জ্য পড়ে অধিকাংশ নতুন ড্রেন ভরাট হয়ে গেছে। এ বিষয়ে কেসিসির নজরদারি কম। বিপুল অর্থ ব্যয় হলেও সঠিকভাবে তদারকির অভাবে তা কাজে আসছে না।
কেসিসি সূত্র বলছে, বর্তমানে খুলনার ২২টি খালের মধ্যে ১৬টির দায়িত্বে রয়েছে কেসিসি এবং বাকি ছয়টির দায়িত্বে রয়েছে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড। শহরের ড্রেনের মোট দৈর্ঘ্য ৬৪২ দশমিক ১৮ কিলোমিটার। পরিবেশবাদী সংগঠন বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) সূত্রে জানা যায়, খুলনার ৩১টি ওয়ার্ডে একসময় ১৭১টি পুকুর ছিল। কেডিএর তথ্য অনুযায়ী, ড্যাপের মানচিত্রে নগরের ৩১টি ওয়ার্ডে ২৯৮টি জলাশয় ছিল। এর মধ্যে ৮০টি জলাশয়ের অস্তিত্ব নেই। ২৭টি জলাশয় আংশিক ভরাট হয়েছে। বাকিগুলো নামমাত্র টিকে আছে।
খুলনা শহরের জলাবদ্ধতা অবশ্য নতুন সমস্যা নয়। ২০০৮-১৩ সালে তৎকালীন মেয়রের প্রথম মেয়াদের শেষ দিকে শতকোটি টাকার নগর অঞ্চল উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছিল। এরপর ২০১৮ ও ২০২৩ সালের নির্বাচনী প্রচারণায়ও জলাবদ্ধতা নিরসন ছিল তার অন্যতম প্রধান প্রতিশ্রুতি। পরে ৮২৩ কোটি টাকার জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্প অনুমোদন হয়। এই প্রকল্পের আওতায় গত সাড়ে পাঁচ বছরে প্রায় দুই শতাধিক নালা নির্মাণ এবং ময়ূর নদসহ সাতটি খাল খননের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। এ পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে প্রায় ৭৫০ কোটি টাকা। তবুও নগরবাসীর অভিযোগ, প্রকল্পের অধীনে দৃশ্যমান অবকাঠামো তৈরি হলেও বৃষ্টির দিনে তার সুফল মিলছে না।
খুলনা সিটি করপোরেশনের কনজারভেন্সি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, নগরীতে নালার মোট দৈর্ঘ্য ১ হাজার ১৬৫ কিলোমিটার। মেগা প্রকল্পের আওতায় নির্মিত অধিকাংশ নালা ঢাকনাযুক্ত। কিন্তু এসব নালা পরিষ্কারের কোনো স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা না থাকায় ম্যানুয়ালি পরিষ্কার করতে হয়। ফলে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ সম্ভব হচ্ছে না।
নগরীর শিববাড়ি এলাকার বাসিন্দা রানা মল্লিক বলেন, রাতের সামান্য বৃষ্টিতেই রোডে পানি জমে গেছে। সম্প্রতি সড়কের দুই পাশে নতুন ড্রেন নির্মাণ করা হয়েছে। এর পরও পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। এই এলাকার বাড়ির ভেতরের পানি কোনোভাবেই সড়কের ড্রেনে আসে না। সিটি করপোরেশন যে ড্রেন বানিয়েছে, তা বাড়ি থেকে অনেক উঁচুতে। এতে বাড়ির ভেতর জমে থাকা পানি কোনোভাবেই ড্রেনে যায় না।
বয়রা মুজগুন্নি আবাসিক এলাকার সোনিয়া বলেন, বৃষ্টির কারণে গরম কিছুটা কমলেও বাসার আশপাশ দিয়ে পানি জমে গেছে, যে কারণে চলাচল করতে খুবই ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে। এমনকি এই সড়কগুলো দিয়ে গাড়িও চলাচল করছে না।
তিনি আরও বলেন, বাসা থেকে মেইন সড়ক পর্যন্ত আসতে হাঁটু সমান পানির মধ্য দিয়ে আসতে হচ্ছে। অথচ মুজগুন্নি আবাসিক একটা ভিআইপি এলাকা। এখানে অনেক সরকারি অফিস, পুলিশের কার্যালয়সহ অনেক ভিআইপি অফিস আছে। সেসব অফিসের সামনে দিয়েও পানি বেধে গেছে।
কবির বটতলা এলাকার বাসিন্দা সায়েম বলেন, এক সময় কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বৃষ্টির পানি নেমে যেত। এখন মাঝারি বৃষ্টিতেই দিনের পর দিন পানি জমে থাকে। ড্রেন হয়েছে, কালভার্ট হয়েছে, কিন্তু জলাবদ্ধতা কমেনি। আমাদের মতো খেটে খাওয়া মানুষের জন্য এটি এখন স্থায়ী দুর্ভোগ। বৃষ্টি হলেই কাজ কমে যায়, আয়ও কমে যায়।
খুলনা সিটি করপোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী মশিউজ্জামান খান বলেন, জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের অনেক কাজ শেষ হলেও কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজ এখনও বাকি রয়েছে। বিশেষ করে, পাম্প স্টেশন ও স্লুইসগেট সংস্কারের কাজ বাকি। এ কাজ সম্পন্ন হলে প্রকল্পের পূর্ণ সুফল পাওয়া যাবে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) বিভাগীয় সমন্বয়কারী মাহফুজুর রহমান মুকুল বলেন, ময়ূর নদ খনন করা হলেও পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ না হওয়ায় নদীর পাড়ে ফেলে রাখা মাটি আবার বৃষ্টির পানিতে নদীতে ফিরে যাচ্ছে। একই সঙ্গে আলুতলা গেট খুলে ময়ূর নদকে রূপসা নদীর সঙ্গে কার্যকরভাবে সংযুক্ত করা গেলে পানি নিষ্কাশন অনেক সহজ হবে।
খুলনা সিটি করপোরেশনের (কেসিসি) প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু বলেন, অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং অপর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থার কারণে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। বছরের পর বছর ধরে জমে থাকা এসব সমস্যার সমাধান একদিনে সম্ভব নয়। জলাবদ্ধতা নিরসনে প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে। বিগত সরকারের আমলে নগরের জলাবদ্ধতা সমস্যার গভীরে কেউ যায়নি। গত সাড়ে তিন মাসে আমরা সমস্যাগুলো চিহ্নিত করেছি। কিন্তু চ্যালেঞ্জটা এমন যে এখনই কাজ শুরু করলে তা শেষ করতে আরও এক-দেড় বছর লাগবে।
What's Your Reaction?